বছর চারেক আগে জন্ম, প্রতীক ফাউন্টেন পেনের নিব! বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের ঠাঁই দেওয়া এনসিপিআইয়ের কাহিনি কী?
ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে দলটির আত্মপ্রকাশ। নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী, এনসিপিআই নামের দলটি ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি আরইউপিপি (রেজ়িস্টার্ড আন রেকগনাইজ়ড পলিটিক্যাল পার্টি) তালিকাভুক্ত হয়।
বছর চারেক আগে তৈরি। প্রতীক ফাউন্টেন পেনের নিব। সেই নতুন দল— ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-র ছাতার তলায় এলেন তৃণমূলের লোকসভার বিদ্রোহী সাংসদেরা। এনসিপিআই অপরিচিত একটি দল। সেখানেই গেলেন বিদ্রোহীরা। কে তাঁদের পথ দেখাল? কেন এমন সিদ্ধান্ত, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
রবিবার সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়ি এবং স্পিকার ওম বিড়লার বাসভবনে বৈঠকের পরে তৃণমূলের বিদ্রোহী ব্লকের ২০ জন সাংসদ জানান, নতুন দলে যোগ দিচ্ছেন তাঁরা। এনসিপিআইয়ের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে তৃণমূলের বিদ্রোহী ব্লকটি।
স্পিকারের বাসভবন থেকে বেরিয়ে সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমরা এনসিপিআই-এ যোগ দিয়েছি। এটি একটি নির্বাচন কমিশন স্বীকৃত রাজনৈতিক দল। আমরা এই দলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছি। এর পরে আদালতে ফয়সলা হবে কে আসল তৃণমূল।” পরে সুদীপ এ কথাও জানান যে, তৃণমূলের প্রতীক এবং নাম পাওয়ার জন্য লড়বেন তাঁরা।
অন্য দিকে, নেত্রী কাকলি ঘোষদস্তিদারের কথায়, “আমরা সংসদে আলাদা বসার আবেদন জানিয়েছি। তৃণমূলের ২০ জন নির্বাচিত সাংসদের সই নিয়ে স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেছি এবং চিঠি দিয়েছি। এর পরে এনডিএ নেতৃত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে সমন্বয় রেখে কাজ করব আমরা।” শীঘ্রই পশ্চিমবঙ্গে এনসিপিআই-এর কার্যালয় খোলা হবে বলেও জানান বিদ্রোহী কাকলি।
রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা এনসিপিআই নামে যে কোনও রাজনৈতিক দল আছে, তা কেউই প্রায় জানতেন না। কিন্তু তৃণমূলের লোকসভার সাংসদদের সেই দলে জুড়ে যাওয়ার ঘটনাটি বাংলা-ভিত্তিক অখ্যাত দলটিকে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সঙ্কটের এক গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং দলটির উৎপত্তি, গঠন, নেতৃত্ব ও অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতির দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে কারা এই এনসিপিআই? কী ভাবে জন্ম? কোথাকার দল?
আরও পড়ুন:
ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে দলটির আত্মপ্রকাশ। নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী, এনসিপিআই নামের দলটি ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি আরইউপিপি (রেজ়িস্টার্ড আন রেকগনাইজ়ড পলিটিক্যাল পার্টি) তালিকাভুক্ত হয়। আরইউপিপি মানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত কিন্তু অস্বীকৃত একটি রাজনৈতিক দল।
দলটির ফেসবুক পেজে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই রাজনৈতিক দলটির প্রধান কার্যালয় হাওড়ার সাঁকরাইল থানা এলাকার হাটগাছা গ্রামে অবস্থিত। বাংলায় নিবন্ধিত হওয়া সত্ত্বেও দলটি ত্রিপুরায় তাদের নির্বাচনী যাত্রা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (টিটিএএডিসি) এলাকায় বঞ্চিত জনজাতি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার লক্ষ্য নিয়ে দলটি ত্রিপুরার রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিল।
২০২৩ সালের বিধানসভা ভোটে ত্রিপুরার বিধানসভা ভোটে সে রাজ্যের ধলাই জেলার চৌমানু এবং উনকোটি জেলার কৈলাসহর কেন্দ্রে এনসিপিআই-এর প্রার্থীরা ভোটে লড়েছিলেন। তবে ত্রিপুরার সেই বিধানসভা নির্বাচনে কোনও প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয় স্বল্প-পরিচিত রাজনৈতিক দলটি।
দলটি মোট সাতটি নির্বাচনী কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়েছিল। তবে চারটি আসনের প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এনসিপিআই-এর প্রার্থীরা দলের প্রতীকে মাত্র দু’টি কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। চৌমানু কেন্দ্রে ৫৩৬টি এবং কৈলাসহর কেন্দ্রে ২৮৬ ভোটটি পেয়েছিল দলটি। সব মিলিয়ে দলটি মাত্র ৮২২টি ভোট পায়।
আরও পড়ুন:
তৃতীয় এক জন প্রার্থী কৃষ্ণকুমার দেববর্মা, আমবাসা থেকে নির্দল হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং ৩৭৬টি ভোট পান। তাঁকে নিয়ে এনসিপিআই-এনসিপিআই সমর্থিত প্রার্থীরা মোট ১,১৯৮টি ভোট পেয়েছিল। তবে কোনও প্রার্থীই জয়ের কাছাকাছি পৌঁছোতে পারেননি।
নির্বাচন কমিশনের নথিপত্র অনুযায়ী, ত্রিপুরা নির্বাচনে দলটি মোট ১.১৩ লক্ষ টাকা অনুদান পেয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এনসিপিআই। সূত্রের খবর, ত্রিপুরা নির্বাচনের পর দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিবাদ শুরু হয়। আর্থিক বিষয় নিয়ে মতপার্থক্যের জেরে সাংগঠনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়।
পরবর্তী কালে দলীয় নেতৃত্বকে নাকি ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন নেতৃত্বেরই একাংশ। কিন্তু টাকার অভাবে সেই প্রস্তাব আর এগোয়নি বলে সূত্রের খবর। রাজনৈতিক পরিসর সীমিত হওয়া সত্ত্বেও এনসিপিআই এখন লোকসভায় তৃণমূলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদকে নিয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
এনসিপিআই দলের নথিপত্রে কোষাধ্যক্ষ হিসাবে শিউলি কুন্ডুর নাম রয়েছে। দলটির অন্যতম সাংগঠনিক দায়িত্বেও রয়েছেন হাটগাছার বাসিন্দা শিউলিই। ওই রাজনৈতিক দলের ঠিকানাতেই নিবন্ধিত আরও দু’টি সংস্থার ডিরেক্টর হিসাবেও যুক্ত শিউলি। ‘বিশ্ববাজার প্রাইভেট লিমিটেড’ (নভেম্বর ২০২১ থেকে ডিরেক্টর) এবং ‘পশ্চিমবঙ্গ অসংগঠিত মহিলা কর্মী অ্যাসোসিয়েশন’ (অক্টোবর ২০২০ থেকে ডিরেক্টর)— যার মধ্যে শেষোক্ত সংস্থাটি সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত।
এই তিনটি সংস্থারই নিবন্ধিত ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায়। দলটির সভাপতি উত্তীয় কুন্ডু, যিনি শিউলির স্বামী। একটি ফেসবুক পোস্টে উত্তীয় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী (তৎকালীন বিরোধী দলনেতা) শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে একটি ছবিও শেয়ার করেছিলেন।
দলটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং তৎকালীন ‘ন্যাশনাল অর্গানাইজ়িং জেনারেল সেক্রেটারি’ শান্তনু দে। তাঁর সঙ্গে আনন্দবাজার ডট কম-এর তরফে যোগাযোগ করা হলে, তিনি দাবি করেন, “আমি এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তৃণমূল সাংসদদের দলে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। যদি জানতাম তা হলে আমি এর বিরোধিতা করতাম। এখনও বিরোধিতা করছি।”
শান্তনুর অভিযোগ, “উত্তীয়ের সিদ্ধান্তেই নিশ্চয়ই এটা হয়েছে। আমার সঙ্গে এই নিয়ে কোনও আলোচনা করা হয়নি। আমায় না জানিয়ে করা মানে তো আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হল।”
শান্তনু আরও বলেন, “আমায় ন্যাশনাল অর্গানাজ়িং জেনারেল সেক্রেটারি পদ দেওয়া হলেও ত্রিপুরায় যখন ভোট হয়েছিল আমি সব কাজ করেছিলাম। দলের নাম, প্রতীক— সব কিছুই আমার হাতে তৈরি করা।” তাঁর সংযোজন, “আমি আরএসএস বা বিজেপির আদর্শে বিশ্বাসী।”
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে তৃণমূলের এই যোগদান শান্তনু ভাল চোখে দেখছেন না, সেটা তিনি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেন। অন্য দিকে, তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদের নতুন দলে যোগ দেওয়ার বিষয়ে উত্তীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এই বিষয় তিনি আর কিছু বলতে চান না। শান্তনুর ব্যাপারে তিনি বলেন, “তাঁর দলের যে কার্যকালের মেয়াদ ছিল তা শেষ হয়ে গিয়েছে।”
শিউলি আবার বলেন, “আমি প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ছিলাম, পদত্যাগ করেছি। এই মুহূর্তে আমি কিছু বলব না, যা বলার পরে বলব।” তৃণমূলের এই যোগদানে তিনি খুশি কি না জানতে চাওয়া হলে সংক্ষিপ্ত ভাবে হ্যাঁ বলেন এবং সাংসদদের স্বাগত জানান। তবে এর বেশি এখনই কিছু বলতে চাননি তিনি।
ত্রিপুরায় এনসিপিআই-এর টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কয়েক জন প্রার্থী দাবি করেছেন, নির্বাচনের পরেই দলটি উধাও হয়ে যায়। কৈলাসহর থেকে দলের প্রার্থী জাহাঙ্গির আলি ফোনে এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘২০২৩ সালের নির্বাচনের সময় কলকাতা থেকে আসা শিউলি কুন্ডু আমাদের প্রার্থী হওয়ার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। নির্বাচনের পর তাঁরা কাজকর্ম গুটিয়ে ফিরে যান। আমাদের সঙ্গেও তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।’’
অন্য এক জন প্রার্থী বরজেদা ত্রিপুরা বলেন, ‘‘স্থানীয় এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে দলের প্রতিষ্ঠাতা শান্তনু দে-র সঙ্গে পরিচয়ের পর আমি তাঁদের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। তাঁরা আমার কাছে কোনও টাকা চাননি এবং প্রচারও তেমন একটা হয়নি। তাঁরা মূলত চেয়েছিলেন প্রার্থীরা নির্বাচনে লড়ুন। নির্বাচনের পর তাঁদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।’’
সমাজমাধ্যম ফেসবুকেও এনসিপিআই দলটির উপস্থিতি রয়েছে। তবে সেই পেজের ফলোয়ারের সংখ্যা খুবই সীমিত। যদিও সংখ্যাটি ক্রমশ বাড়ছে।