সুদীপকে নিয়ে শাহি-সাক্ষাতে ‘আতঙ্ক’ ছড়ালেন শতাব্দী, অভিনেত্রী-সাংসদের সঙ্গে ‘অন্তর্ধান’-এর পথে আরও হেভিওয়েট?
তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ কলকাতা উত্তরের সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অমিত শাহ এবং ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে দেখা করেছেন শতাব্দী রায়। ঘাসফুল শিবিরে ভাঙন ধরাতে বড় ভূমিকা নিচ্ছেন তিনি?
কখনও পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে ছুটে যাওয়া। কখনও আবার একধাপ এগিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ। কিংবা, নিজের বাসভবনেই পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’দের বৈঠকের আয়োজন। সংসদীয় দলে ভাঙনের ছবি স্পষ্ট হতেই তৃণমূল কংগ্রেসের সামনে মূর্তিমান ‘আতঙ্ক’ হয়ে উঠছেন ‘অন্তর্ধান’ খ্যাত বাংলা চলচ্চিত্রের দাপুটে অভিনেত্রী!
তিনি, বীরভূম লোকসভা কেন্দ্রের চার বারের সাংসদ শতাব্দী রায়। গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভরাডুবি হলে দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার। কয়েক দিনের মাথায় ঘাসফুল শিবিরের পরিষদীয় দলে ধরে ফাটল। বিরোধী দলনেতার আসন বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের থেকে ছিনিয়ে নেন উলুবেড়িয়া পূর্বের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তখনও একরকম নিশ্চুপ ছিলেন শতাব্দী।
কিন্তু, অচিরেই তৃণমূলের অন্দরের ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির আকার নেয়। আলাদা ব্লক তৈরি করেন কাকলির মতো বেশ কয়েক জন ‘বিদ্রোহী’ সাংসদ। এ বার ধীরে ধীরে সামনের সারিতে আসেন শতাব্দী। গণমাধ্যমকে বলেন, নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রের এনডিএ জোটকে সমর্থন করবেন তাঁরা। ফলে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় জল্পনা। সাংসদ অভিনেত্রী যে সেখানে বড় ভূমিকা নিতে চলেছেন, তখনও তা বোঝা যায়নি।
রাজ্যে ভরাডুবি হওয়ার পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে বাড়তে শুরু করে ‘বিক্ষুব্ধ’ সাংসদের সংখ্যা। নির্বাচনের ফলপ্রকাশের এক মাসের মাথায় শতাব্দীর দিল্লির বাসভবনে একজোট হন তাঁরা। ৪ জুন ‘হঠাৎ’ সেখানে হাজির হন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বেশ কয়েক ঘণ্টা তাঁদের সঙ্গে বৈঠকের পর সেখান থেকে বেরিয়ে যান তিনি। গাড়িতে ওঠার পর কাচ নামিয়ে জোড়া আঙুল তুলে জয়সূচক চিহ্ন দেখাতে দেখা যায় তাঁকে।
১২ জুন, শুক্রবার ১৯ জন ‘বিদ্রোহী’ তৃণমূল সাংসদের সই করা একটা নথি প্রকাশ্যে আসে। সেখানে প্রথম নামটি কাকলির। শতাব্দীর সই ছিল দ্বিতীয় পংক্তিতে। তার পরে একে একে ছিল বাপি হালদার, শর্মিলা সরকার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ বসুনিয়া, অসিত মাল, অরূপ চক্রবর্তী, কালীপদ সরেন, দেব অধিকারী, জুন মালিয়া, পার্থ ভৌমিক, খলিলুর রহমান, আবু তাহের খান, ইউসুফ পাঠান, মিতালি বাগ, মালা রায়ের স্বাক্ষর।
আরও পড়ুন:
‘বিদ্রোহী’ সাংসদদের একটি সূত্রের দাবি, পরে ওই নথিতে পৃথক ভাবে সই করেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সায়নী ঘোষ। তবে তাতে কলকাতা উত্তরের সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ছিল না। ১৩ জুন, শনিবার আচমকাই দিল্লি রওনা দেন তিনি। একই বিমানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন শতাব্দীও। শুধু তা-ই নয়, রাজধানীতে নেমে দু’জনে একই গাড়িতে চলে যান ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে। সেখান থেকে তাঁরা রওনা হন অটল অক্ষয় উরজা ভবনের উদ্দেশে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ৪ জুন শতাব্দীর দিল্লির বাসভবনে ‘বিদ্রোহী’দের সঙ্গে শুভেন্দুর বৈঠকের পর একাধিক বার ভূপেন্দ্রের বাড়িতে যান তাঁরা। অন্য দিকে কলকাতায় ফিরে ছ’বারের সাংসদ ও চারবারের বিধায়ক সুদীপের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী। একটা সময় লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা ছিলেন সুদীপ। ফলে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা যে ‘বিদ্রোহী’দের কাছে সম্পদ হতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।
এ-হেন সুদীপের সঙ্গে একই বিমানে শতাব্দীর দিল্লি যাওয়াকে তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। রাজধানীতে পৌঁছে ভূপেন্দ্রের বাড়ি যাওয়া হোক বা অমিত শাহের সঙ্গে অটল অক্ষয় উরজা ভবনে বৈঠক, গোটা পর্বে কলকাতা উত্তরের সাংসদের ছায়াসঙ্গী ছিলেন অভিনেত্রী। তা ছাড়া এর নেপথ্যে অন্য অঙ্কও কাজ করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
এ বারের বিধানসভা ভোটে চৌরঙ্গি কেন্দ্র থেকে জিতেছেন সুদীপ-জায়া নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। শতাব্দীর মতো তিনিও ছিলেন বাংলা সিনেমার অভিনেত্রী। কলকাতা উত্তরের বর্ষীয়ান সাংসদকে দলে টানতে সেই সূত্রকে ‘বিদ্রোহী’রা কাজে লাগিয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। একই কথা রচনা ও সায়নীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলা চলচ্চিত্রে দীর্ঘ দিন কাজ করার সুবাদে এঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্তরে সম্পর্ক রয়েছে বীরভূমের সাংসদের।
আরও পড়ুন:
১৩ জুন, কলকাতা ছাড়ার আগে অবশ্য আনন্দবাজার ডট কম-এর কাছে মুখ খোলেন শতাব্দী। বলেন, ‘‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনযাপন একেবারেই পছন্দ করেনি আমজনতা।’’ পাশাপাশি, নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তথা বিজেপি সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। তাঁর দাবি, বাংলা ছায়াছবির হাল ফেরাতে এই জগতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, যেটা তৃণমূলের ১৫ বছরে হয়নি।
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর টালিগঞ্জের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তৃণমূলে যোগ দেওয়ার ঢল নামে। পরবর্তী কালে ঘাসফুলের টিকিটে জিতে সংসদে পা রাখেন মিমি চক্রবর্তী, নুসরত জাহান, জুন মালিয়া, দেব, সায়নী ঘোষ এবং রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়রা। সিনে দুনিয়ার থেকে জোড়াফুল চিহ্নে জয়ী হওয়া বিধায়কের সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। শতাব্দীকে এই দলে ফেলতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
২০০৯ সালে প্রথম বার বীরভূম থেকে জেতেন শতাব্দী। পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতা তখনও বামেদের হাতে। ফলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া ছিল বেশ কঠিন। সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন সদ্য রাজনীতিতে পা দেওয়া অভিনেত্রী। ২০১৪ ও ২০১৯ সালে প্রবল মোদী হওয়ার মধ্যেও তাঁকে হারাতে পারেনি কেউ। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও তাঁকে বেছে নেন লালমাটির জেলার বাসিন্দারা।
২০০৩ সালে অনুব্রত মণ্ডলকে বীরভূমের জেলা সভাপতি করেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গোড়া থেকেই তাঁর সঙ্গে শতাব্দীর সম্পর্ক ছিল ‘অম্ল-মধুর’। দল ক্ষমতায় এলে বিরোধী থেকে পুলিশ, প্রকাশ্যেই সকলকে হুমকি-হুঁশিয়ারি দিতে থাকেন অনুব্রত। এই নিয়ে গণমাধ্যমে উষ্মা প্রকাশ করেন অভিনেত্রী সাংসদ। এতে ঘাসফুল শিবিরের যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, তা বার বার বলতে শোনা যায় তাঁকে।
২০২২ সালে গরুপাচার মামলায় অনুব্রত মণ্ডলকে গ্রেফতার করে সিবিআই। ওই সময় কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার এই পদক্ষেপকে বিজেপি তথা অমিত শাহের প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ হিসাবে চিহ্নিত করেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। শতাব্দী কিন্তু এ ব্যাপারে জোরালো বক্তব্য রাখেননি। বরং বিতর্ক এড়াতে গোটা বিষয়টিকে এড়িয়ে যায় তিনি।
অনুব্রত গ্রেফতার হওয়ার পর বীরভূম থেকে শতাব্দীর জেতা কঠিন হবে বলে মনে করা হয়েছিল। সেখানেও ‘লেটার’ নম্বরে পাশ করেন অভিনেত্রী। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে মুক্তি পেয়ে তিহাড় জেল থেকে লালমাটির জেলার বাড়িতে ফেরেন তৃণমূলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা। তত দিনে অবশ্য তাঁর সঙ্গে দূরত্ব অনেকটাই বাড়িয়ে ফেলেছেন শতাব্দী রায়।
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কলকাতা থেকে দিল্লি যাওয়ার আগে আনন্দবাজার ডট কম-কে বীরভূমের অভিনেত্রী-সাংসদ বলেন, ‘‘অনুব্রত মণ্ডলকে নিয়ে যখনই অভিযোগ করেছি, তখন প্রকাশ্যে ওঁকেই সমর্থন করেছে দল। রাজনৈতিক মঞ্চেও সে কথা বলা হয়েছে। তবে বীরভূমে তৃণমূলের সংগঠন তৈরি করার ক্ষেত্রে অনুব্রতের অবদান রয়েছে। সে দিক থেকে বলব, দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) ঠিক আমি ভুল।’’
শতাব্দীর দাবি, ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ‘বিদ্রোহী’ হননি তিনি। পরে দলীয় বৈঠকে হারের কারণ কাটাছেঁড়া করা হয়নি। সাংসদদের ডেকে নিজেদের কথা বলে গিয়েছেন মমতা-অভিষেক। এর জেরে আলাদা ব্লকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাঁকে। তবে বিক্ষুব্ধ অন্যান্যদের মতো সরাসরি দলনেত্রী বা অভিষেকের নামে সুর চড়িয়ে কোনও কথা বলেননি বীরভূমের সাংসদ।
এই পরিস্থিতিতে ১৪ জুন দিল্লি যাওয়ার আগে বোমা ফাটিয়েছেন শতাব্দীর সতীর্থ কাকলি। তাঁর দাবি, ২০ নয়, ‘বিক্ষুব্ধ’দের জোটে রয়েছেন মোট ২২ জন সাংসদ। ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে আসা সই হওয়া নথিতে নাম নেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ, শত্রুঘ্ন সিন্হা, প্রতিমা মণ্ডল এবং সাজদা আহমেদের। এঁদের কাউকে বীরভূমের সাংসদের বাড়িতে দেখা যায় কি না, তা নিয়ে তীব্র হচ্ছে জল্পনা।
১৯৮৬ সালে তপন সিংহ পরিচালিত ‘আতঙ্ক’-এ অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে পা রাখেন শতাব্দী। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে পর্দায় তাঁর উপস্থিতি সকলের নজর কেড়েছিল। পরের বছর শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রের জন্য পুরস্কার পান তিনি। ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া তাঁর ‘অন্তর্ধান’ ছবিটিও বক্স অফিসে সাড়া ফেলেছিল। সেটিরও পরিচালক ছিলেন তপন সিংহ। দু’টি সিনেমাতেই শতাব্দীর বাবার ভূমিকায় ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
সূত্রের খবর, ১৫ জুন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দেবে তৃণমূলের ‘বিক্ষুব্ধ’ গোষ্ঠী। আগামী দিনে এনডিএ-তে বড় পদ পেতে পারেন তাঁরা। তা ছাড়া মমতার নির্বাচনী প্রতীক ঘাসফুল হাতছাড়া হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকছে। আর তাই বীরভূমের সাংসদের সঙ্গে সুদীপের দিল্লি যাত্রার খবরে দলের অন্দরে যে গুঞ্জন বাড়ছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সেখানকার আর কেউ অন্তর্ধানে হন কি না, উত্তর দেবে সময়।