যেখানে প্রতিরোধ, সেখানেই মারপিট। সোমবার মনোনয়ন পর্ব ঘিরে এমনই ছবি দেখল উত্তরবঙ্গ এবং খাস কলকাতা। সব ক্ষেত্রেই অভিযোগের আঙুল শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন টিএমসিপি-র দিকে। কোথাও তাদের সঙ্গে তুলকালাম হল এসএফআইয়ের, কোথাও অভিযোগ উঠল বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপির উপরে হামলার। তবে সব থেকে বেশি চমক দিয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে প্রথমে টিএমসিপি গোলাপ দিয়ে গাঁধীগিরি করে। কিন্তু সময় গড়াতে তা বদলে যায় দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষে।

এ দিন সব থেকে বেশি গোলমাল হয়েছে শিলিগু়ড়ি এবং তার নিকটবর্তী নকশালবাড়ি কলেজে। নকশালবাড়ি কলেজ একেবারে সেখানকার বিডিও অফিস লাগোয়া। সকাল থেকেই সেখানে বাঁশ, ইট, পাথর নিয়ে ‘রণং দেহি’ মূর্তিতে জমা হন এসএফআই এবং টিএমসিপি-র ছাত্ররা। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ থাকলেও তারা প্রথম থেকেই হাত গুটিয়ে বসে ছিল। ফলে কলেজ খুলতেই দু’পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়ে যায়। বৃষ্টির মতো পড়তে থাকে ইট-পাথর। এমনকী, পুলিশকে লক্ষ করেও ইট ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। ইটের ঘাটে সার্কেল ইন্সপেক্টর কল্যাণ গুরুঙ্গ-সহ তিন পুলিশকর্মী জখম হয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত পুলিশ তিন রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। পরে এই ঘটনায় ছাত্রদের দু’পক্ষেরও মোট ১০ জন জখম হয়েছে বলে খবর।

এসএফআইয়ের অভিযোগ, মনোনয়নপত্র তুলতে গিয়ে শিলিগুড়ি কলেজেও তাদের পড়ুয়ারা টিএমসিপি-র হামলার মুখে পড়েছেন। আরও অভিযোগ, হেলমেট দিয়ে মেরে সাগর শর্মা নামে তাদের এক নেতার মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে, মারধর করা হয় বিমান ভট্টাচার্য নামে আর এক নেতাকে। যদিও টিএমসিপি এই সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে।

আলিপুরদুয়ার জেলার ফালাকাটা কলেজে আবার আক্রান্ত এবিভিপি। অভিযোগ, এবিভিপি প্রার্থীদের মনোনয়ন তুলতে নিয়ে যাওয়ার সময়ে ছাত্র সংগঠনের ব্লক সভাপতি সুজিত ঘোষকে আক্রমণ করে দুষ্কৃতীরা। মাথা লক্ষ করে ভোজালির কোপও মারে। কোনও মতে প্রাণ বাঁচিয়েছেন তিনি।

তবে সকলকে চমকে দিয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। সোমবার এখানে ছিল মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার দিন। সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলকাতা ক্যাম্পাসের দরজায় দাঁড়িয়ে টিএমসিপির সদস্যরা গোলাপ দিয়ে বিরোধীদের স্বাগত জানান। কিন্তু এই গাঁধীগিরির ঘটনা বদলে যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই। অভিযোগ, এসএফআই কর্মীদের হাত থেকে মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয়। ডিএসও সদস্যদেরও হেনস্থা করা হয় বলে অভিযোগ। যদিও টিএমসিপি এ কথা মানতে চায়নি। কিন্তু সন্ধ্যা গড়াতেই বিদ্যাসাগর স্ট্রিটের হস্টেলে টিএমসিপি-র দু’গোষ্ঠীর মধ্যে মারপিট শুরু হয়ে যায়। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) স্বাগত সেন এই ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাননি। তিনি বলেন, ‘‘এ রকম একটু আধটু হয়েই থাকে।’’

কলেজে কলেজে অশান্তি নিয়ে প্রায় একই সুরে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও বলেছেন, ‘‘রাজ্যে ৫৮২টি কলেজ রয়েছে। দু’চারটিতে এ সব হচ্ছে। তবে অবাধ্যতা হলে কঠোর হাতে তা দমন করা হবে।’’ কিন্তু ‘দু’চারটিতে’ এমন অশান্তি হচ্ছে কেন? বিরোধীদের অভিযোগ, রাজ্যের বেশির ভাগ জায়গায় টিএমসিপি-র চাপে প্রার্থীই দিতে পারেননি তাঁরা। যে সামান্য কয়েকটি জায়গায় তাঁদের শক্তি বেশি, সেখানেই মারধর করছে টিএমসিপি। এসএফআইয়ের অভিযোগ, নকশালবাড়ি কলেজে গত বারে তারা জয়ী হয়েছে বলে এ বারে প্রথম থেকেই তাদের আটকানোর চেষ্টা চলছে। তাদের আরও বক্তব্য, যেখানে বিরোধীদের জোর কম, টিএমসিপি-র গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফলে সেখানে গোলমাল হতে পারে। টিএমসিপির দার্জিলিং জেলা সভাপতি নির্ণয় রায় বলেন, ‘‘নকশালবাড়িতে বহিরাগতদের নিয়ে মনোনয়ন জমা দিতে এসে এসএফআই আমাদের উপর হামলা চালিয়েছে।’’ গোষ্ঠী কোন্দল থামাতে এ বার জলপাইগুড়িতে রীতিমতো নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প পেপারে যুব সভাপতি সৈকত চট্টোপাধ্যায় ও টিএমসিপি সভাপতি অভিজিৎ সিংহকে দিয়ে সই করিয়ে নিল তৃণমূলের জেলা নেতৃত্ব৷ কলেজ নির্বাচনে কে ক’টা আসনে লড়বেন সে ব্যাপারে দলের সিদ্ধান্ত জানিয়েও ওই নেতাদের দিয়ে স্ট্যাম্প পেপারে এ দিন সই করিয়ে নেওয়া হয়৷

শিক্ষামন্ত্রীও পাল্টা অভিযোগের সুরে বলেন, ‘‘নানা ঝান্ডা একত্রিত হয়ে টিএমসিপি-র ছাত্রদের মারধর করছে, এমন খবরও পাচ্ছি।’’ তবে শাসক দলের ছাত্র সংগঠন বলে টিএমসিপি-র যে বাড়তি দায়িত্ব আছে, তা-ও তিনি মেনে নিয়েছেন।