ওই, ওই যে পাহাড়টা দেখছেন, ওইটাতেই শ্যুটিং হয়েছিল অমুক ‘বই’টার! ওই যে বাড়িটা, ওইখানে এসে উঠেছিলেন তমুক হিরোইন!

বেড়াতে বেরিয়ে স্থানীয় গাইড বা গাড়িচালকদের কাছে এই জাতীয় টুকরো গল্প শোনা হয়েই যায়। জয়সলমিরে গেলে ‘সোনার কেল্লা’র গল্প, দার্জিলিং-এ ‘আরাধনা’ বা ‘বরফি’র কথা শুনতেই হবে। কাশ্মীর বা হিমাচল প্রদেশে তো পায়ে পায়ে বিছিয়ে থাকে সিনেমা-আলেখ্য!

সিনেমা আর পর্যটনের এই নিবিড় যোগকে কাজে লাগিয়েই এ বার পুরোদস্তুর ফিল্ম-পর্যটনে নামতে চায় কলকাতার একটি ভ্রমণ সংস্থা। পর্দায় দেখা বিখ্যাত শ্যুটিং লোকেশনগুলিতে পর্যটকদের প্যাকেজ ট্যুরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে তারা।

যেমন ধরা যাক, ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবির সেই পাহাড়টা! ঝোপজঙ্গল আর বড় বড় পাথরের চাঁই টপকে উঠে এসে গুপি-বাঘা দেখল, পাহাড়ের গুহায় একটা মানুষ শুয়ে। তাদের দেখতে পেয়েই কাটারি হাতে তেড়ে এল লোকটা। উদয়ন পণ্ডিত! পুরুলিয়ার জয়চণ্ডী পাহাড়েই তো তাঁর সঙ্গে প্রথম আলাপ গুগাবাবা-র!

যেমন ধরা যাক, সিনেমায় দেখা কলকাতার কিছু বনেদি বাড়ি! ‘পিকু’-র সেই বিরাট অট্টালিকার ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে বাড়িটার ইতিহাসের পাশাপাশি শ্যুটিংয়ের ইতিবৃত্ত শুনতে পেলে কেমন হয়? কিংবা ইটাচুনা রাজবাড়ি? সেটাই তো ছিল রণবীর সিংহ-সোনাক্ষী সিন্হার ‘লুটেরা’ ছবির লোকেশন!

অর্থাৎ বেড়াতে গিয়ে পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনার মতো সিনেমার গল্প শুনে আসা নয়! সিনেমার স্মৃতিকে হাতছানি করেই বেড়াতে যাওয়া! পৃথিবী জুড়েই পর্যটন ব্যবসার এখন অন্যতম মূলধন হল সিনেমা! বলিউডের ছবিতে দেশ-দেশান্তরে নিত্যনতুন লোকেশন! পর্যটক আকর্ষণ বাড়াতে ঝাঁপি উজাড় করে দিচ্ছে সে সব দেশের পর্যটন মন্ত্রক। সুইৎজারল্যান্ডে তো যশ চোপড়ার নামে বিশেষ ট্রেন আর হোটেল স্যুইট রয়েছে! রয়েছে বিভিন্ন শ্যুটিং স্পটে ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’র স্মারক! লাদাখ উপত্যকায় আলাদা করে চিহ্নিত করা আছে ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর শ্যুটিং স্পট! লাদাখের পর্যটন যে ফুলেফেঁপে উঠেছে ওই ছবিটার পর থেকেই, সে কথা এক বাক্যে মানেন স্থানীয়রা। আবার সিনেমা দেখেই অনেক সময় বেড়ানোর জায়গা ঠিক করে ফেলেন, এমন ভ্রমণপিপাসুও কম নেই! কলকাতারই এক বেসরকারি সংস্থার কর্মী মানালি চৌধুরী যেমন বললেন, ‘কহো না পেয়ার হ্যায়’ দেখে নিউজিল্যান্ড যাওয়ার লোভ জেগেছিল! কয়েক বছর পরে সেই স্বপ্ন সফল হয়!

কেন্দ্রীয় সরকারও পর্যটনকে নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা ভাবছে। সম্প্রতি যেমন সারা দেশে বস্ত্রশিল্পের পীঠস্থানগুলিকে নিয়ে পর্যটনের পরিকল্পনা সারা হয়েছে। উপদেষ্টা সংস্থা কেপিএমজি-র অন্যতম কর্তা অম্বরীষ দাশগুপ্ত ফিল্ম-পর্যটনের অমিত সম্ভাবনার কথাও মেনে নিলেন। সেই ভাবনা থেকেই কান ফিল্মোৎসবে তো গত কয়েক বছর ধরে
ভারতকে লোভনীয় লোকেশন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কারের তালিকায় শ্যুটিংয়ের জন্য সুবিধাজনক রাজ্য বলে আলাদা পুরস্কার চালু করা হয়েছে। ফিল্ম ব্যবসা বাড়ানোর পাশাপাশি এর পিছনে পর্যটন ব্যবসার হিসেবনিকেশও কাজ করছে।

কলকাতায় বসে এই ট্রেন্ডটাকেই কাজে লাগাতে চাইছেন একটি ভ্রমণ সংস্থার কর্ণধার দেবযানী বসু। তাঁর কথায়, ‘‘চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যটনেও নতুন ভাবনা চাই। ‘রিল লাইফ’-এর নানা জায়গা যেমন অনেককে টানে, তেমনই টানে তার নেপথ্যের গল্প। ছবির বিনোদনকে পর্যটনের সঙ্গে মিশিয়ে এটাকে একটা পরীক্ষা হিসেবেই ধরছি।’’

গোটা পরিকল্পনাটা অবশ্য এখনই ভাঙতে নারাজ দেবযানীরা। তবে এটা স্পষ্ট যে, রসদে টান পড়ার চিন্তা তাঁদের নেই। দার্জিলিঙে ‘আরাধনা’, কার্শিয়াঙে ‘কোমল গান্ধার’, বীরভূমের দুবরাজপুরে সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’, পুরুলিয়ায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘উত্তরা’, কলকাতার অলিগলিতে মৃণাল সেন থেকে সুজয় ঘোষ— উদাহরণ অজস্র!

কলকাতার গণ্ডি পেরিয়ে মুম্বই-পুণে-মহাবালেশ্বরকেও ক্রমশ এই সুতোয় বেঁধে ফেলার কথা ভাবা হচ্ছে।