Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

নিরন্তর খাঁটি বাঙালিয়ানার সন্ধান

৮৯৬ সালে পণ্ডৌল নামে যে উত্তর বিহারের অঞ্চলে বিভূতিভূষণের জন্ম তা শহর নয়, আবার গণ্ডগ্রামও নয়।

আবাহন দত্ত
১৫ জানুয়ারি ২০২২ ০৭:২৩
ছবি: পরিমল গোস্বামী

ছবি: পরিমল গোস্বামী

প্রবাসে জন্ম, আমৃত্যু বাস পরবাসেই। তবু জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে একান্ত ভাবে বাঙালিয়ানার সাধনা করেছেন, সাহিত্যসাধনার অনুপ্রেরণাও তা থেকেই। এমনকি, অভাবে-অপমানেও কখনও নিজের অভীষ্ট থেকে বিচ্যুত হননি বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়।

২৯ মার্চ, ১৯৭২। দারভাঙা থেকে দিন কয়েকের জন্য নিউ আলিপুরে এসেছেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়। সন্ধের আড্ডায় এক বন্ধু নিভৃতে জানালেন, “যাওয়ার আগে একটা ভাল খবরই দিতে পারতাম। কিন্তু তাতে একটু খুঁৎ থেকে যাচ্ছে।” ব্যাপার হল, সে বারের রবীন্দ্র পুরস্কার বিভূতিভূষণেরই পাওয়ার কথা, কিন্তু শেষ কালে এক ‘ইনফ্লুয়েনসিয়াল্’ সাংবাদিক বাদ সেধেছেন। কাষ্ঠ হেসে লেখকের প্রত্যুত্তর, “আপনি তো জানেন, আমার নিজের এ বিষয়ে কোন চেষ্টা থাকেনা। বইও এগিয়ে দিই না। এ অবস্থায় পেলে মুফুতে পাওয়া যায়। না পেলে দুঃখ থাকবার কথা নয়। তবু যে বৈরাগ্যই আছে, এ কথা কি ক’রে বলব? যেমন হয় জানাবেন।” ১২ এপ্রিল রেডিয়োয় ঘোষণা হল, “আর কোন বই না পাওয়ায় বিভূতি মুখোপাধ্যায়ের ‘এবার প্রিয়ংবদা’র ওপর দেওয়া হোল পুরস্কার।” এ বার ব্যাপারটা সত্যিই ভাবিয়ে তুলল বিভূতিভূষণকে। হয়তো কমিটিতে তাঁর নাম আটকানো যায়নি বলে রেডিয়োয় বিকৃত প্রচার! কিন্তু রাজ্য সরকারের সঙ্গে পত্রাচার কি রুচিসম্মত হবে? কলকাতায় দু’-এক জনকে চিঠি লিখলেন। জানা গেল, তাঁর নাম সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হলেও কোনও বইয়ের হদিশ পাওয়া যাচ্ছিল না, অতঃপর এক সদস্য ‘প্রকাশ ভবন’ আর ‘এম. সি. সরকার’ ঘুরে ‘এবার প্রিয়ংবদা’ জোগাড় করতে সমর্থ হন, অগত্যা সেই নামই ঘোষণা। এক দিন সরকারি চিঠিও এল, যথাযথ বিধিবদ্ধ। শেষাবধি আর পুরস্কারখানা প্রত্যাখ্যান করলেন না বিভূতিভূষণ।

ঘটনাটা এমনিতেই অসম্মানজনক, বিশেষত প্রাপকের পক্ষে, কিন্তু বিভূতিভূষণকে তা অন্য ভাবে ভাবিয়েছিল। নিজের জীবনে— শুধু সাহিত্যজীবন নয়, সমগ্র জীবনে— যদি কোনও কিছুর সন্ধান তিনি করে থাকেন, তা নিখাদ বাঙালিত্বের। জীবনের অধিকাংশ কেটেছে প্রবাসে— পণ্ডৌল (মিথিলা), দারভাঙা, পটনা। বঙ্গদেশের চাতরা (হুগলি), শিবপুর, নিউ আলিপুরে অল্প কালই থাকার সুযোগ হয়েছে। এমন প্রতিকূল প্রতিবেশে যিনি আজীবন বাংলা সাহিত্যসাধনা করে গিয়েছেন, তাঁর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেরা সাহিত্যসম্মান, যা নাকি রবীন্দ্রনাথের নামাঙ্কিত, তা নিয়ে এমন গরমিল লজ্জার চেয়ে অনেক বেশি বেদনার। বিভূতিভূষণ সেই ছেলেবেলা থেকেই বাংলাকে দেখতে চেয়েছেন, পেতে চেয়েছেন, এ ভূখণ্ডে পা রাখতেই তাঁর মনে বাড়তি পুলক জেগে উঠত। পরবাসে বাংলাকে বাঁচিয়ে রাখতে স্থানীয় স্বজাতিদের নিয়ে নিয়মিত সভা-সমিতি করে গিয়েছেন, যত দিন পেরেছেন। অমলিন ভালবাসায় এই দাগটুকু না পড়লেই হত।

Advertisement

অ-প্রবাসী

১৮৯৬ সালে পণ্ডৌল নামে যে উত্তর বিহারের অঞ্চলে বিভূতিভূষণের জন্ম তা শহর নয়, আবার গণ্ডগ্রামও নয়। এক প্রান্তে নীলকুঠি, নতুন যুগের অভিজ্ঞান ওটুকুই। গায়ে-লাগা দু’ঘর বাঙালি, মেটে বাড়ি, সে কালের বাবুদের কোয়ার্টার। গঞ্জজীবন এমনিই নিস্তরঙ্গ, তায় সমাজবিচ্ছিন্ন বাঙালি পরিবারে কালেভদ্রের তরঙ্গাঘাতও পৌঁছত না, শিশুমনও তাই অচঞ্চল। কিন্তু যে বিপন্নতায় দিনযাপন, তা বড় হয়ে বুঝেছেন বিভূতিভূষণ। পরবাসে দুই প্রজন্মে বাংলা ভাষা ও কৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখা বড় কঠিন। বড়কি ভৌজি (বড় বৌদি), ছোটকি ভৌজি (ছোট বৌদি), কটোরা (বাটি), বৈগন (বেগুন) ঘরে চালু হয়ে গিয়েছে, বাংলাতেও মৈথিলি টান। পরে তিনি লিখেছেন, বিকৃতির হাত থেকে বাঁচতে বাংলা পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাঁর বাবা, আর ‘একে তার গুরুগম্ভীর ভাষা, তার ওপর বাবার অনুস্বার, বিসর্গ আর যুক্তাক্ষরাদির শুদ্ধতা বজায় রেখে পড়া’, দুইয়ে মিলে বিদ্যাসাগরের ‘আখ্যানমঞ্জরী’ যে ঝঙ্কার সৃষ্টি করত, তা এখনও কানে লেগে। শিশুমনকে বাঙালি ধাঁচে গড়েপিটে নিতে শেষাবধি ছেলেদের চাতরা-শ্রীরামপুরের আদিবাড়িতে পাঠানোর সিদ্ধান্তই নিলেন বাবা। সেই মতো রেলযাত্রা।

সেই রেলগাড়িতেই বছর সাত-আটের বিভূতি ঘুম ভেঙে দেখল, যাঁরা জিনিস বেচছেন, তাঁরা ছাড়া সবাই ‘আমাদের মতোই কথা বলছে’! তার জিজ্ঞাসা: “এরা কারা বাবা?”

“এরা বাঙ্গালী।”

“আমরাও তো তাই।”

“হ্যাঁ, তাছাড়া কি হব?”

“তা এত কোথা থেকে এল বাবা?”

দাদা বলল, “এটা যে বাংলাদেশ রে। কী বোকা বিভূতিটা, বাবা।”

“এবার তোকে বাংলাদেশের একটা মিষ্টি খাওয়াব। কখনও ভুলতে পারবি না।”

বাল্যাবস্থায় বর্ধমানের সীতাভোগের যে স্বাদ সে পেয়েছিল, তা নাকি জিভে লেগে আছে।

পাঁচ বছর বয়সে সরস্বতী পুজোর দিনে হাতেখড়ির পর আড়াই-তিন বছরে দ্বিতীয় ভাগ আর ধারাপাতের কিছুটা আয়ত্ত হয়েছিল। তার জোরেই চাতরার মহাদেব মাস্টারের বাংলা পাঠশালায় ভর্তি হওয়া গেল। বাঙালি শিক্ষকসমীপে পুত্রদের সমর্পণ করে পশ্চিম-প্রবাসে ফিরে গেলেন বাবা।

এ সময়ই বালকের মাথায় চেপে বসল ভবঘুরেবৃত্তি বা বাউন্ডুলেপনার ভূত। যদিও তা ভূত না পরী, না কি ‘গার্জেন-এঞ্জেল’, তা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না, উত্তরজীবনে যা পেয়েছেন, তা তো ওর কৃপাতেই। তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির গোড়ায় ছিল ঘোরার এই নেশা— লেখকের ভাষায় ‘ব্যসন’। প্রবাসী বালক বাংলাভূমিকে আপন করে নিতে না পারলে, এই সাহিত্যিকের কি জন্ম হত? বৃদ্ধ বয়সে আত্মকথায় হিসাব কষেন, বাল্য-কৈশোর-যৌবনে বাংলাকে পেয়েছেন দু’বার, দু’-তিন বছরের দু’টি সংক্ষিপ্ত প্রবাসে, চাতরায় আড়াই-তিন বছর, অল্প ক’দিন শিবপুরে। এই ক’দিনের কথাও ‘নীলাঙ্গুরীয়’ উপন্যাসের অনেকখানি জুড়ে রয়েছে, আছে ‘বর্ষায়’ গ্রন্থের দু’খানা ছোটগল্পে। তিনি বলেন, “‘বর্ষায়’ গল্পের নয়নতারার দ্বিপ্রাহরিক তাসের মজলিশে যে গেছি, তাও প্রায় নিরুদ্দেশভাবেই ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ এক সময় মনে পড়ে গিয়ে।... চাতরার জীবনধারার ভাষা থেকে নিয়ে সর্বাঙ্গীণ বাঙালীত্বের বিস্ময় অনেকদিনই গেছে মিটে।”

ফের যখন পণ্ডৌলে ফেরা গেল, তখন নীলকুঠির উঁচু পদে অরবিন্দ নামে এক বাঙালি ভদ্রলোক, বিভূতির চোখে ‘যেন কলকাতারই এক টুকরো’। কাজ সেরে সন্ধেয় ভরাট গলায়, অপূর্ব ঢঙে, সুর করে নবীন সেনের ‘রৈবতিক’ কাব্য পড়তেন তিনি, নিশুতি গঞ্জের আকাশ নাকি ভরাট করে রাখত শুধু সেই আবেগ-উত্তেজনার স্বরই। তার পর মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, রমেশ দত্তদের নিয়েও কথা হত। এক লহমায় বদলে গেল পণ্ডৌলের জীবন, বিভূতির লেখালিখির অনুপ্রেরণা তৈরি হল।

এর পর দারভাঙার বাংলা স্কুল। দারভাঙার বাঙালিদের ছেলেদের বাংলা পড়ানোর সুবিধার জন্য এর পত্তন। প্রতিষ্ঠাতা রাজশেখর বসুর বাবা চন্দ্রশেখর। তাঁর পুত্র ছাড়াও স্কুলের দুই প্রখ্যাত ছাত্র যতীন্দ্রনাথ সেন ও নন্দলাল বসু। ১৯০৩ সালের ৩ জুলাই এইট্‌থ ক্লাসে ভর্তি হল বিভূতি। বাংলা স্কুলের বাড়ি পরিবেশ ছাত্র শিক্ষক, সব একেবারে বেঁধে ফেলল যৌবনের সাড়ে চারখানা বছর। সে-ও মহা খুশি— পণ্ডৌলের ‘দেহাতী’, ‘গেঁয়ো-গেঁয়ো’ গন্ধটা গা থেকে মুছে যেতে লাগল। ১৯০৮ সালে পরীক্ষা দিয়ে রাজস্কুল। চৌবাচ্চার তেলাপিয়া যেন মহাসাগরে— তিনটে ঘর, তিন শিক্ষকের বিদ্যালয় থেকে কত ঘর, মাস্টার, ছাত্র! চোদ্দো থেকে আঠারো জীবন গঠনের সময়, তখনকার মঞ্চেই ভবিষ্যৎ রচনার সূচনা। এই চার বছর সম্পর্কে তিনিও বলেন, “কত জল্পনা-কল্পনা, তার মধ্যে আমি মাত্র একটি টায়েটোয়ে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে আসতে পেরেছি গল্প-উপন্যাস লেখার বাসনা।”

স্বর্গাদপি গরীয়সী

ইন্টারমিডিয়েট-ইন-আর্টস পড়তে দু’বছরের জন্য শিবপুরে পাঠানো হল বিভূতিভূষণকে— ১৯১২ সালে রিপন কলেজে। রাজস্কুলে চল্লিশটা ছেলের মধ্যে যে ছিল পুরোভাগে, কলকাতার কলেজে বৃত্তি পাওয়া স্কলারদের ভিড়ে সুদূর বিহার থেকে আসা সেই ছাত্রের হারিয়ে যাওয়ারই কথা, অনেকটা তাঁর ‘বরযাত্রী’ গল্পের কে গুপ্ত-র মতোই। শুধু নিজের যোগ্যতা আর আগ্রহেই ভেসে রইল সে ছেলে।

এর পরের আরও কিছু খুচরো আসা-যাওয়া মিলিয়ে শিবপুরে মেরেকেটে তিন বছর কাটিয়েছেন বিভূতিভূষণ। অথচ তিনি বলেন, এই তিনটে বছর তাঁর দীর্ঘ জীবনের যেন অর্ধেকটা জুড়েই আছে। জীবনের মাপকাঠি সময় নয়, উপলব্ধির গাঢ়ত্বে-গভীরতা-বৈচিত্রে। বাংলার প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছতে পেরে তাঁর মনে হয়েছিল, “আমার বাঙালীত্ব-বোধ একটা সার্থকতা পেল।” একে প্রাদেশিক সঙ্কীর্ণতা বা গণ্ডিবদ্ধ স্বজাতীয়তা মনে হতেই পারে, বিভূতিভূষণ তাই বারবার তাঁর পূর্ণ ভারতীয়ত্বে বিশ্বাসের কথা জোর দিয়ে বলতেন। তিনি এমন ভারতের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে প্রদেশের সীমারেখা মুছে গিয়ে জগতের সামনে দাঁড়ায় এক দেশ। তবু তাঁর কাছে, বাঙালিত্ব আলাদা বস্তু— ‘একটা পাড়ার মধ্যে একটা বাড়ীর যে নিজস্বতা’। ছেলেবেলায় চাতরাকে বিভুঁই মনে হয়েছিল, পণ্ডৌল তখনও জীবনের ধ্রুবতারা, দারভাঙার পরিবেশে নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে দিল। বাঙালিরও তখন স্বর্ণযুগ। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, জগদীশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, আশুতোষ, অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল, সুরেন্দ্রনাথ, চিত্তরঞ্জন, সুভাষচন্দ্র, অরবিন্দ, বিবেকানন্দ— “এমন একটা যুগ যে, অবাঙ্গালীও বাঙ্গালীত্বে গৌরববোধ করবেন।”

শিবপুরের জীবন তাঁকে একটা বাঙালি সমাজও দিয়েছিল। বিবাহ, শ্রাদ্ধ, উপনয়ন, ব্রত, অন্নপ্রাশন— ভোজই কি সামাজিক আদানপ্রদানের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান? সবচেয়ে আনন্দের তো বটেই। বিভূতিভূষণ নিজেও কৌতুক করেন, ‘সবটুকু পরস্মৈপদী, রসনা-তৃপ্তির সঙ্গে, সে-তৃপ্তির আহরণের যে-উদ্বেগ আর ব্যয়ভার তার কোন সম্বন্ধ থাকেনা’। আলাপ-আলোচনার সুযোগ এক আকর্ষণ। পঙ্‌ক্তির অপেক্ষা আর পঙ্‌ক্তিতে বসার মধ্যেই হয়ে যায় কত গল্পগাছা, সমালোচনা, পরনিন্দা, পরচর্চা— যাকে বলে মজলিশ। বিভূতিভূষণের লেখালিখির প্রেরণার আট আনাও এই শিবপুর থেকেই। দারভাঙায় অঙ্কুরিত সাহিত্যরচনার বাসনা পল্লবিত হয় শিবপুরে। কলকাতার বিপুল সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের যে সান্নিধ্য তখন পেলেন, নবীন সাহিত্যিকের পক্ষে তা এক কল্পনাতীত পরিবেশ।

আইএ পাশ করে বিহারে ফিরতে হল, পটনা বি এন কলেজে বিএ পড়তে ভর্তিও হলেন, কিন্তু মাত্র জনা ছয়েক বাঙালি ছাত্রের সম্পর্ক হল খুবই নিবিড়, থেমে থাকল না বিভূতিভূষণের কলমও। ১৯১৫ সালে তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হল ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়, তৎকালীন ভারতের অগ্রণী পত্রিকা। পরিচয়ের সঙ্গে এল আত্মবিশ্বাস।

ময়দানের গ্রন্থমেলায় অন্নদাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে।

ময়দানের গ্রন্থমেলায় অন্নদাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে।


জীবন-তীর্থ

১৯১৬ সালে কলেজ পাশের পর ১৯৪২-এ অবসর পর্যন্ত হরেক চাকরি করেছেন বিভূতিভূষণ। অনেক স্কুল, এবং দারভাঙা-রাজের বিভিন্ন বিভাগ ও দফতর। আট-ন’বার চাকরি ছেড়েছেন। মিশতে হয়েছে বহু মানুষের সঙ্গে। সব জায়গাতেই খুঁজে বেরিয়েছেন বাংলাকে। বিহারে তখনও বাঙালিদের ভাল দাপট। উকিলমহলের পুরোধারা সব বাঙালি; বড় অফিসার, জজ ম্যাজিস্ট্রেট, কর্মচারীরা বাঙালি, কিছু কেরানিও। ডাক্তারদের মধ্যেও অনেক। কিন্তু বুদ্ধিজীবী অংশের যে অভাব দারভাঙা বা অন্যত্র ছিল, তা পূরণ হয়েছিল মুজফ্‌ফরপুরে। সেখানে বন্ধুর বাড়ি গিয়ে বিভূতিভূষণ তাই নতুন বিশ্বাস ও শক্তি পেয়েছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, এই বাঙালি সমাজ ‘পরিপূর্ণ’। ঐতিহ্যশালী শহরে গিয়ে বছর তিনেকের জন্য থেমে যাওয়া লেখনী ফের সচল হয়েছিল, তাঁর মতে ‘পুনরভিষেক’। এক সাহিত্যবাসরে রবীন্দ্র জয়ন্তী পালনের উদ্যোগ হয়, কেন্দ্রে অনুরূপা দেবী, মুজফ্‌ফরপুরে যে জনপ্রিয় সাহিত্যিকের উপস্থিতি বাঙালিদের প্রেরণা জোগাত। রীতিমতো শামিয়ানা টাঙিয়ে আবৃত্তি-প্রবন্ধপাঠ-মূকাভিনয়ে পালিত হয় জয়ন্তী। পটনায় যখন থাকতেন, সক্রিয় ভাবে যোগ দিতেন প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনে। নিয়ে আসা হত বনফুল, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, চিত্তরঞ্জন দাশদের। হাঙ্গামার ঘটনাও দেখেছেন। এক বার ‘শনিবারের চিঠি’ গোষ্ঠী তাতিয়ে দিল সভাপতি মোহিতলাল মজুমদারকে, তাঁর অভ্যর্থনা নাকি যথাযোগ্য হয়নি! পর দিন আর স্টেজেই উঠলেন না ক্রুদ্ধ সাহিত্যিক। আবার রাঘোপুরে থাকতে বাবু রঘুনন্দন সিংহের সপ্তম মাসের মাতৃশ্রাদ্ধে যখন সারা দেশ থেকে নামকরা পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানানো হল, বাংলার কদর হল বেশি, সেখানেই ‘মহামহোপাধ্যায়’-এর সংখ্যাধিক্য। সশিষ্য যে ২৫-২৬ জন এসেছিলেন, তার মধ্যে বিভূতিভূষণের জিম্মায় ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং ডা. বিনয়তোষ।

বিভূতিভূষণ আত্মকথায় লিখেছেন, “কয়েদখানার দাপটেও বাঙ্গালীর সাহিত্য-প্রীতিকে দাবিয়ে রাখতে পারেনা, মেডিকেলের ডিসেক্‌শন রুম বা অপারেশন টেবিলে পারবে কেন?” গোটা বিহারে মেডিক্যাল কলেজ তখন মাত্র দুটো, সেখানকার বাঙালি ছেলেরা মিলেই ‘সন্ধ্যা-মজলিস’ সাহিত্যবাসর বসিয়ে ফেলেছিল, বছরশেষে বৈঠকও হত। সভাপতি বিভূতিভূষণ, কলকাতা থেকে প্রধান অতিথি জোগাড়ের ভার তাঁর। পরে আর্টস-সায়েন্সের ছাত্রদেরও সে মৌতাত জমে উঠল। বিভূতিভূষণের উপরি পাওনা— কলকাতার সাহিত্যিকেরা তাঁর কাছে রাত কাটান। কে আসেননি? গজেন্দ্রনাথ মিত্র, প্রবোধকুমার সান্যাল, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সুশীলকুমার দে, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, জগদীশ ভট্টাচার্য, গৌরকিশোর ঘোষ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়। সবাইকেই একটা দিন বেশি ধরে রাখার চেষ্টা করতেন, কলেজের হাঙ্গামা মিটে গেলে মন খুলে সাহিত্য-আলাপ। এক বার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এসেছিলেন, বিহারেও তাঁর খ্যাতি দেখার মতো, বিশেষ করে মৈথিলীদের মধ্যে! তাঁরা বাংলা কিছু বোঝেন, বীরেনবাবুর কৌতুক-চিত্র শোনেন, আর চণ্ডীপাঠের বিশুদ্ধ উচ্চারণ বা আবেগময় কণ্ঠস্বর তো তাঁদের বিহ্বল করে দিয়েছিল।

স্বাধীনতার পরে দেশ ব্রিটিশমুক্ত হলেও বিহারে সংখ্যালঘু বাঙালির হাল ফেরেনি। বাঙালিদের নিয়ে ব্রিটিশ কোনও কালেই সন্তুষ্ট নয়, বাগে আনতে না পেরে দমনের চেষ্টা করত, ঔপনিবেশিক যুগে বিহারে তেমনই এক কানুন ‘ডোমিসাইল রুল’। বাঙালিকে বিহারে চাকরি পেতে গেলে দলিল-দস্তাবেজ দিয়ে ভূমিপুত্রের প্রমাণ দিতে হত, চাকরিজীবনে সার্টিফিকেটের জন্য ঘুরতে হয়েছে বিভূতিভূষণকেও। স্বাধীন দেশে সে দানব তো বেঁচেবর্তে রইলই, ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ ভাগ হওয়ায় রাষ্ট্র রুজির সঙ্গে ভাষার দাবিও তারা করল। প্রতিবাদী হল বাঙালি। এগারো বছর পর ‘বেঙ্গলী এসোসিয়েশন’কে পুনরুজ্জীবিত করলেন পটনার বিশিষ্টরা। ছোট-বড় শহরে সহায়ক সমিতি গঠনকল্পে বার্ষিক সর্ববিহার সম্মেলনের উদ্যোগ হল, জন্ম নিল পাক্ষিক পত্রিকা ‘সঞ্চিতা’। বাঙালিদের ইংরেজি শতবর্ষী সাপ্তাহিক ‘বিহার হেরাল্ড’ নবজীবন পেল। পটনা, ভাগলপুর হয়ে তৃতীয় বছরের সম্মেলন দারভাঙায়। স্মারক পত্রিকা ‘অ-প্রবাসী’। বিভূতিভূষণরা মনে করতেন, আসমুদ্র হিমাচল ভারতের যিনি বাসিন্দা, তিনি নিজভূমেই
আছেন, পরবাসী হওয়ার প্রশ্ন আসে কী করে? ‘অ-প্রবাসী’ তাই অপর পক্ষের প্রতি বঞ্চিতের স্মরণবার্তা— সংখ্যালঘুও নাগরিক, অধিকার তাঁদেরও সর্বস্তরে: শিক্ষায়, ভাষায়, জীবিকার্জনে। বিহারের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে বাঙালির যে দান, তা ভুললে ইতিহাস ফাঁকি দেওয়া হয়। আনন্দের কথা, এই উদ্যোগেই কর্মটাঁড়ে বালিকা বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয় ও সাক্ষরতা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হল। বাংলা সমিতি একতাবদ্ধ হল উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, অসমেও।

শনিবারের চিঠি

বিভূতিভূষণের বাংলা সাহিত্যচর্চাও চলেছে সমান তালে। স্কুলের সহকর্মীরা এক দিন জানালেন, ‘প্রবাসী’র গল্প-প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছে ‘রাণুর প্রথম ভাগ’। বিজেতা ঠিক হত পাঠকদের ভোটে। অর্থমূল্য ১৫০ টাকা। সে বার প্রথম পুরস্কার (২০০ টাকা) পান রাজশেখর বসু। এর পরেই রুটিন করে সাহিত্যচর্চা শুরু, রোজ সন্ধেয় লিখতে বসা, সম্পাদকের তাগাদায় তাৎক্ষণিক লেখা নয়, প্রতি দিন নিয়ম করে বসা। উপন্যাস লেখা ধরার পরে বেরোনোও কমে গেল।

‘উদীয়মান’ লেখক হিসেবে নাম হল, ‘প্রবাসী’তে নিয়মিত লেখা বেরোতে লাগল। ছুটিতে কলকাতায় গেলে এক জন বললেন, “আপনার তো গল্প অনেক জমে থাকবে। বই বের করতে চান? তাহ’লে সজনীবাবুর (সজনীকান্ত দাস) সঙ্গে দেখা করুন, উনি বলছিলেন।” তখনও বইয়ের স্বপ্ন দেখেন না বিভূতিভূষণ, তাই চাপা আনন্দ হলেও মুখে বললেন, “উনি নিলে কেন রাজি হব না?” প্রকাশিত হল প্রথম গল্পগ্রন্থ, সঙ্গে সঙ্গে নামও হয়ে গেল প্রচুর। এর পরে, যাকে বলে, সৃষ্টির আনন্দের যুগ। পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখার বিপুল চাহিদা, পাঠকেরা বাড়িতে আসেন আলাপ করতে, রাস্তাঘাটেও চিনে ফেলেন। খ্যাতির বিড়ম্বনাও হল। বিহারে প্রতিষ্ঠিত বাঙালি সাহিত্যিক ছিলেন, কিন্তু কোনও কাগজ ছিল না, উদীয়মান লেখকরাও ‘কলকাতার পাত’ না পাওয়ায় হারিয়ে যেতেন, তাই ‘প্রভাতী’ নামে পত্রিকা তৈরি হল। সময়ের ভয়ানক অভাবেও পটনার পত্রিকাটিতে দু’টি একাঙ্কিকা দিতে হল।

ছুটিতে আসতেন কলকাতায়। সে এক জরুরি কাজ, কেননা আনন্দবাজার পত্রিকা, ‘শনিবারের চিঠি’, ‘বঙ্গশ্রী’, ‘প্রবাসী’র দফতরে আড্ডা তাঁর বাঙালি মনে অনেক কালের রসদ জুগিয়ে দিত। নিয়ম করে দেখা করতেন কালিদাস রায়, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, নরেন্দ্র দেবদের সঙ্গে। অবসরে ‘নির্ভেজাল’ ফুরসত, জানা যায় রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যোগেশচন্দ্র বাগলের সঙ্গে আড্ডার কাহিনি। বলতেন, “আমার জীবনের মূল বৃত্তি সাহিত্য।”

সমস্যা যদিও ছিল আর্থিক পথে, বিশেষত অবসরের পর। লেখালিখি থেকে কিছু আয় ছিল— ‘পেনশনের মতো’— কিন্তু তা আর কতটা? অর্ধজীবন মসীজীবী হয়ে কাটিয়েও বিভূতিভূষণের মাসান্তের উপার্জন ঘর ভরায়নি, তাঁর ভাষায় ‘ক্ষতিপূরণ করেনি’। বরং প্রাপ্তিযোগ ছিল অন্য রকম। ১৯৫৮ সালে আনন্দবাজার পত্রিকা সাহিত্যিকদের পুরস্কৃত করার যে পরিকল্পনা নিয়েছিল, তাতে বিভূতিভূষণের নাম ঠিক হয়। এর পরে দারভাঙায় চিঠি যায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও— শরৎ-স্মৃতি স্বর্ণপদক। ১৯৭৩-এ পান কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী স্বর্ণপদক। পেয়েছেন নিখিল ভারত বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের সুবর্ণজয়ন্তী পদক, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডি লিট, বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম।

মিথিলায় তাঁর জন্ম, মৃত্যুও সেখানেই। ১৯৮৭ সালে দারভাঙায় প্রয়াত হন বিভূতিভূষণ। বাংলার দিকে তাকিয়ে, বাংলাকে মনে রেখে, দূরে-দূরেই চলে গেলেন ‘পরবাসী’ এক বাঙালি সাহিত্যিক।

***

বিভূতিভূষণের সব ভাল লাগার মধ্যেও বাংলা নিয়ে যে অভিযোগ ছিল, আজকের বাঙালির কাছে তা প্রণিধানযোগ্য। তাঁর আত্মকথায় সে কালের কলকাতা পায়ে হেঁটে ঘোরার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। তিনি বলতেন নেশা— ‘শিবপুর থেকে নিয়ে সর্বত্রই বাঙ্গালী টুকরা টাকরা কুড়িয়ে বেড়ানো’। শিবপুর ফেরিঘাটে গঙ্গা পেরিয়ে হেঁটে কলেজ, সেই পথের পরিধিই ক্রমশ বাড়ে। কিন্তু বদলে যাওয়া শহর দেখে পরিতাপ ঝরে পড়েছে তাঁর গলায়— “আমরা বলি বাঙ্গালী আমরা মূলত কবির জাত, শিল্পীর জাত, গৌণত আর কিছু।... ইডেন গেছে, ডালহৌসী গেছে, আরও কত গেছে এই রকম।” বাংলার সঙ্গে তাঁর দু’বার আলাপ, প্রথম বার চাতরায় তাকে ‘দেখা’, দ্বিতীয় বার শিবপুরে তাকে ‘পাওয়া’। দুই আলাপেই যে ‘ফ্রেশ্‌নেস্’ ছিল, চার পাশের ক্লিন্নতায় দিনে-দিনে কি তা ক্ষুণ্ণও হয়েছিল?

ঋণস্বীকার: জীবন-তীর্থ: বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প: জগদীশ ভট্টাচার্য (সম্পা:), বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় রচনাবলী

আরও পড়ুন

Advertisement