‘যৌনদাস’ বানিয়ে পুরুষ অধস্তনকে দিনের পর দিন ‘ধর্ষণ’! জেপি মরগ্যান-কাণ্ড যেন আমেরিকার ‘এতরাজ়’! কে এই লরনা হাজ়দিনি?
গত ১৫ বছর ধরে জেপি মরগ্যানের মতো খ্যাতনামী আর্থিক সংস্থায় উচ্চ পদে কর্মরত লরনা হাজ়দিনি। কর্পোরেট দুনিয়ার যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন ৩৭ বছরের এই তরুণী। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন সংস্থারই প্রাক্তন কর্মী চিরায়ু রাণা।
২২ বছর আগে বলিউডে মুক্তি পেয়েছিল ‘এতরাজ়’ সিনেমাটি। অভিনয় করেছিলেন অক্ষয় কুমার, প্রিয়ঙ্কা চোপড়া এবং করিনা কপূর খান। ২০০৪ সালের সেই ছবি ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল দর্শকের মধ্যে। সিনেমার কাহিনিতে ছিল এক পুরুষের গল্প, যাকে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্ত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।
দু’দশক পরে জেপি মরগ্যানের মামলাটি প্রকাশ্যে আসার পর বলিউ়ডের এই ছবিটির সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকেই। মার্কিন সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মী লরনা হাজ়দিনির বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন, প্রভাব খাটানো, মাদকসেবন এবং বর্ণবিদ্বেষমূলক হয়রানির মতো বিস্ফোরক সব অভিযোগ এনেছেন সংস্থারই প্রাক্তন কর্মী।
অভিযোগ, পদমর্যাদার জোর খাটিয়ে অধস্তন কর্মীকে যৌন উত্তেজনাবর্ধক ওষুধ ও মাদক সেবন করিয়ে ‘যৌনদাস’ করে রেখেছিলেন ৩৭ বছরের লরনা। এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে আমেরিকা জুড়ে। সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষস্থানীয় মহিলা আধিকারিক লরনার বিরুদ্ধে প্রথমে ‘জন ডো’ ছদ্মনামে মামলা দায়ের করেন ওই প্রাক্তন কর্মী।
পরে জানা যায় লরনার অধস্তন কর্মী তথা অভিযোগকারী তরুণের নাম চিরায়ু রাণা। ৩৫ বছর বয়সি চিরায়ু চলতি সপ্তাহে দায়ের করা একটি মামলায় অভিযোগ করেছেন যে, লরনা তাঁকে দিনের পর দিন মাদকসেবন করানোর পর যৌন নির্যাতন করেছেন। তিনি আরও দাবি করেছেন যে, ওষুধ খাইয়ে যৌনমিলনে বাধ্য করতেন তাঁর বস্।
চিরায়ু মামলায় উল্লেখ করেছেন, লরনা তাঁকে হুমকিও দিয়েছিলেন যে তাঁর কথামতো না চললে পদোন্নতি তো হবেই না, উল্টে বোনাসও কেটে নেওয়া হবে। চিরায়ুর দাবি, তাকে ‘রোহিপনল’ এবং ‘ভায়াগ্রা’র মতো জিনিস খাইয়ে দিনের পর দিন নির্যাতন করেছেন লরনা। এমনকি তাঁর প্রতি বর্ণবিদ্বেষী মনোভাবও পোষণ করতেন লরনা, অভিযোগ চিরায়ুর।
আরও পড়ুন:
চিরায়ুর পরিচয় নিয়ে অবশ্য ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত। আবার অন্য একটি অংশ দাবি করেছে চিরায়ু আদতে নেপালি। মোটমাট অভিযোগকারীর শিকড় দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে। বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং সমাজমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, জেপি মরগ্যানের প্রাক্তন কর্মী চিরায়ু জাতিগত বিদ্বেষের অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, লরনা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করার সময় তাঁকে ‘আমার ছোট্ট বাদামি ছেলে’ বলে সম্বোধন করতেন।
সময়-অসময়ে চিরায়ুর ফ্ল্যাটে হানা দিতেন লরনা, এমন অভিযোগও করেছেন জেপি মরগ্যানের প্রাক্তন কর্মী। এর পর নাকি তাঁকে সঙ্গমে লিপ্ত হতে বাধ্য করতেন জেপি মরগ্যানের পদস্থ কর্ত্রী।
কর্পোরেট দুনিয়ার যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন ৩৭ বছরের তরুণী লরনা। ১৫ বছর ধরে জেপি মরগান চেজ়-এ কর্মরত তিনি। এই বিতর্কের মধ্যে লরনা তাঁর লিঙ্কডইন অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলেছেন। তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটিও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীরা দাবি তুলেছেন যে তাঁর অ্যাকাউন্টটি ব্যক্তিগত করে রাখা হয়েছে।
গত ১৫ বছর ধরে জেপি মরগ্যানের মতো খ্যাতনামী আর্থিক সংস্থায় উচ্চ পদে কর্মরত লরনা। বর্তমানে সংস্থার লেভারেজড ফিন্যান্স বিভাগের নির্বাহী পরিচালক বা এগ্জ়িকিউটিভ ডিরেক্টর পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতে হয় তাঁকে। কর্পোরেট গ্রাহকদের জন্য বিপুল পরিমাণ ঋণের ব্যবস্থা করা বা বন্ড ইস্যু করার মতো কাজগুলি তাঁর বিভাগের অধীনে।
আরও পড়ুন:
লরনা তাঁর সংস্থায় যে পদে রয়েছেন সেই হিসাবে তাঁর বার্ষিক আয় ২ লক্ষ ডলারের (প্রায় ১.৬৭ কোটি টাকা) বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে বোনাস এবং স্টকের মতো অতিরিক্ত আয়ও রয়েছে। তার আগে তিনি প্রাইভেট ইক্যুইটি, প্রযুক্তি ও রিটেলের মতো ক্ষেত্রে গ্রাহকদের উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন।
লরনা ২০১১ সালে জেপি মরগ্যানে আর্থিক বিশ্লেষকের পদে যোগ দিয়েছিলেন। জেপি মর্গ্যানে যোগদানের আগে তিনি গ্লেজ়ার ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট এবং টিউডর ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশনে ইন্টার্নশিপ করেছিলেন। মার্কিন আর্থিক জায়ান্ট সংস্থাটিতে কাজ শুরু করার পর ধীরে ধীরে তাঁর কর্মদক্ষতা নজরে পড়েছিল সংস্থার কর্মকর্তাদের। পর পর পদোন্নতি পেয়ে প্রায় ১০ বছর পর ২০২১ সালে এগ্জ়িকিউটিভ ডিরেক্টর হন তিনি।
কেরিয়ারের মতো লেখাপড়াতেও চৌখস ছিলেন লরনা। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন স্কুল অফ বিজ়নেস থেকে ফিন্যান্স এবং স্ট্যাটিস্টিক্সে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তার পর সোজা হার্ভার্ড বিজ়নেস স্কুল। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাই তাঁকে জেপি মরগ্যানের মতো সংস্থায় সুযোগ পাওয়ার জন্য সাহায্য করেছে।
একাধিক মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে লরনার যোগ্যতা নিয়ে প্রশংসা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জেপি মরগ্যান যে তাঁকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রাপ্য মর্যাদা দিয়েছে তা তাঁর দক্ষতার জন্যই। ২০১১-র এপ্রিল থেকে ২০২৬-এর মার্চ পর্যন্ত তাঁর কর্মজীবন নিষ্কলঙ্ক। কোনও বিতর্ক বা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি লরনার বিরুদ্ধে।
২৬ এপ্রিল প্রাক্তন কর্মী চিরায়ুর চাঞ্চল্যকর অভিযোগের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। অভিযোগকারী চিরায়ু দাবি করেছেন যে, এই নির্যাতন ২০২৪ সালে শুরু হয়েছিল। নিউ ইয়র্ক পোস্টের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ২০২৫ সালে একটি অভ্যন্তরীণ অভিযোগ দায়ের করেন। তবে এর আগে, চিরায়ু প্রতিষ্ঠানটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েক কোটি পাউন্ডের একটি মীমাংসা চুক্তির চেষ্টা করেছিলেন।
যৌন হেনস্থা ও নিপীড়নের মামলায় করা দাবিগুলোতেও বেশ কিছু ফাঁকফোকর পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলি। চিরায়ু দাবি করেছিলেন যে, লরনা তাঁর বোনাস পাওয়া-না পাওয়ার বিষয়টি নির্ধারণ করতেন। ‘দ্য পোস্ট’-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী চিরায়ু প্রকৃতপক্ষে সরাসরি লরনার অধীনে কাজ করতেন না। যদিও তাঁরা দু’জনেই লেভারেজড ফিন্যান্স টিমে কাজ করতেন। তবে তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন ম্যানেজারের অধীনে ছিলেন। এই বিষয়টিই মামলার একটি মূল দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
প্রাক্তন কর্মীর সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লরনা। তিনি তাঁর আইনজীবীদের মাধ্যমে ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’কে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, লরনা এই অভিযোগগুলি দ্ব্যর্থহীন ভাবে অস্বীকার করছেন। তাঁর দাবি, তিনি এই অভিযোগকারী ব্যক্তির সঙ্গে কখনওই কোনও ধরনের অনুচিত আচরণে জড়িত হননি। যৌন নিপীড়নের ঘটনাটি যেখানে ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে, সেখানে কোনও দিন পা মাড়াননি লরনা।
এই মামলায় জেপি মরগ্যান চেজ়কেও যুক্ত করা হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও যথাযথ তদন্ত পরিচালনায় ব্যর্থতার অভিযোগ আনা হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই এই ধরনের সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন সংস্থাটি। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় অভিযোগগুলির কোনও ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।