বাঙালির মেধাকে কুর্নিশ জানাল পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা আন্দিজ! সাত হাজার ফুট উচ্চতায় সূর্যের ‘মন’ পড়ে ফেলতে পারলেন এক বাঙালি বিজ্ঞানী। উড়ল ভারতের বিজয়পতাকাও। এর আগে যে আর কোনও ভারতীয়ের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি।

ভয়ঙ্কর দুর্গম আন্দিজে যখন ব্ল্যাক হোলের মতো গা ছমছমে অন্ধকার, মুখ পুরোপুরি ঢাকা পড়েছে চাঁদে, তখন ঠিকরে বেরিয়ে আসা সূর্যের বায়ুমণ্ডলের (করোনা) আলো দেখিয়ে দিল, বাঙালি বিজ্ঞানীর পূর্বাভাস একেবারেই সঠিক। সূর্যের ‘মন’ পড়তে কোনও ভুলচুকই হয়নি অধ্যাপক দিব্যেন্দু নন্দীর।

অঙ্কের রং, তুলি দিয়ে আগেভাগে কম্পিউটার সিম্যুলেশনে যে ছবি বা মডেল বানিয়েছিলেন বঙ্গসন্তান, সূর্য ভাবে ঠিক সেই ভাবেই! সেই ভাবেই সূর্যের পিঠ থেকে উঠে এসে অসম্ভব শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি ভয়ঙ্কর তাতিয়ে তোলে করোনাকে। তৈরি করে ‘স্ট্রিমার’। সৌরমণ্ডলে হামলা চালানোর ‘মিসাইল’! যেগুলি থেকে তৈরি হয় সৌরবায়ু বা সোলার উইন্ড, সৌরঝড় (সোলার স্টর্ম), এমনকী করোনাল মাস ইজেকশান (সিএমই)-র মতো সৌর-হামলার ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলি। যা ঝনঝন করে কাঁপিয়ে তোলে মহাকাশে আমাদের ‘আগলে রাখার চাদর’ পৃথিবীর ম্যাগনেটোস্ফিয়ারকে। আমাদের বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ে বিপর্যস্ত করে দেয় টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ পরিবহন ব্যবস্থাকে। বিভিন্ন কক্ষপথে থাকা উপগ্রহুগুলির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশকে বিগড়ে দিতে পারে পুরোপুরি।

আন্দিজে সূর্য যে ভাবে মিলিয়ে দিল অঙ্কের রং, তুলিতে আঁকা দিব্যেন্দুর ‘ছবি’। গত ২ জুলাই।

তার হাত থেকে আমাদের বাঁচাতেই, অনেক আগেভাগে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তৈরি হওয়ার পথ দেখাতে গত মঙ্গলবার রাতে (ভারতীয় সময় রাত দশটা) ‘কোর্দিয়েরা দে লোস্ আন্দেস (আন্দিজ)’-এর সাত হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায় উঠেছিলেন দিব্যেন্দু। মোহনপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইসার-কলকাতা)-এর অধ্যাপক। রাতে তাপমাত্রা যেখানে শূন্যের পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে। সঙ্গে ছিলেন বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের (আইআইএ) অধ্যাপক দীপঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারত থেকে দুই বাঙালির সঙ্গী হয়েছিলেন আরও তিন জন। নৈনিতাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রমেশ চন্দ্র ও পুণের ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের (আয়ুকা) অধ্যাপক দুর্গেশ ত্রিপাঠী। ছিলেন দীপঙ্করের ছাত্র রীতেশ পটেলও।

আন্দিজে চার মূর্তি! রীতেশ পটেল (বাঁ দিক থেকে), দীপঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, দিব্যেন্দু নন্দী (পিছনে) ও দুর্গেশ ত্রিপাঠী।

এই গবেষণা আমাদের সাহায্য করবে কী কী ভাবে?

সূর্যের মনের গোপন কথা এই ভাবে দিব্যেন্দুরা জেনে-বুঝে ফেলার ফলে এ বার অনেক আগেই জানা যাবে কী ভাবে কখন, কতটা বেশি পরিমাণে হামলা চালাতে পারে সূর্য আমাদের গ্রহের উপর বা সৌরমণ্ডলে। আগামী ১২ বছরে সেই সৌর হামলা কখন, কতটা ধেয়ে আসতে পারে পৃথিবীর দিকে, আগেভাগে তা আঁচ করা যাবে। ওই ভয়ঙ্কর হামলায় যাতে জিপিএস-সহ যাবতীয় টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ পরিবহন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে না পড়ে, আগাম তার ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। করা যাবে উপগ্রহগুলির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশকে রক্ষার পদক্ষেপও। মহাকাশের আবহাওয়াকে (স্পেস ওয়েদার) নিরাপদ রাখার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে আরও আগে।

দিব্যেন্দুর কোন কোন মডেল সূর্যের ‘মন’ পড়ে ফেলতে পেরেছে?

দু’-দু’টি মডেল। একটির নাম- ‘সোলার সারফেস ফ্লাক্স ট্রান্সপোর্ট মডেল’। অন্যটি, ‘পোটেনশিয়াল ফিল্ড সোর্স সারফেস মডেল’।

সূর্যের পিঠ থেকে চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি কী ভাবে তৈরি হয়, তার পূর্বাভাস দিতে পারে দিব্যেন্দুর প্রথম মডেলটি। আর সেই চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি কী ভাবে উপরে উঠে করোনাকে অতটা তাতিয়ে তোলে, তার পূর্বাভাস দিতেই দ্বিতীয় মডেটি বানিয়েছেন দিব্যেন্দু। পৃথিবী থেকে ওই দু’টি মডেল পরখ করে দেখার সুযোগ এনে দিয়েছে এই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘রিসার্চ নোট্‌স অফ দ্য আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’তে।

আরও পড়ুন- সূর্যের ‘মন’ পড়তে আজ রাতে আন্দিজের মাথায় চড়বেন দুই বাঙালি!​

দিব্যেন্দুকে ওই দু’টি মডেল বানাতে সাহায্য করেছেন আইসার-কলকাতার তিন গবেষক ছাত্রছাত্রী- প্রান্তিকা ভৌমিক, সৌম্যরঞ্জন দাশ এবং আথিরা বি এস। সঙ্গী হয়েছেন অধ্যাপক নির্মল ঘোষও। আর আইসার-কলকাতার অধিকর্তা হিসাবে সৌরভ পালের ভূমিকাও কম নয়। প্রান্তিকা বললেন, ‘‘এ বার এই মডেল ধরে আমরা সৌরঝড়েরও পূর্বাভাস অনেক আগেভাগে দেওয়ার চেষ্টা করব।’’

করোনার ডান ও বাঁ দিকে চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি ফুলের পাঁপড়ির মতো। উত্তর, দক্ষিণ মেরুর দিকে চৌম্বক ক্ষেত্রের মুখ খোলা।

বুয়েনস আইরেস থেকে দীপঙ্কর আনন্দবাজার ডিজিটালকে বললেন, ‘‘দিব্যেন্দুর মডেল এই ভাবে মিলে যাওয়ায় এ বার এক মাস আগেই বলে দেওয়া যাবে সূর্যের করোনার কোন অংশে তৈরি হবে ওই স্ট্রিমারগুলি। তা কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে আমাদের পক্ষে।’’

আন্দিজের মাথায় চড়তে দীপঙ্কর ও দিব্যেন্দু দু’জনেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন গত ২৯ জুন। দীপঙ্কর বেঙ্গালুরু থেকে দিল্লি ও মাদ্রিদ হয়ে চিলির স্যান্টিয়াগো ছুঁয়ে সীমান্তবর্তী আর্জেন্টিনার মেন্ডোজা বিমানবন্দরে নামেন গত ১ জুলাই। তার পর বাসে চেপে পৌঁছন সান জুয়ান প্রদেশে। সেখান থেকে ফের বাসে চেপে আন্দিজে। চার ঘণ্টার জার্নি। আর দিব্যেন্দু কলকাতা থেকে উড়ে গিয়েছিলেন বুয়েনস আইরেসে। রাতটা সেখানে কাটিয়ে মঙ্গলবার ভোরে উড়ে যান সান জুয়ানে। তার পর বাসে চেপে পৌঁছন আন্দিজে।

কেন আন্দিজের মাথায় চড়লেন দীপঙ্কর, দিব্যেন্দুরা?

কারণ, সূর্যের ‘মনের সব গোপন কথা’ই ঢাকা-চাপা থাকে সূর্যের বায়ুমণ্ডলে। যার নাম- ‘করোনা’। ঘুটঘুটে অন্ধকারে উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ির খুব জোরালো হেডলাইটে যেমন আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়, হেডলাইটের জন্য যেমন আমরা গাড়িটাকে দেখতে পাই না, ঠিক তেমনই সূর্যের পিঠ (সোলার সারফেস বা ফোটোস্ফিয়ার) থেকে ঠিকরে বেরনো জোরালো আলোয় আমরা কখনওই দেখতে পাই না তার বায়ুমণ্ডল বা করোনাকে।

সেই সুযোগটা তখনই আসে, যখন চাঁদ, পৃথিবী আর সূর্য একটি সরলরেখায় এসে পড়ে আর সূর্যের পিঠটা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে যায় চাঁদে। তখনই হয় পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। চাঁদে সূর্যের মুখ পুরোপুরি ঢেকে গেলেই অন্ধকার চাকতির (আদতে চাঁদ) চার পাশে দেখা দেয় আলোর রেখা। হিরের মালার মতো। সেটাই সূর্যের করোনা।

ফলে, সূর্যের পূর্ণগ্রাস গ্রহণ হলেই তার করোনাকে দেখতে পাই আমরা। যা অন্য সময়ে আমাদের ‘ধরা-ছোঁয়া’র বাইরেই থেকে যায়। তাই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের অপেক্ষায় কার্যত চাতক পাখির মতো বসে থাকেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। যেমন অপেক্ষায় রয়েছেন দীপঙ্কর, দিব্যেন্দু-সহ পাঁচ সদস্যের ভারতীয় দল, আন্দিজে।

আর পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ এ বার যে পথে হবে সেই পথটা গিয়েছে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর থেকে মূলত চিলি ও আর্জেন্টিনার মধ্যে দিয়ে। যার গুরুত্বপূর্ণ অংশটি পড়বে  আন্দিজ পর্বতমালায়।

করোনাকে দেখা কেন এত জরুরি বিজ্ঞানীদের কাছে?

সূর্যের যে রহস্যের জট এখনও পর্যন্ত খোলা যায়নি, কারণটা লুকিয়ে রয়েছে তারই মধ্যে। রহস্যটা হল সূর্যের অন্তর, অন্দর, তার পিঠ আর করোনার তাপমাত্রার অবাক করা ভিন্নতা। ফারাক। আমরা জানি, সূর্যের অন্দরে রয়েছে বিশাল একটি পরমাণু চুল্লি। যেখান থেকে জন্ম হচ্ছে অসম্ভব শক্তিশালী বিকিরণের। তার ফলে তৈরি হচ্ছে ভয়ঙ্কর তাপমাত্রা। কয়েক কোটি ডিগ্রি কেলভিন। যদিও সেই তাপমাত্রাটা থাকে সূর্যের কেন্দ্র থেকে তার পিঠের কিছুটা নীচের অংশ পর্যন্ত। যে দূরত্বটা সাত লক্ষ কিলোমিটার। আর সূর্যের পিঠ থেকে তার করোনার শেষ প্রান্তের দূরত্বটা তার দেড় গুণ। মানে, আরও ১০/১১ লক্ষ কিলোমিটার।

কিন্তু সূর্যের পিঠে পৌঁছেই তার অন্দরের সেই ভয়ঙ্কর তাপমাত্রাটা ঝপ্‌ করে নেমে মাত্র ৬ হাজার ডিগ্রি কেলভিন হয়ে যায়। আবার পিঠ থেকে করোনায় পৌঁছে সেই তাপমাত্রাটাই হয়ে যায় দশ লক্ষ ডিগ্রি কেলভিন।

বিজ্ঞানীদের খটাকাটা এইখানেই...

সুর্যের কেন্দ্রে যে পরমাণু চুল্লিটি রয়েছে তার তো অনেক কাছে রয়েছে সূর্যের পিঠ। তা হলে সেখানে তাপমাত্রা ঝপ্ করে নেমে গিয়ে কেন তা প্রায় দশ লক্ষ গুণ বেড়ে যা করোনায়? কী রহস্য লুকিয়ে রয়েছে সূর্যের মনে?

আরও পড়ুন- মুঠো মুঠো সোনা, প্ল্যাটিনাম ছড়িয়ে পড়ছে মহাকাশে! ঘটকালি করছে ব্ল্যাক হোল​

দীপঙ্কর বলছেন, ‘‘তার কারণ, সূর্যের অন্দরে তৈরি হওয়া চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি। সেগুলিই সূর্যের পিঠ বা তার কিছুটা নীচ থেকে তৈরি হয়ে উঠে আসে উপরে। সূর্যের বায়ুমণ্ডল বা করোনায়। ওই চৌম্বক ক্ষেত্রগুলিই করোনাকে অতটা তাতিয়ে তোলে।’’

এমনটাই বলেছিলেন দিব্যেন্দু। যা গত মঙ্গলবার আন্দিজে দেখা গিয়েছে করোনায়। সূর্যগ্রহণের সময়।

দিব্যেন্দু জানাচ্ছেন, কোথাও সেই চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি উপরের দিকে উঠে আবার নেমে আসে নীচে। এগুলিকে বলা হয় ‘ক্লোজ্‌ড লুপ’। যা সোলার স্টর্ম বা সৌরঝড় অথবা করোনাল মাস ইজেকশানের (সিএমই) মতো ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলির জন্ম দেয়। যা পৃথিবীর দিকে এলে ভয়ঙ্কর। আবার কোনও কোনও শক্তিশালী চৌম্বক চৌম্বক ক্ষেত্র উপরে উঠে করোনার শেষ প্রান্ত ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা সৌরমণ্ডলে। চলে যায় সৌরমণ্ডলের শেষ প্রান্তে। এগুলিকে বলা হয় ‘ওপ্‌ন লুপ’। ওই চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি সূর্যের করোনা ছাড়িয়ে সৌরমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়লে তাদের আমরা বলি সোলার উইন্ড বা সৌরবায়ু। এগুলি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে এলে মহাকাশের আবহাওয়া, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ পরিবহন ব্যবস্থার পক্ষে তা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে বিভিন্ন কক্ষপথে থাকা উপগ্রহগুলির স্পর্শকাতর যন্ত্রাংশগুলির পক্ষেও। এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল ১৮৫৭ সালে।

আন্দিজে এই সাফল্যে কতটা আশাবাদী বিজ্ঞানীরা?

দুর্গেশ ও দীপঙ্কর দু’জনেই বলছেন, ‘‘এই মডেল সঠিক প্রমাণিত হওয়ায় আগামী দিনে অনেক সুবিধা হবে। আগামী বছরের শেষাশেষিই সূর্য-‘সন্ধানে’ রওনা হবে ইসরোর ‘আদিত্য-এল-ওয়ান’ মহাকাশযান। তাতে যে করোনাগ্রাফ রয়েছে, তার পাঠানো তথ্য ও ছবিগুলিকে থ্রি-ডাইমেনশনাল করে তুলতে দিব্যেন্দুর এই মডেল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।’’

দীপঙ্কর, দিব্যেন্দু, দুর্গেশ-সহ আন্দিজ-অভিযাত্রী পাঁচ ভারতীয়ের জন্য রইল একরাশ অভিনন্দন। আপনাদের দৌলতেই সৌরপদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় পথ দেখাল ভারত।

ছবি সৌজন্যে: অধ্যাপক দিব্যেন্দু​ নন্দী, দীপঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও দুর্গেশ ত্রিপাঠী, আইসার-কলকাতা