বছরখানেক আগেই সিবিআইকে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘তোতাপাখি’ আখ্যা দিয়েছিল যে সুপ্রিম কোর্ট তারাই আজ দক্ষ, দায়বদ্ধ ও সৎ বলে ঢালাও সার্টিফিকেট দিল কেন্দ্রের এই গোয়েন্দা সংস্থার অফিসারদের। পাশাপাশি, সারদা-কাণ্ডে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের কিনারা করতে তারা যে  রাজ্য পুলিশের চেয়ে সিবিআইয়ের উপরেই বেশি ভরসা রাখছে, তা-ও জানিয়ে দিয়েছে বিচারপতি টি এস ঠাকুর ও বিচারপতি সি এস নাগাপ্পনের বেঞ্চ। এমনকী, ছোটখাটো অর্থলগ্নি সংস্থার কেলেঙ্কারির তদন্তের দায়িত্ব থেকে সিবিআই সরতে চাইলেও, তাদের সেই আর্জি মানতে রাজি হয়নি শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ। 

সিবিআই আজ সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানায়, শুধু সারদা ও অন্য বড় মাপের বেআইনি আর্থিক সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব রাখা হোক তাদের হাতে। কারণ, প্রতিটি অর্থলগ্নি সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত করার মতো লোকবল বা পরিকাঠামো তাদের নেই। আদালতে তাদের আর্জি ছিল, ছোটছোট সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত করুক পশ্চিমবঙ্গ পুলিশই। কিন্তু বিচারপতিরা জানিয়ে দেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের উপর আদালত ভরসা রাখতে পারছে না। প্রভাবশালীরা তাতে পার পেয়ে যেতে পারে।

গত বছর ৯ মে সিবিআইকে সারদা-সহ অন্যান্য অর্থলগ্নি সংস্থার কেলেঙ্কারির পিছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্র খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। এই কেলেঙ্কারিতে কোন কোন রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি লাভবান হয়েছেন, তারও তদন্ত করতে বলা হয়েছিল। সিবিআইয়ের পক্ষ থেকে এ দিন আদালতকে বলা হয়, ছোট ছোট সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত নিয়ে মাথা ঘামাতে গেলে বৃহত্তর ষড়যন্ত্র থেকে নজর সরে যেতে পারে।

বিচারপতিরা অবশ্য এই যুক্তি মানতে চাননি। তাঁদের আশঙ্কা, আর্থিক হিসেবে ছোট মাপের কেলেঙ্কারি ভেবে ক্ষুদ্র সংস্থাগুলিকে ছাড় দিলে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের ছবিটা পুরোপুরি ধরা না-ও পড়তে পারে। তাতে তদন্তেরই ক্ষতি। বিচারপতি ঠাকুর এই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার আইনজীবী সলিসিটর জেনারেল রণজিৎ কুমারের উদ্দেশে বলেন, ‘‘সিবিআই অফিসারদের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সততা সর্বজনবিদিত। আপনাদের দক্ষ অফিসার রয়েছে। তাই এই তদন্ত আপনারাই করুন।’’

কেন রাজ্য পুলিশের উপরে তাঁদের ভরসা নেই, সেটাও পরিষ্কার করে দিয়েছেন বিচারপতি ঠাকুর।  তাঁর কথায়, ‘‘ছোট সংস্থার কেলেঙ্কারিতেও রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ বা নিয়ন্ত্রক সংস্থারা জড়িত থাকতে পারেন। সিবিআই সরে দাঁড়ালে রাজ্য পুলিশ সে সবের তদন্তে যাবে না। তাই সব মামলারই তদন্তের জন্য সিবিআইয়ের বাড়তি কী কী পরিকাঠামো প্রয়োজন, আরও কত লোকবল দরকার, তা সিবিআই জানাক।’’

গোটা বিষয়টি নিয়ে যে তাঁরা চিন্তিত তা বোঝাতে বিচারপতি ঠাকুর বলেন, ‘‘ব্যাঙের ছাতার মতো এই সব ভুঁইফোড় সংস্থা গজিয়ে ওঠা চলতে দেওয়া যায় না। আমরা চোখ বুজে বসে থাকতে পারি না। তদন্ত আপনারাই করুন। রাজ্য পুলিশ আপনাদের সাহায্য করবে।’’ 

সিবিআইয়ের অন্য আইনজীবী অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল মনিন্দর সিংহ জানান, দিল্লির মতো পশ্চিমবঙ্গে সিবিআইয়ের বিশেষ আদালত নেই। সিবিআইয়ের আইনজীবীর সংখ্যাও কম। বিচারপতি ঠাকুর বলেন, ‘‘কী কী প্রয়োজন, তা দু’সপ্তাহের মধ্যে লিখিত ভাবে সিবিআই জানাক।’’ বিচারপতিরা জানতে চান, রাজ্য সরকার তদন্তে পুরোপুরি সহযোগিতা করছে কি না। মনিন্দর জবাবে বলেন, ‘‘আগে রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার জন্য সিবিআইয়ের তদন্তে সমস্যা হয়েছে।’’ এ রকম কোনও কারণে ভবিষ্যতে যাতে তদন্তে ব্যাঘাত না ঘটে, তার জন্য সুপ্রিম কোর্ট কয়েকটি প্রস্তাবও দিয়েছে এ দিন। বিচারপতিরা জানান, তদন্তে সিবিআইকে সাহায্য করার জন্য রাজ্য সরকারকে একটি বিশেষ দল তৈরির নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে কলকাতায় বিশেষ সিবিআই আদালত তৈরির জন্যও  হাইকোর্ট ও রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিতে পারে সর্বোচ্চ আদালত।

সারদা-কাণ্ডের তদন্তে সিবিআই যে বিশেষ তদন্তকরী দল গঠন করেছে তার প্রধান রাজীব সিংহ আজ শুনানির সময় আগাগোড়া এজলাসে ছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট আজ যে ভাবে সিবিআই অফিসারদের দক্ষতা, সততা ও দায়বদ্ধতার প্রশংসা করেছে, তাতে বাহিনীর মনোবল অনেকটাই বাড়বে বলে মনে করছেন সিবিআইয়ের কর্তারা। সিবিআইয়ের এক পদস্থ কর্তা বলেন, ‘‘সর্বোচ্চ আদালতের এই মন্তব্যে আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। সুপ্রিম কোর্ট অন্য একটি মামলায় আমাদের সংস্থাকে কেন্দ্রীয় সরকারের তোতাপাখি বলে মন্তব্য করার পরে আমাদের অফিসারদের নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হজম করতে হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও অন্য নেতারা সারদা-কাণ্ডের তদন্ত হাতে নেওয়ার পরে আমাদের বিঁধতে ছাড়েননি। সুপ্রিম কোর্ট আজ আমাদের সম্মান ফিরিয়ে দিল।’’

সুপ্রিম কোর্টের ওই মন্তব্যে তৃণমূল নেতারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টপাধ্যায় বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট কী বলেছে তা জানি না। না জেনে মন্তব্য করব না।’’

যাঁর দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল, সেই আবেদনকারী আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘আমরা চাই, সব মামলারই তদন্ত করুক সিবিআই। সিবিআই তদন্তের জাল আরও বিস্তৃত হোক। আদালতে আমরা সেই আর্জিই জানাব।’’ কলকাতা হাইকোর্টের এক আইনজীবীর মন্তব্য, ‘‘শুধু সারদা এবং রোজ ভ্যালির বিরুদ্ধে তদন্ত করলে তৃণমূল রাজনৈতিক ভাবে আক্রমণের রাস্তায় যেত। তারা রাজনৈতিক অভিসন্ধির অভিযোগ আনত। রাজ্যের আইনমন্ত্রী-সহ অন্যেরা সিবিআই দফতরের সামনে সেই স্লোগান তুলে বিক্ষোভও দেখিয়েছে। সেই অভিযোগ তোলার পথও বন্ধ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট।’’

সারদা কেলেঙ্কারিতে তৃণমূলের শীর্ষনেতাদের নাম জড়িয়ে যাওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আর্জি ছিল, সিবিআই তদন্তে সুপ্রিম কোর্ট নজরদারি করুক। আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। সেই সময়ই সিবিআই আদালতকে জানায়, যে সব ছোটখাটো অর্থলগ্নি সংস্থার বিরুদ্ধে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, সিবিআই তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রয়োজন বোধ করছে না। এ বিষয়ে সিবিআইকে আদালতে আবেদন জানাতে বলা হয়। আজ বিচারপতি টি এস ঠাকুর এবং বিচারপতি সি এস নাগাপ্পনের বেঞ্চে সিবিআইয়ের পক্ষে সেই আবেদনই করা হয়।

সিবিআইয়ের যুক্তি ছিল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন অর্থলগ্নি সংস্থার বিরুদ্ধে হাজার খানেক এফআইআর দায়ের হয়েছে। এত মামলার তদন্ত করা অসম্ভব। সিবিআই সারদার বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে ৭৬টি মামলাকে একজোট করে ৪টি মামলা দায়ের করেছে। সারদা ছাড়া রোজ ভ্যালি, আই-কোর, এমপিএস-এর মতো সংস্থার বিরুদ্ধে ৭০টি মামলাকে একজোট করে ৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সিবিআইয়ের সুপারিশ, কেলেঙ্কারির অঙ্ক ৫০ লক্ষ টাকার বেশি হলে শুধু সেগুলিরই তদন্ত করুক সিবিআই। বাকি তদন্ত করুক রাজ্য পুলিশই।

বিচারপতি ঠাকুরের বক্তব্য, সিবিআই যদি একান্তই রাজ্য পুলিশের হাতে তদন্তের ভার ছেড়ে দেয়, তা হলে সিবিআইকে সেই তদন্তে নজরদারি করতে হবে অথবা রাজ্য পুলিশকে ‘গাইড’ করতে হবে।

বিচারপতি ঠাকুর প্রশ্ন তোলেন, ‘‘আপনাদের মনে হয় না যে ক্ষুদ্র সংস্থাগুলিকে বাদ দিলে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রর তদন্তের ক্ষতি হতে পারে?’’ এ বিষয়ে রাজ্য সরকার ও সিবিআই তদন্তের আর্জি জানিয়ে জনস্বার্থ মামলা করেছেন যাঁরা, তাঁদের বক্তব্যও জানতে চাওয়া হয়েছে। পরের শুনানি হবে ২৭ এপ্রিল।

*****************************

 

সিবিআইয়ের ভূমিকায় বিস্মিত কোর্ট

কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্তে সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। এই মামলা গুটিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েও আবার কী ভাবে এর একটি বিশেষ দিক সম্পর্কে তদন্ত করা হল, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালত। সিবিআইয়ের প্রাক্তন অধিকর্তা রঞ্জিত সিন্হা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে কয়লার ব্লক বণ্টনের তদন্ত বন্ধ করতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ জানিয়েছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শীর্ষ আদালতে আর্জি জানিয়েছিল তারা। তাদের হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ।

***************************

 

টাকা ফেরতের নির্দেশ সেবির

অর্থলগ্নি সংস্থা মঙ্গলম অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস-কে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দিল সিকিওরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড (সেবি)। ওই নির্দেশে বলা হয়েছে, আমানতের মেয়াদ ফুরনোর পর থেকে যত দিন না টাকা দেওয়া হচ্ছে, তত দিন বার্ষিক ১৫ শতাংশ হারে সুদ গুণতে হবে সংস্থাকে। মঙ্গলম ২০১১-১২ সালে বাজারে অবৈধ ডিবেঞ্চার বিক্রি করে ৪৮২০ জনের কাছ থেকে মোট ১১ কোটি টাকা তুলেছিল। সেবি জানিয়েছে, ৫০ জনের বেশি আমানতকারীর কাছ থেকে টাকা তোলা হলে শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত হতে হয়। কিন্তু মঙ্গলম তা করেনি। সেবি জানায়, মঙ্গলমের তিন ডিরেক্টর আগামী ৪ বছর শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত কোনও সংস্থা বা লগ্নি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন না।