এন আর এস হাসপাতালে চিকিৎসক নিগ্রহের প্রতিবাদে ১১ জুন থেকে শুরু হওয়া কর্মবিরতির চতুর্থ দিনে রাজ্য জুড়ে সরকারি হাসপাতালের সিনিয়র চিকিৎসকদের গণইস্তফা দেওয়া শুরু হয়েছিল। সারা রাজ্যে ইস্তফা দেওয়া চিকিৎসকের সংখ্যাটা সে দিন দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৯০০। সোমবার রাতে জুনিয়র চিকিৎসকেরা আন্দোলন তোলার পরে ছন্দে ফিরছে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা। কিন্তু কী করছেন সে দিনের গণইস্তফা দেওয়া চিকিৎসকেরা?

এসএসকেএম হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ চিকিৎসক সরোজ মণ্ডল, শল্য চিকিৎসক দীপ্তেন্দ্র সরকার-সহ আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসকের বক্তব্য, গণইস্তফা দেওয়ার পরেও কর্মবিরতি চলাকালীন তাঁরা জরুরি অস্ত্রোপচার, জরুরি বিভাগে রোগী দেখা এবং হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের পর্যবেক্ষণের কাজ চালিয়ে গেছেন। এখনও পুরোদমে পরিষেবায় অংশ নিচ্ছেন তাঁরা। তবে কি গণইস্তফা শুধুই বিভ্রান্ত করার জন্য ছিল?

এ কথা মানছেন না গণইস্তফায় শামিল এবং রাজ্য সরকার ও জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্যস্থতাকারী সিনিয়র চিকিৎসক গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট অভিজিৎ চৌধুরী। তাঁর কথায়, ‘‘এটাকে গণইস্তফার চেহারায় দাবি-সনদ বলা যেতে পারে। হাসপাতালগুলির নিরাপত্তা এবং পরিকাঠামো বাড়াতে চেয়ে জুনিয়র ডাক্তারদের যে আন্দোলন, তাতে সিনিয়র চিকিৎসকদের পূর্ণ সমর্থন ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছিল, সঠিক জায়গায় বার্তাটা সে ভাবে পৌঁছচ্ছে না। তাই এমন পদক্ষেপ করে চিকিৎসকদের দৃঢ় অবস্থানটা জানানো হয়েছিল।’’

স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, এ ধরনের ইস্তফার কোনও গুরুত্ব নেই। ইস্তফা গ্রাহ্য হয় একক পত্রে। এ ক্ষেত্রে রাজ্য স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তার উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও বিভাগের নাম করে ইস্তফাপত্রগুলি লেখা হয়েছিল। নীচে সই ছিল একাধিক চিকিৎসকের। চিঠিগুলি জমা পড়েছিল সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের অধ্যক্ষদের কাছে। চিকিৎসকদের দাবি, গণইস্তফা যে গুরুত্বহীন সেটা তাঁরা জানতেন। কিন্তু সেটা ছিল প্রতীকী প্রতিবাদ। ১৩ জুন, বৃহস্পতিবার এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসকদের সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য আঘাত করেছিল তাঁদের। যে কারণে সে দিন থেকেই এমন কিছুর ভাবনা হয়েছিল বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। ওই সন্ধ্যায় এন আর এসের অধ্যক্ষ এবং সুপার পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পরেই তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। কিছু পরেই কামারহাটির সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক গণইস্তফা জমা করেন বলে খবর আসে। তাতেই পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির হয়ে যায় বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। 

অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টর্স, পশ্চিমবঙ্গের জেনারেল সেক্রেটারি মানস গুমটার কথায়, “পদবি দেখে চিকিৎসা করি আমরা, এ কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী ধর্মীয় বিভাজনের মিথ্যে দায় চাপিয়েছিলেন ডাক্তারদের উপরে। তাতে গোটা চিকিৎসকমহল অপমানিত হয়েছিল। জুনিয়র চিকিৎসকেরা কাজ বন্ধ করায় পরিষেবা চালিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। পরিকাঠামো ও নিরাপত্তার যে ইসু নিয়ে আন্দোলনের শুরু, সেটা তো ছিলই। পাশাপাশি, আহত জুনিয়র চিকিৎসককে হাসপাতালে মুখ্যমন্ত্রীর দেখতে না যাওয়া প্রভৃতি কারণেই আমাদের মতো করে প্রতিবাদের প্রকাশ ছিল গণইস্তফা।” 

একই সুর অন্য চিকিৎসকদের কথায়। তাঁদের দাবি, ‘‘গণইস্তফা আইনত গুরুত্বহীন হলেও, এটা প্রহসন কখনও নয়। বরং রাজ্য সরকারের কিছু বক্তব্য এবং সমস্যার সমাধানে অনমনীয় মনোভাবের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ ভাবে কড়া বার্তা জানিয়েছিল চিকিৎসকমহল।’’