কত বার ‘জয়ী’ হলে তবে ‘সফল’ বলা যায়?

প্রশ্নটা বিলক্ষণ জানেন রবি শাস্ত্রী। কিন্তু, উত্তরও কি জানা?

তাঁকে সরিয়ে যে ভাবে অনিল কুম্বলেকে নিয়ে আসা হয়েছিল, ঠিক সে রকম ভাবেই তো এ বার কুম্বলেকে সরিয়ে তাঁকে হেড কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এবং সেই নিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় ছিল অজস্র নাটকীয় মোড় ও মোচড়। কাজেই, প্রশ্নটা যে হামাগুড়ি দিয়ে বারে বারেই মাঠের মধ্যে ঢুকে পড়বে, সেটা নিশ্চিত ভাবেই জানেন ‘ক্রাইসিস কোচ’ শাস্ত্রী।

তাঁর সামনের চাঁদমারিতে আপাতত সাজানো রয়েছে একাধিক নিশানা। একের পর এক লক্ষ্যভেদ করে আগামী দু’বছরে ওই চাঁদমারির বেশির ভাগ নিশানাই জয় করতে হবে শাস্ত্রীকে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বকাপের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টও। আপাতত এই ‘হার্ডল’গুলি পেরিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। তবে জয় শব্দটির ভিতরেই যে সাফল্য নামক মহার্ঘ বস্তুটি লুকিয়ে রয়েছে, সেটা জানেন পোড় খাওয়া এই ক্রিকেটার।

আরও খবর: ‘কোচ’ নাটকে যবনিকা, রবির উদয় যে পথে

আসলে এত কাণ্ডের পর যখন শাস্ত্রী এলেন, তখন তাঁর ঘাড়ে চাহিদার বন্দুকটা তো রাখা হবেই। সেই বন্দুকের তাকে শাস্ত্রী কতগুলি জয় ছিনিয়ে আনতে পারেন, ক্রিকেটপ্রেমী-সহ উপদেষ্টা কমিটি ও বোর্ডের সকলেই তা এরিনার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখবেন। তাঁর উপরে তো বটেই, কড়া নজরের বাইরে থাকবেন না বিরাট কোহালিও। প্রাক্তনদের সঙ্গে তুলনাও করা হবে শাস্ত্রীর। ঘাড়ের কাছে সবচেয়ে জোরে শ্বাস ফেলবেন যিনি, তাঁর নাম অনিল কুম্বলে। কারণ, গত এক বছরে হেড কোচ হিসাবে দারুণ সফল প্রাক্তন ওই ভারতীয় বোলার। শাস্ত্রী-পরবর্তী সময়ে অনিল কুম্বলেকে নিয়ে এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, সৌভাগ্যবশত ভারতীয় দল টানা সাফল্য পাওয়ায় তেমনটা হয়নি। সে ভাবে কি শাস্ত্রীও সব আলোচনার ঊর্ধে নিজেকে নিয়ে যেতে পারবেন? জবাব দেবে এই চাঁদমারি!

শুরুর মতো কুন্বলের শেষটা ভাল হয়নি মোটেই। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে হেরে কোচহীন ভারতীয় দল গিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। তখন সদ্য কুম্বলের স্পেল শেষ হয়েছে। সেখানে দুর্বল ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধেও হারতে হয় একটি ওয়ান ডে ও একমাত্র টি-২০ ম্যাচটি। এর পরেই স্ক্রিনে চলে এলেন রবি শাস্ত্রী। তিনি সফর শুরু করবেন শ্রীলঙ্কা সফর দিয়ে। এই শ্রীলঙ্কার কাছেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির লিগ পর্বে হারতে হয়েছিল ভারতকে। আগামী জুলাই-সেপ্টেম্বরে শ্রীলঙ্কা সফরে তিনটি টেস্ট, পাঁচটি ওয়ান ডে এবং একটি টি২০ ম্যাচ খেলবে শাস্ত্রীর ভারত। এখানেই তাঁর প্রথম পরীক্ষা। তুলনামূলক ভাবে কিছুটা সহজ প্রতিপক্ষ হলেও প্রথম সিরিজ সব সময়েই গুরুত্বপূর্ণ।

এর পর অস্ট্রেলিয়ার ভারত সফরের আগে বেশ কিছুটা সময় পাবেন শাস্ত্রী। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সাতটি ওডিআই এবং দুটো টি২০ ম্যাচ খেলার কথা ভারতের।

তার পরেই নভেম্বর থেকে আগামী বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে থাকবে ভারতীয় দল। সেখানে তিনটি টেস্ট, সাতটি ওডিআই এবং দুটো টি২০ ম্যাচ রয়েছে।

২০১৮-র জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের আসার কথা ভারত সফরে। কিন্তু, সেই সফর নিয়ে এখনও সংশয় রয়েছে।

যে শ্রীলঙ্কা সফর দিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হওয়ার কথা শাস্ত্রীর, তারাই আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলে আসবে ভারত সফরে। সেখানে তিনটি টেস্ট, পাঁচটি ওডিআই ও দু’টি টি২০ ম্যাচ খেলবে দু’দল। এর পরেই আইপিএল-এর বিরতি।

এই ছবি আবার দেখা যাবে ভারতীয় ক্রিকেটে।

আগামী বছরের জুন থেকে অগস্ট ইংল্যান্ড সফরে যাবে ভারতীয় ক্রিকেট দল। এই ইংল্যান্ডই কিছু দিন আগে ভারতীয় কোচ বিতর্কের চূড়ান্ত পর্যায় দেখেছিল। এখান থেকেই কোচ পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন কুম্বলে। সেই ইংল্যান্ডেই আবার ফিরবে ভারতীয় দল। এ বার যদিও রবি শাস্ত্রীর কোচিং-এ। সেখানে পাঁচটি টেস্ট, পাঁচটি ওডিআই ও একটি টি২০ খেলবে ভারত।

এর ঠিক এক বছর পরেই আসল চ্যালেঞ্জ আসবে রবি শাস্ত্রীর সামনে। ২০১৯ বিশ্বকাপ। সেটাও সেই ইংল্যান্ডের মাটিতে। তার আগে যদিও রয়েছে একগুচ্ছ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভারত সফর, ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফর, ভারতের ফের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর।

এ তো গেল রবি শাস্ত্রীর আগামী দু’বছরের টার্গেট। খেলায় হার-জিৎ থাকবেই। বিশ্বকাপ-সহ ১১টি সিরিজই ভারতীয় দল জিতবে, এমনটা কেউই ভাবছেন না। যেমন, টানা সাফল্যের পর ইংল্যান্ডের মাটিতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে রানার্স হয়েই থামতে হয়েছে কুম্বলের দলকে। কাজেই হারের মুখ শাস্ত্রীকেও দেখতে হতে পারে। আর, তখনই তুলনার মুখে পড়তে হবে তাঁকে। সেই তালিকায় অবশ্যই উঠে আসবে ভারতের সফল কোচদের নাম। বিশেষ করে কুম্বলে। হয়তো শাস্ত্রীকে তাঁর পুরনো ইনিংসের সঙ্গেই তুলনা করা হবে! তাঁর ১৯ মাসের জমানায় তো সাফল্যই পেয়েছিল দল। ২০১৪ থেকে ২০১৬— ওয়ান ডে-তে শাস্ত্রীর সাফল্যের মাত্রা কুম্বলে, কার্স্টেনদের থেকে খুব একটা কম নয়। টেস্ট ক্রিকেটে অবশ্যে সকলের থেকে এগিয়ে অনিল কুম্বলে। ঘরের মাটিতে টেস্ট সিরিজে বাজিমাত করেছিল কুম্বলের দল। সেখানে কুম্বলের সাফল্যের হার ৭০.৬ শতাংশ। এর পরেই যিনি থাকবেন তিনি জন রাইট, ৫১.৮ শতাংশ। আর রবি শাস্ত্রী ৪১.৭-এ দাঁড়িয়ে। তাঁর ঠিক আগেই ৪৪.৭ শতাংশ নিয়ে রয়েছেন গ্যারি কার্স্টেন। সব থেকে বিতর্কিত কোচ গ্রেগ চ্যাপেল কিন্তু থেমেছিলেন ৩৮.৯ শতাংশে। আরও পিছিয়ে ডানকান ফ্লেচার।

প্রস্তাবিত সিরিজগুলির মধ্যে পাকিস্তানের ভারতে আসার কোনও সম্ভাবনাই প্রায় নেই। যদি না ততদিনে সমস্যা মিটে যায়।

এত ‘হার্ডল’ টপকে ভারতীয় ক্রিকেটে নিজের ঝান্ডা আবার ওড়াতে হবে রবি শাস্ত্রীকে। বিরাট কোহালি তো বটেই, গোটা টিমই রয়েছে তাঁর সঙ্গে।

তবে সাফল্য যে অঙ্কের নিয়ম মেনে আসে না, সেটা শাস্ত্রী ভাল ভাবেই জানেন। তাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য এখন সাফল্যকে ধরে রাখা। পূর্বসূরিদের পাশাপাশি নিজের পুরনো রেকর্ডও হয় ধরে রাখতে হবে, নয় তো ভাঙতে হবে। না হলে যে ‘শাস্ত্র’ মেনে শাস্ত্রীকে আনা হয়েছে, সেই পথ ধরেই হয়তো বিদায় নিতে হবে তাঁকে।