• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

‘কনট্যাক্ট ট্রেসিং’-এর ঘাটতিতে করোনাবৃদ্ধি?

KOLKATA
কন্টেনমেন্ট নীতি কার্যকর হওয়ার পরে চার দিনের ব্যবধানে ৩০০ থেকে ৪০০-র ঘরে (৪১২) ঘরে ঢুকে পড়েছে কলকাতায় ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা। ছবি: পিটিআই।

রাজ্যে অব্যাহত করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী দৌড়। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে ডেঙ্গি সংক্রমণ। এই জোড়া আক্রমণে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার মোকাবিলায় চিকিৎসা বিধি (প্রোটোকল) তৈরি করতে চলেছে স্বাস্থ্য ভবন। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, এ জন্য বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তীর নেতৃত্বে সেই দলে রয়েছেন স্বাস্থ্য দফতরের এডিএইচএস দীপঙ্কর মাজি, এসএসকেএমের মেডিসিন বিভাগের প্রধান সৌমিত্র ঘোষ, আরজিকরের মেডিসিনের প্রফেসর জ্যোতির্ময় পাল, স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধান বিভূতি সাহা, ভাইরোলজিস্ট ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ শিবার্জুন ঘোষ, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সুভাষ টোডি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজ়িজের কো-অর্ডিনেটর প্রীতম রায়।

স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর, জ্বরের উপসর্গ থাকলে এখন মূলত কোভিডের কথা মাথায় রেখেই চিকিৎসকেরা এগোচ্ছেন। কোভিডের পাশাপাশি কী ধরনের উপসর্গ থাকলে ডেঙ্গির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা উচিত, সে বিষয়ে প্রোটোকলে পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে কোভিড-ডেঙ্গি হলে কী ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে, কত ইউনিট প্লেটলেট দেওয়া যাবে সে সম্পর্কেও দিকনির্দেশ থাকতে পারে চিকিৎসা প্রোটোকলে। কোভিড-ডেঙ্গির জোড়া আক্রমণে কো-মর্বিড রোগীর ‘কেস ম্যানেজমেন্ট’ও প্রোটোকলের গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে বলে স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে খবর। ডেঙ্গি সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এ দিন ভিডিয়ো কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

এ দিকে শনিবারের বুলেটিন অনুযায়ী, করোনায় রাজ্যে এক দিনে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১৩৪৪ জন। কন্টেনমেন্ট নীতি কার্যকর হওয়ার পরে চার দিনের ব্যবধানে ৩০০ থেকে ৪০০-র ঘরে (৪১২) ঘরে ঢুকে পড়েছে কলকাতায় ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা। উত্তর ২৪ পরগনায় সেই সংখ্যা হল ৩২৭। দেড়শো (১৪৯) ছুঁইছুঁই দক্ষিণ ২৪ পরগনা। উত্তরবঙ্গে যে তিন জেলা এ দিন প্রথম তিনটি স্থান দখল করেছে তা হল, দার্জিলিং (৭২), জলপাইগুড়ি (৪৬) এবং মালদহ (৪৫)।

আরও পড়ুন: মাস্ক না পরলে ‘স্পট ফাইন’ নয় কেন?

আরও পড়ুন: কবে কোভিড ভ্যাকসিন, বলা সম্ভব নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত রাজ্যে মোট কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা ২৮,৫৪৩ জন। অ্যাক্টিভ করোনা রোগী ৯৫৮৮ জন। ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা পজ়িটিভ রোগীর মৃত্যু হয়েছে ২৬ জনের। শুধু কলকাতাতেই মৃত্যুর সংখ্যা ১৬। এ দিনের পরে গত সাড়ে তিন মাসের বেশি সময়ে বঙ্গে করোনা আক্রান্ত মোট মৃতের সংখ্যা ন’শোর (৯০৬) গণ্ডি অতিক্রম করেছে।

এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গির আক্রমণ উদ্বেগে রেখেছে স্বাস্থ্য ভবনকে। এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কথায়, ‘‘মানবদেহে ডেঙ্গির প্রভাব থাকে অন্তত ৮-১০ দিন। কোভিডের ক্ষেত্রে তা হল ১৪-১৫ দিন। ডেঙ্গির ক্ষেত্রে ভাইরাস প্রবেশের পরে ৫-৭ দিন খুব গুরুত্বপূর্ণ। করোনায় তা ১০-১৪ দিন। কোভিড থাকলে ডেঙ্গি ফলস পজ়িটিভ হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই বিষয়গুলিকে মাথায় রেখে, কোভিড-ডেঙ্গি একসঙ্গে হলে চিকিৎসার রূপরেখা কী হবে, সে সম্পর্কে ধারণা দিতে প্রোটোকল তৈরি করা হচ্ছে।’’

শহরের সব বড় রাস্তা জীবাণুমুক্ত করতে কলকাতা পুরসভার নয়া অস্ত্র ‘মিস্ট ক্যানন’। এই মেশিনে প্রতি মিনিটে ২০০ লিটার সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট-যুক্ত জল স্প্রে করা যায়। মেশিনেই থাকছে ১০,০০০ লিটারের ট্যাঙ্ক। পুর-কর্তৃপক্ষ জানান, এই মেশিনে খরচ হয়েছে প্রায় ২৭ লক্ষ টাকা। শনিবার। ছবি: পিটিআই।

এ দিকে, করোনা সংক্রমণের এই বাড়বাড়ন্তের মধ্যে ‘কনট্যাক্ট ট্রেসিং সেল ওয়ান’এর অনুপস্থিতি তফাত গড়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের একাংশ। সম্প্রতি ওই সেলের ১৫ জনের মধ্যে ১১ জন করোনা সংক্রমণের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে যুগ্মসচিব পদমর্যাদার এক আধিকারিকও রয়েছেন। এ রাজ্যে সংক্রমণের গোড়া থেকে ওই সেল সক্রিয় ছিল। গোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ রোধে তাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দু’নম্বর কনট্যাক্ট ট্রেসিং সেল সক্রিয় থাকলেও অনভিজ্ঞতার কারণে প্রক্রিয়া অনেক সময় ব্যাহত হচ্ছে বলে মত করোনা পরিষেবায় যুক্ত স্বাস্থ্য আধিকারিকদের একাংশের।

কলকাতা পুরসভার কনট্যাক্ট ট্রেসিং সেলের এক চিকিৎসক-আধিকারিকের কথায়, ‘‘স্বাস্থ্য ভবনের কনট্যাক্ট সেলের সঙ্গে পুরসভার কনট্যাক্ট সেলের কাজকর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা যখন কাজ শুরু করেছিলাম, দিনে ৫০টি করে কেস হতো। এখন দিনে ৪০০ কেস হচ্ছে। পজ়িটিভ হওয়ার সঙ্গে কে হোম আইসোলেশনে থাকতে পারে, আর কে হাসপাতালে ভর্তি হবেন, পুরো বিষয়টি এক নম্বর কনট্যাক্ট সেলের নখদর্পণে ছিল। অভিজ্ঞতা কম হওয়ায় এখন অ্যাম্বুল্যান্স জোগাড় করে আক্রান্তদের জায়গা মতো কোভিড সেন্টারে পাঠাতে সময় নষ্ট হচ্ছে। তার উপরে শয্যার অভাব। যতক্ষণ আক্রান্তেরা কমিউনিটিতে থাকবেন, ততক্ষণ তো সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।’’

কলকাতায় সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি প্রসঙ্গে পুরসভার জনস্বাস্থ্য বিভাগের এক চিকিৎসক-আধিকারিক জানান, উপসর্গযুক্তদের হাসপাতালে ভর্তি করার উপরে জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু হোম আইসোলেশনে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা নিয়ম মেনে ঘরে থাকছেন কি না, সেই নজরদারি
সব সময় সম্ভব হচ্ছে না। ওই চিকিৎসক আধিকারিকের কথায়, ‘‘দিনে যেখানে ৪০০ করে কেস হচ্ছে, সেই নিরিখে কন্টেনমেন্ট জোনের সমতা নেই এটা বলা চলে!’’ সর্বোপরি পুর এলাকার বাজারগুলি থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না জনস্বাস্থ্য বিভাগের আধিকারিকদের একাংশ।

এ দিনও রাজ্য জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের প্রোগ্রাম অফিসার (১) তথা উপসচিব পদমর্যাদার এক মহিলা আধিকারিক আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁর স্বামী রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য। গত সোমবার আরটি-পিসিআরে ওই আধিকারিকের নমুনা পরীক্ষার
রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছিল। বৃহস্পতিবার জ্বর আসায় ফের নমুনা পরীক্ষা করান ওই আধিকারিক। এ বার করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।  

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কড়া বার্তা দেওয়ার পরও মাস্ক পরা নিয়ে সাধারণ মানুষের একাংশের অনীহাও সংক্রমণের বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর, স্বাস্থ্য ভবনেরই পদস্থ আধিকারিকদের একাংশের এই প্রবণতা রয়েছে। রাজ্যের করোনা বিশেষজ্ঞ কমিটির এক সদস্য চিকিৎসক, স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের কয়েকজন চিকিৎসক সেই সব আধিকারিকদের সতর্কও করেছেন।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন