লোহিত সাগরে জার্মান গোয়েন্দা বিমানের উপর লেজ়ার হামলা চালিয়ে ফের খবরের শিরোনামে চিনা নৌবাহিনী। এই ঘটনার জেরে বেড়েছে বেজিং ও বার্লিনের মধ্যে সংঘাত। আক্রমণের পর অবশ্য ভুল স্বীকার করেনি ড্রাগনভূমির শি জিনপিং সরকার।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৫ ০৭:৩৯
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৯
লোহিত সাগরে বার্লিন বনাম বেজিং! জার্মান গুপ্তচর বিমানে এ বার লেজ়ার হামলা চালাল চিনা নৌবাহিনী। আচমকা অদৃশ্য রশ্মির আক্রমণে প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় বার্লিনের ওই গুপ্তচর উড়োজাহাজের। কোনও মতে জরুরি অবতরণ করে প্রাণ বাঁচান জার্মান বিমানচালক। ড্রাগন নৌসেনার এ-হেন ‘দাদাগিরি’তে স্তম্ভিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। যদিও হামলার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সরকার।
০২১৯
জার্মান গুপ্তচর বিমানে চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ নৌবাহিনীর লেজ়ার আক্রমণের কথা প্রথম বার ফলাও করে প্রকাশ করে বার্লিনের গণমাধ্যম ‘ডের স্পেগেল’। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ের গোড়ায় লোহিত সাগরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে নামে ইইউ। সেই অভিযানে অংশ নিয়ে ওই এলাকায় চক্কর কাটছিল জার্মান উড়োজাহাজ। তখনই হঠাৎ তার উপর লেজ়ার আক্রমণ শানায় পিএলএ নৌবাহিনী। অদৃশ্য রশ্মি বিমানটির গায়ে আঘাত করতেই মাঝ-আকাশে নিয়ন্ত্রণ হারায় সেটি।
০৩১৯
ইউরোপের ২৭টি দেশের সংগঠন ইইউ-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হল জার্মানি। বার্লিনকে এই গোষ্ঠীর মূল আর্থিক চালিকাশক্তি বলা যেতে পারে। লোহিত সাগরে ইরান মদতপুষ্ট ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিরা বাড়াবাড়ি শুরু করায় সম্প্রতি সেখানে ‘অপারেশন অ্যাসপিড্স’-এ নেমেছে ইইউভুক্ত দেশগুলির ফৌজ। উদ্দেশ্য, ওই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাস্তায় নির্দ্বিধায় পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা। সেই কারণেই হুথিদের ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে নামে ওই জার্মান গুপ্তচর বিমান।
০৪১৯
২০২৩ সালে ইরান মদতপুষ্ট প্যালেস্টাইনপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে ইজ়রায়েলের যুদ্ধ বাধলে সেখানে জড়িয়ে পড়ে হুথি বিদ্রোহীরা। ইহুদি ফৌজের উপর চাপ তৈরি করতে লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজগুলিকে নিশানা করতে থাকে তারা। সেই কারণে পাল্টা ‘অপারেশন অ্যাসপিড্স’ শুরু করতে বাধ্য হয় ইইউ। সূত্রের খবর, গত জুলাইয়ে এই মিশন চলাকালীন বাব এল-মান্দেব প্রণালীর কাছে মোতায়েন থাকা চিনা যুদ্ধজাহাজ থেকে জার্মান গুপ্তচর বিমানের উপর হামলা চালায় পিএলএ নৌবাহিনী। ইয়েমেনের উপকূলভাগ থেকে এলাকাটির দূরত্ব মেরেকেটে ২৯ কিলোমিটার। সংশ্লিষ্ট প্রণালীটিকে এডেন উপসাগরের দিক থেকে লোহিত সাগরের ‘প্রবেশদ্বার’ বলা যেতে পারে।
০৫১৯
গুপ্তচর উড়োজাহাজে বেজিঙের লেজ়ার আক্রমণের পর বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের এক মুখপাত্র। তিনি জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য মাল্টি-সেন্সর প্ল্যাটফর্মযুক্ত একটি উড়োজাহাজকে ওই এলাকায় পাঠানো হয়। সেটি নিয়মিত ইয়েমেন উপকূলের কাছে চক্কর কাটত। আগে থেকে লোহিত সাগরে চিনা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন থাকায় বিমানটিকে বেশ কয়েক বার ওই রণতরীর মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে পূর্ববর্তী কোনও সতর্কতা ছাড়া আচমকাই ওই জাহাজ থেকে লেজ়ার আক্রমণ চালানো হয়।
০৬১৯
সূত্রের খবর, অদৃশ্য রশ্মির আঘাত লাগায় কিছু ক্ষণের জন্য একরকম অন্ধ হয়ে যান জার্মান বিমানচালক। কোনও ক্রমে উড়োজাহাজটিকে পূর্ব আফ্রিকার জিবুতির বায়ুসেনা ঘাঁটিতে নামাতে সক্ষম হন তিনি। লোহিত সাগরের ঠিক কোন এলাকায় এই চিনা হামলা হয়েছে, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। পরে এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) এই সংক্রান্ত একটি পোস্ট করে বার্লিনের বিদেশ মন্ত্রক। সেখানে বলা হয়, ‘‘কোনও ভাবেই এই ধরনের ঘটনাকে বরদাস্ত করা হবে না।’’ পাশাপাশি, চিনা রাষ্ট্রদূতকে তলবও করে চ্যান্সেলার ফ্রেডারিখ মার্জের সরকার।
০৭১৯
চিনা নৌবাহিনীর এ-হেন ‘আগ্রাসী’ মনোভাব কিন্তু নতুন নয়। কিন্তু, আগে শুধুমাত্র ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল বেজিঙের জলযোদ্ধাদের ‘দৌরাত্ম্য’। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, তাইওয়ান এবং ফিলিপিন্সের মতো দেশের রণতরী বা লড়াকু জেটের উপর এই ধরনের ছোটখাটো হামলা প্রায়ই করতে দেখা গিয়েছে তাদের। এ বার সেই গণ্ডি পেরিয়ে লোহিত সাগরে ড্রাগন নৌবাহিনী জার্মানিকে নিশানা করায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য দিকে মোড় নিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
০৮১৯
বিশেষজ্ঞদের দাবি, অত্যন্ত হিসাব কষে এই ধরনের পদক্ষেপ করছে চিন। এর নেপথ্যে মূলত দু’টি উদ্দেশ্য রয়েছে বেজিঙের। প্রথমত, আমেরিকা ও ভারতকে নিয়ে তৈরি কোয়াডভুক্ত জাপান বা অস্ট্রেলিয়া এবং ইইউভুক্ত জার্মানিকে নিশানা করে কতটা জোরালো প্রত্যাঘাত আসতে চলেছে, তা বুঝে নিতে চাইছেন ড্রাগন প্রেসিডেন্ট জিনপিং। পাল্টা আঘাত সে ভাবে না এলে মান্দারিনভাষীদের সাহস যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
০৯১৯
দ্বিতীয়ত, পশ্চিম ইউরোপে এবং আমেরিকার বিপরীতে ইরান ও রাশিয়াকে বর্তমানে খোলাখুলি ভাবে সমর্থন করছে বেজিং। আর তাই তেহরান মদতপুষ্ট প্যালেস্টাইনপন্থী হুথিদের গতিবিধির খবর জার্মানদের হাতে যাক, তা একেবারেই না-পসন্দ চিনের। সেই কারণে বার্লিনের গুপ্তচর বিমানকে লেজ়ার রশ্মিতে নিশানা করেছে পিএলএ নৌবাহিনী।
১০১৯
তৃতীয়ত, উপকূলরেখা থেকে অনেকটা দূরে নিজেদের শক্তি পরীক্ষা করতে চাইছে চিনা নৌসেনা। বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী রয়েছে বেজিঙের হাতে। কিন্তু, তা সত্ত্বেও অভিযানের নিরিখে তাঁদের থেকে মার্কিন নৌসেনাকে কয়েক গুণ এগিয়ে রাখেন দুনিয়ার তামাম প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা। এই ধরনের অভিযানের মাধ্যমে সেই ‘মিথ’ ভেঙে দিতে চাইছেন মান্দারিনভাষীদের প্রেসিডেন্ট শি।
১১১৯
গত ২৪-২৫ জুন নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দ্য হেগ শহরে বৈঠক করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় শক্তিজোট ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংগঠন’ বা নেটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন)। সেখানে চিনকে নিয়ে আলাদা করে সতর্কবার্তা দেন সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুট। তিনি বলেন, ‘‘তাইওয়ানকে দখল করার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে বেজিং। তাদের কোনও অবস্থাতেই হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়।’’
১২১৯
দ্য হেগের সর্বশেষ নেটো সম্মেলনে হাজির ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অবশ্য চিনের শক্তিবৃদ্ধিকে সে ভাবে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাইওয়ানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ওয়াশিংটন যে বদ্ধপরিকর, তা স্পষ্ট করে দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, নেটোর সদস্যরাষ্ট্রগুলির তালিকায় নাম রয়েছে জার্মানিরও। এই সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী, অন্য কোনও দেশ নেটোভুক্ত কাউকে আক্রমণ করলে বাকি সমস্ত সদস্য রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। অর্থাৎ, বার্লিনের সঙ্গে সংঘাত যুদ্ধে পাল্টে গেলে ৩২টি দেশের বাহিনীর মুখোমুখি হতে হবে ড্রাগন ফৌজকে।
১৩১৯
চিন যে এ সবের কিছুই জানে না, এমনটা নয়। তার পরেও জার্মানিকে খোঁচানোর নেপথ্যে অন্য শক্তি কাজ করছে বেজিঙের। ইউরোপের উৎপাদন শিল্পের উপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ড্রাগন সরকারের। ফলে চিনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতের রাস্তায় গেলে বিরাট আর্থিক লোকসান সহ্য করতে হবে জার্মানির মতো ইইউভুক্ত দেশকে। আর তাই বার্লিনের পক্ষে কঠোর পদক্ষেপ করা বেশ কঠিন।
১৪১৯
গত ৮ জুলাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশনীতির মুখপাত্র আনোয়ার এল আনুনি বলেন, ‘‘চিনা নৌসেনার লেজ়ার হামলায় জার্মান পাইলটের মৃত্যু হতে পারত। আমাদের উড়োজাহাজকে মিশন শেষ না করেই ফিরে আসতে হয়। বেজিঙের এই ধরনের মনোভাব বিপজ্জনক এবং কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’’
১৫১৯
এর পরই ৯ জুলাই পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেন চিনা বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মাও নিং। যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘‘জার্মানির উচিত ভুল শুধরে নিয়ে সময়োপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা বৃদ্ধি করা।’’ এডেন উপসাগরে পিএলএ নৌবাহিনী পণ্যবাহী জাহাজগুলিকে এসকর্ট করার জন্য মোতায়েন ছিল বলে জানিয়েছেন মাও। পূর্ব আফ্রিকার জিবুতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং একাধিক ইউরোপীয় দেশের পাশাপাশি রয়েছে বেজিঙের নৌঘাঁটিও।
১৬১৯
তবে বিশ্লেষকদের দাবি, চিনের এই ধরনের ‘দৌরাত্ম্যে’র কারণে ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে ধীরে ধীরে বাড়ছে বেজিং বিরোধিতা। ২০২২ সালে ইটালির প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর জর্জিয়া মেলোনি ড্রাগনের সঙ্গে সম্পর্কছেদে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। চিনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআইতে রাস্তা নির্মাণের প্রকল্প থেকে ইতিমধ্যেই সরে এসেছে রোম।
১৭১৯
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, লোহিত সাগরের ওই ঘটনার পর একই রাস্তায় হাঁটতে পারে জার্মানি। কারণ, বার্লিনে ক্রমশ বাড়ছে ডানপন্থী দলগুলির জনপ্রিয়তা। সে ক্ষেত্রে ইউরোপের বাজারে আর্থিক ভাবে ধাক্কা খেতে পারে চিন। লোহিত সাগরে হুথিদের বিরুদ্ধে চলা অভিযানে জার্মানির সঙ্গে রয়েছে বেলজিয়াম, এস্টোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, গ্রিস, ইতালি, লাটভিয়া, নেদারল্যান্ডস এবং সুইডেন। পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলি সম্মিলিত ভাবে সেখানে পিএলএ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে অবরোধ গড়ে তুলবে, বলছেন সাবেক সেনাকর্তারা।
১৮১৯
২০২০ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় মার্কিন দ্বীপ গুয়ামের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমার উপর আমেরিকার নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্য করে লেজ়ার হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে পিএলএ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে তীব্র হয় অশান্তি। যদিও সে বারও যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে বেজিং।
১৯১৯
কিছু দিন আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে চিনা বিদেশ মন্ত্রক। বেজিং জানায়, কোনও অবস্থাতেই কিভের হাতে মস্কোকে পরাজিত হতে দেবে না তারা। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তখনই ঘুরপথে নেটোকে নিশানা করেছিল ড্রাগন। ইউরোপে রাশিয়া এবং এশিয়া ও আফ্রিকায় নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন রয়েছে মান্দারিনভাষীদের। সেই কারণে জার্মান গোয়েন্দা বিভাগে পিএলএ নৌবাহিনীর লেজ়ার হামলার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।