বাংলার জিমন্যাস্টিক্সে নতুন ইতিহাস লেখার পর মঙ্গোলিয়ার উলানবাটরে যখন প্রণতি নায়েককে ফোনে ধরা হল, তখনও তিনি ঘোরের মধ্যে। ‘‘আমার স্বপ্ন স্বার্থক। দ্বিতীয় ভল্টটা দেওয়ার পরই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম পদক পাব। কিন্তু তারপরও তাকিয়ে ছিলাম স্কোর বোর্ডের দিকে। ভাবছিলাম স্বপ্ন দেখছি না তো! আসলে বারবার চতুর্থ আর পঞ্চম হতে হতে নিজের উপর বিশ্বাসটাই হারিয়ে যাচ্ছিল,’’ বিজয়মঞ্চে পদক নিতে যাওয়ার আগে বলছিলেন পিংলার মেয়ে। শুক্রবার বিকেলে। 

পদক নেওয়ার পর অবশ্য অন্য ছবি। প্রণতি দৌড়ে এসে তা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন কোচ মিনারা বেগমের গলায়। তারপর কোচ এবং ছাত্রী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেন। ১৬ বছর ধরে এই মুহূর্তটার জন্য যিনি অপেক্ষা করেছিলেন, সেই মিনারা বলছিলেন, ‘‘জানেন বারবার ও আমাকে বলছিল ম্যাডাম স্বপ্ন দেখছি না তো। ভাল করে দেখেছেন। পদকটা পেয়েছি তো। দু’জনেই খুব কাঁদছিলাম।’’

ত্রিপুরার দীপা কর্মকার এবং তেলেঙ্গনার অরুণা রেড্ডির পর প্রণতি-ই দেশের তৃতীয় মেয়ে জিমন্যাস্ট, যিনি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে পদক জিতলেন। তবে এই কৃতিত্ব  ছাপিয়ে অবশ্য বঙ্গলললনার যে রেকর্ডটি নিয়ে জিমন্যাস্টিক্স মহল তোলপাড় তা হল, প্রণতির আগে বাংলার কোনও জিমন্যাস্ট  আন্তর্জাতিক মঞ্চে পদক জিততে পারেননি। শুক্রবার ভারতীয় সময় দুপুর তিনটেয় সেটাই করে ফেললেন মীনারা বেগমের ছাত্রী। মঙ্গোলিয়ায় সিনিয়র এশীয় আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জিতলেন প্রণতি। ১৩. ৩৮৪ পয়েন্ট করে। পেতে পারতেন রুপোও। ভল্টিং ইভেন্টে সোনা জিতলেন চিনের ইউ লিনমিন (১৪. ৩৫০) এবং রুপো পেলেন জাপানের আয়াকা শাকাগুচি (১৩. ৫৮৪)। প্রণতি এ দিন যে দু’টি ভল্ট দেন তা হল, প্রথমে সুকুহারা ৩৬০, পরে হ্যান্ড ফ্রন্ট করে ৩৬০ টার্ন। প্রণতি বলছিলেন, ‘‘হোটেল থেকে স্টেডিয়ামে আশার সময় মনে মনে শপথ নিযেছিলাম এ বার পদক না নিয়ে ফিরব না। গত বার ব্যাঙ্ককে চতুর্থ হয়েছিলাম, প্রচন্ড আক্ষেপ ছিল সেটা নিয়ে।’’ তেইশ বছরের মেয়ের গলায় ঝরে পড়ছিল অদ্ভুত একটা তৃপ্তি। 

পিংলার এক প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাত বছরের প্রণতিকে নিয়ে এসে তুলে দিয়েছিলেন সাই কোচ মিনারার হাতে। রাজ্য স্তরের কোনও পদক না থাকায় নিয়মানুযায়ী সাইতে শুরুতে থাকার অনুমতি পাননি প্রণতি। মিনারা বলছিলেন, ‘‘অনেক কষ্টে ওর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল আমাকে। জোর করে তখন ওকে সাইতে রাখতে না পারলে এই দিনটা আমার জীবনে আসত না।’’

জাকার্তা এশিয়াড ছাড়াও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়ন চ্যাম্পিয়নশিপ—আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রণতি গত  কয়েকবছর ধরেই নামছেন দেশের জার্সিতে। কিন্তু পদক পাননি। তবুও হাল ছাড়েননি প্রণতি। সাইতে এবং জাতীয় শিবিরে পদকের জন্য সকাল-বিকেল অনুশীলন করে গিয়েছেন। চূড়ান্ত ব্যস্ততার মধ্যেও ফোনে বলছিলেন, ‘‘অক্টোবরে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রায়াল আছে। আমার পরের লক্ষ্য ওই টুনার্মেন্টে নামা। এই পদকটা আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।’’ বাংলা থেকে এ বার প্রণতির সঙ্গে দলে ছিলেন আরও দুই মেয়ে-- প্রণতি দাশ এবং পাপিয়া দাশও। তাঁরা অবশ্য কেউই ফাইনালে উঠতে পারেননি। 

দীপা কর্মকার চোটের জন্য এই প্রতিযোগিতায় নামতে পারেননি। তবে অধীর আগ্রহে তিনি অপেক্ষা করেছিলেন প্রণতি কি করেন দেখার জন্য। আগরতলা থেকে ফোনে রিয়ো অলিম্পিক্সে চতুর্থ হওয়া দীপা বলছিলেন, ‘‘আমি ওর ভল্ট গুলো সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে লাইভ দেখেছি। ওর ভল্টিং বরাবরই ভাল। গত বার অল্পের জন্য পদক পায়নি। এ দিন ভল্ট দেওয়ার সময় ওর আত্মবিশ্বাস দেখে মনে হচ্ছিল কিছু একটা করবেই। নিজে যেতে পারিনি বলে আক্ষেপ ছিল। সেটা প্রণতি মিটিয়েছে। ওকে অভিনন্দন। আমার সঙ্গে জাতীয় শিবিরে একসঙ্গে অনুশীলন করে। তাই আনন্দটা বেশি হচ্ছে।’’ দীপা এ দিন রাতে ফোনও করেছিলেন প্রণতিকে। দীপার কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দী বললেন, ‘‘এখানে পদক জেতা খুবই কঠিন ছিল। ও আমাদের গর্বিত করেছে।’’ আর ব্যাঙ্ককে যাঁর কোচিংয়ে প্রণতি চতুর্থ হয়েছিলেন সেই জয়প্রকাশ চক্রবর্তীর মন্তব্য, ‘‘মেয়েটা পেশাদার বলেই এই পদকটা পেল।’’ 

এই ঐতিহাসিক পদক কাকে উৎসর্গ করছেন জানতে চাওয়া হলে দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা প্রণতি কারও নাম আলাদা করে  বলতে চাইলেন না। বলবেনই বা কি করে। তিনি যে নিজেই তখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না, পদক জিতেছেন! 

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।