হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে আজ মারা গেলেন দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত। শেষ হয়ে গেল দিল্লির রাজনীতির একটি অধ্যায়। এক প্রবীণ নেতার কথায়, ‘‘দিল্লির বহুত্ববাদী সংস্কৃতিতে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন শীলা। মনে করতেন দিল্লি দিলওয়ালোঁ কি।’’

বছর একাশির শীলা আজ সকালে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। বিকেল চারটে সেখানেই নাগাদ মৃত্যু হয় তাঁর। আজ তাঁর দেহ পূর্ব নিজামুদ্দিনের বাসভবনে রাখা হয়েছে। এ দিন সেখানে যান সনিয়া গাঁধী, নরেন্দ্র মোদী-সহ রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট জনেরা। আগামিকাল তাঁর দেহ কংগ্রেসের সদর দফতরে আনা হবে। পরে নিগমবোধ ঘাটে শেষকৃত্য হবে। 

১৯৩৮-এ পঞ্জাবের কপূরথালায় ক্ষত্রী পরিবারে জন্ম শীলার। ১৯৬২-তে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা উমাশঙ্কর দীক্ষিতের ছেলে বিনোদের সঙ্গে বিয়ে হয় দিল্লির মিরান্ডা হাউস কলেজের প্রাক্তনী শীলার। বিনোদ ছিলেন আমলা। স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ের সঙ্গে ট্রেনে সফরের সময়ে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর।  

ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন শীলা। নিজেই স্বীকার করতেন, তাঁর রাজনীতিতে আসার পিছনে শ্বশুরমশাইয়ের অবদানের কথা। উমাশঙ্করের সঙ্গে কাজ করার সময়েই ইন্দিরা গাঁধীর নজরে পড়েন। মনোনীত হন মহিলাদের অবস্থা নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের কমিশনের সদস্য পদে। 

১৯৮৪ সালে উত্তরপ্রদেশের কন্নৌজ কেন্দ্র থেকে প্রথম লোকসভায় নির্বাচিত হন শীলা। পরে রাজীব গাঁধী জমানায় সংসদীয় প্রতিমন্ত্রী ও পরে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন তিনি। ১৯৮৯ সালের লোকসভা ভোটে কন্নৌজ কেন্দ্রেই হেরে যান শীলা। রাজীবের মৃত্যুর পরে সাত বছর কংগ্রেস রাজনীতিতে গুরুত্ব পাননি তিনি। সনিয়া দলের দায়িত্ব নেওয়ার পরে ফের মূলস্রোতে ফেরেন শীলা। 

১৯৯৮ সালে পূর্ব দিল্লি কেন্দ্রে বিজেপির লালবিহারী তিওয়ারির কাছে হেরে যান শীলা। কিন্তু পরে ওই বছরেই দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হন। ২০১৩ সাল পর্যন্ত দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে শীলা যে রাজধানীর ভোলবদলের কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন সে কথা দলমত নির্বিশেষে সকলেই স্বীকার করেন। দিল্লি মেট্রো থেকে রাজধানীর গণপরিবহণে সিএনজি-চালিত গাড়ির প্রচলনের মতো নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় তাঁর আমলেই। দরিদ্র মানুষ থেকে শুরু করে নাইটক্লাবমুখী উচ্চবিত্ত, আধুনিকমনস্ক শীলা স্বচ্ছন্দ ছিলেন সকলের সঙ্গেই। পূর্ব দিল্লি থেকে সাংসদ হয়েছিলেন তাঁর ছেলে সন্দীপও। 

বিতর্কও পিছু ছাড়েনি। ২০১০ কমনওয়েলথ গেমস কেলেঙ্কারির সময়ে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিপাকে পড়তে হয় শীলাকে। আবার ২০১২ সালে দিল্লিতে নির্ভয়ার গণধর্ষণ ও খুনের পরে প্রবল বিক্ষোভেও কোণঠাসা হয় কেন্দ্র ও দিল্লির কংগ্রেস সরকার। যন্তরমন্তরে ধর্নার সময়ে মোমবাতি জ্বালাতে গিয়েও প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়ে ফিরে আসতে হয় শীলাকে।

কার্যত শীলা জমানার দুর্নীতির অভিযোগকে হাতিয়ার করেই ২০১৩ সালে দিল্লির মসনদ দখল করেন অরবিন্দ কেজরীবাল। ২০১৪ সালে শীলা কেরলের রাজ্যপাল হন। নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পরে রাজ্যপালের পদ থেকে সরে দাঁড়ান শীলা। রাজনীতিকদের মতে, সেই সময়ে ইউপিএ জমানায় নিযুক্ত অনেক রাজ্যপালকে সরাতেই বেগ পেতে হয়েছিল মোদী সরকারকে। কিন্তু তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহের সঙ্গে বৈঠকের পরে সম্মান বজায় রেখে সরে দাঁড়ান শীলা।

বরাবরই সনিয়া ও রাহুল গাঁধীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন শীলা। কংগ্রেস সূত্রের মতে, রাহুলের অনুরোধেই ২০১৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের মুখ হতে রাজি হয়েছিলেন শীলা। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের জেরে কোণঠাসা হয়ে যান। গত লোকসভা ভোটেও কিছুটা দলের চাপেই উত্তর-পূর্ব দিল্লি কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হয়ে হারেন বিজেপির মনোজ তিওয়ারির কাছে। জানুয়ারিতে দিল্লি প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির প্রধানের দায়িত্ব নেন। কিন্তু শীলার অসুস্থতার কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করে তিন কার্যনির্বাহী সভাপতিকে জেলা ও ব্লক স্তরের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের অধিকার দেন এআইসিসি-তে দিল্লির দায়িত্বে থাকা নেতা পি সি চাকো। কংগ্রেস নেতাদের মতে, এতে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন শীলা। 

আজ অবশ্য দিল্লি তথা দেশের রাজনীতিতে অবদানের কথা একবাক্যে স্বীকার করেছেন সকলেই। রাহুল গাঁধীর কথায়, ‘‘আমি বিপর্যস্ত। শীলাজি কংগ্রেস দলের প্রিয় কন্যা। আমার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল গভীর।’’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কথায়, ‘‘দিল্লির উন্নয়নে শীলাজির বিশেষ অবদান রয়েছে।’’ কেজরীবালের কথায়, ‘‘শীলাজির মৃত্যু দিল্লির পক্ষে বড় ক্ষতি।’’

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।