ভোটে অসমের খবর একটাই
নাজিরুল এখানকার অধিবাসী, অরুণ এখানকার পার্টটাইম বাসিন্দা— কেউই এনআরসি করাননি। এগুলো তো সব উটকো লোকদের আটকাতে, আসল বাসিন্দাদের কোনও সমস্যা হবে না।
vote

প্রতীকী ছবি।

নাজিরুল মিঞা চার দশক ধরে গুয়াহাটি শহরের পানবাজারে মুদির দোকান চালাচ্ছেন। এত দিন? কখনও অসুবিধে হয়নি, বাঙালি বলে? স্মিত মুখে প্রৌঢ়ের উত্তর, না না, তাঁর দোকান বছরে এক দিনও বন্ধ থাকে না। মোদীকে তিনি পুরো নম্বরই দেবেন, দেশের জন্য কত কী করছেন। অসমের বিজেপি সরকার অবশ্য বেশি কাজ করেনি। রাস্তাঘাটের চেহারা দেখছেন না? তা ছাড়া, সরকারি চাল সস্তায় দিয়ে লাভ হচ্ছে কেবল ভুয়ো কার্ড-ওয়ালাদের। আসল গরিবদুঃখীর কাছে কি পৌঁছচ্ছে সে সব? 

অমনি শুরু হইচই তর্ক। দোকানে যাঁরা মাল নিতে বা নামাতে এসেছিলেন, সকলে যোগ দিয়ে ফেললেন। আরে, মানুষ দুর্নীতি করলে তার দায়ও কি সরকারের? কম ঝক্কি মেটাচ্ছে এই সরকার? কলকাতায় পরিবার রেখে অরুণবাবুর অনেক কাল গুয়াহাটিতে ব্যবসা। তাঁর জোরালো মত: বেশি কথা কী, পশ্চিমবঙ্গের থেকে অনেক ভাল অবস্থা অসমের। ডিসেম্বরে পঞ্চায়েত ভোট হল, একটা জায়গাতেও অশান্তি হয়েছে?  

নাজিরুল এখানকার অধিবাসী, অরুণ এখানকার পার্টটাইম বাসিন্দা— কেউই এনআরসি করাননি। এগুলো তো সব উটকো লোকদের আটকাতে, আসল বাসিন্দাদের কোনও সমস্যা হবে না।— কিন্তু এখন যে শুনছি ভূমিপুত্র বা ‘খিলঞ্জিয়া’ না হলে মুশকিল, চিন্তা হচ্ছে না দেখেশুনে? মিটিমিটি হাসলেন নাজিরুল। ও সব রাজনীতির কথা। আমরা কত দিনের লোক, এরা সক্কলে জানে। অন্যরা বলে উঠলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, এদের দোকানই তো সবচেয়ে পুরনো। ‘সমস্যা একটাই। বিজনেস পারমিটের জন্য এনআরসি চাইবে কি না, দেখা যাক।’  

বাঙালি ‘ভদ্রলোক’ সমাজের থেকে অসমিয়া সমাজের অনেক কাছাকাছি থাকেন নাজিরুলরা। তাই কি এনআরসি দুশ্চিন্তায় অত কাতর নন? বিজেপি নিয়েও মোটামুটি নিশ্চিন্ত?

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

কে জানে। এ তো শুধু গুয়াহাটি শহরের কথা। গোটা অসম জুড়ে কিন্তু এনআরসি ও নাগরিকত্ব বিল অসমের সমাজে ধর্মীয় মেরুকরণ আগের থেকে অনেকটা বাড়িয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে ভোট ভাগের সম্ভাবনাও বেড়েছে। বিজেপি, কংগ্রেস এবং বদরুদ্দিন আজমলের নেতৃত্বে মুসলিমপ্রধান দল এআইইউডিএফ, প্রত্যেকের এক স্ট্র্যাটেজি। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় যেখানে সংখ্যালঘু ভোট বেশি, সেই সব জায়গায় বিরোধীদের তাই বোঝাপড়া চলছে: বিজেপি-বিরোধী ভোট 

যাতে ভাগাভাগি না হয়। এআইইউডিএফ মাত্র তিনটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে, কাছাড়ের করিমগঞ্জ-হাইলাকান্দি, ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার ধুবড়ি আর বরপেটা— তিনটিতেই নাকি তাদের জেতার সম্ভাবনা ভাল। বাকি আসনে কংগ্রেসের পিছনেই তাঁদের সমর্থন। 

সম্ভবত সেই কারণেই, নগাঁও-এর নেতা, অসম প্রদেশ কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক চিত্ত পালকে অতীব প্রত্যয়ী শোনাল। (এনআরসি বিষয়ে তিনিই প্রথম কলকাতায় সভা করে পশ্চিমবঙ্গের টনক নাড়িয়েছিলেন।) নাগরিকত্ব বিল দিয়ে বিজেপির বাজিমাত হবে না: তাঁর বক্তব্য। ‘এটা তো ‘লং-টার্ম ভিসা’র মতো ব্যাপার! শেষ পর্যন্ত নাগরিকত্ব জুটবে কি না কে জানে?’ কিন্তু সাধারণ মানুষ কি সেটা বুঝছেন? কথাটা মানলেন তিনি। ‘হ্যাঁ, ধর্মের ডোজ পড়েছে ভাল মাত্রায়’, তবু এই নির্যাতন কেউ ভুলবে না। ‘অসমে বিজেপি বাঙালি হিন্দু ও অসমিয়াদের মধ্যে ক্যাব (নাগরিকত্ব বিল) নিয়ে সংঘাত লাগানোর চেষ্টা করছে, বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের মধ্যেও বিরোধিতা তীব্র করছে।’ সুতরাং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা জুড়ে মঙ্গলদৈ নগাঁও কলিয়াবর তেজপুরে তিনি কংগ্রেসের জয়ের আশা দেখছেন। শিলচর তো বটেই। শিলচরেও দেখলাম, অটোওয়ালা, দোকানি, ব্যবসায়ীরা আশা রাখছেন কংগ্রেসেই।

গুয়াহাটির হসপিটাল রোডের হোটেলকর্মী হিতেন্দ্রর অবশ্য স্পষ্টাস্পষ্টি কথা: অসমের হিন্দুরা মুসলিম পার্টির সঙ্গে কংগ্রেসের বোঝাপড়া মোটেই ভাল চোখে দেখছেন না। ‘জানেন, ‘এরা’ এনআরসি-তে জাল কাগজ জমা দিয়ে নাম তুলিয়েছে?’ কী করে? ‘ওদের লোক থাকে, তারা ম্যানেজ করে দেয়।’ কথাটা অবশ্য প্রকারান্তরে আইনজীবীরাও বললেন। 

এই পরিপ্রেক্ষিতেই তো গনগনে মুসলিমদ্বেষের আঁচ ছড়াচ্ছেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মতো বিজেপি নেতারা। বাঙালি হিন্দু অসমিয়া হিন্দুদের এককাট্টা করে কংগ্রেসকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছেন। বদরুদ্দিন আজমলের ‘বোঝাপড়া’র স্বীকৃতিটি তাই কংগ্রেসকে ঝামেলায় ফেলে দিয়েছে। মুসলিমদের সঙ্গে কংগ্রেসের ‘অশুভ আঁতাঁত’ আর তলে তলে অনুপ্রবেশকারীদের তোষণের রব ছড়াতে বিজেপির সুবিধে হয়ে গিয়েছে। অমিত শাহদের ভাষায়: অসম হতে চলেছে ভারতের ‘দ্বিতীয় কাশ্মীর’! আর তাই, কাছাড়ের ডিটেনশন সেন্টার থেকে বেরিয়ে চার-পাঁচ বার সরকারি কেন্দ্রে নাকাল হয়েও, এনআরসি-তে নাম না-ওঠা বৃদ্ধের মুখে শোনা যাচ্ছে নরেন্দ্র মোদীরই জয়গান। যদি পারেন, মোদীই নাকি পারবেন বিপদ থেকে উদ্ধার করতে। কাছাড় কলেজের অধ্যাপকের কথাটা মনে পড়ল: ‘অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, মারবেও বিজেপি বাঁচাবেও বিজেপি।’

আশ্চর্য। কলকাতায় বসে মনে হয়েছিল, বিজেপির উপর এনআরসি-র জন্য বাঙালি চটেছে, আর নাগরিকত্ব বিল-এর জন্য চটেছে অসমিয়ারা। অসমে ঘোরাঘুরি করে মনে হল, পরিস্থিতিটা হয়তো উল্টো— অসমিয়ারা সেই এনআরসি-র উপরই আশা রাখছেন, ভাবছেন যে ক্যাব দিয়ে অসমকে বাঙালি রাজ্য বানানো সহজ নয়। আর উল্টো দিকে বাঙালিরা ভাবছেন, নাগরিকত্ব বিল তাঁদের উদ্ধার করবেই। বিজেপি ফিরে এলে কাজটা হবে তাড়াতাড়ি, বিরোধীরা এলেই বিল শিকেয় ওঠার সম্ভাবনা।

এই সব সাত-পাঁচ জেনেশুনে বরাক-ব্রহ্মপুত্রের রাজ্য ছাড়লাম যখন, মনে হল, এই ভোট-ঋতুতে আসলে অসমের খবর একটাই। ভোটের ফলাফল নিয়ে চুল চিরে লাভ নেই, মানুষ কোন বোতাম টিপবেন দেবা ন জানন্তি। কিন্তু অসমকে আর কেউ উত্তর-পূর্বের ‘প্রান্তিক’ রাজ্য বলে অবহেলা করার সাহস পাবেন না: তার হাতে এখন থেকে ধরা থাকবে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক আখ্যানটার সুতো।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত