দলীয় দফতর থেকে সিবিআই আদালত— দিনভর প্রশ্নটা তুললেন কংগ্রেস নেতারা। পি চিদম্বরমের দলীয় সহকর্মী তথা আইনজীবী কপিল সিব্বল, অভিষেক মনু সিঙ্ঘভিরা বললেন, শুধুমাত্র ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়ের বয়ানের উপরে ভিত্তি করে কী ভাবে আইএনএক্স দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন অর্থমন্ত্রীকে অভিযুক্ত করল সিবিআই এবং ইডি? 

কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্য, ইন্দ্রাণী নিজের মেয়েকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত। আইএনএক্স মামলায় অভিযুক্তদের তালিকায় প্রথম নাম তাঁরই। এমন এক জনের বয়ানের মূল্য কতটা? তা ছাড়া, প্রাক্তন মিডিয়া ব্যারন পিটার মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী (এখন বিচ্ছেদ মামলা চলছে) ইন্দ্রাণী ইডি-কে বয়ান দিয়েছিলেন ২০১৭ সালে। সেই বয়ান নিয়ে এত দিন পরে গোয়েন্দারা নড়ে বসলেন কেন? কেন ইন্দ্রাণীকে হঠাৎ রাজসাক্ষী করা হল? এক কংগ্রেস নেতার কটাক্ষ, ‘‘সত্যিই কি ইন্দ্রাণীর বয়ানে ঘায়েল হলেন চিদম্বরম? নাকি ইন্দ্রাণীকে দিয়ে দেওয়ানো বয়ানে নিশানা করা হল তাঁকে?’’ 

ইডি-কে দেওয়া বয়ানে ইন্দ্রাণী বলেছিলেন, তাঁদের সংস্থা আইএনএক্স মিডিয়ায় বিদেশি লগ্নি আনার জন্য ফরেন ইনভেস্টমেন্ট প্রোমোশন বোর্ড (এফআইপিবি)-এর অনুমোদন দরকার ছিল। ২০০৮ সালে নর্থ ব্লকের অফিসে বসে তাঁকে এবং পিটারকে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী চিদম্বরম বলেছিলেন, কার্তির ব্যবসায় টাকা ঢাললে সেই অনুমোদন মিলবে। এর পরে দিল্লির একটি পাঁচতারা হোটেলে দেখা করে কার্তি তাঁদের একটি বিদেশি অ্যাকাউন্টে ১০ লক্ষ ডলার জমা করতে বলেছিলেন। আজ যদিও কার্তি দাবি করেন, ইন্দ্রাণীকে তিনি প্রথম দেখেন মুম্বইয়ের জেলে, যখন তাঁদের মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা হয়েছিল। এর বাইরে কখনওই মুখোপাধ্যায় দম্পতিকে তিনি দেখেননি। 

আইএনএক্সের কাছে ৪.৬২ কোটি টাকা বিদেশি লগ্নি আনার অনুমতি ছিল। অভিযোগ, এই ঊর্ধ্বসীমা পেরিয়ে ইউপিএ জমানায় ৩০৫ কোটি টাকা বিদেশি লগ্নি এনেছিল সংস্থাটি। ইন্দ্রাণীর বয়ান অনুযায়ী, বিদেশি লগ্নি আনতে চেয়ে এফআইপিবি-র কাছে তাঁরা যে আবেদনপত্র পাঠিয়েছিলেন, সেটিতে ‘অসঙ্গতি’ রয়েছে বলে জানানো হয়। পিটার ঠিক করেন, বিষয়টি মিটমাট করতে চিদম্বরমের কাছে যাবেন। ইন্দ্রাণীর বয়ান বলছে, ‘‘পিটার ওই আবেদনপত্রের বিষয়টি দিয়েই কথাবার্তা শুরু করেন। সেটির একটি প্রতিলিপি দেন। গোটা বিষয়টি বোঝার পরে চিদম্বরম বলেন, বিদেশে টাকা পাঠিয়ে কার্তির ব্যবসায় সাহায্য করতে হবে। তার বিনিময়েই মিলবে এফআইপিবি-র অনুমোদন।’’ 

ইন্দ্রাণীর দাবি, এর পরেই কার্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ। কার্তি সবই জানতেন। তিনি তাঁর নিজের বা কোনও সহযোগীর বিদেশি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১০ লক্ষ ডলার জমা দিতে বলেন। পিটার তাঁকে জানান, বিদেশে লেনদেন সম্ভব নয়। কার্তি তখন ‘চেস ম্যানেজমেন্ট’ এবং ‘অ্যাডভান্টেজ স্ট্র্যাটেজিক’ নামে দু’টি সংস্থাকে টাকা দিতে বলেন। এ-ও বলেন, ওই দুই সংস্থা বলবে, তারা আইএনএক্সের পরামর্শদাতা। ইন্দ্রাণী বলেছেন, লেনদেনের বিষয়টি পুরোপুরি পিটার দেখছিলেন। ফলে কত টাকা দেওয়া হয়েছে, তিনি জানেন না। কার্তির এই দুই সংস্থার মধ্যে চেস ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে এফআইপিবি-র অনুমোদন নিয়ে কথা হয়। তবে অ্যাডভান্টেজ স্ট্র্যাটেজিক কনসাল্টিং প্রাইভেট লিমিটেড কোনও পরিষেবা দেয়নি আইএনএক্স-কে। 

ইডি-র যদিও দাবি, ওই অনুমোদন সংক্রান্ত বিষয়েই ৯.৯৬ লক্ষ টাকার চেক অ্যাডভান্টেজ স্ট্র্যাটেজিককে দিয়েছিল আইএনএক্স। জবানবন্দিতে পিটারও বলেছেন, ওই টাকা কার্তির চাওয়া টাকারই অংশ। অনুমোদন যাতে আটকে না-থাকে, তা নিশ্চিত করতে চিদম্বরমের সঙ্গে দেখা করেছেন তিনি। আর চিদম্বরমও তখন বলেছেন, তাঁর ছেলের ব্যবসার কথা মাথায় রাখতে এবং বিদেশে টাকা পাঠাতে। এর পরেই কার্তির সঙ্গে সাক্ষাতের কথা বলেছেন পিটার। আর এই সব কথাই অস্বীকার করেছেন চিদম্বরম পিতা-পুত্র।