সুবিধাবাদী নীতিতে সাপ-ব্যাঙ দু’পক্ষকেই ‘চুমু’ খেয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ! ‘আম-ছালা’ দুই-ই হারিয়ে এখন কাঁদছে ধনকুবের আরব রাষ্ট্র
ইরান যুদ্ধের জেরে ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে পড়েছে আরব দুনিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ কাতার। কখনও ইজ়রায়েল, কখনও আবার তেহরানের হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে দোহাকে। কেন যুযুধান দু’পক্ষই নিশানা করছে তাদের?
কখনও জনবহুল শহর। কখনও আবার সেনাঘাঁটি বা তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের শোধনাগার। লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে মার্কিন ‘বন্ধু’ কাতারের কৌশলগত এলাকাগুলিকে নিশানা করছে ইরান। এই আক্রমণ আটকাতে না পেরে দিশেহারা দোহা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কয়েক দিন আগে পর্যন্ত ‘সাপের গালে চুমু ও ব্যাঙের গালে চুমু’ খেয়ে দিব্যি আখের গোছাচ্ছিল ওই আরব রাষ্ট্র। সেটা নীতিই যে এ বার তাঁকে খাদের কিনারায় এনে ফেলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, যে ভাবে ইরান যুদ্ধের গতি বদলাচ্ছে, তাতে সর্বাধিক লোকসানের মুখ দেখবে কাতার। কারণ, সংশ্লিষ্ট আরব রাষ্ট্রটিতেই রয়েছে মার্কিন ফৌজের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম-এর সদর দফতর। তার পরেও গত ৩০ বছর ধরে ‘সুবিধাবাদী’ বিদেশনীতিকে আঁকড়ে এগিয়েছে দোহা। সেই ‘গাছেরও খাব, তলারও কুড়োব’ মনোবৃত্তির জন্যই আজ ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের, বলছেন দুঁদে কূটনীতিকদের একাংশ।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, কাতারের বিদেশনীতির মূল কথাটা ছিল সারা বিশ্বের কাছে নিজেদের গুরুত্ব তুলে ধরা। অর্থাৎ, জটিল পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে দোহাকে ভরসা করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ‘সুপার পাওয়ার’। আবার তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রেখে চলবে ইরান, আফগানিস্তানের তালিবান এবং প্যালেস্টাইনের গাজ়া উপত্যকার শাসনক্ষমতায় থাকা ইরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠী হামাস। গত তিন দশকে ধীরে ধীরে সেই গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে এই উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র।
পারস্য উপসাগরের কোলের দেশ কাতারে কোনও দিনই ছিল না গণতন্ত্র। আরব মরুর এই নদীবিহীন রাষ্ট্রটিতে ১৮০০ সাল নাগাদ ক্ষমতায় আসে আল-থানি পরিবার। দোহার শাসনব্যবস্থা আজও রয়েছে তাদেরই হাতে। যদিও গোড়া থেকেই একটা বড় সমস্যার মুখে পড়ে তারা। সেটা হল ছোট্ট আরব রাষ্ট্রটির জাতীয় নিরাপত্তা। আল-থানি পরিবারের মধ্যেও ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের জেরে রাজা (পড়ুন আমির) বদল হতে বার বার দেখেছে কাতার।
এই পরিস্থিতিতে গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে দোহার আল-থানি পরিবার। জাতীয় নিরাপত্তার ভার ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেয় তারা। পাশাপাশি, সৌদি আরবকে ওই এলাকার ‘দাদা’ মেনে নিয়ে নতুন করে বিদেশনীতি সাজিয়ে তোলে কাতার। ফলে কিছুটা হ্রাস পায় বহির্শক্তির চাপ। তা ছাড়া বিদেশসফরে গেলেই আমির বদলের রীতিতেও পড়ে ছেদ। এই অবসরে আর্থিক শক্তি বৃদ্ধিকেই পাখির চোখ করে তারা।
আরও পড়ুন:
১৯৪০ সালে প্রথম বার জ্যাকপট পায় দোহা। ওই বছর আরব রাষ্ট্রটিতে মেলে খনিজ তেল। ১৯৭১ সালে পারস্য উপসাগরে বিশ্বের বৃহত্তম তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডারের খোঁজ পাওয়ার পর কাতারের আল-থানি পরিবারকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ওই গ্যাসক্ষেত্রটির উত্তর অংশের অধিকারী হন তারা, যার পোশাকি নাম নর্থ ফিল্ড। দক্ষিণ অংশটি যায় ইরানের ভাগে। তেহরান এর নামকরণ করেছে সাউথ পার্স।
পারস্য উপসাগরে ‘কুবেরের ধন’ আবিষ্কার হতেই কাতার জানতে পারে সেখানে মজুত আছে ৯০০ লক্ষ কোটি ঘনফুট তরল প্রাকৃতিক গ্যাস। ফলে খুব দ্রুত এর গা ঘেঁষে রাস লাফান শিল্পশহর গড়ে তোলে দোহা। তৈরি হয় শোধনাগার। অন্য দিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গোলমালের জেরে সাউথ পার্সে সেই পরিকাঠামো কখনওই গড়ে তুলতে পারেনি ইরান। ফলে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠে এই উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র।
১৯৭৯ সালে ইসলামীয় বিপ্লবের জেরে ইরানে পতন হয় রাজতন্ত্রের। তেহরানের শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি চলে যায় কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরুদের হাতে। সেটা একেবারেই মেনে নিতে পারেনি আমেরিকা। আর তাই ইরানকে কোণঠাসা করতে তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপায় ওয়াশিংটন। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো ১৯৮০ সালে নবগঠিত শিয়া মুলুকটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে ইরাক। বাগদাদের প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে তখন ছিলেন কিংবদন্তি সাদ্দাম হুসেন।
পরবর্তী আট বছর ধরে চলেছিল ইরাক-ইরান যুদ্ধ। যদিও তাতে জয়-পরাজয় নির্ণয় করা যায়নি। তবে এই সংঘর্ষে সর্বাধিক লাভবান হয় কাতার। তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজার রাতারাতি দখল করে ফেলে দোহা। আল-থানি পরিবার অবশ্য সংঘাতপর্বে সাদ্দামকে বিশ্বাস করতে পারেনি। আর তাই তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করে তারা। ফলস্বরূপ, পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাস্তা হরমুজ় প্রণালীতে তাদের অবাধ যাতায়াতে বাধা দেয়নি সংশ্লিষ্ট শিয়া মুলুক।
আরও পড়ুন:
১৯৯৫ সালে ফের কাতারের রাজনীতিতে আসে বড় বদল। সে বছর বাবার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে আমিরের কুর্সি দখল করেন হামাদ বিন খলিফা আল-থানি। তাঁর ওই রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের চরম বিরোধিতা করে সৌদি আরব। যদিও তাতে লাভ কিছুই হয়নি। ক্ষমতা হাতে পেয়ে জাতীয় ও পরিবারের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন হামাদ। ব্রিটিশদের বদলে সুরক্ষার দায়িত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেন তিনি। ১৯৯৬ সালে তাঁর উদ্যোগে সরকারি অর্থানুকূল্যে প্রকাশিত হয় ‘আল জাজ়িরা’।
হামাদের আমলে দোহার প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ৭.৭ কোটি টনে গিয়ে পৌঁছোয়। শুধু তা-ই নয়, মাথাপিছু গড় আয়ের নিরিখেও বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে কাতার। এর মধ্যেই তাঁর প্রশাসনের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে ‘আল জাজ়িরা’। ইজ়রায়েলের কড়া সমালোচনা করে গোড়া থেকেই প্রকাশিত হয়েছে এর প্রতিবেদন। পাশাপাশি, ইরান মদতপুষ্ট প্যালেস্টাইনপন্থী হামাস, হুথি বা হিজ়বুল্লাকে সমর্থন জুগিয়েছে তারা।
১৯৯৬ সালেই মার্কিন ফৌজের জন্য আল উদেইদ বায়ুসেনা ঘাঁটি তৈরি করেন হামাদ। পরে সেখানেই গড়ে ওঠে সেন্টকমের সদর দফতর। কূটনীতিকদের একাংশের দাবি, এটা ছিল তাঁর বিদেশনীতির সবচেয়ে বড় মাস্টারস্ট্রোক। কারণ তত দিনে ইরান-সহ পশ্চিম এশিয়ার অন্য আরব রাষ্ট্রগুলিতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়ে গিয়েছে ‘আল জাজ়িরা’। অন্য দিকে আমেরিকার সামরিক ছাউনি থাকার কারণে ইহুদি হামলার মুখে পড়তে হবে না বলে একরকম নিশ্চিত ছিল দোহা।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমি জোট। ফলে পতন হয় সাদ্দামের। এই সামরিক অভিযান পরিচালনার নেপথ্যে ছিল আল উদেইদ ঘাঁটিতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম। ফলে ওয়াশিংটনের কাছে বাড়তে থাকে দোহার গুরুত্ব। পরবর্তী বছরগুলিতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মধ্যস্থতাকারী হিসাবেও আন্তর্জাতিক আঙিনায় নিজেদের অবস্থান মজবুত করে সংশ্লিষ্ট আরব রাষ্ট্র।
২০০১ সালে ৯/১১ জঙ্গি হামলার পর আফগানিস্তান আক্রমণ করে আমেরিকা। ফলে সেখান থেকে পালাতে বাধ্য হয় তালিবান। তবে হিন্দুকুশের কোলের দেশটিকে কখনওই পুরোপুরি ছাড়েনি তারা। মার্কিন ফৌজকে তাড়াতে গেরিলা রণকৌশল নেয় তাদের বাহিনী। অন্য দিকে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের আশ্রয় দেয় দোহা। উদ্দেশ্য, যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে ওয়াশিংটনের ‘নয়নের মণি’ হয়ে ওঠা।
কাতারের এই চালও কাজে এসেছিল। ২০২০ সালে দোহায় তালিবানের সঙ্গে চুক্তি করে আমেরিকা। সেই সমঝোতা অনুযায়ী ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য সরিয়ে নেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সঙ্গে সঙ্গেই কাবুলে ক্ষমতায় ফেরে তালিবান। এই ঘটনার জেরে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় সংশ্লিষ্ট আরব রাষ্ট্রের।
তালিবানের কায়দাতেই এর পর হামাসকে নিজের ঘরে আশ্রয় দেয় কাতার। কূটনীতিকদের দাবি, তখনই ভুরু কুঁচকেছিল ইজ়রায়েল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজ়ার প্যালেস্টাইনপন্থী গোষ্ঠীটি ইহুদি ভূমিতে ঢুকে হামলা চালানোয় পশ্চিম এশিয়ায় বেধে যায় যুদ্ধ। তেল আভিভকে ধ্বংস করতে সঙ্গে সঙ্গে তাতে যোগ দেয় ইরান, লেবাননের হিজ়বুল্লা এবং ইয়েমেনের হুথি।
৭ অক্টোবর ইজ়রায়েলে ঢুকে হামাস গণহত্যা চালানোয় বিপাকে পড়ে কাতার। ‘আল জাজ়িরা’য় প্যালেস্টাইনের পক্ষে প্রচার করা দোহার পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠে। গত বছর (২০২৫ সাল) হামাসের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিকেশ করতে আরব রাষ্ট্রটিকে নিশানা করে ইহুদি বিমানবাহিনী। ওই সময় তেল আভিভকে কোনও রকম বাধা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইজ়রায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যৌথ ভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নামলে আরও বিপদে পড়ে দোহা। পাল্টা প্রত্যাঘাত শানাতে কাতারের সেন্টকমকেই উড়িয়ে দিতে একরকম মরিয়া হয়ে ওঠে তেহরানের আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)। আর তাই তাদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ধাক্কা সহ্য করতে হচ্ছে আল-থানি পরিবারকে।
ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইহুদিদের হামলার মুখে পড়ে হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে ইরান। জুনের প্রথম দু’সপ্তাহ কেটে গেলেও এখনও তা খোলেনি তেহরান। ফলে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবসা ধাক্কা খাচ্ছে কাতারের। কারণ, সৌদি আরবের মতো দোহার কাছে জ্বালানি পাঠানোর কোনও বিকল্প রাস্তা নেই।
ইতিমধ্যেই কাতারের রাস লাফান প্রাকৃতিক গ্যাস শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ফলে আপাতত সেটা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে দোহা। প্রাণে বাঁচতে শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করতে বলবে দোহা, না কি শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে তারা? এর উত্তর দেবে সময়।