How does Israel get Azerbaijan, a Muslim majority country as a strategic partner amid Gaza war dgtl
Israel-Azerbaijan
অস্ত্র বেচে তরল সোনা কিনতেই ঘুরল খেলা, ভারতের চিন্তা বাড়িয়ে তলে তলে পাকিস্তানের ‘বন্ধু’কে বুকে টেনেছে ইহুদিরা!
মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও আজ়ারবাইজ়ানের সঙ্গে ক্রমশ ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে ইজ়রায়েল। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের গর্ভ থেকে জন্ম হওয়া ককেশাস এলাকার ওই দেশটির সঙ্গে পাকিস্তানের মধুর সম্পর্ক রয়েছে। এতে বিপদ বাড়বে নয়াদিল্লির?
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৩
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৮
গাজ়া যুদ্ধে ইজ়রায়েলি ফৌজের গণহত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে মুসলিম দুনিয়ায় শোরগোল। ইহুদিদের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে আতশকাচের তলায় রেখেছে ফ্রান্স-সহ একাধিক ‘বন্ধু’ ইউরোপীয় রাষ্ট্র। এ-হেন ‘একঘরে’ পরিস্থিতিতে সবাইকে চমকে গিয়ে তেল আভিভের পাশে এসে দাঁড়াল একটি মুসলিমপ্রধান দেশ। তাদের ‘জেরুজ়ালেম প্রেম’ আগামী দিনে পশ্চিম এশিয়া ও ককেশাস এলাকার যাবতীয় ভূ-রাজনৈতিক হিসাবে বদলে দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
০২১৮
ইজ়রায়েল ও আজারবাইজ়ান। দীর্ঘ দিন ধরে মুসলিমপ্রধান দেশটির সঙ্গে ইহুদি রাষ্ট্রটির ‘গলায় গলায় ভাব’ থাকলেও ঘুণাক্ষরে তার টের পায়নি গোটা বিশ্ব। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্যালেস্টাইনি ভূখণ্ড গাজ়া উপত্যকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে তেল আভিভের বাহিনী মুখোমুখি সংঘর্ষে নামলে বিষয়টি সকলের নজরে পড়ে। গত প্রায় আড়াই বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে এককাট্টা হয়ে ইজ়রায়েলের কড়া সমালোচনা করে গিয়েছে ইসলামি দুনিয়া। সেখানে একমাত্র ব্যতিক্রম আজারবাইজ়ান।
০৩১৮
গাজ়া যুদ্ধের গোড়ার দিকে মোটেই স্বস্তিতে ছিল না ইহুদি বাহিনী। সাত ফ্রন্টে লড়তে হচ্ছিল তাদের। তবে ধীরে ধীরে শত্রুদের পিছু হটতে বাধ্য করে তারা। ২০২৪ সাল আসতে আসতে ওই প্যালেস্টিনীয় ভূখণ্ডটির আকাশের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে ইজ়রায়েলি বায়ুসেনা। তার পরই যত্রতত্র বোমাবর্ষণের অভিযোগ ওঠে তেল আভিভের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি, ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’ চালিয়ে একটু একটু করে সেখানকার জমি দখল করতে থাকে ইজ়রায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ)।
০৪১৮
তেল আভিভের এ-হেন সামরিক অভিযানের খবর প্রকাশ্যে আসতেই প্যালেস্টাইনের পাশে দাঁড়িয়ে সমালোচনার ঝড় তোলে বিশ্বের প্রায় সমস্ত মুসলিম দেশ। আশ্চর্যজনক ভাবে এ ব্যাপারে প্রায় কোনও কথাই বলেনি আজারবাইজ়ান। বিশ্লেষকদের দাবি, শুধুমাত্র গভীর কূটনীতি এর নেপথ্যকারণ নয়। পাশাপাশি আছে সামরিক ও জ্বালানি সহযোগিতার মতো বিষয়। এর জেরে তেল আভিভের ‘কৌশলগত অংশীদার’ হয়ে উঠেছে বাকু।
০৫১৮
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে জন্ম হয় ১৫টি রাষ্ট্রের। এর মধ্যে ককেশাস এলাকার আজ়ারবাইজ়ান অন্যতম। খনিজ তেল সমৃদ্ধ মুসলিম দেশটির এক দিকে রয়েছে কাস্পিয়ান সাগর। প্রায় তিন দশক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে বাকুর প্রেসিডেন্ট হায়দার আলিয়েভের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন তৎকালীন ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইৎজ়্যাক রবিন। সম্ভবত এটাই দুই দেশের মধ্যে নিবিড় বন্ধুত্বের সূত্রপাত।
০৬১৮
গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে সোভিয়েতের গর্ভ থেকে ককেশাস এলাকায় আরও একটি দেশের জন্ম হয়। তার নাম আর্মেনিয়া। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার কিছু দিনের মধ্যেই আজ়ারবাইজ়ানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে তারা। ফলে অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির খোঁজ চালাতে থাকে বাকু। অন্য দিকে আরব রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে বার বার সংঘর্ষ হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা চাইছিল ইজ়রায়েল। ফলে কোনও রকমের জাতিগত বন্ধন না থাকা সত্ত্বেও দুই রাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে ওঠে সখ্য।
০৭১৮
বর্তমানে ইজ়রায়েলের খনিজ তেলের চাহিদার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সরবরাহ করে আজ়ারবাইজ়ান। এর বেশির ভাগটাই তুরস্কের মধ্যে দিয়ে পাঠায় তারা। সংশ্লিষ্ট পরিবহণে বাকু-তিবিলিসি-সেহান পাইপলাইনের বহুল ব্যবহার করে ককেশাস এলাকার ওই মুসলিম রাষ্ট্র। শুধু তা-ই নয়, গত কয়েক দশকে আরব দেশগুলির মধ্যে সংঘর্ষের সময়েও তরল সোনা ইহুদি রাষ্ট্রে পাঠানো বন্ধ করেনি তারা। এতে মজবুত হয়েছে দু’পক্ষের ‘কৌশলগত অংশীদারি’।
০৮১৮
খনিজ তেলের বিনিময়ে ইহুদিরা আজ়ারবাইজ়ানকে বিপুল পরিমাণে অত্যাধুনিক হাতিয়ার ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করছে বললে অত্যুক্তি হবে না। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫-’১৯ সালের মধ্যে আমদানি করা অস্ত্রের ৬০ শতাংশই ইজ়রায়েলের থেকে পেয়েছিল বাকু। ২০২০ সালে আর্মেনিয়ার থেকে বিতর্কিত নাগোর্নো-কারাবাখ দখল করতে সে সব ব্যবহার করে তারা। তাৎপূর্য বিষয় হল, ওই লড়াইয়ে ‘খেলা ঘোরানো’ পারফরম্যান্স করে তেল আভিভের সামরিক ড্রোন।
০৯১৮
২০২৩ সালে নাগোর্নো-কারাবাখ পুরোপুরি কব্জা করতে সক্ষম হয় আজ়ারবাইজ়ান। তার পরও সংঘাতের আতঙ্ক তাদের মন থেকে পুরোপুরি দূর হয়নি। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ইজ়রায়েলের সঙ্গে আর একটি অস্ত্রচুক্তি করে বাকু। এতে দু’তরফে আরও জোরদার হয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। পাশাপশি পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের খোঁজ, মহাকাশ গবেষণা ও জ্বালানি অনুসন্ধানের মতো বিষয়গুলিতে তেল অভিভের সঙ্গে অংশীদারি বাড়াতে দেখা যাচ্ছে তাদের।
১০১৮
গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সালে) সেপ্টেম্বরে আচমকাই প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দিয়ে বসে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা-সহ একাধিক পশ্চিম ইউরোপীয় দেশ। ওই সময় ইজ়রায়েলি ফৌজের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুনিয়া জু়ড়ে উঠেছিল সমালোচনার ঝড়। আন্তর্জাতিক স্তরে এ ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটেছিল বাকু। শুধু তা-ই নয়, ইহুদিদের সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবসা চালানোর উপরেই জোর দেন আজ়ারবাইজ়ানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ।
১১১৮
গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সালে) গাজ়ায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাশ করে রাষ্ট্রপুঞ্জ। তার পক্ষে অবশ্য ভোট দিয়েছিল আজ়ারবাইজ়ান। কিন্তু ওই পর্যন্তই। আন্তর্জাতিক স্তরে ইজ়রায়েল-প্যালেস্টাইন সমস্যা নিয়ে কোনও কথা বলতে শোনা যায়নি প্রেসিডেন্ট আলিয়েভকে। জ্বালানি ও সামরিক সহযোগিতার মতো লাভজনক ব্যবসাকে বাদ দিলে বাকুর এই নীরবতার নেপথ্যে বেশ কিছু কারণ আছে বলেও মনে করা হয়।
১২১৮
প্রথমত, ইসলামীয় মৌলবাদকে যথেষ্ট ঘৃণা করেন আজ়ারবাইজ়ানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ইজ়রায়েলের মতোই মুসলিম কট্টরপন্থীদের নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বাকুরও। আর তাই প্যালেস্টাইনপন্থী হামাসকে কখনওই কোনও প্রতিরোধী গোষ্ঠী হিসাবে দেখেনি তারা। বরং চরম ইহুদি বিদ্বেষের থেকে যে তারা বার বার যুদ্ধে জড়াচ্ছে, ককেশাস এলাকার রাষ্ট্রটির কাছে তা একরকম স্পষ্ট। এখানেই আরব দুনিয়ায় অন্যান্য ইসলামীয় দেশগুলির সঙ্গে মতাদর্শগত ফারাক রয়েছে আজ়ারবাইজ়ানের।
১৩১৮
দ্বিতীয়ত, ২১ শতকের জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিদেশনীতি পরিচালনা করছে আজ়ারবাইজ়ান। তুরস্ক ও ইজ়রায়েল, দু’টি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বাকুর। কিন্তু সমস্যা হল নানা ইস্যুতে আঙ্কারা ও তেল আভিভের মধ্যে বাড়ছে শত্রুতা। ফলে পর্দার আড়ালে থেকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সুযোগ পাচ্ছে বাকু। এর জেরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের অবস্থান মজবুত করতে পারছেন প্রেসিডেন্ট আলিয়েভ।
১৪১৮
ইজ়রায়েল ও আজ়ারবাইজ়ানের এ-হেন সম্পর্ক কিন্তু এক দিনে গড়ে ওঠেনি। ১৯৯৮ সালে ইহুদিদের বিদেশ মন্ত্রক ককেশাস রাষ্ট্রটিকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ দেশ’ হিসাবে উল্লেখ করে। পরবর্তীকালে বাকুকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন সাবেক ইহুদি প্রধানমন্ত্রী ইয়ার ল্যাপিড। তিনি বলেন, ‘‘আজ়ারবাইজ়ান আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের সঙ্গে আমাদের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।’’
১৫১৮
১৯৯৩ সালে বাকুতে একটি দূতাবাস খোলে ইজ়রায়েল। ওই সময়ে আজ়ারবাইজ়ানের কোনও দূতাবাস ইহুদিভূমিতে ছিল না। ২০২৩ সালে ককেশাস রাষ্ট্রটিও তেল আভিভে চালু করে দূতাবাস। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট আলিয়েভের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন ইজ়রায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জ়োগ। ওই বছরই জ্বালানি সঙ্কট মেটাতে একধিক বার আলোচনার টেবিলে বসেন দুই দেশের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী।
১৬১৮
তবে এগুলির উল্টো মতও রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, যে ভাবে তুরস্কের সঙ্গে ইজ়রায়েলের সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে তাতে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় আগামী দিনে মুখোমুখি হতে পারে যুযুধান দুই পক্ষ। তখন খোলাখুলি ভাবে ইহুদিদের পক্ষ নেওয়া আজ়ারবাইজ়ানের পক্ষে কঠিন হবে। কারণ বাকুর খনিজ তেল পরিবহণ অনেকাংশেই আঙ্কারার উপর নির্ভরশীল।
১৭১৮
দ্বিতীয়ত, কাশ্মীর ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সবসময়েই পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছে আজ়ারবাইজ়ান। এর ফলশ্রুতিতে আর্মেনিয়াকে একের পর এক অত্যাধুনিক হাতিয়ার বিক্রি করতে শুরু করেছে নয়াদিল্লি। তা ছাড়া ভারতের সঙ্গে ইহুদি রাষ্ট্রটির সম্পর্কও যথেষ্ট ভাল। ফলে ককেশাস এলাকায় ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা অন্য দিক দিয়ে যে বাকুর বিপদ বাড়াতে পারে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
১৮১৮
তা ছাড়া অনেকেই মনে করেন বেশ কিছু জাতীয় স্বার্থের উপর টিকে আছে ইজ়রায়েল ও আজ়ারবাইজ়ানের সম্পর্ক। সেখানে পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গা কতটা তা নিয়ে সন্দেহ করা যেতেই পারে। ফলে আগামী দিনে এই সম্পর্কে চিড় ধরে কি না, সেটাই এখন দেখার।