দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পরে রেলের নিরাপত্তা কমিশনার পাতালপথের প্ল্যাটফর্মে ট্রেনচালকের জন্য বড় উত্তল আয়না রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু আয়না না-থাকুক, এখন মেট্রোয় রেকের গার্ডের কাছে সিসি ক্যামেরার মনিটর থাকে বলে জেনেছে পুলিশ। দরজা বন্ধ হয়েছে কি না বা দরজায় কেউ আটকে পড়েছেন কি না— সবই তাতে দেখা যায়। শনিবার পার্ক স্ট্রিট স্টেশনে দুর্ঘটনাগ্রস্ত রেকের গার্ড সেই মনিটর দেখেই ট্রেন ছাড়ার সঙ্কেত দিয়েছিলেন কি? উত্তরের খোঁজে চালক ও গার্ডকে একসঙ্গে বসিয়ে কথা বলতে চান তদন্তকারীরা। 

সেই সঙ্গে পুলিশের প্রশ্ন, শনিবার ট্রেনের দরজায় সজলকুমার কাঞ্জিলালের হাত আটকানো থেকে সুড়ঙ্গে ঢোকা পর্যন্ত ঠিক কী হয়েছিল, তার ছবি কি পাওয়া যাবে? লালবাজারের খবর, মেট্রো-কর্তৃপক্ষের কাছে সিসি ক্যামেরার ভিডিয়ো চাওয়া হয়েছে। কিন্তু মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত তা মেলেনি। পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, পার্ক স্ট্রিট স্টেশনের অনেক সিসি ক্যামেরাই যে খারাপ, তদন্তকারীরা তা জানতে পেরেছেন। সে-ক্ষেত্রে ঠিকঠাক ছবি ধরা পড়েছে কি না, সন্দেহ। মেট্রো ভিডিয়ো সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার আগে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না তদন্তকারীরা। দমদম মেট্রো স্টেশনে এক যুগলকে নিগ্রহের ঘটনাতেও সিসি ক্যামেরার কোনও ছবি মেলেনি। 

এই পরিস্থিতিতে হাতের কব্জি কতটা চওড়া হলে মেট্রোর দরজা আটকাবে না, সজলবাবুর মৃত্যুর তদন্তে নেমে সেটাই এখন জানতে চাইছে পুলিশ। লালবাজার জানিয়েছে, তাদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মেট্রোর দুর্ঘটনাগ্রস্ত রেকের দরজায় ১৫ মিলিমিটারের বেশি পুরু কিছু থাকলে তবেই দরজা বন্ধ হবে না, খুলে যাবে। বস্তুটি তার থেকে সরু হলে দরজা বন্ধই থাকবে। প্রাথমিক ভাবে পাওয়া এই তথ্য কতটা ঠিক, সেটাই পরীক্ষা করতে চান তদন্তকারীরা। দুর্ঘটনাগ্রস্ত রেকের দরজায় সে-দিন কতটা ফাঁক ছিল, তা-ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। 

দুর্ঘটনাগ্রস্ত ট্রেনটির ফরেন্সিক পরীক্ষা করানো হবে। তার জন্য বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, মেট্রোয় ট্রেনের দরজায় কী ধরনের সেন্সর রয়েছে, তা জানা দরকার। ‘অবস্ট্রাকশন সেন্সর’ থাকলে কব্জি সরুর তত্ত্ব খাটবে না। উন্নত মানের লিফটে এই ধরনের সেন্সর থাকে। তার ফলে দুই দরজার মাঝখানে সরু বা মোটা কোনও জিনিস এলে দরজা বন্ধ হবে না। সেই বস্তু কতটা চওড়া, সেন্সর তা মাপে না। 

লালবাজার সূত্রে এই তদন্তের জটিলতার কথাও জানানো হয়েছে। এমন দুর্ঘটনার তদন্ত এই প্রথম করছে কলকাতা পুলিশ। প্রযুক্তিগত জটিলতা খতিয়ে দেখতে হচ্ছে। প্রয়োজনে সেন্সর প্রযুক্তি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হবে। পুলিশের খবর, দুর্ঘটনার দিন কারা উপস্থিত ছিলেন, মেট্রো রেলের কাছে তাঁদের নাম জানতে চাওয়া হয়েছে। মেট্রোয়, বিশেষত দুর্ঘটনাগ্রস্ত ট্রেনে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল বা আছে, জানতে চাওয়া হয়েছে তা-ও।

পুলিশ জানাচ্ছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত মেট্রো তাদের প্রশ্নের কোনও উত্তরই দেয়নি। এ দিন ফের একটি ‘রিমাইন্ডার’ অর্থাৎ উত্তর চেয়ে নতুন চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলে থাকা মেট্রোকর্মীদের বয়ানও নথিবদ্ধ করেছেন তদন্তকারীরা। এ দিন পার্ক স্ট্রিটের প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রেলরক্ষী বাহিনীর কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা। তবে লালবাজার সূত্রের খবর, ওই কর্মীরা জানিয়েছেন, তাঁরা মূলত ‘অপারেশনন্স’ সংক্রান্ত বিষয়টি দেখেন, নিরাপত্তা নয়। 

রেলওয়ে সেফটি কমিশনার রবিবার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সরকারি ভাবে বৃহস্পতিবার তাঁর তদন্ত শুরু করার কথা। পুলিশ তার মধ্যেই নিজেদের তদন্তে জানতে চাইছে, কার গাফিলতি ছিল।