Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের দিন কি তবে ফুরলো? কে বাঁচাবে ব্যাকটেরিয়াদের থেকে!

লিখছেন দেবনাথ ঘোষাল। (লেখক আমেরিকার ‘ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’র বিশিষ্ট গবেষক।)অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের দিন বোধ হয় ফুরিয়েই আসছে, দ্

ক্যালিফোর্নিয়া ২১ জুলাই ২০১৬ ০৯:২৪
Save
Something isn't right! Please refresh.
সেই ধুরন্ধর ব্যাকটেরিয়ারা।

সেই ধুরন্ধর ব্যাকটেরিয়ারা।

Popup Close

মে মাসের শেষ সপ্তাহের কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া প্রদেশের সামরিক হাসপাতালে এক রোগীকে পরীক্ষা করার সময় ডাক্তাররা লক্ষ্য করলেন, তার শরীরে এমন মারাত্মক একটি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয়েছে, যা প্রচলিত কোনও অ্যান্টিবায়োটিক্‌স দিয়েই সারানো যাচ্ছে না। এমনকী, ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধের জন্য ব্যবহৃত আমাদের ‘শেষ অস্ত্র’- কলিস্টিন-ও আর কাজ করছে না!

সেই দিনই আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ দফতর ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’-এর অধিকর্তা টম ফ্রাইডেন ওয়াশিংটনের জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, “ব্যাকটেরিয়া-প্রতিরোধের লড়াইয়ে, এটা একটা সঙ্কটজনক মুহূর্ত! আমরা খুব তাড়াতাড়ি বিকল্প ব্যবস্থার হদিশ না পেলে, এই নতুন যুগের অ্যান্টিবায়োটিক্‌স-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বা ‘সুপার বাগ’-দের সংক্রমণ ঠেকানোটা কার্যত অসম্ভবই হয়ে পড়বে!”

তার পর এক মাসও পার হয়নি। জুনের শেষের দিকে কলিস্টিনকে রুখে দিতে পারে, এমন আরও একটি ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান মিলল নিউইয়র্কে। এক রোগীর শরীরে। ‘সুপার বাগ’দের এই বাড়বাড়ন্তে এখন তাই আমেরিকার স্বাস্থ্য দফতর আর চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের ঘুম ছুটে গিয়েছে। হরেক রকমের অ্যান্টিবায়োটিক্‌সকে ভোঁতা করে দিতে পারে, এমন ‘মাল্টিড্রাগ-রেসিস্ট্যান্ট’ বা, ‘MDR’ আর কলিস্টিনকে রুখতে পারে, এমন ব্যাকটেরিয়াদের হদিশ এর আগে ইউরোপ, এশিয়া বা কানাডায় মিললেও আমেরিকায় এই প্রথম তাদের সন্ধান মিলল।

Advertisement

ভাবুন, বিজ্ঞানের এই অভূতপূর্ব অগ্রগতির যুগে যখন আমরা মঙ্গলে মহাকাশযান পাঠাচ্ছি, তখন কি না এই পুঁচকে ব্যাকটেরিয়াদের দৌরাত্ম্যে প্রতি বছর ৭ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে! সম্প্রতি ইংল্যান্ডে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র জানিয়েছে, ‘সুপার বাগ’দের রোখার উপায় অবিলম্বে বের করতে না-পারলে ২০৫০ সাল নাগাদ প্রতি ৩ সেকেন্ডে ১ জন করে মানুষ ‘সুপার বাগ’-এর সংক্রমণে মারা যাবেন! আর প্রতি বছরে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৫ গুণ বেড়ে হবে ১ কোটির কাছাকাছি। যা বর্তমানে ক্যান্সারে মৃত্যুর হারের চেয়েও অনেকটাই বেশি!

কলিস্টিনকে রোখার ব্যাকটেরিয়া কতটা বিপজ্জনক, দেখুন এই ভিডিওতে।

শুনে নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে, এই ‘সুপার বাগ’রা ঠিক যেন কোনও ‘সাই-ফাই’ ফিল্মের কোনও ভিলেন, যার হানাদারি রুখতে গিয়ে আমাদের সকলেরই দিশেহারা অবস্থা! ব্যাপারটা কিন্তু তার থেকে কোনও অংশে কম নয়!

এখন প্রশ্নটা হল, ব্যাকটেরিয়া-সংক্রমণ হলে তো প্রায়ই আমরা অ্যান্টিবায়োটিক্‌স খেয়ে থাকি। আর তাতে আমাদের সংক্রমণ সেরেও যায়। তা হলে কেনই-বা প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক্‌স দিয়ে মেরে ফেলা যাচ্ছে না এই সব নতুন যুগের (‘সুপার বাগ’) ব্যাকটেরিয়াদের? ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই সব ব্যাক্টেরিয়া কী এমন ফন্দি-ফিকির বের করে ফেলেছে, যাতে আমাদের এত উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞানকেও তারা নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে? ধুরন্ধর ব্যাকটেরিয়াদের ‘শকুনির মতো’ কূট চালগুলোকে চটপট ধরে ফেলতে হলে, আমাদের একটু বুঝে নিতে হবে অ্যান্টিবায়োটিক্‌স জিনিসটা ঠিক কী জিনিস? আর কী ভাবেই-বা কাজ করে এই অ্যান্টিবায়োটিক্‌স?

সবার প্রথমে এটা বলে নেওয়া ভাল, অনেকেরই একটা ভুল ধারণা আছে, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা, যে কোনও পরজীবীর সংক্রমণ রুখতে গিয়ে যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়, সেটাই হল- ‘অ্যান্টিবায়োটিক্‌স’। আদত ঘটনাটা কিন্তু তা নয়। অ্যান্টিবায়োটিক্‌স শুধুই ব্যাকটেরিয়াদের রুখতে পারে। সীমিত কিছু ক্ষেত্রে প্রোটোজোয়াদের সংক্রমণ রুখতে অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের ব্যবহার হলেও, ভাইরাস বা অন্যান্য পরজীবীকে রুখতে অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের ব্যবহার করলে, তার কোনও ফলই পাওয়া যাবে না!

কী ভাবে পেলাম আমরা প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের সন্ধান?

১৯২৮ সালে স্কটিশ বিজ্ঞানী স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং-ই প্রথম লক্ষ্য করেন, পেনিসিলিয়াম গোত্রের ছত্রাক- ‘পেনিসিলিয়াম রুবেন্স’ বিশেষ একটি রাসায়নিক যৌগ নিঃসরণ করে। যা থাকলে ব্যাকটেরিয়ারা আর বাড়তে পারে না। ব্যাকটেরিয়াদের কোষের মৃত্যু হয়। পেনিসিলিয়াম ছত্রাক থেকে বেরিয়ে আসা ওই যৌগেরই তিনি নাম দিলেন- ‘পেনিসিলিন’। ১৯২৯ সালে তাঁর গবেষণাপত্রটি ‘ব্রিটিশ জার্নাল অফ এক্সপেরিমেন্টাল প্যাথলজি’-তে প্রকাশিত হয়। ১৯৪৫ সালে তাঁর এই অসামান্য অবদানের জন্যে তাঁকে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।


লন্ডনের সেন্ট মেরি মেডিক্যাল স্কুলে গবেষণায় মগ্ন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং।



----------------------------------------------------------

কিন্তু কী ভাবে ব্যাকটেরিয়াদের জব্দ করে পেনিসিলিন?

ব্যাকটেরিয়াদের কোষের আকার আমাদের কোষের তুলনায় অনেক অনেক গুণ ছোট। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই সব ব্যাকটেরিয়া-কোষের দৈর্ঘ্য এক মিলিমিটারের এক হাজার ভাগের এক ভাগ মাত্র। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে তাদের অনেক বেশি লড়াই করতে হয় বেঁচে থাকার জন্য। তাই ব্যাকটেরিয়াদের কোষের গঠন কিন্তু আমাদের চেয়ে অনেক বেশি মজবুত।

আমাদের কোষের মতোই ব্যাকটেরিয়ার কোষ আর কোষরসকে ঘিরে ফসফোলিপিড দিয়ে বানানো একটি আস্তরণ থাকে। যাকে ‘অন্তর্বর্তী কোষ-পর্দা’ বলা হয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে নিজেদের বাঁচাতে ব্যাকটেরিয়ার কোষের বাইরে আরও দু’টি ‘প্রতিরক্ষা বলয়’ থাকে। ‘অন্তর্বর্তী কোষ-পর্দা’র ঠিক বাইরে থাকে কোষপ্রাচীরের একটি সুদৃঢ় আবরণ। আর শেষে থাকে ‘বাহ্যিক কোষ-পর্দা’র আরও একটি আস্তরণ (চিত্র-১)।


ব্যাকটেরিয়া কোষের বাহ্যিক আবরণ।



তবে হ্যাঁ, সব ব্যাকটেরিয়ার কোষের বাইরের দিকে ‘বাহ্যিক কোষ-পর্দা’র আস্তরণটা থাকে না। ‘গ্রাম-পজিটিভ ব্যাকটেরিয়া’দের (এরা ‘গ্রাম-রঞ্জকে’ রঞ্জিত হয়) কোষের বাইরের দিকটায় সাধারণত, এই ‘বাহ্যিক কোষ-পর্দা’র আস্তরণটা থাকে না। তবে ‘গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া’দের (এরা ‘গ্রাম-রঞ্জকে’ রঞ্জিত হয় না) বাইরের দিকটায় কিন্তু ‘বাহ্যিক কোষ-পর্দা’র আস্তরণটা থাকে| ওই আস্তরণটা আছে বলেই ‘গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া’দের মেরে ফেলাটা অনেক বেশি কঠিন। আজ পর্যন্ত যত রকমের ‘সুপার বাগ’ বা, ‘MDR’-এর সন্ধান মিলেছে, তাদের বেশির ভাগই ‘গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া’।

ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীর কেন?

কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, ‘অন্তর্বর্তী কোষ-পর্দা’ ও কোষপ্রাচীর কিন্তু সব ব্যাকটেরিয়াতেই থাকে। কোষ-পর্দা তো আমাদের কোষেও আছে, কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার আবার কোষপ্রাচীরের দরকার পড়ল কেন ?

কোষপ্রাচীরের কাজটা হল, ব্যাকটেরিয়াদের কোষের আকৃতিটাকে রক্ষা, সেটা যাতে শক্তপোক্ত থাকে, তার ওপর নজর রাখা আর ব্যাকটেরিয়া কোষকে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার হাত থেকে বাঁচানো। কোনও ভাবে এই কোষপ্রাচীর নষ্ট হয়ে গেলে ব্যাকটেরিয়ার কোষটিও নষ্ট হয়ে যায়। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে, ‘সেল লাইসিস’। ব্যাকটেরিয়াদের কোষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তাই এই কোষপ্রাচীরের ভূমিকা অপরিসীম।

পেনিসিলিন গোত্রের অ্যান্টিবায়োটিক্‌সগুলি ব্যাকটেরিয়াদের কোষের এই কোষপ্রাচীরের গঠনটাকে নষ্ট করে দেয়। আর সেই জন্যই এই সব অ্যান্টিবায়োটিক্‌স থাকলে ব্যাকটেরিয়ারা একেবারে কুপোকাত!

আরও পড়ুন- অন্ধকার পথে এ বার আলো দেবে গাছ!

তা হলে তো ল্যাঠা চুকেই গেল! পেনিসিলিন দিলেই ব্যাকটেরিয়ারা জব্দ!

কিন্তু ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়! পৃথিবীতে প্রাণ-সৃষ্টির একদম ঊষালগ্নে এসেছিল ব্যাকটেরিয়ারা। আজ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে। আর তাই নানা রকম প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে ওদের লড়াই করতে হয়েছে। আর তাই ওদের অভিযোজন ক্ষমতা অস্বাভাবিক রকমের বেশি। বিপদে পড়লে, ওরা তাই কিছু দিনের মধ্যেই তার থেকে বেরিয়ে আসার একটা উপায় বের করে ফেলে, চটপট। পেনিসিলিনের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি।

পেনিসিলিনের হাত থেকে বাঁচতে কী করল ব্যাকটেরিয়া?

পেনিসিলিন বা ওই গোত্রের যে কোনও অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের প্রধান গঠনগত বৈশিষ্ট্যটাই হল, ‘বিটা-ল্যাকটাম রিং’-এর উপস্থিতি (চিত্র-২)। তাই ওই পেনিসিলিন গোত্রের যে কোনও অ্যান্টিবায়োটিক্‌সকে ‘বিটা-ল্যাকটাম অ্যান্টিবায়োটিক্‌স’ও বলা হয়। বুদ্ধিমান ব্যাকটেরিয়ারা ‘বিটা-ল্যাকটামেস’ নামে এমন একটি উৎসেচক (যা একটি বিশেষ ধরণের প্রোটিন) ইতিমধ্যেই বানিয়ে ফেলেছে, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের ‘বিটা-ল্যাকটাম রিং’টিকে ভেঙে ফেলে। তার ফলে, অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের কার্যকারীতা একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়।

তা হলে এই সব পেনিসিলিনকে ভোঁতা করে দেয়, এমন ‘সুপার বাগ’দের সংক্রমণ কী ভাবে রুখতে পারা যাবে?

কিন্তু বিজ্ঞানীরাও এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন! বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা উঠেপড়ে লাগলেন কী ভাবে এই ‘বিটা-ল্যাকটামেস’ উৎসেচকটিকে কব্জা করা যায়! সমাধান সূত্র মিলল, একটি ব্যাকটেরিয়া থেকেই। এ যেন কাঁটা দিয়েই কাঁটা তোলা! ‘স্ট্রেপ্‌টোমাইসেস ক্লাভুলিজেরাস’ নামে একটি ব্যাকটেরিয়া থেকে ক্লাভুলানিক অ্যাসিড নামে একটি যৌগের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা, যা ব্যাকটেরিয়ার ‘বিটা-ল্যাকটামেস’ উৎসেচকটিকেই নিষ্ক্রিয় করে দেয়। তাই ক্লাভুলানিক অ্যাসিড থাকলে, পেনিসিলিন আবার কাজ করতে শুরু করে দেয়। আর এই ভাবেই ‘বিটা-ল্যাকটাম সুপার বাগ’দের আবার জব্দ করা সম্ভব হল। এই জন্যই ‘অ্যামোক্সিসিলিন’-এর মতো ওষুধ কাজ না-করলে, ডাক্তাররা আমাদের ‘কো-অ্যামোক্সিক্লাভ’ বা, ‘অগমেনটিন’ দেন, যা আসলে পেনিসিলিন আর ক্লাভুলানিক অ্যাসিডেরই সমষ্টি (চিত্র -২)।



তা হলে আর ভয়টা কীসের?

তবে গল্পের শেষ কিন্তু এখানেও নয়! ব্যাকটেরিয়ারাও কিন্তু হাল ছাড়েনি! তারা ‘বিটা-ল্যাকটামেস’ জিনের গঠনের বার বার পরিবর্তন (মিউটেশান) করিয়ে দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক্‌সকে নানা ভাবে ধোঁকা দিতে পেরেছে। ধোঁকা দিয়ে চলেছে। একেবারে হালের একটি গবেষণাপত্র জানিয়েছে, নানা রকমের ব্যাকটেরিয়া সামগ্রিক ভাবে প্রায় ১৩০০-রও বেশি রকমের ‘বিটা-ল্যাকটামেস’ তৈরি করতে পারে। উল্টো দিকে, বিজ্ঞানীরাও ‘বিটা-ল্যাকটাম’ (অর্থাৎ, পেনিসিলিন গোত্রের) অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের গঠনের বার বার পরিবর্তন করে তার সক্রিয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করে চলেছেন। এই ভাবেই অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক্‌সকে যতটা সম্ভব, বাঁচানোর চেষ্টা চলছে।

‘সুপার বাগ’ আর বিজ্ঞানীদের এই লড়াইয়ে এখনও পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছে কে ?

খুব অবাক লাগলেও সত্যি, ব্যাকটেরিয়া আর বিজ্ঞানীদের এই দড়ি টানাটানির লড়াই প্রায় সমানে সমানে চললেও, ব্যাকটেরিয়ারাই কিন্তু সামান্য এগিয়ে রয়েছে।

আরও অবাক হয়ে যাবেন এটা শুনলে, এখন বাজারে চালু ‘বিটা-ল্যাকটাম’ অ্যান্টিবায়োটিক্‌সগুলির মধ্যে সবেচেয়ে সেরা যেটি, সেই কার্বাপেনেমের বিরুদ্ধেও এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাকটেরিয়ারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছে, যা বিজ্ঞানীদের কাছে এখন বেশ আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সে জন্যই এই সব ব্যাকটেরিয়াদের রুখতে আমাদের ‘শেষ অস্ত্র’- কলিস্টিনেরই দ্বারস্থ হতে হয়েছে।

তবে, আমাদের শরীরে কলিস্টিনের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া (সাইড এফেক্টস) কিন্তু মারাত্মক। তাই প্রায় ৫০ বছর আগে এই অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের প্রতিরোধে সক্ষম হয়ে উঠেছে MDR ‘সুপার বাগ’রা। তাই, তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাধ্য হয়েই আবার এই অ্যান্টিবায়োটিক্‌সটিকে নতুন রূপে ফিরিয়ে এনেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। তবু হালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমাদের এই ‘ব্রহ্মাস্ত্রে’র বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে একদল ব্যাকটেরিয়া। আমেরিকার পেনসিলভেনিয়া বা নিউয়র্কের ঘটনা তারই সেরা উদাহরণ।

এই ব্যাকটেরিয়ারা ‘এমসিআর-১’ নামে একটি জিনকে বদলে দিতে পারে। আর সেই ভাবেই তা নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে কলিস্টিনকেও। শুধু তাই নয়, এই ব্যাকটেরিয়াদের ‘ভ্রাতৃ-প্রীতি’ এতই বেশি যে, তারা এই ‘এমসিআর-১’ জিনটিকে এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্য ব্যাকটেরিয়ায় ছড়িয়েও দিতে পারছে। তাই বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এই কলিস্টিন-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ক্রমশই বাড়তে থাকবে। আর তাই বিজ্ঞানীদের কপালের ভাঁজটা আরও গভীর হয়েছে।

এখন উপায় কী?

‘সুপার বাগ’দের বিরুদ্ধে লড়াইটাকে জোরদার করে তুলতে বিজ্ঞানীরা ‘বিটা-ল্যাকটাম’ ছাড়া কম করে আরও ৫টি শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের ( যেমন, রাইবোজোম ইনহিবিটর্স, জায়রেজ ইনহিবিটর্স, ফোলেট সিন্থেসিস ইনহিবিটর্স, ট্রান্সক্রিপশন ইনহিবিটর্স, ও আউটার মেমব্রেন পারমিয়াবিলিটি চেঞ্জ-ফ্যাক্টর্স) উৎকর্ষ বাড়িয়ে তুলতে মন দিয়েছেন। যেগুলো ব্যাকটেরিয়া কোষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলোতে বাধা দিয়ে ব্যাকটেরিয়াদের মেরে ফেলে। সন্ধান চলছে আরও নতুন নতুন শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক্‌সেরও।


ব্যাকটেরিয়াদের সঙ্গে লড়াইয়ে প্রায় হঠে যাওয়ার মুখে এই সব ওষুধ!



তবে হ্যাঁ, যতই নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক্‌স বাজারে আসুক না কেন, বার বার তাদের ব্যবহার করা হলে, এক সময় কিন্তু তাকে রোখার কৌশনও বের করে ফেলবে ব্যাকটেরিয়ারা।

তা হলে আমাদের কী করণীয়?

‘সুপার বাগ’দের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধটা পুরোপুরি জিততে হলে অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। আর সবার প্রথমে অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

হালের একটি সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, শুধু আমেরিকাতেই প্রতি বছর প্রায় ৫ কোটি অনাবশ্যক অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয় ঠান্ডা লাগা, ব্রঙ্কাইটিস বা ভাইরাল জ্বরের জন্যে। যাতে অ্যান্টিবায়োটিক্‌স কোনও কাজই করে না। ইংল্যান্ডেও এই সংখ্যাটা ১ কোটির বেশি। তা হলে বিশ্বে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে, কী যথেচ্ছ পরিমানে অ্যান্টিবায়োটিক্‌সের ব্যবহার হচ্ছে, ভাবুন!

একই ভাবে, গবাদি পশুর দ্রুত বৃদ্ধির জন্যে তাদের খাদ্যেও প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক্‌স ব্যবহার করা হয়। এ সব থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক্‌সকে রোখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে ব্যাকটেরিয়াদের মধ্যে।

কলিস্টিনকেও রোখার ক্ষমতা যে ব্যাকটেরিয়াদের মধ্যে গড়ে উঠতে শুরু করেছে, তার শুরুটা কিন্তু হয়েছিল চিনের একটি শুয়োর প্রতিপালন কেন্দ্রেই!

এই ধুরন্ধর ‘শয়তান’দের কী ভাবে মোকাবিলা করা যাবে, বা এখনই পুরোপুরি মোকাবিলা করা যাবে কি না, সেটাই এখন দেখার।

ছবি ও ভিডিও সৌজন্যে: ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement