পোলিয়োর পর এ বার দেশকে ২০২০ সালের মধ্যে হাম ও রুবেলা মুক্ত করতে উদ্যোগী হল কেন্দ্র। লক্ষ্য ছুঁতে হাতে নেওয়া হয়েছে দেশ জুড়ে টিকাকরণ কর্মসূচি। ন’মাস থেকে ১৫ বছর বয়সি মোট ৪১ কোটি ছেলেমেয়েকে টিকাকরণের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক।

ইতিমধ্যেই পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে ওই টিকাকরণ কর্মসূচি শুরু হয়ে গিয়েছে। অতীতে পোলিয়ো দমনের ক্ষেত্রে উত্তর-পূর্ব ভারতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল ত্রিপুরা। এ বারও হাম ও রুবেলা নিয়ন্ত্রণে ত্রিপুরাকে সামনে রেখে এগোতে চাইছে কেন্দ্র। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ত্রিপুরা জুড়ে শুরু হচ্ছে ওই টিকাকরণ অভিযান। বর্তমানে হাম প্রতিরোধের জন্য দুই ডোজের টিকা চালু থাকলেও, ২০১৫ সালে গোটা দেশে প্রায় ৪৯ হাজার ২০০টি শিশু হাম ও রুবেলার সংক্রমণে মারা যায়। হামের কারণে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে বহু শিশু। পোলিয়ো মুক্তি অভিযানের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এই দু’টি রোগকে দেশ থেকে মুছে ফেলতে তৎপর হয়েছে কেন্দ্র ও ইউনিসেফ। নতুন ব্যবস্থায় দুই ডোজের পরিবর্তে একটি টিকাই হাম-রুবেলা দু’টি রোগ থেকেই শিশুদের সুরক্ষা দেবে। রুবেলা ভ্যাকসিনের প্রয়োজনিয়তা ব্যাখ্যায় ইউনিসেফের চিকিৎসক (অসম) তুষার রাণে জানান, ‘‘হামের মতোই রুবেলার সংক্রমণ হয় ভাইরাস থেকে। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে রুবেলার সংক্রমণ হলে গর্ভস্থ শিশুর জিনগত বিকৃতি হতে পারে। নবজাতকের চোখে ছানি, কানে না শোনা, মস্তিষ্ক বিকৃতি বা হৃদ্‌যন্ত্রজনিত সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গর্ভপাত বা মৃত সন্তান প্রসব হয়ে থাকে।’’

এক মাসের ওই টিকাকরণ অভিযানের প্রথম দু’সপ্তাহে প্রতিটি বিদ্যালয়-অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র থেকে ও শেষে বাড়ি বাড়ি ঘুরে টিকা দেওয়া হবে। তার আগে জনসচেতনতা বাড়াতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক, ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে আগরতলায় টিকাকরণ সংক্রান্ত সম্মেলনের আয়োজন করে ত্রিপুরা সরকার। অনুষ্ঠানে এ রাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের অধিকর্তা এস এন চৌধুরী (মেম্বার সেক্রেটারি) বলেন, ‘‘টিকাকরণ প্রশ্নে এখনও নানা সংস্কার রয়েছে। নিম্ন বর্গে তো বটেই শহরের নামি স্কুলও সংস্কারের বাইরে নয়। তাই সব পক্ষকে এক যোগে এগোতে হবে।’’ সংখ্যালঘু সমাজে টিকাকরণ নিয়ে নানাবিধ সংস্কার থাকায় মাস দু’য়েক আগে থেকেই মসজিদ-মাদ্রাসাগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রচারে নামে ত্রিপুরা সরকার। আগরতলার দক্ষিণ ইন্দ্রনগর এলাকায় ইমাম ফরিদউদ্দিনের কথায়, ‘‘গরিব মানুষের স্বার্থেই ওই টিকাকরণ— এটাই আমি আম জনতাকে বোঝাই।’’ পোলিয়ো টিকাকরণের সময়ে দ্বিধা থাকলেও, এ বার নিজেরাই ছেলেমেয়েদের টিকা দিতে এগিয়ে এসেছেন মঞ্জু ধর, রাবেয়ারা। তাঁদের কথায়, ‘‘পোলিয়োর সময়ে নানা কথা প্রচার হয়েছিল। ছেলেমেয়েরা সুস্থ থাকায় মনে ভরসা এসেছে। এ বার নিজেরাই এগিয়ে এসেছি।’’

সচেতনার প্রশ্নে সমাজের তথাকথিত উচ্চবর্গের একাংশও যে বেশ পিছিয়ে, তা মানেন মেডিক্যাল অফিসার ইশিতা গুহ। তাঁর কথায়, ‘‘বিত্তশালীরা গণ টিকাকরণে বাচ্চাদের না পাঠিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে অর্থের বিনিময়ে তা করান। এ বার তাই আগরতলার সমস্ত শিশু চিকিৎসক বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছেন বেসরকারি হাসপাতালেও ওই টিকাকরণে সরকারি ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হবে। তা-ও বিনামূল্যে। ফলে কিছুটা হলেও সরকারি ব্যবস্থার উপরে আস্থা ফিরেছে উচ্চবিত্তদের।’