সুযোগ এলেও ফুটবল বিশ্বকাপ খেলতে রাজি হয়নি ভারত! কেন? রয়েছে অনেক কারণ এবং ভয়ঙ্কর এক গুজব
প্রতি বছরের মতো এ বারও ভারত থেকে অত্যুৎসাহী ফুটবল ভক্তদের কেউ কেউ বিদেশে গিয়েছেন খেলা দেখতে। প্রিয় তারকাদের খেলা সামনে থেকে গ্যালারিতে বসে দেখতে গিয়েছেন তাঁরা। বিশ্বকাপ নিয়ে তাঁদের উৎসাহের অভাব নেই। অভাব কেবল ভারতীয় জার্সির।
বিশ্ব জুড়ে উন্মাদনা। ১১ জুন রাত থেকে শুরু হয়ে গিয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপ। এ বারই প্রথম বার ৪৮টি দেশকে নিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন করছে ফিফা। ফলে অনেক বেশি দেশের ফুটবলার বিশ্বকাপে খেলতে পারছেন।
ফুটবল বিশ্বকাপ হচ্ছে তিনটি দেশে। আমেরিকা, কানাডা এবং মেক্সিকো বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক। তিনটি দেশে আলাদা আলাদা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করেছে ফিফা।
এক দিকে ব্রাজ়িল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকোর মতো দক্ষিণ আমেরিকার দেশ, অন্য দিকে ইউরোপের জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা ইংল্যান্ড— পায়ে বল নিয়ে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে উঠেপড়ে লেগেছেন ফুটবলাররা।
বিশ্বকাপ নিয়ে ভারতীয়দের মধ্যেও উত্তেজনা তুঙ্গে। রাত জেগে খেলা দেখছে দেশবাসী। ভারতে অগুনতি ফুটবলভক্ত। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের দেশ না থাকলেও তাঁদের উৎসাহে অন্ত নেই। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা জার্মানির তারকা ফুটবলারদের জাদু দেখতে তাঁরা চোখ রাখেন টিভির পর্দায়।
প্রতি বছরের মতো এ বারও ভারত থেকে অত্যুৎসাহী ফুটবল ভক্তেরা বিদেশে গিয়েছেন খেলা দেখতে। প্রিয় তারকাদের খেলা সামনে থেকে গ্যালারিতে বসে দেখতে গিয়েছেন তাঁরা। বিশ্বকাপে তাঁদের উৎসাহের অভাব নেই। অভাব কেবল ভারতীয় জার্সির।
আরও পড়ুন:
১৯৩০ সাল থেকে ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন করছে ফিফা। এখনও পর্যন্ত বিশ্ব ফুটবলের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে কখনও খেলেনি ভারত। কখনও বিশ্বকাপে নিজের দেশের জন্য গলা ফাটাতে পারেননি ফুটবলপ্রিয় ভারতীয় সমর্থকেরা।
তবে সুযোগ অবশ্য এক বার এসেছিল। ১৯৫০ সালে ফিফা আয়োজিত ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিল ভারত। কিন্তু ফিফার ডাক পেয়েও ভারতীয় দল বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি। হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে দিয়েছিল তারা।
কিন্তু কেন? কী এমন হয়েছিল, যার জন্য বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পেয়েও ফিফাকে ‘না’ করে দেয় ভারত? প্রশ্নের উত্তর আজও ধোঁয়াশায়। নানা জনে নানা রকম সম্ভাবনার কথা বলে থাকেন। আসল কারণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কেউ মুখ খোলেননি।
১৯৪৮ সালের অলিম্পিকে দুরন্ত প্রদর্শন করেছিল ভারতীয় দল। লন্ডনে তাঁদের খেলা সকলের নজর কেড়েছিল। তার ঠিক দু’বছর পর ফিফা আয়োজিত ফুটবল বিশ্বকাপ খেলার জন্য ব্রাজ়িলে ডাক পায় ভারত।
আরও পড়ুন:
তখন বিশ্বকাপের বাছাই প্রক্রিয়া এখনকার তুলনায় অনেক সহজ ছিল। ১৬টি দল নির্ধারণের জন্য মোট ৩৪টি দল বাছাই পর্বে অংশ নিয়েছিল। তবে ১৯৫০ সালের ফিফা বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৩টি দল অংশগ্রহণ করেছিল।
অলিম্পিকের দু’বছর পর ফিফার বিশ্বকাপ বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছিল ভারতের কাছে। এশিয়া থেকে একটি মাত্র দেশের জন্যই ফিফার দরজা খোলা ছিল। কিন্তু ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া এবং বর্মা (বর্তমানে মায়ানমার) নিজে থেকেই দল তুলে নিয়েছিল। তারা বিশ্বকাপ খেলতে রাজি হয়নি।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জন করা ভারত প্রথম বারের মতো এই প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করে। ভারতকে তৎকালীন বর্মা (বর্তমানে মায়ানমার), ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপিন্সের সঙ্গে একটি গ্রুপে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বাছাই পর্ব শুরু হওয়ার আগেই অন্য দলগুলি নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় ১৯৫০ ফিফা বিশ্বকাপে ভারতীয় পুরুষ ফুটবল দলের পথ বাধাহীন হয়ে যায়। ফলে শেষ এবং একমাত্র এশীয় দল হিসাবে ভারতকে ডাকে ফিফা। কিন্তু ভারতও খেলতে যায়নি শেষমেশ।
অনেকে বলেন, বিশ্বকাপে ভারতের না খেলার কারণ হল ফুটবলের জুতো। ফিফার তরফে জুতো পরে খেলার শর্ত দেওয়া হয়েছিল বলেই নাকি বিশ্বকাপে ভারতীয় ফুটবলারেরা খেলতে চাননি। কিন্তু এই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
মনে করা হয়, লন্ডন অলিম্পিকের ম্যাচগুলিতে খালি পায়ে খেলেছিলেন সদ্য-স্বাধীন ভারতের ফুটবলারেরা। কেউ কেউ পায়ে মোটা মোজা পরেছিলেন। স্বাধীনতার পর সেই প্রথম কোনও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল ভারত।
প্রচলিত রয়েছে, ফিফা তাদের নিয়ম অনুযায়ী, ভারতের ফুটবলারদের জুতো পরে খেলার নিয়মের কথা জানিয়েছিল। তাতে নাকি খুব একটা খুশি হননি ভারতীয় খেলোয়াড়রা। তবে তাতে বিশ্বকাপে না খেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞেরা। তবে, এটি ছিল নিছকই একটি গুজব। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত ফিফার নিয়মে বুট পরা বাধ্যতামূলক ছিল না।
অনেকে আবার বলেন, বুটের চেয়েও বেশি, প্রশাসনিক দ্বিধা, অগ্রাধিকার এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতাই ভারতকে ফিফা বিশ্বকাপে একটি ঐতিহাসিক অভিষেক করা থেকে বিরত রেখেছিল।
ব্রাজ়িলে অনুষ্ঠিত ১৯৫০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ছিল চতুর্থ ফিফা বিশ্বকাপ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তখনও যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং ধ্বংসযজ্ঞ থেকে সেরে উঠতে পারেনি। আন্তর্জাতিক ভ্রমণও ছিল ব্যয়বহুল ও জটিল।
মনে করা হয়, ব্রাজ়িলে খেলতে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য সে সময় ভারতেরও ছিল না। তাই তাদের বিশ্বকাপ খেলতে পাঠানো হয়নি। তবে এ যুক্তিও ত্রুটিমুক্ত নয়। কারণ, ফিফা ভারতীয় ফুটবলারদের ব্রাজ়িল-যাত্রা সংক্রান্ত খরচ বহন করার আশ্বাস দিয়েছিল। অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের তরফে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়, বিশ্বকাপের দল নির্বাচন নিয়ে খেলোয়াড় এবং কর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়। তা ছাড়া, বিশ্বকাপ খেলার প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছিল।
ভারত বিশ্বকাপে খেলতে গেলে সেই দলের নেতৃত্ব দিতেন বাঙালি ফুটবলার শৈলেন মান্না। তিনি পরে নাকি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপকে আসলে অলিম্পিকের মতো গুরুত্বই দেয়নি ভারতের ফুটবল ফেডারেশন। ফিফা আয়োজিত টুর্নামেন্ট নিয়ে তাদের কোনও উৎসাহ ছিল না। অনেকে আবার এ-ও বলেন, ভারত থেকে সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজ়িলে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি ছিল না তৎকালীন ফুটবলারদের একাংশের। বিশ্বকাপে খেলার উৎসাহ পাননি তাঁরাও।
কারণ যা-ই হোক, বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েও তা ভারতের হাতছাড়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় ফুটবল সমর্থকেরা হা-হুতাশ করেন আজও। ব্রাজ়িলে আয়োজিত সেই বিশ্বকাপের পর ৭৬ বছর কেটে গিয়েছে। আর কখনও ফুটবলের এই চূড়ান্ত মঞ্চে সুযোগ পায়নি ভারত।
ফুটবল বিশ্বকাপে ভারতের অংশগ্রহণ এবং ব্রাজ়িলে একটি স্মরণীয় ফলাফল ভারতের ফুটবলের জন্য ঠিক তা-ই করতে পারত, যা কপিল দেব ও তাঁর দল ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে ক্রিকেটের জন্য করেছিলেন— খেলাটিকে একটি আবেগপ্রবণ সাধনা থেকে জাতীয় আবেশে রূপান্তরিত করা।