Advertisement
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বর্ণময় টেনিস উত্‌সব

তারাদের ঔজ্জ্বলে আইপিটিএলে গ্র্যান্ড স্ল্যামের আঁচ

স্ট্রবেরি আর ক্রিমেরই যেন শুধু অভাব! কিংবা স্টেডিয়ামের মাথার উপর দিয়ে এরোপ্লেন উড়ে যাওয়ার সোঁ সোঁ আওয়াজ! নইলে একটা উইম্বলডন অথবা একটা ইউএস ওপেনের সঙ্গে যেন বিশেষ তফাত নেই দিল্লির আইপিটিএল টেনিস টুর্নামেন্টের! ইন্দিরা গাঁধী ইন্ডোরের কোর্টে আপনার চোখের সামনে মারিন চিলিচবর্তমান যুক্তরাষ্ট্র ওপেন চ্যাম্পিয়ন। কয়েক ফুট দূরে ঘোরাঘুরি করছেন জো উইলফ্রেড সঙ্গা। আশপাশেই এ বছর উইম্বলডনে রাফা নাদালকে ছিটকে দেওয়া প্রতিভাবান অস্ট্রেলীয় নিক কিরগিয়স।

কোর্টে সানিয়া-বোপান্না।

কোর্টে সানিয়া-বোপান্না।

সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়
নয়াদিল্লি শেষ আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৪ ০১:৪৪
Share: Save:

স্ট্রবেরি আর ক্রিমেরই যেন শুধু অভাব! কিংবা স্টেডিয়ামের মাথার উপর দিয়ে এরোপ্লেন উড়ে যাওয়ার সোঁ সোঁ আওয়াজ!

নইলে একটা উইম্বলডন অথবা একটা ইউএস ওপেনের সঙ্গে যেন বিশেষ তফাত নেই দিল্লির আইপিটিএল টেনিস টুর্নামেন্টের!

ইন্দিরা গাঁধী ইন্ডোরের কোর্টে আপনার চোখের সামনে মারিন চিলিচবর্তমান যুক্তরাষ্ট্র ওপেন চ্যাম্পিয়ন। কয়েক ফুট দূরে ঘোরাঘুরি করছেন জো উইলফ্রেড সঙ্গা। আশপাশেই এ বছর উইম্বলডনে রাফা নাদালকে ছিটকে দেওয়া প্রতিভাবান অস্ট্রেলীয় নিক কিরগিয়স। ও দিকে লকাররুমের সামনেটায় ছোট জটলা করে আড্ডা মারছেন লেটন হিউইট, গোরান ইভানিসেভিচ, প্যাট র্যাফটারের মতো প্রাক্তন বিশ্বসেরারা।

মেয়েরা আবার নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় ব্যস্ত কোর্টের অন্য দিকে। কে নেই সেখানে? আনা ইভানোভিচ, ক্যারোলিন ওজনিয়াকি, হান্টুকোভা, ফ্লিপকিন্স, সানিয়া মির্জা...!

যে কোনও গ্র্যান্ড স্ল্যামের কোর্ট চত্বরের আবহ যেন! যে দিকে তাকাবেন, টেনিসবিশ্বের তারকা ছেলেমেয়ের ছড়াছড়ি।

যতটুকু গ্ল্যামার আর হাইভোল্টেজ লেভেলের খামতি আছে বলে কোনও খুঁতখুঁতে টেনিসপ্রেমীর হয়তো মনে হচ্ছে, সেটুকুও আর কয়েক ঘণ্টার ভেতর থাকবে না।

কারণ? আজ গভীর রাতেই যে নয়াদিল্লি পৌঁছে যাচ্ছেন রজার ফেডেরার, নোভাক জকোভিচ, পিট সাম্প্রাস। কালই র্যাকেট হাতে নেমে পড়বেন এখানকার কোর্টে।

এর পরে আইপিটিএলের ড্রাফ্‌টে থাকা সত্ত্বেও নানা কারণে দিল্লিতে সেরেনা উইলিয়ামস, মারিয়া শারাপোভা, অ্যান্ডি মারে, কিংবা আন্দ্রে আগাসিকে দেখতে না পাওয়ার দুঃখও হয়তো রাজধানীর টেনিসজনতার থাকার কথা নয়!

মহেশ ভূপতিকে টেনিসের এই মহাযজ্ঞে ঠিক যেন বরকর্তা দেখাচ্ছিল আজ! বছরখানেকের বাচ্চা মেয়েকে কোলে নিয়েই স্টেডিয়ামের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নেড়ে নানা নির্দেশ দিয়ে চলেছেন তাঁর অসাধারণ টিম ম্যানেজমেন্টকে। এআইটিএ প্রধান অনিল খন্না-সহ দেশের টেনিস ফেডারেশন প্রায় পুুরো ঝেঁটিয়ে হাজির আইপিটিএল দেখতে। তাঁদের মধ্যে এক প্রভাবশালী কর্তা পরিষ্কার স্বীকার করলেন, “অন্তত পাঁচশো সত্যিকারের কাজের লোক রয়েছে মহেশের পিছনে। বেশির ভাগই বিদেশের সেরা সব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের লোকজন। নইলে এই লেভেলে টেনিস টুর্নামেন্ট করা এটিপি, ডব্লিউটিএ ছাড়া কারও কম্মো নয়! ছেলেটা সত্যিই যেমন ব্যবসাটা বোঝে, তেমনই দুর্দান্ত অর্গানাইজার!”

কোর্টের লাগোয়া ভিভিআইপি স্ট্যান্ডে বসে সুনীল গাওস্কর যতক্ষণ তাঁর সিঙ্গাপুর স্ল্যামার্সের ম্যাচ চলল, দেখলেন। হিউইট-হান্টুকোভাদের দলের অন্যতম মালিক গাওস্করের ক্রিকেটের বাইরে বরাবরের প্রিয় খেলা ব্যাডমিন্টন হলেও আইপিটিএল টেনিসের টানকে অগ্রাহ্য করতে পারেননি তিনিও। ধোনির ভারতের অ্যাডিলেড টেস্ট আরম্ভের তিন দিন মাত্র আগেও তাই সিরিজের ধারাভাষ্যকার অস্ট্রেলিয়ায় না থেকে নয়াদিল্লিতে বসে!

সেই গাওস্করের সিঙ্গাপুরকে ২৯-১৬ পয়েন্টে হারিয়ে দিল্লি লেগের উদ্বোধনী ম্যাচ চিলিচ-ওজনিয়াকিদের দুবাই রয়্যালস পকেটে পুরে লিগ টেবিলে এক নম্বরে থাকা ইন্ডিয়ান এসেসকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল। কিন্তু অত সব হিসেব কে আর মনে রাখছে এই টেনিস উত্‌সবে?

সন্ধে সাড়ে সাতটায় হোম টিমের ম্যাচ শুরুর সময় আঠারো হাজারের গ্যালারি প্রায় ভর্তি। কাল-পরশু রজার-জোকার কোর্টে নামলে গ্যালারির চেহারা কী দাঁড়াবে ভাবলেই যেন গায়ের রোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে!

আজই তো কোর্টের ভেতর গেম-সেট-ম্যাচের সঙ্গেই গ্যালারির চারদিক থেকে রংবেরঙের সাইকোডেলিক আলোর বিচ্ছুরণে স্টেডিয়ামের মায়াবী পরিবেশ, স্বল্পবাস চিয়ারলিডারদের উদ্দাম নাচ, অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেমে ডিজে-র ঝিনচ্যাক গানবাজনার তালে দর্শকরা উদ্বেল!

তার মধ্যেই প্রথম ম্যাচের লেজেন্ড্‌স সেটে ইভানিসেভিচকে উদ্দেশ্য করে গ্যালারির এক কোণ থেকে তীব্র চিত্‌কার“গোরান, দু’হাজার এক আর এক বার হয়ে যাক!” অর্থাত্‌ ২০০১ উইম্বলডন ফাইনালের রিপ্লে। যে ম্যাচে র্যাফটারকে হারিয়ে ইভানিসেভিচ উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। আর শনি-বিকেলে নয়াদিল্লিতেও নেটের উল্টো দিকে সেই র্যাফটারই। এবং আজও ম্যাচের রেজাল্টের কোনও হেরফের ঘটতে দেননি ইভানিসেভিচ।


প্লেয়ার্স লাউঞ্জে ওজনিয়াকি। শনিবার।

আসলে গোটা ব্যাপারটা টেনিস-উত্‌সবের মোড়কে মোড়া হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খামতি নেই। খেলতে নেমে কোন তারকা প্লেয়ার আর নিজের ইগোকে বিসর্জন দিতে চান অন্য তারকার সামনে? তাই টপ ক্লাস কিছু র্যালির পাশপাশি অনেক বার লাইনকল চ্যালেঞ্জ হল! চাপের মুখে চমত্‌কার জেতার পর বিজয়ী ডাবলস জুটির চেস্টবাম্প পর্যন্ত দেখা গেল! বিশেষ করে ম্যানিলা মাভেরিক্সের বিরুদ্ধে (২৫-২৫ পয়েন্ট টাই থাকায়) সাত মিনিটের সুপার শু্যট আউটে ইন্ডিয়ান এসেসের জেতা ম্যাচে।

সুপার শু্যট আউটে আবার কেবল পুরুষ সিঙ্গলসই হয়। যেখানে সঙ্গাকে ১০-৭ পয়েন্টে আজ হারালেন সপ্তাহ কয়েক আগেই ডেভিস কাপ ফাইনালে ফ্রান্স দলে তাঁরই সতীর্থ মঁফিস!

অভিনবত্বের সত্যিই অভাব নেই! ইভানিসেভিচ আর চিলিচ গুরু-শিষ্য একই টিমের জার্সিতে লড়ছেন! ফেডেরার-স্টাইলে কিরগিওস নেটের দিকে পিছন ফিরে দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে সঠিক রিটার্ন মারছেন! তা-ও এক বার নয়, তিন-চার বার। প্রথম ম্যাচে শেষ সেট হান্টুকোভা ৬-৪-এ জিতে নিলেও টুর্নামেন্টের অভিনব নিয়মে ওই সেটে পরাজিত ওজনিয়াকি যতক্ষণ না পরের পয়েন্টটা জিতছেন, ‘সুপার টাইব্রেক’ চলল!

নতুন ফর্ম্যাট, নতুন সার্ভিস রুল, নতুন পয়েন্ট সিস্টেম, কুড়ি সেকেন্ডের সার্ভিস ক্লক। তার ভেতর সার্ভ করতে না পারলে প্রতিপক্ষ শুধু সেই পয়েন্টটাই পাবে না, স্কুলে ডাবল প্রমোশনের মতো পরের সার্ভ রিসিভে জিতলে ডাবল পয়েন্ট পাবে। যার নাম ‘হ্যাপিনেস পাওয়ার পয়েন্ট।’ আইপিটিএলের অভিনব নিয়মকানুন গোড়ায় বুঝতে একটু অসুবিধে হয়তো হতে পারে। কিন্তু এক বার ধরে ফেললে দর্শকদের জন্য অপেক্ষা করছে দেদার উত্তেজনা, অফুরন্ত মজা!

প্লেয়াররাও বোধহয় সেই উত্তেজনা-আনন্দের বাইরে নন। চিলিচ থেকে হান্টুকোভা, ইভানিসেভিচ থেকে কিরগিওস, সঙ্গা থেকে ময়া, আনা থেকে সানিয়া ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে তারকারা প্রায় জনে জনে বলে গেলেন, “সারা বছর পেশাদার ট্যুরে একা একা কাটানোর পর এই টিম টেনিস আর তার অভিনব নিয়মে খেলতে দারুণ লাগছে। কয়েক দিনের মধ্যেই একটা শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে ঘুরে আইপিটিএল খেলতে হচ্ছে বটে, কিন্তু এর উত্তেজনা, মজার ব্যাপারটা ভাবলেই সব ক্লান্তি উধাও!”

ছবি: গেটি ইমেজেস

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE