• বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

কৃষ্ণচন্দ্রের স্বপ্নে দেখা দেবীই পূজিত হন জগদ্ধাত্রী রূপে

Jagaddhatri Puja at Krishnanagar Rajbari
কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজো। ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য।

জগদ্ধাত্রী দুর্গারই রূপভেদ। কৃষ্ণনগর, চন্দননগরের গণ্ডি অতিক্রম করে এই পুজো ছড়িয়ে পড়েছে দেশের নানা প্রান্তে। শাস্ত্র অনুসারে কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে পূর্বাহ্ণে সাত্ত্বিক, মধ্যাহ্নে রাজসিক এবং সায়াহ্নে তামসিক রূপে জগদ্ধাত্রী পুজো করা যায়। বিভিন্ন প্রাচীন তন্ত্রেও উল্লেখ মেলে এই দেবীর। যেমন ‘মায়াতন্ত্র’-এ উল্লেখ রয়েছে ‘প্রপূজয়েজগদ্ধাত্রীং কার্তিকে শুক্লপক্ষকে দিনোদয়ে চ মধ্যাহ্নে সায়াহ্নে নবমেহহন।’ দেশের বিভিন্ন সংগ্রহালয়ে সিংহবাহিনী দেবীর মূর্তিগুলি থেকে গবেষকরা মনে করেন পাল-সেন যুগেও এই দেবীর পুজোর প্রচলন ছিল। পরবর্তী কালে নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় সাড়ম্বরে এ পুজোর প্রচলন করেন। সেই নিয়েও শোনা যায় কয়েকটি কাহিনি।

প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, রাজকর দিতে না পারায় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে কারাগারে বন্দি করেছিলেন নবাব আলিবর্দি খান। সালটা ১৭৫৪। পরে নবাবের কারাগার থেকে যখন তিনি মুক্ত হয়েছিলেন তখন দুর্গোৎসব প্রায় শেষ। নৌকায় কৃষ্ণনগর ফেরার পথে রাজা বুঝলেন সে দিন বিজয়া দশমী। সে বার পুজোয় উপস্থিত থাকতে না পারায় ক্লান্ত বিষণ্ণ রাজা নৌকার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। জনশ্রুতি, সেখানেই রাজা দেখেছিলেন যে এক রক্তবর্ণা চতুর্ভুজা কুমারী দেবী তাঁকে বলছেন, আগামী কার্তিক মাসের শুক্লানবমী তিথিতে তাঁর পুজো করতে। অন্য একটি কাহিনি অনুসারে ইংরেজদের বন্ধু এই সন্দেহে ১৭৬৪ সালে মীরকাশিম মুঙ্গেরের কারাগারে বন্দি করেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর পুত্র শিবচন্দ্রকে। শোনা যায়, মীরকাশিম নাকি কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাণদণ্ডেরও আদেশ দিয়েছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর দূত মারফত এই সংবাদ মেরতলার প্রসিদ্ধ তান্ত্রিক কালীশঙ্কর মৈত্রের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এবং তাঁর প্রাণ রক্ষার প্রার্থনা জানিয়েছিলেন।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের উত্তরপুরুষ সৌমীশচন্দ্র রায় বলছিলেন, শোনা যায়, কারাগারেই কৃষ্ণচন্দ্র এক কুমারী দেবীর স্বপ্নাদেশ লাভ করেছিলেন এবং কারাগার থেকে মুক্তিলাভের প্রতিশ্রুতি লাভ করেছিলেন। কিছু দিনের মধ্যেই তিনি সত্যি কারামুক্ত হয়েছিলেন। এর পরেই তিনি কালীশঙ্কর মৈত্রকে এই স্বপ্নের কথা জানান, এবং জানতে চান কে এই দেবী? কালীশঙ্কর তাঁকে জানান এই দেবী হলেন স্বয়ং চণ্ডী। প্রাচীন কালে এই দেবীর পুজোর প্রচলন ছিল। রাজা তখন জানালেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি এই দেবীর পুজোর আয়োজন করতে চান। এর উত্তরে কালীশঙ্কর বলেছিলেন কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দেবীর পুজোর বিধান আছে। হাতে সময় কম থাকলেও কৃষ্ণচন্দ্র পুজোর সমস্ত আয়োজন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র কালীশঙ্করকে পৌরোহিত্যের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অনুরোধ করায় তিনি রাজাকে যথাযথ সাহায্য করার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

সৌমীশবাবু আরও জানালেন, একটা সমস্যার কথা কৃষ্ণচন্দ্র অনুমান করে, কৃষ্ণনগরে না ফিরে সেখান থেকেই সরাসরি গিয়েছিলেন চন্দননগরে তাঁর বন্ধু ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর কাছে। যাওয়ার আগে পুজোর সব দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন পুত্র শিবচন্দ্র ও গোপালভাঁড়ের কাছে। তাঁরাই পুজোর সব আয়োজন করেছিলেন। আর বলেছিলেন পুজোর আগের দিন রাত্রে তিনি কৃষ্ণনগরে ফিরে আসবেন। সমস্যাটা হল, রাজপরিবারের কুলগুরু ছিলেন বৈষ্ণবাচার্য। তিনি নতুন এই শাক্ত দেবীর পুজোয় অনুমতি না দিলে পুজো করা সম্ভব হতো না। তাই রাজা ঠিক করেছিলেন পুজোর আগের দিন মধ্যরাত্রে কৃষ্ণনগরে ফিরবেন। আর পরের দিন সকালে অঞ্জলি দেবেন। তখন কুলগুরুর কোনও বাধাই কার্যকর হবে না।

ইতিমধ্যেই শিবচন্দ্র ও গোপালভাঁড় পুজোর সব আয়োজন করে রেখেছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী পুজোর আগের দিন গভীর রাতে গোপনে কৃষ্ণনগরের প্রাসাদে ফিরে এসেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র। এবং পর দিন সারা দিন উপবাসী থেকে পুজোয় অঞ্জলিও দিয়েছিলেন। সেই থেকেই শুরু হল রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজো।

তবে কৃষ্ণনগরে বেশির ভাগ প্রতিমা যেখানে বিশাল আকারের, সেখানে রাজবাড়ির প্রতিমা অন্যান্য প্রতিমার চেয়ে আকারে ছোট। এর কারণ জানতে চাইলে সৌমীশবাবু বললেন, “স্বপ্নাদেশে কৃষ্ণচন্দ্র যে দেবীর দর্শন পেয়েছিলেন তিনি কুমারী রূপিণী। তাই দেবীর মূর্তি কুমারী বালিকার মতোই। বর্তমানে প্রচলিত জগদ্ধাত্রী মূর্তির চেয়ে আলাদা রাজবাড়ির প্রতিমা। আড়াআড়ি ভাবে না বসে দেবী সোজাসুজি সিংহের উপর বসে। সিংহটি দেখতে দাবানলের ঘোড়ার মতো। সামনে ঝুলন্ত অভ্রধারা। রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোর আচার অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে রাজপরিবারের বধূ অমৃতা রায় বলছিলেন, “একদিনে তিন বার পুজো হয়। ভোগে থাকে খিচুড়ি, ৯ রকম ভাজা, তরকারি, পোলাও, তিন রকম মাছ, চাটনি, পায়েস, সুজি, মিষ্টি ইত্যাদি।”

চন্দননগরে পুজোর প্রচলন কী ভাবে হয়েছিল তা নিয়ে মতান্তর রয়েছে। ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ছিলেন ফরাসি সরকারের দেওয়ান। এ কথা বহুল প্রচলিত যে কৃষ্ণচন্দ্র আর ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর মধ্যে সখ্যতা এবং যোগাযোগ ছিল। অনেকেই মনে করেন ইন্দ্রনারায়ণের মাধ্যমে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো চন্দননগরে প্রবেশ করেছিল। এক বার কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো দেখে পরের বছর তিনি চন্দননগরে পুজোর প্রবর্তন করেছিলেন। যদিও এ কাহিনি নিয়ে মতান্তর আছে। কেননা ইন্দ্রনারায়ণের মৃত্যু হয়েছিল ১৭৫৬ সালে। আর ১৭৫৬-য় কৃষ্ণনগরে পুজোর প্রচলন হয়েছিল কি না তা নিয়ে দ্বিমত আছে।

চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজো প্রসঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষ্ণচন্দ্রের দেওয়ান দাতারাম শূরের নাম। দাতারামের বাড়ি ছিল ভদ্রেশ্বরের গৌরহাটি অঞ্চলে। এখানেই আনুমানিক ১৭৬২-র কাছাকাছি সময় দাতারামের বিধবা মেয়ে তাঁর বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেছিলেন। গবেষকদের মতে এ পুজোতেও কৃষ্ণচন্দ্রের অনুদান ছিল। পরে পুজোটি স্থানান্তরিত হয় শিবতলা অঞ্চলে। পরবর্তী কালে মূলত আর্থিক কারণে পুজোটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে গৌরহাটি অঞ্চলের বাসিন্দারা পুজোটির দায়িত্ব নেন। সেই পুজোটি আজ তেঁতুলতলার পুজো বলে প্রসিদ্ধ। বর্তমানে এই পুজো উপলক্ষে দূরদূরান্ত থেকে মানুষের সমাগম হয়।

চন্দননগর (ফরাসডাঙা) আর কৃষ্ণনগরের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বহু দিনের। কারও মতে কৃষ্ণনগরের চাল ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট সময় চাল কিনে ফিরতে না পারায় ফরাসি সরকারের অনুমতি নিয়ে চাউল পট্টিতে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেছিলেন। পরে এই পুজোর দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন চন্দননগরের চাল ব্যবসায়ীরা। এর পরে শুরু হয়েছিল লক্ষ্মীগঞ্জ কাপড়পট্টির জগদ্ধাত্রী পুজোটি। আরও পরে একে একে প্রচলিত হয় চন্দননগরের অন্যান্য পুজোগুলির।

আরও পড়ুন:
কংক্রিটের আড়ালে মুখ ঢেকেছে মন্দিরশিল্প

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন