National Green Tribunal gives green signal for Great Nicobar mega infrastructure project, a game changer for India dgtl
NGT on Great Nicobar Mega Project
সবুজ সাফ করে বন্দর, সেনাঘাঁটি আর শহর নির্মাণ, সমুদ্রে ড্রাগনের রক্তচাপ বাড়াতে দ্বীপ জুড়ে ‘দক্ষযজ্ঞে’ ভারত!
বঙ্গোপসাগরের আন্দামান-নিকোবরের একেবারে দক্ষিণে রয়েছে গ্রেট নিকোবর দ্বীপ। এ বার সেখানে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের মেগা প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। নয়াদিল্লির জন্য এই প্রকল্প ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছে ওয়াকিবহাল মহল।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫১
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৮
আর কোনও বাধা নেই। খোদ আদালত দিয়েছে ছাড়পত্র। ফলে এ বার নবরূপে সেজে উঠবে বঙ্গোপসাগরের ছোট্ট দ্বীপ। অচিরেই সেখানে তৈরি হবে আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্টের বন্দর। থাকবে উড়োজাহাজ ওঠানামার জায়গা, সেনাছাউনি এবং সেই সঙ্গে ছোটখাটো একটা শহর। এই প্রকল্প পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির জন্য ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
০২১৮
বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আন্দামান-নিকোবরের একেবারে দক্ষিণে রয়েছে গ্রেট নিকোবর দ্বীপ। জায়গাটার কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট দ্বীপটি থেকে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাস্তা মলাক্কা প্রণালীর দূরত্ব মেরেকেটে ৪০ নটিক্যাল মাইল। সেখানেই এ বার ‘আন্তর্জাতিক কন্টেনার ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর’ (ইন্টারন্যাশনাল কন্টেনার ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট বা আইসিটিপি) নির্মাণের কাজ বিনা বাধায় চালু করতে পারবে কেন্দ্র।
০৩১৮
২০২৩ সালে গ্রেট নিকোবর দ্বীপে কন্টেনার ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর তৈরির প্রকল্পে সবুজ সঙ্কেত দেয় মোদী সরকার। কিন্তু এতে পরিবেশগত নানা ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে দায়ের হয় মামলা। চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি এতে রায় দেয় জাতীয় পরিবেশ আদালতের ছ’সদস্যের বিশেষ বেঞ্চ। সেখানে বলা হয়েছে, ৮১ হাজার কোটি টাকার গ্রেট নিকোবর মেগা প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্রে হস্তক্ষেপ করার কোনও ‘যুক্তিগ্রাহ্য কারণ’ খুঁজে পাননি তাঁরা।
০৪১৮
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গ্রেট নিকোবর দ্বীপে রয়েছে ভারতের দক্ষিণতম বিন্দু ইন্দিরা পয়েন্ট। ঠিক তার উপরের জায়গাটি ‘গালাথিয়া উপসাগর’ নামে পরিচিত। গত দু’বছর ধরে সেখানেই আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্টের বন্দর নির্মাণের কাজ চালাচ্ছিল কেন্দ্র। কিন্তু, প্রকল্পটি নিয়ে জাতীয় পরিবেশ আদালতে মামলা দায়ের হওয়ায় সেটা কিছুটা থমকে যায়। সেখান থেকে রায় চলে আসায় এ বার যে ওই কাজে গতি আসবে, তা বলাই বাহুল্য।
০৫১৮
বর্তমানে ভারতের হাতে একটি মাত্র কন্টেনার ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর রয়েছে, যা কেরলে তৈরি করেছে আদানি গোষ্ঠী। সাধারণ বন্দরের সঙ্গে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের পার্থক্য রয়েছে। একটি বাণিজ্য রুটে অনেক বন্দর থাকে। যে বন্দর থেকে একাধিক জায়গার জন্য জাহাজে পণ্য তোলা বা নামানো হয়, তাকে বলে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর। এত দিন ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় বাণিজ্যে এই ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের জন্য অন্য দেশের সাহায্য নিতে হত দিল্লিকে।
০৬১৮
বিশেষজ্ঞদের দাবি, আইসিটিপি নির্মাণের জন্য কৌশলগত দিক থেকে একটি চমৎকার জায়গা বেছে নিয়েছে ভারত। গ্রেট নিকোবরের গালাথিয়ার অবস্থান পূর্ব-পশ্চিম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সমুদ্রপথের উপর। ফলে এখান থেকে সিঙ্গাপুর, কলম্বো ও ক্লাংয়ের মতো ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনালগুলির সুবিধা পাওয়া যাবে। বন্দরটির স্বাভাবিক গভীরতা হবে ২০ মিটার। ফলে বড় জাহাজ অনায়াসেই এতে ঢুকতে পারবে।
০৭১৮
দ্বিতীয়ত, গত কয়েক বছর ধরে দ্রুত খবরের শিরোনামে চলে আসা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলের একটি অংশ হতে চলেছে গালাথিয়া বন্দর। একে ওই এলাকার প্রবেশদ্বার হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এটি ভারতের পূর্ব দিকের সমস্ত বন্দরের জন্য ট্রান্সশিপমেন্টের কাজ করবে। সেই তালিকায় রয়েছে কলকাতা, হলদিয়া, ধামরা, পারাদ্বীপ, বিশাখাপত্তনম ও চেন্নাই। এ ছাড়া বাংলাদেশের মঙ্গলা, চট্টগ্রাম এবং মায়ানমারের ইয়াঙ্গনকেও সংযুক্ত করবে এই বন্দর।
০৮১৮
আজকের দিনে ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্যের প্রায় ৭৫ শতাংশই পরিচালিত হয় বিদেশি বন্দর থেকে। এর মধ্যে কলম্বো, সিঙ্গাপুর ও ক্লাং বন্দরের উপর ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট বাণিজ্যের ৮৫ শতাংশ নির্ভরশীল। গালাথিয়া উপসাগরীয় বন্দর তৈরি হলে নয়াদিল্লির ট্রান্সশিপমেন্ট খরচ বাঁচবে প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি টাকা।
০৯১৮
সূত্রের খবর, এই বন্দর নির্মাণে ৪১ হাজার কোটি টাকা খরচ করবে কেন্দ্র। মোট চারটি পর্যায়ে এটি তৈরি করা হবে। প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হলেই বন্দরটি চালু করবে নয়াদিল্লি। ২০২৮ সাল নাগাদ এটি চালু হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
১০১৮
প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষে ২০২৮ সালে গালাথিয়া উপসাগরীয় বন্দর চালু হলে এটি ৪০ লক্ষ ‘টোয়েন্টি ফুট ইক্যুইভ্যালেন্ট ইউনিট’ বা টিইইউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। পুরো বন্দরটি তৈরি হয়ে গেলে তা বেড়ে দাঁড়াবে ১ কোটি ৬০ হাজার টিইইউ-তে। প্রথম পর্যায়ের জন্য আনুমানিক খরচ ১৮ হাজার কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছে।
১১১৮
প্রথম পর্যায়ে বন্দর নির্মাণের পাশাপাশি ড্রেজ়িং, ব্রেকওয়াটার তৈরি, পণ্য রাখার এলাকা, একাধিক ভবন এবং যন্ত্রপাতি ইনস্টলেশনের কাজ সম্পূর্ণ করা হবে। পাশাপাশি, বন্দরটিকে কেন্দ্র করে একটি পোর্ট কলোনি তৈরি করবে কেন্দ্র। এলাকাটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখানে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সমস্যা নেই।
১২১৮
সমীক্ষক সংস্থা ‘ক্রিসিল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালিটিকস’-এর সিনিয়র ডিরেক্টর ও গ্লোবাল হেড (ট্রান্সপোর্ট, মোবিলিটি অ্যান্ড লজিস্টিক কনসাল্টিং) জগনারায়ণ পদ্মনাভন জানিয়েছেন, গালাথিয়া উপসাগরীয় বন্দর প্রকল্পের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। এটি পশ্চিমা়ঞ্চলীয় পণ্যবাহী জাহাজগুলিকে আকর্ষণ করবে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার অন্য ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলিকে এটি প্রতিযোগিতার মুখে ফেলতে পারে।
১৩১৮
গালাথিয়া বন্দর তৈরির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল নির্মাণ সামগ্রী পরিবহণ। উদাহরণ হিসাবে ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের কথা বলা যেতে পারে। এর জন্য প্রচুর পরিমাণে পাথরের দরকার হবে। এগুলি বেশ দূর থেকে আনতে হবে ঠিকাদার সংস্থাকে। এ ছাড়া এই এলাকাটি যথেষ্ট ভূমিকম্পপ্রবণ। ২০০৪ সালের কম্পনে ইন্দিরা পয়েন্ট সমুদ্রের জলরাশির তলায় চলে গিয়েছিল। পরে অবশ্য জল সরলে সেটি ফের জেগে ওঠে।
১৪১৮
আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরকে বাদ দিলে গ্রেট নিকোবরের মেগা প্রকল্পে সামরিক ও অসামরিক দু’ধরনের কাজের জন্য ব্যবহারযোগ্য বিমানবন্দর নির্মাণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৫০ এমভিএ গ্যাস এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রও সেখানে গড়ে তোলা হবে। থাকবে ডিজিটাল পরিকাঠামো। পাশাপাশি, দ্বীপটির বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে নগরায়ণের পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রের মোদী সরকার।
১৫১৮
আয়তনের নিরিখে গ্রেট নিকোবর দ্বীপটি সিঙ্গাপুরের চেয়ে বড় এবং হংকঙের চেয়ে খানিকটা ছোট। প্রায় ১,০৪৪ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে এর বিস্তৃতি। চারদিক সমুদ্রে ঘেরা হলেও এতে ছোট ছোট কয়েকটি পাহাড় রয়েছে। আছে শিরা-উপশিরার মতো বেশ কয়েকটা নদীও।
১৬১৮
আন্দামান ও নিকোবরের সব দ্বীপে আদিবাসী আইন প্রযুক্ত হয়। গ্রেট নিকোবরকে তার বাইরে রেখেছে কেন্দ্র। সেখানে বসবাস করে শমফেন নামের একটি উপজাতি। সরকারের সঙ্গে তাদের বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তা ছাড়া এলাকাটার অর্থনৈতিক গুরুত্বও নেহাত কম নয়। রবার, লাল তৈলবীজ, কাজু, পাম গাছের জঙ্গল রয়েছে সেখানে। দ্বীপটির এক দিকে মিলবে প্রাচীন প্রবালপ্রাচীর।
১৭১৮
এ-হেন গ্রেট নিকোবরে মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১৬৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে উঠবে আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর-সহ অন্যান্য পরিকাঠামো। তবে এর জন্য ১৩০ বর্গকিলোমিটারের বনভূমিকে সরিয়ে ফেলতে হবে। কাটা পড়বে ১০ লক্ষ বা তার বেশি গাছ। আর তাই আদালতের রায় সত্ত্বেও বার বার পরিবেশগত ঝুঁকির কথা বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
১৮১৮
সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হল স্থানীয় উপজাতিদের পুনর্বাসন। যথেষ্ট সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিষয়টি দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্র। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা অবশ্য মনে করেন, গ্রেট নিকোবর দ্বীপে নতুন বন্দর এবং সামরিক ছাউনি তৈরি হলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় বাড়বে নয়াদিল্লির প্রভাব। পাশাপাশি, সামুদ্রিক বাণিজ্যে চিনকে টক্কর দিতে সুবিধা হবে কেন্দ্রের। ভবিষ্যতের সংঘাতের আশঙ্কার জায়গা থেকেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।