বেলজিয়াম টাইব্রেকারে হারিয়েছে ব্রাজিলকে!

শুক্রবার রাতে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পরে ব্রাজিল সমর্থকেরা মজা করে সোশ্যাল মিডিয়া ভর্তি করে দিয়েছেন এই লাইনটায়। বেলজিয়ামের এক নামী সাংবাদিক এসেছেন কাজ়ানে। তাঁর কাগজেও ‘ব্যানার হেডিং’ এটাই! সঙ্গে এডেন অ্যাজার এবং কেভিন দে
ব্রুইনের জয়গাথা।

কিন্তু যে ম্যাচটা দুর্দান্ত খেলে ২-১ গোলে জিতেছে সোনালি প্রজন্মের বেলজিয়াম, সেটাতে কোথা থেকে এল টাইব্রেকার?

ব্রাজিল কোচ তিতের মতো সাম্বা সমর্থকেরাও মনে করছেন, থিবো কুর্তোয়া-র অবিশ্বাস্য সব গোল-রক্ষার জন্যই জিতেছে বেলজিয়াম। টাইব্রেকারে যেমন দু’দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কিক বাঁচান কুর্তোয়া, রাশিয়া বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেমার, কুটিনহোদের শট  নব্বই মিনিট সে ভাবেই বাঁচিয়েছেন বেলজিয়াম গোলকিপার। সে জন্যই মজা করে এই লাইনটা ছড়িয়েছেন ব্রাজিলের সমর্থকেরা।

একের পর এক গোল বাঁচানো নিয়ে অবশ্য মিক্সড জোনে এসে কিছু বলেননি কুর্তোয়া। বরং তাঁর সমালোচকদের এক হাত নিয়েছেন। ‘‘যাঁরা আমার সমালোচনা করছিলেন, তাদের দেখিয়ে দিয়েছি আমি কে!’’ চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বার্সেলোনার বিরুদ্ধে খেলতে নেমে তিন গোল খেয়েছিলেন কুর্তোয়া। চেলসির গোলে দাঁড়িয়ে। তার মধ্যে দুটো ছিল লিয়োনেল মেসির। ওই দুটো গোল হয়েছিল কুর্তোয়ার পায়ের ফাঁক দিয়ে। এ দিন সেই প্রসঙ্গ টেনে দীর্ঘদিন চেলসিতে খেলা বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলকিপার বলে দিলেন ‘‘আমি জানতাম যে নেমার কী ভাবে বল সোয়ার্ভ করাবে। তাই আমার ওর শট বাঁচাতে কোনও অসুবিধা হয়নি।’’

ব্রাজিল কোচ তিতে প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন যে, কুর্তোয়ার জন্যই ব্রাজিল হেরেছে। এবং এই গোলরক্ষক বলে দিয়েছেন, ‘‘আমাকে এ বছর বার বার অযথা সমালোচনার সামনে পড়তে হয়েছে। সে জন্য  নিজেকে দেখানোর দরকার ছিল। আমাদের স্বপ্ন ছিল ব্রাজিলকে হারানো। প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হয়েছে। এ বার আরও এগোতে হবে।’’ ১৯৮৬-র পরে টিনটিনের দেশ আবার বিশ্বকাপের শেষ  চারে। দলকে ফাইনালে তুলে বেলজিয়ামে এখন জাতীয় নায়কের মর্যাদা পাচ্ছেন কুর্তোয়া। 

সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের সামনে এ বার ফ্রান্স। রোমেল লুকাকু, এডেন অ্যাজারদের সঙ্গে লড়াই কিলিয়ান এমবাপেদের। সেই ম্যাচের আগে অবশ্য দারুণ তেতে রয়েছেন কুর্তোয়া। বলে দিলেন, ‘‘আমরা পরের ম্যাচটা জেতার জন্য মানসিক ভাবে তৈরি। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে জেতার পর দলের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। সেটা কাজে লাগাতে হবে।’’

কুর্তোয়ার মতো মানসিকভাবে তৈরি বেলজিয়ামের সব ফুটবলারই। ম্যাচের পর মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে কেভিন দে ব্রুইন বলছিলেন, ‘‘ব্রাজিল আমাদের শুরুতে বুঝতেই পারেনি। তার আগেই দু’গোলে এগিয়ে গিয়েছিলাম। শেষ পনেরো মিনিট আমাদের উপর চাপ বাড়িয়েছিল ব্রাজিল। মাঝমাঠে লোক বাড়িয়ে ওরা আমাদের সমস্যায় ফেলেছিল। আমরা সেটা দারুণ ভাবে সামলেছি।’’ সামনে লুকাকু, অ্যাজারদের রেখে পিছন দিক থেকে সাপ্লাই লাইন সচল রেখেছিলেন কেভিন দে ব্রুইনই। তাঁর গোলটাও ছিল অসাধারণ। প্রায় ব্রাজিলের গোল বক্সের মাথার উপর থেকে দুর্দান্ত প্লেসিং শটে।

বেলজিয়াম এখন ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের তিন নম্বর দল। যিনি এই জায়গায় তুলে এনে প্রকৃতই লাল দৈত্য করে তুলেছেন কুর্তোয়াদের, সেই  রবের্তো মার্তিনেস স্পেনের লোক। ব্রাজিলের মতো দলের বিরুদ্ধে কোন টোটকায় তিনি তাতিয়েছেলিন ছেলেদের? প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের সামনেই তা বলে দিলেন হাসতে হাসতে, ‘‘বলেছিলাম, যদি তোমরা মানসিক ভাবে তৈরি হয়ে থাকো তা হলে পাঁচ বারের চ্যাম্পিয়নদের মাঠে হারিয়ে এসো।’’ মঙ্গলবার রাতটা তাঁর কোচিং জীবনের সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে স্বীকার করে নিলেন। ব্রাজিলের সংবাদপত্রগুলো এ দিন লিখেছে, ‘‘তিতের মনে রাখা উচিত ছিল কোনও দলই অপরাজেয় নয়।’’ মনে হল, সেটাই ঘুরিয়ে কুর্তোয়াদের কোচও মজ্জায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর ছাত্রদের। হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘‘ব্রাজিল তো ফুটবলের সেরা দেশ। পাঁচ বারের চ্যাম্পিয়ন। শেষ মিনিট পর্যন্ত আমার বুক ধুকপুক করছিল। গোল না হয়ে যায় ভেবে।’’ পাশাপাশি অবশ্য তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ‘‘ম্যাচ অবশ্য কখনও আমার অঙ্কের বাইরে যায়নি। ব্রাজিল কোথায় আমাদের ধাক্কা দিতে পারে জানতাম। ছেলেদের জন্য আমি গর্বিত। ওরা দেশে ফিরে এই ম্যাচ নিয়ে গর্ব অনুভব করতে পারে।’’

বেলজিয়াম থেকে হাজার দুয়েক দর্শক এসেছেন এখানে। মঙ্গলবার ম্যাচের পরে তাঁদের উৎসবে মাতা ছিল দেখার মতো। ম্যাচের পরে কুর্তোয়া, অ্যাজার, দে ব্রুইনরা গিয়ে তাঁদের শুভেচ্ছা জানিয়ে আসেন। ৩৪ বছর আগের রেকর্ড ছোঁয়ার পরে এ বার মার্তিনেস তাঁর দলকে কতদূর নিয়ে যেতে পারেন সেটাই দেখার।