Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৭ জুন ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

পাত্রের জলে ফুল দিতেন, ধূপ জ্বালতেন, শুরু হত আঁকা

তাঁর কাছে ছবি আঁকা ছিল পুজোর মতোই। দেশপ্রেমী, ছাত্রবৎসল এক শিক্ষক। মাস্টারমশাই নন্দলাল বসুকে নিয়ে লিখছেন তাঁর শিষ্য রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ত

২৫ মে ২০১৯ ০০:০১
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

তখন আমার বয়স কতই বা? ষোলো-সতেরো হবে। জামালপুরের বাড়ি থেকে আমার কিছু আঁকা নিয়ে গিয়েছিলুম কলকাতায় বেদান্ত মঠের স্বামী প্রজ্ঞানন্দজির কাছে। তিনি আমার আঁকাগুলি দেখে মাকে বললেন, ‘‘মা, খোকার এক জন ভাল গুরু দরকার।’’ মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘আমি কোথায় যাব, মহারাজ?’’ স্বামীজি বললেন, ‘‘শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসুর কাছে চিঠি দিচ্ছি। খোকা গিয়ে দেখা করুক।’’ মহারাজের চিঠি সম্বল করে বৈশাখের প্রচণ্ড গরমে গিয়ে পৌঁছলাম শান্তিনিকেতনে আচার্য নন্দলাল বসুর নিবাসে। দরজায় কড়া নাড়তেই এক ভদ্রলোক আমার আসার কারণ জিজ্ঞেস করায় বললাম, ‘‘আমি স্বামী প্রজ্ঞানন্দজির কাছ থেকে আসছি। তাঁর লেখা একটি চিঠি আচার্য নন্দলাল বসুর হাতে দিতে চাই।’’ ভদ্রলোক চিঠিটি চাইলে বললাম, ‘‘স্বামীজি বলেছেন চিঠিটি যেন সরাসরি তাঁর হাতেই দিই।’’ তখন উনি আমাকে একটি ঘরে বসিয়ে বললেন, ‘‘অপেক্ষা করো। উনি আসছেন।’’ কিছুক্ষণ বাদেই আচার্য নন্দলাল তাঁর ঘরে ঢুকে নিজের আসনে বসলেন। তিনি মাটিতেই বসতেন। সামনে ছবি আঁকার ডেস্ক। চিঠিটি মাথায় ঠেকিয়ে খুলে পড়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘‘তোমার বাড়ির অনুমতি আছে তো?’’ ‘হ্যাঁ’ বলায় তিনি বললেন, ‘‘বাড়ি ফিরে যাও। ঠিক সময়ে চিঠি পাবে।’’ আমি রোজই অপেক্ষা করি। একদিন একটি পোস্টকার্ড এল। আমাকে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ডেকে পাঠানো হয়েছে। দেরি না করে পরের ট্রেনেই বোলপুরের উদ্দেশে রওনা হলাম। শান্তিনিকেতনের কলাভবনে পৌঁছলাম। বেশ মনে আছে, সেই সময়ে কলাভবনের অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ কর। তিনি আমাকে বললেন, ‘‘তুমি তৈরি হয়ে এসেছ তো?’’

নন্দলাল কারেকশন করতেন না, ইমপ্রুভ করতেন

আমি সেই রাতের ট্রেনেই আবার জামালপুরে ফিরে গিয়ে, বিছানা আর জামাকাপড় রাখার ছোট্ট সুটকেস নিয়ে পরদিন হাজির হলাম শিল্পশিক্ষার বিদ্যাপীঠ কলাভবনে। সাল ১৯৫৩। আজও প্রতিটি দিন চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাই। এলাম এক নতুন জগতে। গাছের তলায় ক্লাস, অতি সামান্যেই অসামান্য জীবনযাপন। সবচেয়ে ভাল লেগেছিল, ‘তুমি পারবে না’, ‘পারছ না’... এমন নিরুৎসাহব্যঞ্জক কথা হত না। নন্দলাল বসুকে আমরা ‘মাস্টারমশাই’ বলে ডাকতাম। আমি যখন কলাভবনে গিয়েছি, তখন মাস্টারমশাই অবসর নিয়েছেন। কিন্তু রোজ এসে নিজের স্টুডিয়োয় বসতেন। আমরা গিয়ে কাজ দেখাতাম। ওঁর শেখানোর পদ্ধতিটা ছিল ভারী অদ্ভুত। উনি কারও ড্রয়িংয়ে হাত দিতেন না। উপরে একটা পাতলা কাগজ ফেলে সেই ড্রয়িংয়ের উপরে ‘কারেকশন’ করতেন। ওঁর ছাত্র ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মণ বলেছিলেন, ‘নন্দলাল কারেকশন করতেন না, ইমপ্রুভ করতেন।’ আঁকাটা ঠিকঠাক করে দিয়ে পাতলা কাগজটা পাশে রেখে দিতেন। ফলে বুঝতে পারতাম, আমি কী ভুল করেছি। কিন্তু মুছে দিলে কি বুঝতে পারতাম, ভুলটা কোথায়? একবার খুব বড় এক শিল্পীকে ঘোড়ার ছবি আঁকতে দেখেছিলাম। ঘোড়ার খুর এঁকেছেন চেরা! এই হল ডিটেলে না দেখার ফল, যেটা উনি আমাদের বারবার দেখতে বলতেন।

Advertisement

অনেক সময়ে হয়তো রাস্তা দিয়ে চলেছি। পথেই ছবি আঁকার জন্য কোনও বিষয় ভাল লাগল। অথচ সাবজেক্ট চলমান। মাস্টারমশাই বলতেন, ‘টুকরো টুকরো শব্দ দিয়ে বিষয়টিকে মনে ধরে রাখবে। যখন সময় পাবে, তখন ওই টুকরো লেখাগুলোই তোমার পূর্ণ পট গড়ার মস্ত সহায় হবে।’ আর একটি কথা খুব বলতেন, ‘বেশি বার রাবার দিয়ে মোছার অভ্যেস কোরো না। বরং তোমার প্রথম খসড়ার উপরে পাতলা ট্রেসিং কাগজ ফেলে শুধরে নিতে চেষ্টা করো। এমন ভাবে দু’-তিন বার করলে তুমি যা চাইছিলে, তাকেই দেখতে পাবে।’ আমি কোনও কিছু আগাম শিখে যাইনি বলে এই শিক্ষাকে আপন করে নিতে অসুবিধে হয়নি।



বাগবাজারে নন্দলালের বাড়ি

একবার ক্লাসে জন্তু-জানোয়ার বিষয়ে ছবি আঁকতে হবে। ভাবতে গিয়ে বুঝলাম, গরুই আমার কাছে সবচেয়ে সহজ বিষয়। বিকেলের দিকে মাস্টারমশাইয়ের কাছে গিয়ে বললাম, গরুকে বিষয় করে পট গড়ব। মাস্টারমশাই সব শুনে বললেন, ‘একটি গরু আঁকো।’ খুব যত্ন করে আঁকলাম। সেটি মাস্টারমশাই নিজের কাছে রেখে বললেন, ‘যাও, ভাল করে গরু দেখে এসো।’ পাশের সাঁওতাল পাড়ায় গিয়ে খুব ভাল করে গরু দেখলাম ও আঁকলাম। তার পরে আমার স্কেচ সামনে নিয়ে বললেন, ‘দেখো তো, তোমার আগের আঁকা গরুটি কী রকম হয়েছে?’ আগের ড্রয়িংটি দেখে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, গরু সম্পর্কে আমার এমন ধারণা ছিল!

একবার তাঁর ব্যবহার করা পোস্টকার্ড, পেনসিল রাখার চামড়ার ব্যাগ জীর্ণ হয়ে যাওয়ায় নতুন একটা ব্যাগ তৈরি করে দিয়েছিলাম। তিনি সেটি উল্টে-পাল্টে দেখে বললেন, ‘বেশ হয়েছে। তবে এটা তোমার কাছেই থাক।’ মন তো খারাপ হলই, কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না। একদিন মাস্টারমশাই তাঁর পুরনো পোস্টকার্ড, পেনসিল ইত্যাদি রাখার ব্যাগ আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, একটু গুছিয়ে দিতে। অতি আনন্দে যত্ন সহকারে গুছিয়ে দেওয়ার সময়ে দেখলাম, ব্যাগের মাথার কাছে সামান্য কাটা। যার মাঝ দিয়ে আঙুল ঢোকাতেই একটা শক্ত কাগজের টুকরো আছে বলে মনে হওয়ায় সেটি টেনে বার করে দেখি, শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদা মা আর স্বামীজির ছবি। বুঝলাম, এই কারণেই আমার তৈরি করা নতুন ব্যাগটি তিনি নেননি। বেলুড় মঠ থেকে শান্তিনিকেতন আশ্রমে কার্যকারণে রবীন্দ্রনাথের কাছে কেউ এলে, তিনি সন্ন্যাসীদের দেখাশোনার ভার সব সময়ে নন্দলালের উপরে দিতেন। মাস্টারমশাইয়ের ঘরে খাটের কাছে একটি কুলুঙ্গিতে মা-ঠাকুর ও স্বামীজির ছবি থাকত। সেখানে তিনি নিত্য ফুল দিতেন। তাঁর কাছে ছবি আঁকাটাও ছিল পুজোর মতো। সব গোছানো থাকত। পাত্রের জলে একটা ফুল দিতেন। ধূপ জ্বালতেন। তার পরে শুরু হত আঁকা।

অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ যেন মণিকাঞ্চন যোগ

মাস্টারমশাইয়ের বাল্যকাল কেটেছিল খড়্গপুরে। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সেখানেই। কলকাতায় এসে সেন্ট্রাল কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। প্রথাগত শিক্ষা কোনও দিনই ভাল লাগত না। ছোট থেকেই শিল্পের প্রতি অনুরক্ত। খড়্গপুরে শিল্পীদের প্রতিমা নির্মাণ বুঁদ হয়ে দেখতেন। তার পরে কাদামাটি দিয়ে দেবদেবীর মূর্তি গড়তেন। কলকাতায় এসেই নন্দলালের সঙ্গে প্রথম পরিচয় অবনীন্দ্রনাথের ছবির এবং সেই ছাপানো ছবি দেখে মুগ্ধ হন। যেন সন্ধান পেলেন জীবনের লক্ষ্যপথের।

পরের অধ্যায় কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুল, সেখানে ভর্তি হওয়া এবং অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে নন্দলালের আলাপ। মণি-কাঞ্চন যোগ। তাঁদের সম্পর্ক কোনও দিনই শুধু শিক্ষক-ছাত্রের ছিল না। বলা ভাল, গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক। অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গ তিনি সব সময় পেতেন। আত্মীয়ের মতো, বন্ধুর মতো। নন্দলালদের মৌলিক ছবি আঁকায় উৎসাহ দিতেন অবনীন্দ্রনাথ। ক্লাসে বসে মজার গল্প বলতেন, যেন আড্ডা। আসলে তিনি যে শেখাচ্ছেন, তা যেন ছাত্ররা ধরতে না পারে।

অবনীন্দ্রনাথের সূত্রেই ভগিনী নিবেদিতার সঙ্গে পরিচয় নন্দলালের। তার পরে আর মাত্র পাঁচ বছর বেঁচেছিলেন নিবেদিতা। কিন্তু ওই অল্প সময়ের সান্নিধ্যই নন্দলালের শিল্পচেতনাকে সমৃদ্ধ করেছিল প্রভূত ভাবে। তাঁর যে অজন্তা যাত্রা, তা কিন্তু অবনীন্দ্রনাথ আর নিবেদিতার জোরাজুরিতেই। ১৯০৯-এ ভারতে আসেন লেডি হ্যারিংহাম, অজন্তা গুহার ভিত্তিচিত্রের অনুলিপি তৈরির জন্য। নন্দলাল, অসিতকুমার হালদার, সমরেন্দ্র গুপ্ত প্রমুখ হ্যারিংহামের সঙ্গে অজন্তায় যান। সেখানে তাঁরা তিন মাস ছিলেন। নন্দলালের আঁকা ছবিগুলির মধ্যে সপ্তদশ গুহার ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড অ্যাডোরিং দি বুদ্ধ’ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ক্লাসিক্যাল চিত্রকলার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষানিরীক্ষার যে প্রথম সুযোগ নন্দলাল প্রমুখ শিল্পীরা পান, তার মূলে কিন্তু নিবেদিতা। পরবর্তী সময়ে বাগগুহাও গিয়েছিলেন তিনি এবং এই সূত্রেই অজন্তা আর বাগের ধ্রুপদী রীতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ হয় নন্দলালের। নিজের হাতে গড়া এই অসামান্য শিল্পী ও তাঁর সতীর্থদের চিত্রকলায় ধ্রুপদী ওই দ্যোতনা দেখে অবনীন্দ্রনাথ বলেছিলেন (স্মৃতিচিত্র: প্রতিমা দেবী), ‘‘ওরা নিল অজন্তার দিক, আমি রইলুম পার্সিয়ানে।’’



নিজের স্টুডিয়োয়

অবনীন্দ্রনাথের এ হেন শিষ্য নন্দলালকে গুরুদেব নিয়ে এলেন শান্তিনিকেতনে। কিন্তু ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টের কাজের জন্য নন্দলালকে আবার কলকাতায় ডেকে পাঠালেন অবনীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথকে তিনি বললেন, ‘তুমি যখন ডেকেছ, তখন ও নিশ্চয়ই যাবে। কিন্তু আমার ক্ষতি হবে।’ যখন নন্দলাল সোসাইটিতে ফিরে গেলেন, অবনীন্দ্রনাথ বললেন, ‘মন চাঙ্গা হল আমার!’ কলকাতায় ফিরে গিয়ে নন্দলাল তাঁর গুরুকে সঙ্গ দিলেন বটে, তবে এ শহরকে খুব বদ্ধ মনে হতে লাগল তাঁর। আবার তিনি ফিরে এলেন শান্তিনিকেতনে। উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে। অবনীন্দ্রনাথ একবার একটা দেশি পাকুড় গাছকে নিয়ে জাপানি প্রথায় ‘বামন গাছ’ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেননি। কারণ তার ধর্ম বড় হওয়া। ১৯২১ সালে কলাভবনের ভার নিয়ে যখন নন্দলাল পাকাপাকি ভাবে শান্তিনিকেতনে এলেন, গুরু তাঁর প্রিয় শিষ্যকে বললেন, ‘তুমি এটা নিয়ে যাও। শান্তিনিকেতনে মাঠের মধ্যিখানে ছেড়ে দিও।’ নন্দলাল সেটাকে নিয়ে এসে কলাভবনের কেন্দ্রস্থলে বসিয়ে দিলেন। আমারও ব্যক্তিগত অভিমত, শান্তিনিকেতনের ওই পরিবেশ না পেলে তাঁর প্রতিভা হয়তো এ ভাবে বিকশিত হত না।

মাস্টারমশাইয়ের দ্বিতীয় বার অর্থাৎ পাকাপাকি ভাবে ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টের কাজ ছেড়ে শান্তিনিকেতনে কলাভবনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ব্যাকুল আহ্বান ছাড়া আরও একটি বড় প্রেরণা ছিল। নন্দলালের মন তখন গাঁধীজির অসহযোগ আন্দোলনের দ্বারা আন্দোলিত। ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট মুখ্যত সরকারি টাকায় চলত। এমন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে জীবিকা অর্জন তখন তাঁর একটুও ভাল লাগছিল না। প্রতিমা দেবী লিখছেন, ‘‘তিনি যখন আমার মামার কাছ থেকে আর্ট স্কুল ছেড়ে শান্তিনিকেতনে আসবার অনুমতি চাইলেন, তখন অবনীন্দ্রনাথ প্রথমে মত দিতে পারেন নি, পরে গুরুদেবের অনুরোধে রাজী হলেন। নন্দলালবাবু তখন গান্ধীজির স্বদেশী কাজের অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেই জন্যে গবর্নমেণ্ট আর্ট স্কুলের কাজ করবেন এটা তাঁর মনোমত হচ্ছিল না এবং স্বাধীন ভাবে গুরুদেবের প্রেরণায় নতুন আদর্শের মধ্যে তাঁর চিত্রকলার কাজ করবেন এই তাঁর ইচ্ছা। সেই কারণেই মনে হয় তিনি কলকাতা ছেড়ে আশ্রমের শান্তিময় জীবনে ফিরে আসবেন স্থির করলেন।’’

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পোস্টার আঁকতেন রাত জেগে

শান্তিনিকেতনে এসেও নন্দলালের অস্থিরতা দূর হল না। অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউয়ে তাঁর মন আন্দোলিত। মনকে এ সব থেকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও এল। নন্দলাল লিখেছেন, ‘‘১৯২১ সাল শান্তিনিকেতনে কাজ নিয়ে স্থির হয়ে বসার চেষ্টা করছি। কিন্তু সারা দেশ ময় রাজনৈতিক তোলপাড় চলছে। তাতে আমার মনও বেশ বিক্ষিপ্ত। এমন সময় একটা অপ্রত্যাশিত আমন্ত্রণ এল গোয়ালিয়র রাজদরবার থেকে ভগ্নন্মুখ বাঘ গুহার ভিত্তি চিত্রগুলি কপি করার। আমার তখনকার মানসিক অবস্থার পক্ষে কাজ এবং পারিপার্শ্বিকের এরূপ একটা সাময়িক পরিবর্তনের সুযোগ লাভের খুবই প্রয়োজন ছিল।’ কাজ পেয়ে অসহযোগ আন্দোলনজনিত মনের উত্তেজনা প্রশমিত হল। কিন্তু গাঁধীজির নেতৃত্ব ও আদর্শের প্রতি নন্দলালের শ্রদ্ধা অটুট ছিল চিরকাল।

আসলে মাস্টারমশাইয়ের জীবন আদ্যন্ত দেশপ্রেমে ভরপুর। স্বদেশী আন্দোলন তাঁর কৈশোর ও যৌবনের ঘটনা। বৈপ্লবিক আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ যোগের হয়তো প্রমাণ নেই, তবে বিপ্লবীদের প্রতি সহানুভূতি ও সময়ে সময়ে সাহায্য করার প্রমাণ আছে। রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ থেকে যে বিশেষ আধ্যাত্মিক ভাব ও ভারতপ্রেম নানা ধারায় প্রবাহিত হয়ে নন্দলালের জীবনে প্রবেশ করে, তার একটি ধারা এসেছিল ভগিনী নিবেদিতার মধ্য দিয়ে। আমাকে বলতেন, ‘পরাধীনতার জ্বালা তোমরা অনুভব করতে পারবে না।’ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পোস্টার আঁকতেন রাত জেগে। ওঁর বাড়ির জানালার শিক আলগা করা থাকত। ছেলেরা এসে তা উঠিয়ে ভিতরে ঢুকত। পোস্টার কোমরে বেঁধে নিয়ে বেরিয়ে যেত। হরিপুরা কংগ্রেসে মাস্টারমশাইয়ের কাজ তো একাধারে দেশপ্রেম ও শিল্পবোধের অসামান্য মেলবন্ধন। গাঁধীজির অনুরোধে হরিপুরার কংগ্রেস নগর সাজাবার ভার নিয়েছিলেন তিনি। প্রচারপত্রে আঁকা ছবিতে ওই রকম লাইন, রঙের ব্যবহার ভারতের আর কোনও শিল্পী পারবেন না, নির্দ্বিধায় বলতে পারি। উনি সাজিয়েছিলেন হরিপুরা কংগ্রেসের মূল মণ্ডপ। তার সামনে একটা চৌকো জায়গা করে, মাটি ভরাট করে প্রচুর ধান ছড়িয়ে েদওয়া হয়। নিয়মিত তাতে জল দেওয়া হত। আর সরষে গাছ লাগিয়েছিলেন। তাতে মণ্ডপ সবুজ আর হলুদের অসাধারণ রূপ নিল। ওখানে কাজ করতে করতে বাইরে চাটাই পেতে শুতেন সকলে। লম্বা চাটাইয়ে গাঁধীজিও শুয়ে, নন্দলাল বসুও। উনি খুব সংশয়ে থাকতেন, পাছে পা লেগে যায় গাঁধীজির গায়ে! শান্তিতে ঘুমোতে পারতেন না। তাঁর ছাত্ররা লক্ষ করেছিল, ওখানে কোনও নেতা এলে আগে থেকে ঘোষণা করা হত, ‘...আ রহে হ্যায়’— এই আওয়াজে যাঁরা গেট সামলাতেন, খুলে দিতেন। তখন মাস্টারমশাইয়ের ছাত্ররাও তিনি আসা মাত্র, ‘নন্দলালজি আ রহে হ্যায়’ বলে চিৎকার করতেন।

‘মিস্ত্রি’ নন্দলাল বকুনিও খেয়েছেন

গাঁধীজির কাছেও আর্ট সম্পর্কিত ব্যাপারে নন্দলালের মত ছিল সবার উপরে। পুরীতে একবার কংগ্রেস অধিবেশন হওয়ার কথা। সেই সময়ে পুরী, কোণারক, ভুবনেশ্বরের মন্দিরের মূর্তিগুলি নিয়ে কংগ্রেস নেতাদের দুশ্চিন্তা হয়। তা দেখে বিদেশিরা কী ভাববে? একদল মত দেয়, চুনকাম করে দেওয়া হোক। এক শিল্পপতি খরচ দিতেও রাজি ছিলেন। গাঁধীজি সম্মতি জানানোর আগে নন্দলালের মত জানতে চাইলেন। নন্দলাল বললেন, এমন অপূর্ব ভাস্কর্য নষ্ট হলে ভারতের অমূল্য সম্পদ লুপ্ত হয়ে যাবে। বেঁচে গেল অসাধারণ সে শিল্পসৃষ্টি!



শান্তিনিকেতনে তাঁর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে

গাঁধীজির মতো রোগী সেবার উদারতা নন্দলালেরও ছিল। সামনে আর্ত বিপন্ন দেখলে স্থির থাকতে পারতেন না। অথচ নিজের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা এই মানুষটির প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিল। শান্তিনিকেতনে নৃত্য, নাটক অভিনয়ে সার্থক সাজসজ্জা যাঁর সৃষ্টি, তাঁকে কিন্তু কখনও সামনে আসতে দেখা যেত না। পারতপক্ষে কোনও সভার সামনের দিকে তিনি বসতেন না। নন্দলালের যে ‘স্বাভাবিক আভিজাত্য’র কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, এটি তারই লক্ষণ। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, পুরনো গ্রন্থাগারের (বর্তমান পাঠভবন দফতর) বারান্দায় জয়পুরী প্রথায় অনবদ্য দেওয়াল চিত্রণ আঁকার সে ঘটনা। ওখানে বিরাট মুরালটি তৈরির সময়ে মাস্টারমশাই তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সাবধান করে দিয়েছিলেন, জয়পুরী পদ্ধতি শেখানোর জন্য যিনি এসেছিলেন, তাঁর কাছে নন্দলালের আসল পরিচয় যেন গোপন রাখা হয়। সেই কারণেই ওই কারিগর মুরালটি গড়ার সময়ে নন্দলালকে অনেক বার বকেছেন। আবার তাঁকে দেখিয়ে বাকি ছাত্রদের ধমকেছেন, ‘তোমরা শিল্পী হয়ে কাজ শিখতে এত দেরি করছ, আর দেখো তো এই মিস্ত্রি কেমন তাড়াতাড়ি সব শিখে ফেলছে!’ সবচেয়ে মধুর হল, মুরালের কাজ শেষ হওয়ার পরে জয়পুরী শিল্পীদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সেই বয়স্ক মানুষটি নন্দলালের আসল পরিচয় জানতে পারেন। তখন সাশ্রুনয়নে ক্ষমা প্রার্থনা করায় মাস্টারমশাই বলেন, ‘আমি তো সেই সময়ে তোমার ছাত্রই ছিলাম।’ এমন কত অসাধারণ সব ঘটনা আশ্রমের চারিদিকে ছড়িয়ে আছে, যাদের তুলনা নেই।

তাঁর সমস্ত কাজের সঙ্গে মাটির যোগসূত্র। চাষাভুষো, সাধারণ লোক... ক্লাসিক্যাল ছবি যেমন তিনি এঁকেছেন, তেমনই এই মানুষগুলোও ছিল নন্দলালের বিরাট অবলম্বন। ওঁকে রোজ তেল মাখাত ধামাই নামে এক সাঁওতাল ছেলে। একদিন আমাকে বললেন, ‘জানো তো, ধামাইয়ের ছাগলটা কে যেন চুরি করে নিয়েছে। ওর মনটা খারাপ।’ পরদিন গিয়ে দেখলাম, মাস্টারমশাই একটা ছবি এঁকেছেন ধামাইয়ের জন্য। মাঝখানে ধামাই দাঁড়িয়ে, তার চারিদিকে ছাগল ঘুরে বেড়াচ্ছে! সম্পর্কের যে নিবিড় আত্মিক বুনন, তা ওই কাজটা দেখলেই বোঝা যায়।

ছাত্রছাত্রীদের প্রতিও যে কী অসীম মমতা ছিল! শান্তিনিকেতনে তখন কিছু সেকেলে শৌচাগার ছিল। মেথর রসিক তাঁর দলবল নিয়ে সেগুলো পরিষ্কার রাখত। গাঁধীজি যে দিন দক্ষিণ আফ্রিকার ফনিক্‌স আশ্রমের অধিবাসীদের নিয়ে শান্তিনিকেতনে প্রথম এসে উঠেছিলেন, সেই দিনটির স্মরণে গাঁধী পুণ্যাহ পালন করা হয়। ওই দিনটি আশ্রমের সেবাকর্মীদের ছুটি দেওয়া হত। কাজের ভার নিতেন ছাত্র শিক্ষক-কর্মী আশ্রম পরিবারভুক্ত সকলে। প্রতি বছর মাস্টারমশাই বেছে নিতেন মেথরের কাজটি। চেলাও জুটে যেত, তাঁরই ছাত্রদের একটি দল। রান্নাঘরের বাগানের জন্য কমপোস্ট সারের খাদ তৈরি হত। সমস্ত ময়লা, পচা পাতা আর কাটা জঙ্গল দিয়ে সেটা ভরাট করা হত। তার উপরে পড়ত মাটির আস্তরণ। এ হেন কাজের পুরোধা নন্দলাল বসু মহাশয়!

অমন শিব কে আঁকতে পেরেছে

আরও একটা ঘটনার কথা বলি। একবার ছাত্রীরা নন্দলালকে ধরেছেন মুনলাইট পিকনিকে যাবে। গুরুদেবের কাছে খবর গেল, ছাত্রীরা পিকনিকে গিয়েছে। উনি শুধু প্রশ্ন করলেন, ‘নন্দলাল আছে তো সঙ্গে? তা হলে ঠিক আছে।’ এ থেকেই বোঝা যায়, কতটা গুরুত্ব তিনি দিতেন নন্দলালকে! কত সময় দেখেছি, কিঙ্করদা (রামকিঙ্কর বেজ) মূর্তি গড়ে রেখে হয়তো চলে গিয়েছেন। মাস্টারমশাই দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখছেন। তার পরে পোস্টকার্ডে ওই মূর্তিটা স্কেচ করলেন। কিঙ্করদা বলতেন, ‘জানো, আমার গুরু কে? বিশ্বকর্মার বরপুত্র আমার গুরু নন্দলাল!’ মানুষের তৈরি অনেক গল্প বিচ্ছিন্নতা তৈরির চেষ্টা করে হয়তো, কিন্তু সেগুলো সত্য নয়। মাস্টারমশাইয়ের ৭৫ বছরের জন্মদিনে কলাভবনের আদি ছাত্ররা সকলে এসেছেন, তাঁকে অর্ঘ্য দেওয়া হবে। কলকাতা থেকে পদ্মফুল আনানো হয়েছে। একে একে সকলে মাস্টারমশাইকে ফুল দিয়ে প্রণাম করবে। আমরা বসে আছি। হঠাৎ দেখি কিঙ্করদা উল্টো দিকে হাঁটছেন। বললেন, ‘দাঁড়াও, আসছি।’ দূরে একটা কল্কে গাছ ছিল। সেখান থেকে কিছু ফুল নিয়ে এসে মাস্টারমশাইয়ের পায়ে নিবেদন করলেন। প্রণাম করলেন। আমরা ছেঁকে ধরতে বললেন, ‘আরে ও রকম শিব কে আঁকতে পেরেছে? পদ্ম দেব না কল্কে দেব, তোমরা বলো!’ সেই উষ্ণতা আজও অনুভব করি... অমলিন শান্তিনিকেতন।



নন্দলাল বসুর আঁকা, দেশ পুজোসংখ্যা ১৯৪০। (নীচে) নন্দলালের স্বাক্ষর

মাস্টারমশাইকে আমরা কখনও পরিপাটি পোশাকে দেখিনি। খাদির সাধারণ পোশাক পরতেন। এই মানুষটির ‘নন্দলাল বসু’ হয়ে ওঠার পিছনে মাসিমা সুধীরা বসুর অবদান অনেকখানি। মাস্টারমশাইও নির্ভর করতেন স্ত্রীর উপরে। কলকাতার বাড়ি তো বটেই, শান্তিনিকেতনের বাড়িও মাসিমা জোর করে তৈরি করিয়েছিলেন। খুব রাশভারী মানুষ ছিলেন। ছেলেদের বিয়ে দেওয়ার পরে পাশেই আলাদা একটা বাড়ি করে সেখানে থাকতেন মাসিমা। নিজে আলাদা হয়ে পুত্রবধূকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেন। নন্দলাল কিন্তু পুত্র-পুত্রবধূ ও নাতিদের সঙ্গেই থাকতেন। রোজ দেখা করতে আসতেন মাসিমা। মাস্টারমশাইয়ের কাছে বসতেন। আলো জ্বালিয়ে রাখতেন বলে মাসিমা বকাবকি করতেন, ‘দিনের বেলা আলো জ্বালিয়ে রাখো, ওদের খরচ হয়!’ এক জন শিল্পীকে বিকশিত হওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন তাঁর অর্ধাঙ্গিনী।

শান্তিনিকেতনের প্রতিটি উৎসব অনুষ্ঠানে মাস্টারমশাই ব্যস্ত থাকতেন নতুন নতুন পরিকল্পনায়। উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি, অলঙ্করণ, আলোর ব্যবহার, অভিনেতাদের পোশাকআসাক... সব নিয়ে পড়াশোনা আলোচনার ফলশ্রুতি ছিল প্রতিটি অনুষ্ঠানের স্বকীয়তা। চমক। শুধু অনুষ্ঠানেই নয়, তাঁর শিল্পবোধের সৃষ্টিশীল প্রকাশ দেখা গিয়েছে কলাভবনের ছাত্রাবাস, ভোজনাগারের সামনের চৈত্য এবং রবীন্দ্রগৃহ শ্যামলী জুড়ে। সেখানে ফুটে উঠেছে গ্রামীণ স্থাপত্য শিল্প সম্বন্ধে তাঁর আগ্রহ। এই বাড়িগুলোর অলঙ্করণ বৈশিষ্ট্য এখনও সারাদেশে নজিরবিহীন। এই বাংলায় মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির ফলক এঁটে অলঙ্করণের রেওয়াজ ছিল ইংরেজ শাসনের প্রথম যুগ অবধি।

রামকিঙ্কর-সহ অন্যান্য ছাত্রদের নিয়ে নন্দলাল সেই ঐতিহ্যের আধুনিক প্রয়োগের পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন মাটির বাড়িগুলোর দেওয়ালে। পোড়ামাটির ফলক নয়, মাটির দেওয়ালের সঙ্গে মিশ খাওয়া মাটিরই অলঙ্করণ। নানা উপাদান মিশিয়ে ও আলকাতরার প্রলেপ দিয়ে তাকে শক্ত, জলপ্রতিরোধক করা হয়েছে। পাকা বাড়িগুলোতে দেওয়ালচিত্র নিয়ে নানা পরীক্ষা হয়েছে। কলাভবনের ছাত্রাবাসের দেওয়ালে তুষ, আলকাতরা মেশানো মাটির মূর্তি ও ছবিগুলিতে নন্দলালের শিল্পকীর্তির প্রবাহ বর্তমান। দেশ বিদেশের দেওয়াল চিত্র অঙ্কনের কলাকৌশল সংগ্রহ করেছেন প্রিয় শিষ্য বিনোদবিহারীকে দিয়ে। তাঁরই প্রেরণায় শান্তিনিকেতনে কাঁকর ও সিমেন্ট মিশ্রিত মূর্তি তৈরিতে হাত দিয়েছিলেন তাঁর ছাত্ররা।



শান্তিনিকেতনে নন্দলালের বাড়িতে জওহরলাল নেহরু

জীবনভর মাস্টারমশাইয়ের অসংখ্য অসামান্য কাজ। নানা রকম কাগজে, কাপড়ে, সিল্কে এবং কাঠের উপরে জলে ভেজা ওয়াশ পদ্ধতি, টেম্পারা ও চিনা বা জাপানি প্রথায় রঙিন, একরঙা ছবি বা স্কেচ এঁকে গিয়েছেন বিচিত্র সব বিষয়ে। রবীন্দ্রনাথের কথায়, নন্দলালের ‘বিচিত্র ছবি, তাতে বিচিত্র চিত্তের প্রকাশ বিচিত্র হাতের ছাঁদে তাতে না আছে সাবেককালের নকল বা না আছে আধুনিকের, তা ছাড়া কোন ছবিতেই চলতি বাজার-দরের প্রতি লক্ষ্য মাত্র নেই।’ তাঁর আঁকা শিল্পের সম্পদ। তাই আমরা সবচেয়ে স্বস্তি পেয়েছিলাম, যখন ইন্দিরা গাঁধী এসে মাস্টারমশাইয়ের সব কাজ জাতীয় সম্পদ বলে গ্রহণ করে নিলেন। মাস্টারমশাইয়ের আঁকা গুছোচ্ছি যখন, তিনি বললেন, ‘জানো, মেয়ের ভাল বিয়ে হলে যেমন স্বস্তি হয়, তেমনই মনে হচ্ছে আমার।’ দিল্লির নন্দলাল গ্যালারিতে সেই জাতীয় সম্পদ রয়েছে। এখন বয়স যত কমছে, সে সব কাজের অসাধারণত্ব তত যেন নতুন করে অনুভব করছি। একটা সময়ের পরে উনি যখন আর কলাভবনে হেঁটে আসতে পারতেন না, ওঁর বড় ছেলে বিশুদা (বিশ্বরূপ বসু) কোলে করে তুলে এনে কাজের জায়গায় বসিয়ে দিতেন। আর ওর আঁকার জায়গায় বোর্ডে একটা জাপানি বা নেপালি পেপার আটকে দেওয়া হত। মাস্টারমশাই সাদা-কালোয় ছবি আঁকতেন। কাজ করেননি, এমন একটা দিনও যায়নি।

নন্দলাল ছিলেন এক অসামান্য চিত্রকর, যাঁর পরিধি মাপা সম্ভব নয়। মনে হয়, রবীন্দ্রনাথও ছিলেন সত্যিকারের জহুরি, যিনি এমন এক মানুষকে নিজের আশ্রমে প্রতিষ্ঠা দিয়ে স্বাধীন আনন্দে কাজ করার উৎসাহ দিয়েছিলেন। আজ যে আশ্রম দেখি, এ তাঁর দেওয়া সেই পূর্ণ স্বাধীনতার পরিপূর্ণ রূপ।

অনুলিখন: পারমিতা সাহা, ঋণ: দেশ বিনোদন ১৩৮৯, নন্দলাল জন্ম-শতবার্ষিকী সংখ্যা

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement