এত অশান্তি হবে কেন, প্রশ্ন তুলছেন নিহতদের পরিজনেরা
এর মধ্যেই দেখা গেল, পুলিশ ও তৃণমূল সমর্থকদের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েছেন ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী অর্জুন সিংহ।
ManiFa

নিহত নাসির হালদারের স্ত্রী মনিফা বিবি। সোমবার, আমডাঙায়। ছবি: সুদীপ ঘোষ

গণতান্ত্রিক দেশে যাঁর যাঁকে ইচ্ছে, তাঁকেই ভোট দেবেন। এ নিয়ে অশান্তি কেন হবে? প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন এক বছর আগে পঞ্চায়েত ভোটে আমডাঙায় নিহতদের পরিজনেরা।

এ সব শুনে রাস্তায় উঠে একটু এগোতেই দেখা গেল, পরপর দাঁড়িয়ে বেশ কিছু গাড়ি। কোনওটায় লেখা সিআরপিএফ, কোনওটা সংবাদমাধ্যমের। জায়গার নাম তেঁতুলিয়া। কী হয়েছে এখানে? জড়ো হওয়া মহিলা-পুরুষেরা জানালেন, গণ্ডগোল হচ্ছে। কিছু ক্ষণ আগে গুলি-বোমার শব্দও পাওয়া যাচ্ছিল। তবে আমডাঙার ভোটে ‘এটুকু’ গোলমালকে আমল দিচ্ছিল না পুলিশও।

এর মধ্যেই দেখা গেল, পুলিশ ও তৃণমূল সমর্থকদের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েছেন ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী অর্জুন সিংহ। তাঁর অভিযোগ, তেঁতুলিয়া স্কুলের বুথ থেকে বিজেপি এজেন্টকে বার করে দেওয়া হয়েছে। অর্জুনের কথার প্রতিবাদ করছিলেন তৃণমূল সমর্থকেরা। ও দিকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিচ্ছিলেন বিজেপি-র লোকজন। এ সবের মধ্যে সিআরপিএফ জওয়ানেরা লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে গেলেন। রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে আটকানো হয়েছিল পথ। সরানো হল সেই গুঁড়ি। সরু রাস্তার দু’পাশের বাড়িঘর, গাছগাছালির মধ্যেই দৌড়ে পালালেন দু’দলের কর্মী-সমর্থকেরা। সিআরপিএফ জওয়ানেরা কার্যত ঠেলে গাড়িতে তুলে দিলেন অর্জুনকে। সেই গাড়ির পিছনে চলতে লাগল সংবাদমাধ্যমের গাড়িও।

অর্জুনের গাড়ি ১০০ মিটারের মতো এগোতেই রাস্তার দু’ধারে জড়ো হওয়া শ’তিনেক তৃণমূল কর্মী-সমর্থক ‘গো ব্যাক অর্জুন’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন। অর্জুনের গাড়ি এগোতেই ‘মিডিয়াকে সঙ্গে এনেছিস’ বলে চিৎকার করতে করতে ওই কর্মী-সমর্থকেরা হামলে পড়েন সংবাদমাধ্যমের গাড়ির উপরে। বাঁশ আর লাঠি দিয়ে ভাঙা হয় গাড়ির কাচ। ইট দিয়ে মারা হয় গাড়ির বনেট, জানলা ও দরজায়। গাড়ি এগোতেই উড়ে আসে থান ইট। গাড়ির কাচ ভেঙে একের পরে এক ইট বৃষ্টির মতো পড়তে থাকে। সেই ইটের আঘাতে জখম হন বেশ কয়েক জন সাংবাদিক ও চিত্র সাংবাদিক। কারও কারও মাথা ও গাল ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। মোটরবাইকে থাকা সাংবাদিকদের হেলমেটে থান ইট দিয়ে পরের পর আঘাত করা হয়। সেখান থেকে কোনও মতে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে সাংবাদিকেরা কেউ চিকিৎসা করান বারাসত জেলা হাসপাতালে, কাউকে ভর্তি করা হয় নার্সিংহোমে।

পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, গত লোকসভা, বিধানসভা ও পঞ্চায়েত ভোটের মতো এ বার খুনোখুনি হয়নি আমডাঙায়। শেষ পঞ্চায়েত ভোটেও মনোনয়ন জমা দেওয়া থেকে শুরু করে নির্বাচনপর্ব এবং বোর্ড দখলকে কেন্দ্র করে শাসক দল ও বিরোধীদের ছ’জন খুন হন আমডাঙায়। ‘‘যাঁদের বাড়ির কারও প্রাণ যায়, শুধু তাঁরাই বোঝেন,’’ বলছিলেন আমডাঙায় গত পঞ্চায়েত ভোটে নিহতদের পরিজনেরা। ভোট এলেই সেই সব বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া।

‘‘আমার স্বামী কোনও দল করতেন না, সবাই ওঁকে ভালবাসতেন,’’ বাড়ির দাওয়ায় বসে বলছিলেন নিহত কুদ্দুস আলি গনির স্ত্রী ফরিদা বিবি। কুদ্দুসের দাদা, তৃণমূল নেতা সুকুর আলিকে একদল দুষ্কৃতী মারতে এলে গুলি-বোমার আঘাতে বাড়ির মধ্যেই খুন হন কুদ্দুস। সে দিনটার কথাই বলছিলেন সুকুর। কুদ্দুসের ছেলে সোহেল ষষ্ঠ শ্রেণি আর মেয়ে নৌরিন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। তাদের হাত ধরে ফরিদা বলেন, ‘‘মানুষটা চলে যাওয়ার পরে সংসারটা ছারখার হয়ে গেল। ভোট তো বারবার হয়। কিন্তু সেই ভোট নিয়ে এক জন মানুষ কেন অন্য জনকে মারবে? ও তো কোনও দলে ছিল না।’’

পঞ্চায়েত ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে খুন হয়েছিলেন আমডাঙার পাঁচপোতার সিপিএম কর্মী তহিবুর গায়েন। বোর্ড দখলকে কেন্দ্র করে ঝামেলায় খুন হন বৈঁচগাছার তৃণমূল কর্মী নাসির হালদারও। মেয়ে ওম্মল আরা পঞ্চম শ্রেণি আর ছেলে আলতাফ দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তাদের পড়াশোনা সামলাতে বাড়ির সামনে চায়ের দোকান চালাতে হয় নাসিরের স্ত্রী মনিফা বিবিকে। মনিফা জানান, নাসির খুন হওয়ার পর থেকে অনেক নেতা-মন্ত্রী এসে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছেন তাঁকে। কিন্তু চাকরি হয়নি। এ দিন ভোট দিয়ে এসে তিনি বলেন, ‘‘ছেলে-মেয়ের সঙ্গে বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়িও রয়েছেন। একটা কাজের খুব দরকার। আসলে যার বাড়ির কেউ চলে যায়, সে-ই যন্ত্রণাটা বোঝে।’’

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত