হেরেছেন সুপ্রিমো, উপড়ে গিয়েছে বহু ‘মহীরুহ’! গেরুয়া ঝড় রুখে তৃণমূলের মুখরক্ষা করলেন ৩১ ‘অনামী’ মুখ
বিজেপির পালে প্রবল হাওয়ার জোরে রাজ্যের রাজধানীতে তৃণমূল গড় কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। রেহাই পাননি খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। অথচ জেলায় তৃণমূলের সাংগাঠনিক শক্তিকে ধরে রেখেছেন তথাকথিত ‘হেভিওয়েট’ নন তেমন কিছু তৃণমূল নেতা।
প্রচারের আলো পড়েনি তাঁদের মুখে। রাজ্য জুড়ে গেরুয়া ঝড়ে রথী-মহারথীরা ধরাশায়ী হলেও তৃণমূলের বেশ কয়েক জন প্রার্থী ধরে রেখেছেন তাঁদের গড়। এঁদের অনেকেই সংগঠনকেই হাতিয়ার করে বিজেপির বিরুদ্ধে সমানে টক্কর দিয়ে ছিনিয়ে নিয়েছেন জয়। তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ককে ধরে রাখার মূল কারিগর এই সেনাপতিরা, যাঁদের নেতৃত্বে ভর করেই বিজেপি ঝড় কিছুটা হলেও আটকে দিতে পেরেছেন তৃণমূল কংগ্রেস।
২৯৩টি বিধানসভা আসনে গণনার ফল বেরোতেই দেখা গেল একে একে পদ্মের ঘায়ে নুইয়ে পড়ছেন তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা-নেত্রীরা। বিজেপির পালে প্রবল হাওয়ার জোরে রাজ্যের রাজধানীতে তৃণমূল গড় কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। রেহাই পাননি খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। অথচ জেলায় তৃণমূলের সাংগাঠনিক শক্তিকে ধরে রেখেছেন তথাকথিত ‘হেভিওয়েট’ নন তেমন কিছু তৃণমূল নেতারা ঘাসফুলের পতাকা উড়িয়েছেন নিজের নিজের কেন্দ্রে। তুলনামূলক ‘অনামী’ তৃণমূল প্রার্থীদের নজরকাড়া ফলের হদিস রইল এই প্রতিবেদনে।
উত্তরবঙ্গের তৃণমূলের ভোটপ্রাপ্তি এক ধাক্কায় কমেছে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে। তা সত্ত্বেও কোচবিহারের সিতাইয়ে তৃণমূলের একটি আসন ধরে রাখতে পেরেছেন সঙ্গীতা রায়। ব্যবধান যদিও খুব বেশি নয়। মাত্র ২৭০০ ভোটে জিতলেও একটি আসন ধরে রেখেছেন উত্তরবঙ্গে।
উত্তর দিনাজপুর জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা আসন চোপড়া। সেখানে গেরুয়া ঝড়কে পুরোপুরি রুখে দিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী। দীর্ঘ দিন কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল এই কেন্দ্রটি। ২০১১ সালে এই আসনটি তৃণমূল দখল করে। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হামিদুল রহমান চতুর্থ বারের জন্য জয়ী হয়েছেন চোপড়ায়। জয়ের ব্যবধান প্রায় ৭০ হাজার।
উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরে ২০১৬ সালে কংগ্রেসের হাত চিহ্নে দাঁড়িয়ে জয় পেয়েছিলেন কানাইয়ালাল অগরওয়াল। ২০১৭ সালে তৃণমূলে যোগ দেন কানাইয়া। যদিও ২০২১ সালে ভোটের টিকিট পেয়েছিলেন তৃণমূলের পুরনো নেতা আব্দুল করিম চৌধুরী। করিম-কানাইয়ার গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ইসলামপুরে সর্বজনবিদিত। এ বার টিকিট পাননি অশীতিপর আব্দুল। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিধানসভা কেন্দ্রে ৪০ হাজারেরও বেশি ভোটে বিজেপি প্রার্থী চিরঞ্জিৎ রায়কে পরাস্ত করেছেন কানইয়ালাল।
আরও পড়ুন:
উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়া থেকে জয়ী হয়েছেন আজাদ মিনহাজুল আরফিন। দ্বিতীয় বারের জন্য বিধায়ক হতে চলেছেন তিনি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন বিজেপি প্রার্থী মনোজ কুমার জৈন। ২৮০১১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন মনোজ।
ইটাহারে বিজেপি প্রার্থী সবিতা বর্মণকে পরাজিত করেছেন ২৭ হাজারেরও বেশি ভোটে। ইটাহার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিধানসভা। ইটাহারের বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক তথা শাসকদলের সংখ্যালঘু সেলের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন এ বারও জয় ধরে রেখেছেন এই কেন্দ্রে। তিনি পেয়েছেন ৯৮ হাজার ৮৭৮ ভোট। তাঁর নির্বাচনী প্রচারে এসেছিলেন তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
বিপরীতে ছিলেন কংগ্রেসের হেভিওয়েট প্রার্থী মৌসম বেনজির নূর। কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত মালতীপুর কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীর লড়াইটা বিজেপির সঙ্গে ছিল না। তৃণমূলের জেলা সভাপতি তথা ওজনদার বিধায়ক আব্দুর রহিম বক্সী এ বারও জিতেছেন বিপুল ভোটে। ৬০ হাজার ভোটে পিছিয়ে দ্বিতীয় স্থানে মৌসম।
মালদহের চাঁচল বিধানসভা কেন্দ্রে নজরকাড়া ফল তৃণমূলের। প্রায় ৬৪ হাজার ভোটে বিজেপির রতন দাসকে হারিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১ সালেও এখানে জিতেছিলেন তৃণমূল প্রার্থী। জয়ের ধারা বজায় রেখেছেন প্রসূনও।
আরও পড়ুন:
মালদহের রতুয়াতেও ফুটেছে ঘাসফুল। ৩২ হাজার ৫০০-এর বেশি ভোটে বিজেপি প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়ে তৃণমূলের আসন ধরে রেখেছেন অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক সমর মুখোপাধ্যায়।
২০২৬ সালে দলের টিকিট পাওয়া নিয়ে প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা গিয়েছিল মালদহেরই হরিশচন্দ্রপুরে। টিকিট না পেয়ে তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী তাজমুল হোসেন প্রকাশ্যে ফুঁসে উঠেছিলেন। মন্ত্রী তাজমুলের বদলে এ বার ওই কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী করেছেন মতিউর রহমানকে। ২০২১ সালে যিনি বিজেপির টিকিটে হরিশ্চন্দ্রপুর কেন্দ্র থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ফলপ্রকাশের পর দেখা গিয়েছে ‘দলবদলু’ মতিউর জিতিয়েছেন তৃণমূলকে।
২০২৬ সালের ফলপ্রকাশ শুরু হওয়ার পর তৃণমূলের প্রথম ঘোষিত জয়ী আসনটি ছিল ভগবানগোলা। রেয়াত হোসেন সরকার জিতেছেন ৫৬ হাজার ৪০৭ ভোটে। বিজেপির মাহুমুদুল হাসান ছিলেন তাঁর বিপক্ষে। রেয়াত ২০১৯ সালে যোগ দেন তৃণমূলে। ২০২৪ সালে উপনির্বাচনে জয়ের পর বিধায়ক হন তিনি। এ বারও বিধায়ক পদে শপথ নেবেন তিনি।
মুর্শিদাবাদের ভরতপুরেও নিজেদের আসন ধরে রাখতে পেরেছে তৃণমূল। এই কেন্দ্রে জয়লাভ করেছেন মুস্তাফিজ়ুর রহমান। বিজেপির অনামিকা ঘোষকে হারিয়েছেন ৩০ হাজারেরও বেশি ভোটে।
মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি বিধানসভা কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক আব্দুর রজ্জাক। তাঁকে এ বার টিকিট দেয়নি দল। বদলে প্রার্থী করেছে বাবর আলি বিশ্বাসকে। ‘পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ হেডমাস্টার’কে প্রার্থী করে চমক দিয়েছিল তৃণমূল। নিরাশ করেননি ১০ বছর বয়সে বাড়িতে স্কুল খুলে বসা বাবর। ২১ হাজার ৫১৬ ভোটে সিপিএম প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন বাবর।
গত বার বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিট না পেয়ে চাপড়ার বিধায়ক রুকবানুর রহমানের বিরুদ্ধে নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন জেবের শেখ। ২০২৬-এর নির্বাচনে জেবেরই তৃণমূল প্রার্থী। রুকবানুরকে সরিয়ে দেওয়া হয় পলাশিপাড়ায়। বিরোধীদের অভিযোগ, চাপড়ায় গত কয়েকটি নির্বাচনে ভোট দিতে দেওয়া হয়নি তাঁদের। সেই সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে ঘাসফুলের পতাকা উড়িয়েছেন জেবের। বিজেপি প্রার্থীর থেকে ৩০ হাজার ৭৮০টি ভোট বেশি পেয়েছেন তিনি।
বাদুড়িয়া থেকে তৃণমূল প্রার্থী করেছে বসিরহাট তৃণমূল সাংগঠনিক জেলার সভাপতি বুরহানউল মুকাদ্দিন (লিটন)-কে। উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ার বিদায়ী বিধায়ক কাজি আব্দুর রহিম (দিলু)কে টিকিট দেয়নি দল। এই নিয়ে ক্ষোভে দল ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দেন আব্দুর। গোষ্ঠীকোন্দলের প্রভাব পড়েনি তৃণমূলের ভোটবাক্সে। ৪০ হাজারের বেশি ভোটে জিতে মুখরক্ষা করেছেন বুরহানউল।
রেশন দুর্নীতি মামলায় ২০২৪ সালে ইডির হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন দেগঙ্গার তৃণমূল নেতা আনিসুর রহমান বিদেশ। ২০২৫ সালে জামিন। আনিসুরের ভাই আলিফ রাজ্যের প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের ‘ঘনিষ্ঠ’ বাকিবুর রহমানের আত্মীয় বলে পরিচিত। দুর্নীতির ভূরি ভূরি অভিযোগ থাকলেও ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁকেই বেছে নিয়েছেন দেগঙ্গার আমজনতা। আনিসুর রহমান বিদেশ নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আইএসএফের প্রার্থী প্রায় ১৮ হাজারের ভোটে হারিয়ে দিয়েছেন।
হাড়োয়ায় তৃণমূলের লড়াইয়ে প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল আইএসএফ। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী আবদুল মতিন মহম্মদ। ৪৯ হাজার ৩৪১ ভোটে আইএসএফ প্রার্থীকে ধরাশায়ী করে ঘাসফুলের বিজয়পতাকা উড়িয়েছেন তিনি।
একসময় দলের সুপ্রিমো প্রকাশ্যে ভর্ৎর্সনা করেছিলেন মিনাখাঁর বিদায়ী বিধায়ক ঊষারানি মণ্ডলকে। ২০২৪ সালে ‘বিজেপি ঘনিষ্ঠতা’র অভিযোগ ছিল দলের অভ্যন্তরে। জনসভা থেকে মমতা তাঁকে পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন। পরে বরফ গলে অভিষেকের দৌত্যে। ২০২৬-এর নির্বাচনে একদা বিক্ষুব্ধ ঊষারানির উপরই আস্থা রেখেছিলেন মমতা-অভিষেক। নেত্রীর মুখ রেখেছেন ঊষারানি। ৩২ হাজার ২৯২ ভোটে বিজেপির রূপেন্দ্র পাত্রকে পরাজিত করেছেন।
গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, ধর্মীয় মেরুকরণ, নেতাদের দাপট, দুর্নীতি এবং সর্বোপরি ভোটার বাদের কোনও কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বসিরহাট উত্তরে। বিপুল জনমত গিয়েছে তৃণমূলের পক্ষেই। সংখ্যালঘু কেন্দ্রটিতে প্রতিপক্ষ আইএসএফ ও বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ে জয় ছিনিয়ে এনেছেন মহম্মদ তসফ্ফুর রহমান। ৫৭ হাজারের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী।
বাসন্তী বিধানসভায় এ বার তৃণমূল প্রার্থী করেছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সভাধিপতি নীলিমা মিস্ত্রি বিশালকে। বাসন্তী বিধানসভা কেন্দ্র থেকে এ বার টিকিট পাননি বিদায়ী বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী শ্যামল মণ্ডল। সেখানে প্রার্থী করা হয়েছে গোসাবার বাসিন্দা নীলিমাকে। ৫৬ হাজারের বেশি ভোটে বিজেপির বিকাশ মণ্ডলকে পরাজিত করেছেন তিনি।
২০১৬ সালে জয়নগরের মানুষ তৃণমূলকে ক্ষমতায় এসেছিল। তবে তার আগে ২০১১ সালে রাজ্য জুড়ে পরিবর্তনের হাওয়াতেও জয়ী হন বামপ্রার্থী। ২০২১-এ আবার তৃণমূলের প্রার্থী বিধায়ক হন। সেই বিদায়ী বিধায়ক বিশ্বনাথ দাসকেই টিকিট দেয় তৃণমূল। ২০১৬ সালে তাঁর জেতার ব্যবধান ছিল ১৫ হাজারের মতো। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দল এগিয়েছিল ১৯ হাজার ভোটে। ২০২১ এবং ২০২৪ সালে ওই ব্যবধান ৩৯ এবং ৪৪ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। প্রাক্তন শিক্ষক বিশ্বনাথ আশা করেছিলেন ব্যবধান আরও বাড়বে। ব্যবধান কমলেও আসন হাতছাড়া হয়নি তৃণমূলের। ২৬ হাজারের বেশি ব্যবধানে জিতেছেন বিশ্বনাথ।
২০১১ সালে রাজ্যে পরিবর্তনের ভোটে কুলতলি থেকে জিতেছিলেন বামপ্রার্থী রামশঙ্কর হালদার। ব্যবধান কমলেও ২০১৬ সালের ভোটে এই কেন্দ্র সিপিএমের হাতছাড়া হয়নি। তবে, ২০২১ সালের নির্বাচনে এখানে জয়ী হন তৃণমূলের যুবনেতা গণেশ মণ্ডল। এ বারও তিনি তৃণমূল প্রার্থী ছিলেন। ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজেপির মাধবী মহলদারকে ধরাশায়ী করে বিধায়ক পদ ধরে রেখেছেন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্যানিং পশ্চিম কেন্দ্র থেকে পরেশরাম দাস প্রায় ৩৬ হাজার ভোটে জয় পেয়েছিলেন। এ বারও তার অন্যথা হয়নি। সোমবার ফল প্রকাশ হতে দেখা গেল জয়ের ব্যবধান আরও বেড়েছে। ৪০ হাজারেরও বেশি। জয়ের ‘ক্ষেত্র’ হাতছাড়া করেননি পরেশ।
ভাঙড়ের ‘তাজা নেতা’ আরাবুল ইসলামের গড়ে ঘাসফুলের ঝ়়ড়। নেপথ্যে কারিগর তৃণমূলের বাহারুল ইসলাম। বিপক্ষে তৃণমূলের বহিষ্কৃত ও বিতর্কিত নেতা আরাবুল এ বার আইএসএফের হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ক্যানিং পূর্বে। ভোটের আগে দফায় দফায় অশান্তিতে উত্তপ্ত হয়েছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা এলাকা। আইএসএফ-তৃণমূলের সংঘর্ষ অশান্ত হয়েছিল এলাকা। তবে এখানে দাঁত বসাতে পারেনি আরাবুল বা বিজেপির প্রার্থী। ৯১ হাজারের বেশি ব্যবধানে দুর্গ ধরে রেখেছেন তৃণমূল প্রার্থী বাহারুলই।
মগরাহাট পূর্ব বিধানসভায় তিন বারের বিধায়ক নমিতা সাহার জায়গায় টিকিট পেয়েছেন শর্মিষ্ঠা পুরকাইত। এই দুই বিধানসভায় সে ভাবে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সমস্যা না থাকলেও নতুন প্রার্থী বদল হয়েছে। তবে প্রার্থীরা কেউই রাজনীতিতে নতুন নন। শর্মিষ্ঠা মগরাহাট পশ্চিম পঞ্চায়েতের উপপ্রধানের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। তাঁর উপরে ভরসা রেখে ভুল করেনি তৃণমূল। মগরাহাটে তৃণমূলের জয় পাকা করেছেন তৃণমূল প্রার্থী। ৩১ হাজার ৬০৭ ভোটে জিতেছেন শর্মিষ্ঠা।
পূর্বের মতো পশ্চিম মগরাহাটেও ঘাসফুলের রমরমা। এই বিধানসভার তিন বারের বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী গিয়াসউদ্দিন মোল্লা। তাঁর পরিবর্তে এই বছর অভিষেক-ঘনিষ্ঠ সামিম আহমেদ মোল্লাকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। কারণ বিধায়ক অনুগামী ও বিরোধী গোষ্ঠীদের সংঘর্ষ ও প্রকাশ্য বিরোধিতায় দল কার্যত নাজেহাল হয়ে উঠেছিল। সেই সমস্ত বাধাবিপত্তি কাটিয়ে এই কেন্দ্রে নজরকাড়া ফল করেছেন সামিম। প্রায় ৫৯ হাজার ভোটে বিজেপির গৌরসুন্দর ঘোষকে পরাজিত করেছেন তিনি।
ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্রে গেরুয়া ঝড়কে রুখে দিয়েছেন পান্নালাল হালদার। বিদায়ী বিধায়ক এ বারও আসন ধরে রেখেছেন তৃণমূলের। বিজেপির দীপক কুমার হালদারকে হারিয়েছেন ৩১ হাজারের বেশি ভোটে।
বজবজ কেন্দ্রে ঘাসফুল ফুটিয়েছেন বর্ষীয়ান তৃণমূল প্রার্থী অশোক কুমার দেব। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির তরুণ কুমার আদককে প্রায় ৪৭ হাজার ভোটে হারিয়ে নিজের কেন্দ্র দখলে রেখেছেন তিনি।
২০২১ সালে তৃণমূল ৩৩ হাজার ভোটে জিতেছিল হাওড়ার এই কেন্দ্রে। গত লোকসভা নির্বাচনে এই বিধানসভায় তৃণমূলের এগিয়েছিল ৪৯ হাজার ভোটে। এখানকার ১৫টি পঞ্চায়েতই তৃণমূলের দখলে রয়েছে। পাঁচলা পঞ্চায়েত সমিতিও তাদের। সে দিক থেকে দেখতে গেলে সংখ্যালঘু প্রধান পাঁচলা তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। সেই ঘাঁটি নিজেদের কব্জায় রাখতে পেরেছেন হাওড়া পাঁচলার তৃণমূল প্রার্থী গুলশন মল্লিক। ৩৮,৩২০ ভোটে জিতেছেন তিনি।
বিধানসভা ভোটের মুখে সাঁকরাইলের বিদায়ী তৃণমূলের বিধায়ক প্রিয়া পালের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছিলেন স্থানীয় নেতাদের একাংশ। তাতে খুব একটা প্রভাব পড়েনি বিধানসভার নির্বাচনের ফলে। হাওড়ায় যে ক’টি আসন তৃণমূল ধরে রেখেছে তার মধ্যে একটি হল সাকঁরাইল। ১৬ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছেন প্রিয়া।
ডোমজুড়েও আসন সুরক্ষিত করেছেন তৃণমূলের তাপস মাইতি। বিজেপি প্রার্থী গোবিন্দ হাজরাকে পরাজিত করেছেন ৪২ হাজার ১৭৭ ভোটে।
নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর মুরারই বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী নিয়ে দলের অন্দরই ক্ষোভ ছিল তৃণমূলে। বিদায়ী বিধায়ক তথা চিকিৎসক মোশারফ হোসেনকে নিয়ে দলের একটি বড় অংশের অসন্তোষ ছিল বলে সূত্রের খবর। তাতে কান দেননি তৃণমূলের মাথারা। মোশারফকেই প্রার্থী ঘোষণা করা হয় ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে। দলকে নিরাশ করেননি তিনি। ৩৭ হাজার ৭০৫ ভোটে মোশারফ জিতেছেন মুরারই থেকে।