রাজ্যে কমছে ঘাসফুল, দাপট পদ্মের! ইঙ্গিত বুথফেরত সমীক্ষায়, অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার শঙ্কায় বাম-কংগ্রেস
২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ছিল ৩৪। এ বার ব্যাপক বিজেপির হাওয়ায় আসন সংখ্যা যে কিছুটা কমতে পারে রাজ্যের শাসক দলের, তার ইঙ্গিত মিলছিল ভোটের আগের জনমত সমীক্ষায়।
GFX

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

রাজ্যে তৃণমূলের ভোটবাক্সে ধসের ইঙ্গিত বুথ ফেরত সমীক্ষায়। একমাত্র নিউজ ১৮-আইপিএসওএস-এর সমীক্ষায় উঠে এসেছে তৃণমূলের ২০১৪ সালের আসন সংখ্যা ৩৪ থেকে বেড়ে এ বার হতে পারে ৩৬। ২ থেকে এক লাফে বিজেপির আসন বেড়ে শুধু দুই সংখ্যাতেই নয়, কয়েকটি সমীক্ষায় ইঙ্গিত পশ্চিমবঙ্গে ৪২টির মধ্যে ১৮টি আসনও পেয়ে যেতে পারে বিজেপি। সমীক্ষা মিললে বামেদের ফল হতে চলেছে সবচেয়ে ভয়াবহ। ইতিহাসে প্রথম বার এ রাজ্যে বামেদের খাতা শূন্য হওয়ার সম্ভাবনা অধিকাংশ সমীক্ষায়। শক্তি খুইয়ে কংগ্রেসও নেমে আসতে পারে ৪ থেকে দুইয়ে।

২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ছিল ৩৪। এ বার ব্যাপক বিজেপির হাওয়ায় আসন সংখ্যা যে কিছুটা কমতে পারে রাজ্যের শাসক দলের, তার ইঙ্গিত মিলছিল ভোটের আগের জনমত সমীক্ষায়। সপ্তম তথা অন্তিম দফার ভোটপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন জনমত সমীক্ষাতেও সেই প্রবণতা অব্যাহত। অর্থাৎ রাজ্যে আসন কমছে তৃণমূলের, অধিকাংশ সমীক্ষার ইঙ্গিত তেমনই। শুধু কমে যাওয়াই নয়, কার্যত ধস নামতে চলেছে তৃণমূলের ভোট বাক্সে। যদিও একটি সমীক্ষায় আসনবৃদ্ধির ইঙ্গিতও রয়েছে।

কত আসন পেতে পারে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল? একটি মাত্র সমীক্ষা নিউজ ১৮-আইপিএসওএস বলছে, তৃণমূলের আসন ৩৪ থেকে বেড়ে হতে পারে ৩৬ থেকে ৩৮। ওই সমীক্ষায় বিজেপির ঝুলিতে যাচ্ছে ৩ থেকে ৫টি আসন। কংগ্রেস ৪ থেকে কমে হচ্ছে এক এবং বামফ্রন্ট দু’টি থেকে পৌঁছে যেতে পারে শূন্যতে।

বাকি সমীক্ষাগুলির মধ্যে তৃণমূলের ঝুলিতে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে রিপাবলিক সি-ভোটার। তাদের মতে তৃণমূলের দখলে যেতে পারে গতবারের চেয়ে ৫টি কম অর্থাৎ ২৯টি আসন। এর পর টাইমস নাও-ভিএমআরএর সমীক্ষায় ২৮, এবিপি নিয়েলসন ২৪, টুডেজ চাণক্য ২৩ এবং রিপাবলিক জনমত সমীক্ষার হিসেবে সবচেয়ে কম ১৭টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা তৃণমূলের।

লোকসভা ভোটের আগের কয়েকটি উপনির্বাচন এবং গত বছরের পঞ্চায়েত ভোটের ফলেই ইঙ্গিত মিলেছিল, বামেদের পিছনে ঠেলে রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল হয়ে উঠছে বিজেপি। ২০১৪ সালে এ রাজ্য থেকে আসানসোল আসনটি বিজেপি একার কৃতিত্বে জিতেছিল। দার্জিলিংয়ে বিমল গুরুংয়ের নেতৃত্বে তৎকালীন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থনে বিজেপির জয় এসেছিল দার্জিলিং আসনেও। দুই সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় এবং সুরেন্দ্র সিংহ অহলুওয়ালিয়া— দু’জনই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন। এ বার সেই দুই থেকে বাড়িয়ে পদ্ম শিবির রাজ্যে দখলে নিতে পারে ২২টি পর্যন্ত আসন। রিপাবলিক-জনমত সমীক্ষায় অন্তত তেমনই ইঙ্গিত।

যদিও বিজেপি সবচেয়ে কম ৩ থেকে ৫টি আসন পেতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে নিউজ ১৮-আইপিএসওএস-এর মতো সমীক্ষা। টুডেজ চাণক্যের মতে এই সংখ্যা হতে পারে ১৮ (কমবেশি ৮), এবিপি নিয়েলসন ১৬, টাইমস নাও-ভিএমআর এবং রিপাবলিক-সিভোটার উভয়ের মতেই ১১। তবে একটি বিষয় সব সমীক্ষাতেই ইঙ্গিত, রাজ্যে বিজেপির আসন বাড়ছে। এমনকী, যে নিউজ ১৮-আইপিএসওএস তৃণমূলের আসন বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেখানেও বিজেপির আসন বাড়ছে বলে ইঙ্গিত। এই সমীক্ষায় বাম এবং কংগ্রেসের আসন কমা আসন ভাগাভাগি করে নেবে তৃণমূল এবং বিজেপি।

কিন্তু সমীক্ষাগুলিতে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির ইঙ্গিত বামেদের। প্রায় সব কটি সমীক্ষায় ইঙ্গিত, রাজ্য থেকে লোকসভায় কোনও প্রতিনিধি নাও পাঠানোর ‘সৌভাগ্য’ হতে পারে। অর্থাৎ আগের বারের রায়গঞ্জ কেন্দ্র থেকে মহম্মদ সেলিম এবং মুর্শিদাবাদ থেকে বদরুদ্দোজা খানের হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা। একমাত্র টাইমস নাও-ভিএমআর ১টি আসন পাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। বাকি সব সমীক্ষায় বামেদের ভোটের খাতায় শূন্য পাওয়ারই ইঙ্গিত।

রাজ্যে শক্তি হারাচ্ছে কংগ্রেসও, ইঙ্গিত সিংহভাগ বুথ ফেরত সমীক্ষায়। ২০১৪ সালে মালদহ উত্তর, মালদহ দক্ষিণ, বহরমপুর এবং জঙ্গিপুর— এই চারটি আসন ছিল কংগ্রেসের। এ বার সমীক্ষাগুলির ইঙ্গিত সেই আসন সংখ্যা নেমে আসতে পারে অর্ধেকে, এমনকি, মাত্র এক সাংসদ থাকার ইঙ্গিতও দিচ্ছে টুডেজ চাণক্য এবং নিউজ ১৮-আইপিএসওএস। এবিপি নিয়েলসন, টাইমস নাও-ভিএমআর এবং রিপাবলিক-সিভোটার— তিন সমীক্ষাতেই ধরা হয়েছে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা হতে পারে ২। শুধুমাত্র রিপাবলিক-জনমত সমীক্ষার পূর্বাভাস, কংগ্রেসের হাতে থাকতে পারে ৩টি আসন। অর্থাৎ রাজ্যে কার্যত অস্তমিত কংগ্রেসের শক্তি হারানোর সম্ভাবনা মালদহে গণি খানের গড়ে, এবং মুর্শিদাবাদে অধীরের খাসতালুকে। মালদহ উত্তরে গত বার কংগ্রেসের টিকিটে জিতেছিলেন মৌসম বেনজির নুর। এ বার তিনি দল বদলে তৃণমূলে। ফলে এই আসন খোয়াতে পারে কংগ্রেস। অন্য দিকে মুর্শিদাবাদে অধীর নিজের আসন বহরমপুর ধরে রাখতে পারলেও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ছেলে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের হারের ইঙ্গিত দিচ্ছে সমীক্ষাগুলি।

তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী যদিও এই সমীক্ষাকে ‘গসিপ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সব মিলিয়ে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ পর্ব শেষে বুথ ফেরত সমীক্ষার পূর্বাভাসগুলির প্রবণতা ব্যাখ্যা করলে এটা অনেকটাই স্পষ্ট যে, রাজ্যে শক্তিক্ষয় হচ্ছে তৃণমূলের, বাড়ছে বিজেপির। তবে তৃণমূলের আসন সত্যি কমলে সেটা কতটা কমতে পারে, এবং বিজেপির বৃদ্ধি হলে কতদূর যেতে পারে, আপতত সেটা নিয়েই জল্পনা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। আর সেই সঙ্গে প্রহর গোণা শুরু ২৩ মে ভোটগণনার।

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ 

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত