১৮০০ ক্যারেটের হিরের ব্লাউজ় না কি ভারতীয় চিত্রকলা, এ বার মেট গালায় নজরে কোন ভারতীয় তারকার সাজ?
কর্ণ জোহর থেকে অনন্যা বিড়লা, ঈশা অম্বানী থেকে মণীশ মলহোত্র, ২০২৬-এ মেট গালায় কে কী চমক আনলেন, দেখে নিন এক ঝলকে।
প্রতি বছরের মতো এ বারও মেট গালা ফ্যাশন প্রদর্শনীর লাল গালিচায় উপস্থিত ছিলেন সারা বিশ্বের ফ্যাশনিস্তারা, যাঁরা বিভিন্ন সময় তাঁদের সাজগোজ দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। তবে এ বছরের মেট গালায় আলাদা করে নজর কেড়েছে ভারতীয় তারকাদের ফ্যাশন এবং সাজগোজ।
ভারতীয় তারকারা মেট গালার শুধু ‘ফ্যাশন ইজ় আর্ট’ থিমটিকেই গ্রহণ করেননি, বরং নিউ ইয়র্ক সিটির মেট্রোপলিটন মিউজ়িয়াম অফ আর্টে যেন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছোঁয়াও নিয়ে এসেছেন। কর্ণ জোহর থেকে অনন্যা বিড়লা, ঈশা অম্বানী থেকে মণীশ মলহোত্র, ২০২৬-এ মেট গালায় কে কী চমক আনলেন, দেখে নিন এক ঝলকে।
কর্ণ জোহর: মেট গালায় এ বছর প্রথম দেখা গেল পরিচালক কর্ণ জোহরকে। পোশাকশিল্পী মণীশ মলহোত্রের নকশা করা পোশাকে একেবারে রাজার বেশে মেট গালার লাল গালিচায় ক্যামেরাবন্দি হলেন কর্ণ। রাজা রবি বর্মার আঁকা ‘অর্জুন আর সুভদ্রা’র দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছে কর্ণের পোশাক।
এর আগে কোনও ভারতীয় পরিচালককে দেখা যায়নি মেট গালায়। কর্ণের পরনের ৬ ফুট লম্বা কেপটির মাধ্যমে ভারতীয় শিল্পকলাকে দক্ষতার সঙ্গে পোশাকে তুলে ধরেছেন মণীশ। নিখুঁত হাতের কাজে প্রস্তুত কর্ণের এই পোশাকটি তৈরি করতে প্রায় ৫৬০০ ঘণ্টা সময় লেগেছে। পোশাকে ছবি আঁকা থেকে জারদৌসি নকশার সূক্ষ্ম কারুকাজ করেছেন প্রায় ৮০ জন শিল্পী মিলে।
ঈশা অম্বানী: এ বছরের মেট গালায় শিল্পপতি মুকেশ অম্বানী ও নীতা অম্বানীর কন্যা ঈশার সাজগোজে ছিল আলাদা চমক। সাজের চমক তো রয়েছে, এর পাশাপাশি রয়েছে হিরের চমকও। লাল গালিচায় ঈশার পরনে ছিল পোশাক শিল্পী গৌরব গুপ্তের নকশা করা সোনালি শাড়ি। এর সঙ্গে ঈশা পরেছিলেন প্রায় ১০০০টি হিরে-মানিক বসানো ব্লাউজ়। প্রায় ৪০ জন শিল্পী মিলে তৈরি করেছেন ঈশার এই ১৮০০ ক্যারেটের ব্লাউজ়টি।
আরও পড়ুন:
ঈশার ব্লাউজ়ের পিছনের অলঙ্কারটি ছিল সবচেয়ে নজরকাড়া। এটি একটি সরপেঁচ। যা আদতে এমন এক রত্নখচিত অলঙ্কার, যেটিকে মূলত পাগড়ির সঙ্গে পরেন পুরুষেরা। ঈশার পরনের সরপেঁচটি এক সময় হায়দরাবাদেরর নিজ়ামের মালিকানাধীন ছিল। এতে রয়েছে প্রাচীন পান্নার পুঁতি এবং রোজ়-কাট ও টেবিল-কাট হীরা, যা কুন্দন পদ্ধতিতে বসানো। কুন্দন এক ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় কারু, যেখানে পাথরকে না কেটেই সোনায় বসানো হয়। এই সরপেঁচটি আদতে নীতা অম্বানীর সংগৃহীত ঐতিহ্যবাহী অলঙ্কারের সম্ভার থেকে নেওয়া হয়েছে।
ঈশা গলায় পরেছিলেন মায়ের ১৫০ ক্যারেটের হিরের হার। মাথায় নয়, গায়ে জড়িয়ে শাড়ির সঙ্গে জুঁইয়ের মালা স্টাইল করেছিলেন ইশা। দেখতে একেবারে আসল ফুলের মনে হলেও এই মালাও আদতে কৃত্রিম। প্রায় ১৫০ ঘণ্টা ধরে শিল্পী সৌরভ গুপ্ত কাগজ, তামা আর পিতল দিয়ে এই মালাটি তৈরি করেছেন।
মণীশ মলহোত্র: মেট গালায় পোশাকশিল্পীর পরনেও ছিল চমক। তাঁর কর্মক্ষেত্র মুম্বই এবং তাঁর সহকারী শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই মণীশ তাঁর মেট গালার পোশাকটির নকশা করেছেন। মণীশের পরনে ছিল বন্ধগলা স্যুট। সঙ্গে তিনি নিয়েছিলেন একটি নজরকাড়া কেপ। জারদৌসি, চিকনকারি, ডোরি ওয়ার্ক— ভারতের রকমারি কারুশিল্পের মিশেল দেখা গিয়েছে, মণীশের কেপে।
মুম্বই এবং দিল্লির প্রায় ৫০ জন পোশাকশিল্পী প্রায় ৯৬০ ঘণ্টা ধরে এই কেপটির নকশা করেছেন। কেপটির নকশায় ত্রিমাত্রিক কারুকাজও ছিল নজরকাড়া। যে ৫০ শিল্পী তাঁর পোশাকটি নকশা করেছেন, তাঁদের স্বাক্ষরও তিনি পোশাকে নিয়ে রেখেছেন।
আরও পড়ুন:
অনন্যা বিড়লা: ভারতীয় উদ্যোগপতি অনন্যা বিড়লার মেট গালা লুক ছিল একেবারে চোখ ধাঁধানো। পোশাকশিল্পী রবার্ট উনের নকশা করা কালো স্কার্ট আর ব্লেজ়ারে ক্যামেরাবন্দি হয়েছেন অনন্যা। গলায় হিরের নেকলেস। তবে অনন্যার গালা লুকে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে সুবোধ গুপ্তের নকশা করা ধাতব মাস্কটি। পোশাক নিয়ে অন্যন্যার এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা মনে ধরেছে ফ্যাশনিস্তাদের।
গৌরবী কুমারী এবং সওয়াই পদ্মনাভ সিংহ: জয়পুরের মহারানি গায়ত্রী দেবীর নাতি-নাতনি সওয়াই পদ্মনাভ সিংহ এবং গৌরবী কুমারীকেও এ বছর দেখা গেল মেট গালায়। গৌরবীর পরনে গায়ত্রী দেবীর গোলাপি রঙের শিফন শাড়ি, তবে সেই শাড়িকেই নতুন রূপে গাউন বানিয়ে পরেছেন তিনি। সঙ্গে হিরে আর মুক্তোর গয়না। পদ্মনাভের পরনে কালো বন্ধগলার কোট, সঙ্গে নীল রঙের ভেলভেটের জ্যাকেট। জ্যাকেট জুড়ে জারদৌসির নকশা। সঙ্গে তিনি পরেছিলেন হিরে আর কুন্দনের গয়না।
সুধা রেড্ডি: ব্যবসায়ী সুধা রেড্ডির মেক গালার লুকও ছিল নজরকাড়া। পোশাকশিল্পী মণীশের নকশা করা পোশাক পরেছিলেন তিনি। তাঁর পরনে ছিল করসেট টপ আর স্কার্ট। স্কার্ট জুড়ে ছিল কলমকারি নকশার সূক্ষ্ম কারুকাজ। তাঁর স্কার্টে ‘ট্রি অফ লাইফ’-এর বার্তা ছিল স্পষ্ট। সঙ্গে ছিল জারদৌসির নকশা করা সূর্ষ, চাঁদ আর ময়ূর। পোশাকটি তৈরি করেছেন প্রায় ৯০ জন শিল্পী। সময় লেগেছে প্রায় ৩৪০০ ঘণ্টা।
রিহানা: প্রতি বারের মতো এ বারও মেট গালায় পপ তারকা রিহানার পোশাকে ছিল চমক। তাঁর পরনে ছিল গ্লেন মার্টিনের নকশা করা মেটালিক গাউন। মূলত তরল ধাতুর মতো দেখতে একটি অত্যন্ত চকচকে কাপড় দিয়ে তৈরি এই পোশাকটির পাশাপাশি মূল আকর্ষণ ছিল তাঁর অঙ্গের রত্নখচিত অলঙ্কারগুলি। কানের দুল থেকে শুরু করে আংটি ও বিভিন্ন অনুষঙ্গ রিহানার সাজের নাটকীয়তাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলেছিল। জেনিফার বেহরের নকশা করা সোনার তারের মতো গয়নাগুলি সু্ন্দর ভাবে শোভা পেয়েছে রিহানার চুলের বাঁধনে।
কিম কার্দাশিয়ান: বিশেষ নজর কেড়েছে কিম কার্দাশিয়ানের সাজও। রাজকুমারী ডায়ানার বিখ্যাত ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’-থেকে অনুপ্রাণিত ছিল তাঁর পোশাকটি। তরল-ধাতুর ফিনিশযুক্ত একটি তামাটে রঙের ব্রেস্টপ্লেট পরেছিলেন তিনি, সঙ্গে বডিস্যুট। খোলা চুল, গায়ে ছিল না গয়নার চিহ্নমাত্র।
কাইলি জেনার: কার্দাশিয়ান-জেনার পরিবারের কনিষ্ঠতম কন্যা কাইলির মেট গালার পোশাকেও ছিল অভিনব ছোঁয়া। পোশাক আছে, তবুও যেন নেই— কাইলির পোশাক দেখে এমনই ধন্দ জাগে ফ্যাশনিস্তাদের মনে। তাঁর পরনে ছিল ন্যুড ইলিউশন করসেট টপ। সঙ্গে তিনি স্টাইল করেছেন লো হিপ আইভরি রঙের স্কার্ট। শুধু পোশাকেই নয়, কাইলির ভুরু জোড়াতেও ছিল চমক। ব্লিচ করিয়ে একেবারে সোনালি ভুরু নিয়েই মেট গালায় হাজির হয়েছিলেন তিনি।