Why does Pakistan look new partner for Roosevelt Hotel of New York dgtl
Roosevelt Hotel of Pakistan
বাবুয়ানি দেখাতে আমেরিকায় বিলাসবহুল হোটেল কিনে ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’! মুখ বাঁচাতে ‘রুজ়ভেল্ট’ বেচবে পাকিস্তান
গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের একেবারে শেষে নিউ ইয়র্কের বিলাসবহুল হোটেল কেনে পাকিস্তান। চরম লোকসানের জেরে বর্তমানে তা বন্ধ করে রেখেছে ইসলামাবাদ। ওই হোটেল বিক্রি করতে হন্যে হয়ে খদ্দের খুঁজছেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫১
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৮
সন্ত্রাসবাদকে মদত দিতে দিতে পকেট গড়ের মাঠ। আর তাই এক এক করে জাতীয় সম্পত্তি বিক্রি করছে পাকিস্তান! কী নেই তাতে? বিমানবন্দর, রাষ্ট্রায়ত্ত অসামরিক উড়ান পরিষেবা সংস্থা থেকে শুরু করে খনিজ সম্পদ। সেই তালিকায় এ বার যুক্ত হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিলাসবহুল হোটেল। নিউ ইয়র্ক শহরের ওই বিদেশি সম্পত্তি বেচে ১০০ কোটি ডলার হাতে পেতে মরিয়া ইসলামাবাদ। আর তাই হন্যে হয়ে খদ্দের খুঁজে বেড়াচ্ছেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ এবং সেনা সর্বাধিনায়ক বা সিডিএফ (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
০২১৮
নিউ ইয়র্কের রুজ়ভেল্ট হোটেল। একে বিদেশে থাকা পাকিস্তানের মূল্যবান সম্পত্তিগুলির অন্যতম বললে অত্যুক্তি হবে না। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেউলিয়ার দরজায় পৌঁছে যাওয়ায় কিছুটা বাধ্য হয়েই সেই হোটেল বিক্রি করতে রাজি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ়। আর তাই আগামী দিনে পুনর্নবীকরণের নামে হোটেলটির অংশীদারি বেসরকারি সংস্থা বা ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। অন্য দিকে এই পদক্ষেপের জেরে আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে ইসলামাবাদ।
০৩১৮
দেশ চালাতে গত কয়েক বছরে একাধিক বার আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার বা আইএমএফের (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড) দ্বারস্থ হয়েছে পাক প্রশাসন। সম্প্রতি ইসলামাবাদকে ৭০০ কোটি ডলার ঋণ মঞ্জুর করে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। তবে ওই টাকা হাতে পেতে হলে বেশ কিছু শর্ত মানতে হবে তাদের। এর মধ্যে অন্যতম রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বেসরকারিকরণ। রয়টার্স জানিয়েছে, সেই শর্ত মেনেই নিউ ইয়র্কের রুজ়ভেল্ট হোটেলের উপর থেকে রাশ আলগা করছে শাহবাজ় সরকার। বেসরকারি সংস্থা বা ব্যক্তির হাতে ছাড়তে চলেছে তার অংশীদারি।
০৪১৮
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন পাক প্রশাসনের এক পদস্থ কর্তা। তাঁর কথায়, হোটেলটির পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য কম করে ১০০ কোটি ডলার প্রয়োজন। তা ছাড়া সেই কাজ শেষ হতে চার থেকে পাঁচ বছর লেগে যাবে। তবে রুজ়ভেল্ট হোটেল শতাব্দীপ্রাচীন হওয়ায় বিশ্বের তাবড় রিয়্যাল এস্টেট সংস্থাগুলির একে নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। ফলে হোটেলটির অংশীদারি পেতে তারা অচিরেই ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে আশাবাদী ইসলামাবাদ।
০৫১৮
এ ব্যাপারে রয়টার্স জানিয়েছে, রুজ়ভেল্ট হোটেল নিয়ে পাক প্রশাসনের পদস্থ কর্তাদের যথেষ্ট উচ্চ ধারণা রয়েছে। তাঁরা মনে করেন, চলতি বছরের জুনের মধ্যেই ওই বিদেশি সম্পত্তির জন্য ধনকুবের অংশীদারের সন্ধান মিলবে। প্রাথমিক ভাবে রুজ়ভেল্টকে তাঁর হাতে তুলে দিতে ১০ কোটি ডলার নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ইসলামাবাদের। যদিও এই নিয়ে সরকারি ভাবে কোনও বিবৃতি দেয়নি শাহবাজ় শরিফের সরকার।
০৬১৮
পাক প্রশাসনিক কর্তাদের এ-হেন ধারণার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে প্রথমেই বলতে হবে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী হোটেলটির অবস্থান ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র নিউ ইয়র্ক শহরের ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ের এক কোনায় বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে রুজ়ভেল্ট হোটেল। গ্র্যান্ড টার্মিনাল, ফিফ্থ অ্যাভিনিউ ও টাইম্স স্কোয়্যার থেকে হাঁটাপথে এর দূরত্ব কয়েক মিনিট। নিউ ইয়র্কের রিয়্যাল এস্টেটের দৃষ্টিকোণ থেকে এর চেয়ে ভাল অবস্থান যে আর হয় না, সে কথা বলাই বাহুল্য।
০৭১৮
১৯২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পথচলা শুরু করে রুজ়ভেল্ট হোটেল। ওই সময় এর পরিচালন সংস্থা ছিল নিউ ইয়র্ক ইউনাইটেড হোটেল্স ইনকর্পোরেটেড। বো-আর্টস শৈলীর ওই হোটেলটির নকশা তৈরিতে হাত রয়েছে আমেরিকার বিখ্যাত নির্মাণ সংস্থা জর্জ বি পোস্ট অ্যান্ড সনের। গ্র্যান্ড সেন্ট্রালের দিকে যাওয়ার সক্রিয় রেললাইনের উপর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে হোটেলটিকে দাঁড় করায় তারা। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজ়ভেল্টের সম্মানে এর নামকরণ করা হয়েছিল।
০৮১৮
গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে বিলাসিতার প্রতীক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে নিউ ইয়র্কের রুজ়ভেল্ট হোটেল। এর ভিতরে রয়েছে হাজারের বেশি ঘর, রাজকীয় স্যুইট এবং বারান্দা-সহ একটি প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইট। ওই যুগে সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা একাধিক সুযোগ-সুবিধা সেখানে রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল শিশুদের যত্ন নেওয়ার জায়গা বা চাইল্ড কেয়ার রুম ও আবাসিক চিকিৎসক।
০৯১৮
১৯৪৩ সালের রুজ়ভেল্ট হোটেল অধিগ্রহণ করেন মার্কিন ধনকুবের কনরাড নিকলসন হিলটন। চল্লিশের দশকে সংশ্লিষ্ট হোটেলটির প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইটেই পাকাপাকি ভাবে থাকা শুরু করেন তিনি। ওই সময় আমেরিকা জুড়ে তাঁর একাধিক হোটেল ছিল। যদিও এই ব্যবসায় সর্বাধিক লাভ রুজ়ভেল্টের থেকেই ঘরে তুলতেন হিলটন। পরবর্তী কালে বিশ্বের প্রথম হোটেল হিসাবে অতিথিকক্ষে টেলিভিশন বসানোর রেকর্ড করেন তাঁরা। আতিথেয়তার ইতিহাসে এটি নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছিল।
১০১৮
গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের আগে পর্যন্ত রুজ়ভেল্ট হোটেলের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক ছিল না পাকিস্তানের। ১৯৭৮ সালে হঠাৎ করেই ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’র মতো ওই হোটেল লিজ়ে পায় ইসলামাবাদ। ওই সময় রুজ়ভেল্টের হর্তাকর্তা ছিলেন রিয়্যাল এস্টেট লগ্নিকারী পল মিলস্টেন। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের বিনিয়োগকারী শাখা পিআইএ ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের হাতে সংশ্লিষ্ট হোটেলটিকে তুলে দেন তিনি। পরবর্তী কালে সুনির্দিষ্ট মূল্যে ওই সম্পত্তি কিনে নেওয়ার সুযোগও পায় ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী।
১১১৮
সত্তরের দশকের শেষের দিকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা অবশ্য আজকের মতো এতটা খারাপ ছিল না। ফলে মিলস্টেনের দেওয়া টোপ গিলতে ইসলামাবাদ দেরি করেনি। শুধু তা-ই নয়, লেনদেনের ওই চুক্তির অন্যতম অংশীদার ছিলেন সৌদি আরবের যুবরাজ ফয়সল বিন খালিদ বিন আবদুল আজ়িজ আল সৌদ। যদিও আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, ওই বিনিয়োগ ছিল ভস্মে ঘি ঢালার শামিল। কারণ, তত দিনে পুরনো গৌরব হারিয়ে লোকসানে চলে গিয়েছে রুজ়ভেল্ট হোটেল।
১২১৮
তৎকালীন পাক সরকারের কাছে অবশ্য নিউ ইয়র্কের ওই হোটেল কেনার নেপথ্যে ছিল অন্য যুক্তি। প্রথমত, আমেরিকার মাটিতে ঐতিহ্যবাহী সম্পত্তি রাখার গর্ব অনুভব করতে চেয়েছিল ইসলামাবাদ। দ্বিতীয়ত, এ ব্যাপারে ভারতকে টেক্কা দেওয়া যাবে বলে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল তাদের। ফলে লিজ়ে পাওয়া লোকসান ‘রোগে আক্রান্ত’ রুজ়ভেল্টকে সারিয়ে তুলতে জলের মতো টাকা খরচ করতে থাকে তারা। পরের দু’বছর বজায় ছিল এই ধারা।
১৩১৮
তবে পাকিস্তানের ব্যাপক সংস্কার সত্ত্বেও আর কখনও তার পুরনো গৌরব ফিরে পায়নি রুজ়ভেল্ট হোটেল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৯৯৮ সালে নিউ ইয়র্কের ওই হোটেল কেনে পিআইএ ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড। এর জন্য প্রায় ৩ কোটি ৬৫ লক্ষ ডলার খরচ করেছিল ইসলামাবাদ, যা যুক্তরাষ্ট্রের সম্পত্তির বাজারের নিরিখে জলের দরে পাওয়া বলা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট লেনদেন শেষ হওয়ার পরই লিজ় চুক্তি ভাঙার অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয় মিলস্টেন পরিবার।
১৪১৮
ফলে রুজ়ভেল্ট হোটেল কিনেও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে পাকিস্তান। ২০০০ সালে অবশ্য ওই মামলার রায় দেয় আমেরিকার আদালত। সেখানে জয়লাভ করায় পাকাপাকি ভাবে হোটেলটির সম্পূর্ণ মালিকানা হাতে পায় পিআইএ। এর পরই নিউ ইয়র্কের সম্পত্তি থেকে দীর্ঘমেয়াদি লাভের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে ইসলামাবাদ। যদিও কখনওই সেটা বাস্তবে রূপান্তরিত হয়নি।
১৫১৮
গোড়ার দিকে অবশ্য রুজ়ভেল্ট হোটেল পাক সরকারের আশাভঙ্গ করেছিল এমনটা নয়। নিউ ইয়র্কে বেড়াতে আসা পর্যটক বা ধনকুবের ব্যবসায়ীদের অন্যতম পছন্দের জায়গা হয়ে ওঠে ওই চারতলা হোটেল। একসময় রুজ়ভেল্টের সেরা আকর্ষণ ছিল গাই লোম্বার্ড ও তাঁর রয়্যাল কানাডিয়ান্স ব্যান্ডের সঙ্গীতশিল্পীদের অনুষ্ঠান। এ ছাড়া নববর্ষের সময় সেখানে বাজত লরেন্স ওয়েলকের অর্কেস্ট্রা। নব্বইয়ের দশকে ইসলামাবাদের জুনুন ব্যান্ডের মতো গানের দলও সেখানে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
১৬১৮
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের সঙ্গেও রুজ়ভেল্ট হোটেলের যোগসূত্র রয়েছে। ভোটের সময় ওই হোটেলটিকে প্রধান দলীয় কার্যালয় হিসাবে ব্যবহার করেছেন নিউ ইয়র্কের গভর্নর টমাস ই ডিউই। মাইকেল ডগলাস, আল পাচিনো এবং জেনিফার লোপেজের মতো চলচ্চিত্র ও টিভি তারকারা সেখানে ‘ওয়াল স্ট্রিট’, ‘দ্য ফেঞ্চ কানেকশান’ এবং ‘মেইড ইন ম্যানহাটন’-এর মতো সিনেমার প্রচারে সেখানে গিয়েছেন। এ ছাড়া ‘ম্যাড মেন’ সিরিজ়টিও হোটেলটিতে প্রদর্শিত হয়েছে।
১৭১৮
২০২০ সালে কোভিড অতিমারীর সময় মারাত্মক ভাবে লোকসানের মুখে পড়ে রুজ়ভেল্ট হোটেল। ফলে ওই বছর এর দরজা গ্রাহকদের জন্য বন্ধ করতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। ২০২১-’২৩ সালের মধ্যে অভিবাসীদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ওই হোটেল। সেখান থেকে অবশ্য ভালই রোজগার করছিল ইসলামাবাদ। কিন্তু একে কেন্দ্র করে আমেরিকায় শুরু হয় রাজনৈতিক বিতর্ক। ফলে অভিবাসীদের সেখান থেকে বার করে দিতে বাধ্য হয় পাক প্রশাসন।
১৮১৮
বর্তমান পরিস্থিতিতে অবশ্য ৪২ হাজার বর্গফুটের রুজ়ভেল্ট হোটেলকে ৫০ থেকে ৬০তলা লম্বা বহুতলে বদলে ফেলতে চাইছে শাহবাজ় সরকার। ওই গগনচুম্বী অট্টালিকাকে অফিস ও আবাসন হিসাবে গড়ে তুলতে চাইছে ইসলামাবাদ। এর জন্য চাই ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলার। সেই কারণেই নতুন অংশীদার খুঁজতে কোমর বেঁধে লেগে পড়েছে পাকিস্তান, বলছে ওয়াকিবহাল মহল।