• জয়ন্ত ঘোষাল
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

মুখে উন্নয়ন, মোদীর কাছে প্রার্থী মমতা

1-1

সোমবার দুপুর বারোটায় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকে বসবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার ৯ মাস পরে এই প্রথম বার। বৈঠকের ঘোষিত কারণ, রাজ্যের ঘাড়ে চেপে থাকা বিপুল ঋণের বোঝা লঘু করার আর্জি।

লোকসভা ভোটের আগে থেকে এই সে দিন পর্যন্ত মোদী সম্পর্কে প্রকাশ্যেই তীব্র বিরোধিতা করে এসেছেন মমতা। কিন্তু সোমবারের বৈঠকে সেই তিক্ততার কোনও আঁচ পড়তে দিতে চান না প্রধানমন্ত্রী। আনন্দবাজারের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক সঙ্কট মানে কিন্তু ভারতের অর্থনীতির সঙ্কট। আমাকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাজ করার দায়িত্ব দিয়েছে মানুষ। সেই দায়িত্ব রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছেও। তাই মুখ্যমন্ত্রী কী চাইছেন, তা শুনতে আমি আগ্রহী।” সরকারি আলোচনার বাইরে সোমবার মমতার সঙ্গে মোদীর একান্ত বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে। দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনায় ঋণের বিষয়টি ছাড়া বাংলাদেশ প্রসঙ্গও উঠতে পারে।

সরকার সূত্রে খবর, সোমবার দুপুর ১২টায় সংসদে নিজের ঘরে মমতার সঙ্গে দেখা করবেন মোদী। সেখানে বৈঠকের পরে তাঁরা যাবেন সংসদের লাইব্রেরির কনফারেন্স    রুমে। সেখানে ক্যাবিনেট সচিব থাকবেন। থাকবেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রও। আবার প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও রাজনাথ সিংহ, অরুণ জেটলির সঙ্গেও বৈঠক হতে পারে মমতার। দেখা হতে পারে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও।

মমতার এই সফরে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে নেই একদা তাঁর ছায়াসঙ্গী মুকুল রায়। সারদা-কেলেঙ্কারি নিয়ে সিবিআই তদন্তের জেরে তৃণমূলের একের পর এক নেতা-মন্ত্রী-সাংসদ গ্রেফতার হওয়ার পরে এবং মুকুল নিজে বিজেপির দিকে ঝুঁকছেন, এমন জল্পনার জেরেই মোদী সম্পর্কে মমতা নরম মনোভাব নিয়েছেন বলে আজ ব্রিগেড সমাবেশে অভিযোগ করেছেন সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম। সেলিম বলেন, “মোদীকে কোমরে দড়ি দিয়ে ঘোরাবেন বলেছিলেন দিদি। আজ তিনি সেই দড়ি নিয়ে যাচ্ছেন কি না, সেটাই আমাদের প্রশ্ন।” কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নান বলেন, “এর আগে স্রেফ মোদীর মুখোমুখি হওয়ার জন্যই দিল্লিবাসের মেয়াদ বাড়িয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সম্মানে দেওয়া প্রণব মুখোপাধ্যায়ের নৈশভোজে হাজির হন মমতা।”

অথচ মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ তো দূরস্থান, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে রীতিমাফিক শুভেচ্ছা পর্যন্ত জানাননি। যদিও রাজনৈতিক ভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিজের গোটা মন্ত্রিসভাকে বসিয়ে দিয়েছিলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। মমতা অবশ্য তা নিয়ে কটাক্ষ করেছিলেন। আর মোদীর ঘোষিত রাজনৈতিক শত্রু নীতীশ কুমার তো বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই রাজ্যের অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

দিল্লিতে পালাবদল। রাজধানীতে পৌঁছে মমতা উঠলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে। তাই তৎপরতা সেই বাড়ির সামনে। ও দিকে সুনসান মুকুল রায়ের বাংলো। রবিবার। ছবি: রমাকান্ত কুশওয়াহা

অনড় মমতা আচমকা অবস্থান পাল্টালেন কেন? কংগ্রেসের আব্দুল মান্নান বা সিপিএম সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, সারদা কাণ্ড থেকে শুরু করে মুকুল রায়ের বিদ্রোহ, অন্য দিকে ঘনিষ্ঠ অনুচর শিবাজি পাঁজার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ দেখে মুখ্যমন্ত্রী প্রমাদ গুনছেন। সিবিআই, ইডি’কে ঠেকাতেই প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হচ্ছেন তিনি।

কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আবার বিজেপির তরফেও পাল্টা দায় দেখছেন। জয়রাম রমেশ যেমন বলছেন, “রাজ্যসভায় বিজেপি  সংখ্যালঘু। এই পরিস্থিতিতে এক দিকে দিল্লিতে দলের ভয়াবহ বিপর্যয়, অন্য দিকে বিহারে জিতনরাম মাঁজিকে নিয়ে পরীক্ষা ব্যর্থ হওয়ায় বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁদের আক্রমণাত্মক রণকৌশল কিছুটা বদলে ফেলেছেন।”

প্রধানমন্ত্রী অবশ্য এই যুক্তি মানতে রাজি নন। তাঁর বক্তব্য, “আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় যারা মতাদর্শগত ভাবে খুশি হতে পারেননি, তাঁরাই এ সব প্রচার চালাচ্ছেন। কিন্তু আমি সব সময়ই অন্য দলের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৭, রেসকোর্স রোডে বসে রাজনীতি করাটা আমার কাজ নয়। আমার কাজ দেশ চালানো।” প্রশাসক হিসেবে নিজেকে যে তিনি রাজনীতির বাইরে রাখতে চান, তার উদাহরণ হিসেবে গুজরাত প্রসঙ্গ টানছেন মোদী। তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের দশ বছর কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে প্রশাসনিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছিলেন মোদী। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “অরবিন্দ কেজরীবালের জয়ের পর সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছি। কেন্দ্র ও রাজ্যে ভিন্ন দলের সরকার এ দেশে নতুন নয়।”

মমতা মোদীকে এড়িয়ে গেলেও প্রধানমন্ত্রী কিন্তু গোড়া থেকেই রাজ্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলে এসেছেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠক করতে কলকাতায় পাঠিয়েছেন সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নিতিন গডকড়ী, কয়লামন্ত্রী পীযূষ গয়াল, মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি বা পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। রাজ্য সরকার আয়োজিত বেঙ্গল গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট সামিট-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। তার আগে এক বার রাজ্যে এসে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকও করেছিলেন তিনি।

কিন্তু তৃণমূল তো সিবিআইকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিৌযাগ করেছে?

প্রধানমন্ত্রীর জবাব, “এ কাজটা আগে কংগ্রেস করত। আর তাই সাধারণ ভাবে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, কেন্দ্রের সব শাসক দল সব সময় এ রকমটাই করে থাকে। কিন্তু তদন্ত তো দূরের কথা, সিবিআই কর্তারা কে কোথায় নিযুক্ত হবেন, সেটা নিয়েও আমি মাথা ঘামাই না।” সরকারি সূত্র বলছে, সারদা কেলেঙ্কারিতে সিবিআই তদন্ত শুরু হওয়ার সময় তৎকালীন আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদকে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, যখন আদালতের নির্দেশে তদন্ত হচ্ছে, তখন প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় তো দূরস্থান, আইন মন্ত্রকও যেন নাক গলায়। আর মোদীর নিজের কথায়, “আমরা কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে বলি না, কাউকে বাঁচানোরও চেষ্টা করি না।”

মোদীর সঙ্গে সাক্ষাতের পিছনে কোনও রাজনৈতিক কারণের কথা স্বাভাবিক ভাবেই মানছেন না মমতাও। তাঁর বক্তব্য, “রাজ্যের সব সাংসদকেই আমি প্রতিনিধি দলে সামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। কারণ, এটা রাজনীতির বিষয় নয়। অর্থনীতি ও উন্নয়নের বিষয়।” দিল্লি আসার আগে রবিবার কলকাতায় এক অনুষ্ঠানেও মমতা বলে এসেছেন, ‘‘ভিক্ষা চাই না, দয়া চাই না। অধিকার চাই।”

কিন্তু তা হলে এত দিন উন্নয়নের সব বৈঠক মমতা এড়িয়ে গিয়েছেন কেন? জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “এত দিন অপেক্ষা করেছি ঋণ মকুব নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয় কি না, তা দেখার জন্য। অর্থ কমিশনের রিপোর্টেও কিন্তু সে সম্পর্কে কোনও উচ্চবাচ্য নেই। তাই নিজেই দিল্লি এলাম।”

কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য মনে করছে, ঋণের বোঝা মকুব করা নিয়ে মমতার যে দাবি, তা মেটানো কার্যত অসম্ভব। অরুণ জেটলি বলেন, “অর্থ কমিশনের সুপারিশ মেনে রাজ্যকে অতিরিক্ত অর্থ সাহায্য দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যসভায় প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গকে অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। যা বিহার ও ওড়িশার থেকে অনেক বেশি।” কিন্তু মমতার পাল্টা বক্তব্য, ১৫টি কেন্দ্রীয় প্রকল্প বন্ধ করে দিয়ে রাজ্যের ঘাড়ে বাড়তি আর্থিক দায় চাপিয়ে দিয়েছে মোদী সরকার। ফলে হরেদরে রাজ্যের কিছুই লাভ হচ্ছে না।

তবে সম্প্রতি সংসদে দাঁড়িয়ে মোদী যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গের বেহাল আর্থিক দশার জন্য ৩৪ বছরের বাম শাসনকেই দুষেছেন, তাতে আশার আলো দেখছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, রাজ্যের তৃণমূল সরকারের প্রতি নরম মনোভাব নিয়েই চলছে মোদীর সরকার। কিন্তু কেন্দ্রের সেই মনোভাবের প্রতিফলন যে বিজেপির রণকৌশলে পড়বে না, তা স্পষ্টই জানাচ্ছেন দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ এবং দলের তরফে পশ্চিমবঙ্গের ভারপ্রাপ্ত নেতা সিদ্ধার্থনাথ সিংহ। তাঁদের কথায়, “প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকটি সাংবিধানিক বিষয়। সারদা তদন্তও সিবিআইয়ের ব্যাপার। কিন্তু রাজ্যে শাসক দলের বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তখন বিরোধী দল হিসেবে বিজেপি সেটাকে কাজে লাগাবে না কেন?” অমিতের মন্তব্য, “মমতা যদি বিজেপি সভাপতি হতেন, তা হলে আমি যা করছি, সেটাই করতেন।”

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন