The world’s longest and deepest undersea road tunnel is being built in Norway dgtl
World’s deepest sea tunnel
সমুদ্রের ৪০০ মিটার গভীরে ২৭ কিমি দীর্ঘ সুড়ঙ্গে দক্ষযজ্ঞ! লোকচক্ষুর আড়ালে কী তৈরি করছে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’?
সমুদ্রতলের শক্ত পাথর কেটে তৈরি করা হচ্ছে এই সড়ক-সুড়ঙ্গটি। উত্তর ইউরোপের নর্ডিক দেশে নির্মীয়মাণ এই সড়ক প্রকল্পটির পোশাকি নাম ‘রোগফাস্ট’। এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াতের জন্য সমুদ্রপথের উপর নির্ভরতা কমাবে এই সুড়ঙ্গ।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:০৪
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৭
২৭ কিলোমিটার সড়ক। তা দিয়ে চলবে গাড়ি। কিন্তু সেই সড়ক থাকবে লোকচক্ষুর আড়ালে। কারণ সেই রাস্তাটি মাটির উপরে নয়, থাকবে সমুদ্রের নীচে। ‘নিশীথ সূর্যের দেশে’ শুরু হয়েছে এক মহাযজ্ঞ। ইউরোপের ছোট্ট দেশে সমুদ্রের পেট চিরে তৈরি হচ্ছে এক দীর্ঘ সড়ক।
০২১৭
সংবাদসংস্থা সিএনএন-এর প্রতিবেদনে এটিকে বিশ্বের ‘গভীরতম সমুদ্রতলের সড়ক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তর ইউরোপের নর্ডিক দেশ নরওয়েতে নির্মীয়মাণ এই সড়ক প্রকল্পটির পোশাকি নাম ‘রোগফাস্ট’। এটি রোগাল্যান্ড ফাস্টফোরবিন্ডেলসের সংক্ষিপ্ত রূপ। সমুদ্রের ৪০০ মিটার গভীরে খোঁড়া হচ্ছে এই সুড়ঙ্গ। বিশাল এই পরিবহণ প্রকল্পটি শেষ হলে দেশটির পশ্চিম উপকূলের শহরগুলির সড়ক পরিবহণের রূপরেখা বদলে দেবে বলে আশা করছে সে দেশের সরকার।
০৩১৭
সমুদ্রতলের শক্ত পাথর কেটে তৈরি করা হচ্ছে এই সুড়ঙ্গটি। সেটির কাজ সম্পূর্ণ হলে দেশের পশ্চিম উপকূলরেখা বরাবর এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াতের জন্য সমুদ্রপথের উপর নির্ভরতা কমবে। বাঁচবে শহরান্তরে যাতায়াতের সময়।
০৪১৭
সুড়ঙ্গটি নরওয়ের র্যান্ডাবার্গ এবং বোকন অঞ্চলকে সংযুক্ত করবে। ইউরোপীয় মহাসড়কের অংশ ই৩৯-এ মিশে যাবে রোগফাস্ট। এই রাস্তাটি উত্তরে ট্রন্ডহেইম থেকে দক্ষিণে ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড পর্যন্ত ১ হাজার ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ। এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথ পেরোতে বর্তমানে সাত বার ফেরি বদল করতে হয়।
০৫১৭
নরওয়েতে ফেরি পারাপার অনেকটাই আবহাওয়া নির্ভর। আবহাওয়ার প্রতিকূল হলেই ফেরি পরিষেবা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সুড়ঙ্গনির্মাণ সম্পূর্ণ হলে বিভিন্ন সড়ক ও সেতুর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে এই ফেরি পারাপার বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে নরওয়ে সরকারের।
০৬১৭
নরওয়ের পশ্চিম উপকূলের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল স্ট্যাভাঙ্গার এবং হাউগেসুন্ডের মধ্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার জন্যই মূলত এই প্রকল্পের ভাবনা। ফেরি যাতায়াতকে সরিয়ে দিলে বার্গেন এবং স্ট্যাভাঙ্গারের মধ্যে ভ্রমণের সময় প্রায় ৪০ মিনিট কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বার্গেন এবং স্ট্যাভাঙ্গার জনসংখ্যার দিক থেকে নরওয়ের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ বৃহত্তম শহর।
০৭১৭
সমুদ্রের গভীরে সড়ক বা সুড়ঙ্গটির নির্মাণকাজে হাত দেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালে। তবে বাজেটের তুলনায় নির্মাণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় এক বছর পরেই তা বাতিল করে দেওয়া হয়। ২০২১ সালে ফের সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।
০৮১৭
তিন বছরের বিরতির ফলে প্রকল্পের পূর্বের চুক্তিগুলি বাতিল করতে হয়েছিল। প্রকল্পটি কী ভাবে এগিয়ে যাবে তার সমস্ত নকশা ও চুক্তি নতুন ভাবে করা হয়েছিল। সংশোধিত পরিকল্পনা এবং চুক্তির ফলে ২০২১ সালের শেষের দিকে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হয়েছিল। এতে মোট খরচ পড়বে ২৪০ কোটি ডলার বা ২৩ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা।
০৯১৭
গভীরতম স্থানে সুড়ঙ্গটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৯২ মিটার নীচে নেমে যাবে। অটোমোটিভ বা রেল পরিবহণের জন্য ব্যবহৃত সাবমেরিন টানেলের তুলনায় এই সড়ক নির্মাণের কৌশল কিছুটা ভিন্ন। সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ইঞ্জিনিয়ারেরা সমুদ্রতলের নীচে একই সময়ে উভয় প্রান্ত থেকে একসঙ্গে কাজ করে সুড়ঙ্গটি খনন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর ফলে খননকর্মীরা সুড়ঙ্গ খুঁড়তে খুঁড়তে একে অপরের দিকে এগিয়ে চলেছেন।
১০১৭
তাঁদের লক্ষ্য হল পাঁচ সেন্টিমিটারেরও কম ব্যবধান অর্জন করে দু’প্রান্তের সড়ককে মিলিয়ে দেওয়া। এই ধরনের পদ্ধতি গ্রহণের ফলে নকশা যেমন নির্ভুল হবে, তেমনই অর্থেরও সাশ্রয় হবে। খননের সময় সামান্য ভুল হলে তা প্রকল্পকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে বিশাল বিশাল কঠিন পাথর সরানোর সময় সামান্য ভুলচুকও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
১১১৭
সুড়ঙ্গনির্মাণের প্রধান প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি হল পাথরের ফাটলগুলি সঠিক ভাবে ভরাট করা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েকশো মিটার নীচে কাজ করার ফলে আশপাশের পাথর এবং সমুদ্রের জল নির্মাণস্থলে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে। সুড়ঙ্গে যাতে লবণাক্ত জল ঢুকতে না পারে, তার জন্য ফাটল মেরামতের কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১২১৭
নির্মাণে নির্ভুলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তিই মূল চালিকাশক্তি। সুড়ঙ্গে নতুন খনন করা অংশগুলি পরিমাপ করার আয়নাযুক্ত লেজ়ার স্ক্যানার ব্যবহার করা হয়। এই বিশেষ যন্ত্রটি নির্দিষ্ট এলাকায় ঘুরে ঘুরে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২০ লক্ষ তথ্য সংগ্রহ করে।
১৩১৭
এর পর এই তথ্যগুলিকে বিস্তারিত ডিজিটাল মডেল তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়। ইঞ্জিনিয়ারেরা এই মডেলটিকে মূল নকশা পরিকল্পনার সঙ্গে তুলনা করে দেখেন, যাতে কোনও ভুলত্রুটি আগে থেকেই ধরা সম্ভব হয়।
১৪১৭
সুড়ঙ্গটির উত্তর দিকের নির্মাণকারী সংস্থা সুইডেনের স্কানস্কা। সংস্থার প্রকল্প ব্যবস্থাপক অ্যান ব্রিট মোয়েন সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই উত্তর অংশে খননের সময় সমুদ্রের নোনা জল সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়েছে। ফলে তাঁদের আরও উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন পড়ছে। সুড়ঙ্গ খননের কাজ মাটির যত গভীরে যেতে শুরু করেছে ততই পরিবেশ নিরাপদ রাখা তাঁদের কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
১৫১৭
রোগফাস্টের প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী এখানে দু’টি পৃথক ‘টানেল টিউব’ থাকবে। প্রতিটি টিউবে দু’টি ট্র্যাফিক লেন থাকবে এবং এগুলি কেবল সড়কপথ হিসাবে ব্যবহৃত হবে। সুড়ঙ্গের ঠিক মাঝামাঝি লেন পরিবর্তন করার জন্য একটি গোলাকার চত্বর থাকবে। এই গোল চত্বরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৬০ মিটার নীচে অবস্থিত হবে। এই সংযোগস্থল থেকে আরও একটি শাখা তৈরি হবে। সেটি নরওয়ের সবচেয়ে ছোট পুরসভা, কেভিটসোয় দ্বীপের দিকে যাওয়ার জন্য একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।
১৬১৭
পরিকাঠামোগত চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সুড়ঙ্গটির দীর্ঘ অংশ জুড়ে বায়ুর গুণমান বজায় এবং ট্র্যাফিক সুরক্ষা পরিচালনা করার জন্য উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন। যেহেতু রোগফাস্টকে সড়কপথ হিসাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তাই সুড়ঙ্গের ভিতরে যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
১৭১৭
এই সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য, ইঞ্জিনিয়ারেরা একটি বায়ুচলাচল ব্যবস্থার পরিকল্পনা করছেন যাতে টানেলের দৈর্ঘ্য বরাবর বাতাস চলাচল করতে পারে। স্থবির যানবাহন বা যানজটের মতো ঘটনা শনাক্ত করার রিয়্যাল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম, ক্যামেরা এবং রাডারও ব্যবহার করা হবে বলে সূত্রের খবর।