গত কয়েক বছর যাবৎ দানের মাধ্যমে যে সব চোখ কলকাতার ‘রিজিয়োন্যাল ইনস্টিটিউট অব অপথ্যালমোলজি’-তে (আরআইও) সংগৃহীত হচ্ছে, তার ৯০ শতাংশ দৃষ্টিহীনকে চক্ষুষ্মান করতে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এমনটা জানার পরেই তদন্ত শুরু করতে চলেছে স্বাস্থ্য দফতর।

খোদ আরআইও কর্তৃপক্ষই স্বীকার করছেন, চোখের চিকিৎসার উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে শিরোপা প্রাপ্ত রাজ্যের এই প্রধান হাসপাতালের চক্ষু ব্যাঙ্কে সংগৃহীত চোখের মাত্র ৮-১১ শতাংশ দৃষ্টিহীনকে দৃষ্টিমান করতে ব্যবহার করা গিয়েছে। বাকি চোখের গুণমান ‘ভাল নয়’ বলে সে সব চোখের ক্ষত মেরামতির কাজে এবং গবেষণায় বা মেডিক্যালের ছাত্রছাত্রীদের পঠনপাঠনে ব্যবহার হয়েছে। আরআইও-তে সব সময়ে চোখের প্রতীক্ষায় থাকেন ২০০-২৫০ দৃষ্টিহীন। তাঁদের এক এক জনকে একটি চোখের জন্য সাড়ে তিন থেকে চার বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

তবে চোখের গুণমান ‘খারাপ’-এর যুক্তি নিয়ে উঠছে অনেক প্রশ্ন। অন্য রহস্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে চোখ সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা একাধিক বেসরকারি সংস্থা। স্বাস্থ্য ভবনও বিষয়টি নিয়ে নড়ে বসেছে। কারণ, তাদের কাছে আসা নথি দেখাচ্ছে, নীলরতন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অতুলবল্লভ চক্ষু ব্যাঙ্কে সংগৃহীত চোখের ৪৭-৪৯ শতাংশ দৃষ্টিহীনকে আলো দিচ্ছে।

চোখ-বৃত্তান্ত

    হাসপাতাল             সময়           সংগৃহীত  প্রতিস্থাপিত
• আরআইও        ২০১৯ (জুন পর্যন্ত)    ৩৯৩    ৩৯
• এসএসকেএম    ২০১৯ (জুলাই পর্যন্ত)    ১১০    ৯৪
• এন আর এস    ২০১৯ (জুলাই পর্যন্ত)    ১৮০    ৭০
আর জি কর: বছরে গড়ে সংগৃহীত হয় ১১৫০-১১৬০টি চোখ। প্রতিস্থাপিত হয় ৭৫ শতাংশ।                 
                                                           তথ্য: রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর

এসএসকেএম ও আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কোনও চক্ষু ব্যাঙ্ক নেই। তবে দু’টি বেসরকারি সংস্থা সেখান থেকে মৃত রোগীদের চোখ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। সেখানেও দেখা যাচ্ছে, সংগৃহীত চোখের ৮০-১০০ শতাংশ দৃষ্টিহীনের চোখে বসিয়ে তাঁকে দৃষ্টিমান করা যাচ্ছে। তা হলে শুধু আরআইও-তে সমস্যা কোথায় হচ্ছে, উঠছে সেই প্রশ্ন। বিষয়টির মধ্যে গোলমাল আঁচ করা হচ্ছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তী বলেন, ‘‘এ নিয়ে স্বাস্থ্য দফতর তদন্তের কথা ভাবছে। কারণ, অন্যত্র প্রকল্প এত ভাল চলছে। অথচ রাজ্যে চোখের একমাত্র রেফারাল হাসপাতাল আরআইও-তে এমন করুণ অবস্থা হওয়ার কারণ নেই।’’

বর্তমান অধিকর্তা অসীমকুমার ঘোষের ব্যাখ্যায়, ‘‘সব মৃত রোগীর চোখ নেওয়া যায় না। কাদের নেওয়া যাবে তা চিহ্নিত করা এবং তাঁদের বাড়ির লোককে কাউন্সেলিং করে মৃতের চোখ দিতে রাজি করানোর জন্য ‘গ্রিফ কাউন্সেলর’ নিয়োগ করতে হয়। আরআইওতে এমন ২ জনকে ১৫ হাজার বেতনে নিয়োগ করার অনুমতি ও টাকা দুই-ই রয়েছে। কিন্তু বার বার বলা সত্ত্বেও নিয়োগ হচ্ছে না।’’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘‘যে সব স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা চোখ সংগ্রহ করে আনেন তাঁরা অনেক সময় সময়ের মধ্যে, পদ্ধতি মেনে চোখ আনছেন না। আবার অনেক সময় সেপসিস, যক্ষ্মা, এডস, হেপাটাইটাসের মতো রোগে মৃতদের চোখও তুলে আনছেন। সেই চোখ আমরা ব্যবহার করতে পারছি না কিন্তু সরকারি নিয়মে তার জন্য সংস্থাগুলি টাকা পেয়ে যাচ্ছে।’’

এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে শ্রীরামপুরের একটি চক্ষু সংগ্রহকারী সংস্থার প্রধান দিলীপ চট্টোপাধ্যায়ের পাল্টা অভিযোগ, ‘‘সমস্যা আসলে আরআইও-র অন্দরে। আমরা ভাল চোখই আনি, সময়ের মধ্যেই আনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, সেগুলি ব্যবহারের কোনও ইচ্ছা আরআইও-র অধিকাংশ চিকিৎসকের নেই। বরং চোখ আনলে তাঁরা বিরক্ত হন। সরকারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।’’

কেন এখনও পর্যন্ত এসএসকেএম ও আরজিকরের চক্ষু ব্যাঙ্ক তৈরি করা গেল না এবং কেন এখান থেকে বেসরকারি সংস্থা চোখ সংগ্রহ করে নিয়ে যাবে তা নিয়েও এখন স্বাস্থ্য দফতরের অন্দরে শোরগোল শুরু হয়েছে।