• অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সৌজন্য-সম্ভ্রমের প্রকাশ দ্বিজেনদা

Dwijen Mukhopadhyay
শেষযাত্রায় দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। —নিজস্ব চিত্র ।

আজ তিনি নীরব। শ্যামপুকুর, সল্টলেক, শান্তিনিকেতন, সব ঠিকানা যেন হারিয়ে গেল। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় এখন অমৃতধামের বাসিন্দা। মর্তধামে বসে অন্তরে শুনছি তাঁর কণ্ঠে অমৃতধামের সঙ্গীত: তোমারেই করিয়াছি, জীবনের ধ্রুবতারা।

জীবনের একতলা থেকে উপরতলা পর্যন্ত এই গানই গেয়ে যাচ্ছিলেন, বয়সের শেষ প্রান্তে এসেও। আমাদের দু’জনের চাক্ষুষ দেখা না-হওয়া অনেক সময় দীর্ঘায়িত হত। কিন্তু সেই অদেখা কোনও দিন আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। কিছু দিন আগেই পিজি হাসপাতাল থেকে কানে কানে বললেন, ১৬ জুন রবীন্দ্র সদনে একটা সংবর্ধনা আছে। আমি উপস্থিত হতে পারব কি না! আমার পরম ভাগ্য যে, দ্বিজেনদার বিশ্বাস অর্জন করেছি। তাঁকে প্রণাম। 

দেহের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। সম্পর্কের তো মৃত্যু নেই। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সম্বন্ধ, সম্পর্কের শ্রেষ্ঠ প্রকাশই সভ্যতা।’ আর সভ্যতার এক পরিশীলিত প্রকাশ দ্বিজেনদার ব্যক্তিত্ব। দ্বিজেনদার তিন বন্ধু— মানবদা (মুখোপাধ্যায়), নির্মলদা (চৌধুরী) এবং তরুণদা (বন্দ্যোপাধ্যায়)। এই চারমূর্তি একসঙ্গে বাইরে অনুষ্ঠান করতে গেলে কী যে হত!  দ্বিজেনদা যতই শিল্পীর সম্ভ্রান্ত উপস্থিতিকে বজায় রাখতে চেষ্টা করতেন, বাকি তিন জন ততই ওঁকে গণ্ডির বাইরে আনার চেষ্টা করতেন। কিন্তু সকল রঙ্গরসকে সভ্যতার মোড়কে রেখেই চলত অবিরাম মজা! 

প্রথম তাঁকে দেখি কালীপুজোয়, ঢাকুরিয়ার এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। আমি তখন সেখানে হাফপ্যান্ট পরা ভলান্টিয়র। গান শুনছি এক নতুন শিল্পীর, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। সঙ্গে হারমোনিয়ামে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। হেমন্তদার জনপ্রিয়তাকে কেন্দ্র করে অনেক শিল্পী ‘হেমন্ত-কণ্ঠ’ হয়ে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। কিন্তু চিত্রজগতে বা বেসিক গানের ক্ষেত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে পাওয়া না গেলে আমরা প্রায় সবাই বদলি শিল্পী হিসেবে বেছে নিয়েছি দ্বিজেনদাকে। আর সে কাজে পথ দেখিয়েছেন সঙ্গীতজগতে সবার গুরু পঙ্কজ কুমার মল্লিক। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’তে ‘জাগো দুর্গা’ গানটির প্রথম শিল্পী ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। দ্বিজেনদা তখন সমবেতর দলে। মনে আকাঙ্ক্ষা, তিনি যদি গানটি গাইতে পারেন! সুযোগ এল পঞ্চাশের দশকের গোড়ায়, হেমন্তদা মুম্বই চলে যাওয়ায়। সেই গানের অমর শিল্পী হয়ে গেলেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ই। 

এক বার সলিল চৌধুরী মনে করলেন, কবি মাইকেলের কবিতায় সুর করবেন। সুর করলেন মুম্বইতে বসে। ধরে নেওয়া হল, হেমন্ত-সলিল জুটি মানেই নতুন কিছু। কিন্তু সলিলদা কলকাতায় এসে খবর পাঠালেন দ্বিজেনদাকে। এবং তাঁকে দিয়ে গাওয়ালেন ‘রেখো মা দাসেরে মনে’। 

গ্রামোফোন কোম্পানি যখন সুধীন দাশগুপ্তের দক্ষতা বিচার না করে শুধু আউটগোয়িং শিল্পীদের দিয়ে তাঁর গান গাওয়াচ্ছেন, তখন স্বনামে জনপ্রিয় দ্বিজেনদা সুধীনদার চারটি গান গাইলেন। জনপ্রিয় হল, ‘ভাঙা তরীর শুধু এ গান’ এবং ‘এই ছায়া ঘেরা কালো রাতে।’ কারও প্রতি অভব্যতা, অসৌজন্য, অমানিকবতা দেখলে সেটা তাঁকে খুবই নাড়া দিত। 

স্বর্ণযুগে জ্ঞানী-গুণী অনেক শিল্পীর কাছে আসার সুযোগ আমায় ঈশ্বর দিয়েছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত দুর্বলতা ছিল দ্বিজেনদার প্রতি। এক বার শ্যামল মিত্রের পুজোর গান করেছি। গানটির নির্মাণ উৎকর্ষ, আমার বিচারে, সুপারহিট হতে পারে। কিন্তু  গানটি আমি দ্বিজেনদাকে না শুনিয়ে শ্যামলদাকে দিতে পারলাম না। দ্বিজেনদা যদি দুঃখ পান! এবং সেই গান শেষে দ্বিজেনদাই গাইলেন। আমার আর সে বার শ্যামলদার পুজোর গান করা হল না। এর ‘ক্ষতিপূরণও’ করলেন দ্বিজেনদা, ‘সাতনরী হার’ গেয়ে। রেকর্ডটি এমন বিক্রি হল যে তার ভিত্তিতেই গ্রামোফোনে আমার রয়ালটি চালু হয়ে গেল!

দ্বিজেনদার কাছে সকল বন্ধুত্বের খুব মর্যাদা ছিল। যেমন, তিনি ছিলেন নচিদা, মানে নচিকেতা ঘোষের বাল্যবন্ধু। আবার, তরুণদা-দ্বিজেনদার একটা অদ্ভুত রসায়ন ছিল। সেই রসায়ন ঘটিয়েছিলেন পঙ্কজদাই। ওঁদের মধ্যে কেউ ভুল করলেই পঙ্কজদা বলতেন, ‘‘ইদ্‌বিজেন তুমি তরুণের কান ধরো। তরুণ তুমি ইদ্‌বিজেনের কান ধরো।’’ দ্বিজেন বানান ‘দ-য়ে ব’ বলে দ্বিজেনদাকে ‘ইদ্‌বিজেন’ বলতেন পঙ্কজদা।

সলিল-দ্বিজেন বন্ধুত্বও ছিল অসম্ভব আন্তরিক। ‘শ্যামল বরণী ওগো কন্যা’য় আপনি  দিয়ে শুরু হয়েছিল। ‘অ্যায় দিল, কহাঁ তেরি মঞ্জিল’-এ এসে তুই-তে পৌঁছে গিয়েছিল। কলকাতার শিল্পী দ্বিজেনদাকে দিয়ে সেই সময় মুম্বইতে দেবানন্দের লিপে গান  গাওয়াচ্ছেন সলিলদা! তামাম ভারতবর্ষে কারও বুকে এত বল ছিল না যে কেউ লতাজিকে বলবেন ওই গানের নেপথ্যে তুমি হামিং ও কোরাস  করবে! দ্বিজেনদার উপর অনেক রাগারাগি করেছি সেই সময় মুম্বই থেকে চলে আসার জন্য। কারণ ওই গানের রেন্ডারিং, উচ্চারণ, জনপ্রিয়তা সবই অসাধারণ। সুযোগ পেয়েও তিনি ওখানে থাকলেন না। চলচ্চিত্র জগতে তাঁর আর এক অবদান ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ছবিতে। এক দিকে আমির খানের বন্দিশ, অন্য দিকে বাগেশ্রীতে ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’। 

বছর বছর দ্বিজেনদার জন্য পুজোর গান করেছি। বছর বছর ঝগড়া করেছি। আবার পরের বছর এক সঙ্গে কাজ করেছি। আজ শুধু মনে হচ্ছে, স্বর্ণযুগের স্তম্ভটি ভেঙে পড়েছে, আর ভগ্নস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসছে সুরের ধারা: যাহা যায় আর যাহা কিছু থাকে/ সব যদি দিই সঁপিয়া তোমাকে/ তবে নাহি ক্ষয়/ সবই জেগে রয়/ তব মহামহিমায়।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন