Advertisement
২৫ জুন ২০২৪
CRY

শিশু দিবসে কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারতের শৈশব

দেশের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ আমরা। অথচ সব ক্ষেত্রেই লড়াই করতে হচ্ছে আমাদের অধিকার নিয়ে। নির্যাতন, শোষণেরও শিকার আমরাই। শিশু দিবসে কি এই কথাগুলোই বলছে আমাদের দেশের অভিমানী, ক্ষুধার্ত শিশু কণ্ঠগুলো?

নিজস্ব প্রতিবেদন
শেষ আপডেট: ১৪ নভেম্বর ২০১৬ ১৬:৫৭
Share: Save:

দেশের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ আমরা। অথচ সব ক্ষেত্রেই লড়াই করতে হচ্ছে আমাদের অধিকার নিয়ে। নির্যাতন, শোষণেরও শিকার আমরাই। শিশু দিবসে কি এই কথাগুলোই বলছে আমাদের দেশের অভিমানী, ক্ষুধার্ত শিশু কণ্ঠগুলো? এই মুহূর্তে দেশের শৈশবের ১০ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরল চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড ইউ বা ক্রাই।

১। নিজের দেশে আমি নিরাপদে থাকতে চাই: গত ১০ বছরে শিশুদের ওপর অপরাধের হার ৫০০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। ২০০৫ সালে যে অপরাধের সংখ্যা ছিল ১৪,৯৭৫, ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪,১৭২। উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে আমাদের আর্থিক ও মানবসম্পদ বাড়াতে হবে। যা শিশুদের প্রতি অবহেলা, নির্যাতন, সন্ত্রাস ও শোষণ রুখতে সাহায্য করবে। এমন একটা সমাজ গড়ে তুলতে হবে যা শিশুদের প্রতি কোনও রকম অপরাধ সহ্য করবে না।

২। বিয়ে করার আগে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই: ২০০১ সালে যেখানে ১৪ বছরের নীচে ৬৬,৬৪৯ জন নাবালিকার বিয়ে হয়েছিল, ২০১১ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯,১৮,৭৭৪। অর্থাত্, এক দশকে ৩৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে এই সব নাবালিকাকে সন্তান ধারণও করতে হয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই। এই মুহূর্তে দেশে ১৪ বছর কম বয়সে এক বা একাধিক সন্তানের মা হওয়া নাবালিকার সংখ্যা ৪,৫৭,০০৫ জন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা আরও সহজলভ্য করতে হবে। যাতে কেউ শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে বাবা, মায়ের ভার লাঘব করতে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য না হয়।

৩। আমি শৈশব উপভোগ করতে চাই: আমাদের দেশে এই মুহূর্তে ১ কোটি শিশুশ্রমিক রয়েছে। গত ১০ বছরে এই হার মাত্র ২.২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সেই সঙ্গেই ৫-৯ বছর বয়সী শিশুশ্রমিকের হার ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৫-১৮ বছর বয়সী শ্রমিকের সংখ্যা ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাত্, প্রতি চার জন শিশুর এক জন শিশুশ্রমে বাধ্য হয়েছে। শৈশব থেকেই অন্নসংস্থানের জন্য ভাবতে হওয়ায় শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। ফলে আমাদের দেশের ৭-১৪ বছর বয়সী ১৪ লক্ষ শিশুশ্রমিক নিজেদের নামও স্বাক্ষর করতে পারে না।

৪। আমি ক্ষুধার্ত ঘুম চাই না: বিশ্বে অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগা শিশুর সংখ্যায় ভারতের স্থান প্রথম সারিতে। ২০০৫-০৬ সালে দেশের ৫ বছরের কমবয়সী শিশুর ৭০ শতাংশ ছিল অপুষ্টিজনিত রোগের শিকার। ২০১৫-১৬ সালে দেশের ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই হার ৩৮-৭৮ শতাংশের মধ্যে। বহু জটিল কারণে অপুষ্টির শিকার হচ্ছে শিশুরা। অপুষ্টির প্রকোপ রুখতে কিশোরী, গর্ভবতী মহিলা ও স্তন্যদায়ী মায়েদের সঠিক পুষ্টির ওপর জোর দিকে হবে। সেই সঙ্গেই জন্মের পর প্রতিটা শিশুর পুষ্টির প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৫। আমি সুস্থ জীবন চাই: এক মাত্র সুস্বাস্থ্য বজায় থাকলেই শিশুরা পড়াশোনা ও সামগ্রিক জীবনে বিভিন্ন দিক বজায় রাখতে পারবে। আমাদের লক্ষ্য ১০০ শতাংশ ভ্যাক্সিনেশন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা সেই লক্ষ্যের ধারেকাছেও পৌঁছতে পারিনি। দেশের ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের রিপোর্ট বলছে ভ্যাক্সিনেশনের হার ঘোরাফেরা করছে ৫৩-৮৪ শতাংশের মধ্যে। এ ক্ষেত্রে এমন এক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যা প্রতিটা শিশুকে এই সুবিধা দিতে পারবে।

৬। আমার চিকিত্সা প্রয়োজন: শিশুদের পর্যাপ্ত চিকিত্সার প্রয়োজনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিত্সকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। গ্রামীণ ভারতে এখনও পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশু বিশেষজ্ঞের অভাব। ২০০৫ সালে প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ৫০ শতাংশ শিশু বিশেষজ্ঞ ছিলেন গ্রামীণ ভারতের হাসপাতাগুলোতে। ২০১৫ সালে সেই হার ৮২শতাংশ হলেও ঘাটতি এখনও মেটেনি।

৭। আমার অস্তিত্বের পরিচিতি চাই: প্রতিটা শিশুর বার্থ সার্টিফিকেট চাই। এটা যেমন শিশুর বৈধ পরিচয়পত্র, তেমনই স্কুলে ভর্তিক ক্ষেত্রেও এই বার্থ সার্টিফিকেট প্রয়োজন। জন্মের বৈধ নথিভুক্তিকরণ বাড়লেও ২০১৩ সালের রিপোর্ট বলছে তখনও ২ কোটি ২৫ লক্ষ শিশুর বার্থ সার্টিফিকেট ছিল না।

৮। আমি মেয়ে, আমাকে বাঁচার অধিকার দাও: ২০১১ সালের আদমসুমারী বলছে দেশে ছেলে:মেয়ে অনুপাত কমে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি ১০০০ জন ছেলের অনুপাতে মেয়ের সংখ্যা ৯১৪। যা ভারতের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। কন্যাসন্তানের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলার কাজে আমাদের সকলকে একযোগ কাজ করতে হবে। কন্যাসন্তানকে সমান অধিকার দেওয়ার বদলে এখনও তাকে বোঝা হিসেবে দেখা হয় ভারতে।

৯। আমি স্কুলের পাঠ শেষ করতে চাই: ভারতে স্কুলে ভর্তি হওয়া প্রতি ১০০০ জন শিশুর মধ্যে মাত্র ৭২ জন স্কুল অষ্টম শ্রেণির গণ্ডি পেরোতে পারে। মাত্র ৪৮ মাধ্যমিক স্তর ও ৩৩ জন সঠিক বয়সে উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করতে পারে। প্রতিটা শিশুর শিক্ষার অধিকার আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত্।

১০। আমাদের সাহায্য করো: ২০০১ সালে আমাদের দেশের শিশুর সংখ্যা ছিল ৪৫ কোটি। এখন যা দাঁড়িয়েছে ৪৭.২১ কোটি। যা ভারতের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। শিশুদের সব রকম অধিকার থেকেই আমাদের দেশ বঞ্চিত। দেশের আর্থিক বাজেটে শিশুদের খাতে যে পরিমাণ ধার্য করা হত তার উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে ২০১২-১৩ আর্থিকবর্ষ থেকে। ২০১৬-১৭ আর্থিক বর্ষে যা দাঁড়িয়েছে বাজেটের ৩.৩২ শতাংশ।

ক্রাই-এর পলিসি, রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ডিরেক্টর কোমল গানোত্রা জানাচ্ছেন, ‘‘সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার কাছে আমাদের আবেদন শিশুদের অধিকারের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিন। আজ একজন শিশুর খাতে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে আমাদের দেশ দারিদ্র, অপুষ্টি ও নির্যাতনের মতো বিষয়গুলো কাটিয়ে উঠতে পারবে।’’

গত ৩০ বছর ধরে শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে ক্রাই।

আরও পড়ুন: শিশু দিবসে জেনে নিন কী ভাবে সন্তানের প্রিয় বন্ধু হতে পারেন

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

অন্য বিষয়গুলি:

Child Right CRY
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE