এত দিন থেকেছেন অন্তঃপুরে। অন্তর্মুখী সেই মহিলাই এখন ধর্মীয় সালিশি সভার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছেন।

মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে রঞ্জিতপুর গ্রাম এখন তোলপাড় হচ্ছে দুই সন্তানের মা, বছর আটত্রিশের নাসিমা বিবির বিদ্রোহে। স্বামী তাঁকে তিন তালাক দিয়েছিলেন। এখন মিটমাট করে আবার একত্রে থাকতে চান। কিন্তু শরিয়তের বিধান, স্বামীর কাছে ফিরতে হলে অন্য পুরুষকে বিয়ে করে তিন মাস কাটিয়ে ফের তালাক নিয়ে ফিরতে হবে, যাকে বলে ‘নিকাহ্ হালালা’। তাতেই বেঁকে বসেছেন নাসিমা বিবি।

বছর দেড়েক আগে পারিবারিক অশান্তির সময়ে গ্রামের রাস্তায় গিয়ে ‘তালাক তালাক তালাক’ বলে দেন নাসিমার স্বামী রবিউল। নাসিমা তখন ধারে-পাশে ছিলেন না। পরে গ্রামের লোকের কাছে তিনি বিষয়টি শোনেন। তবু তাঁকে বাপের বাড়ি চলে যেতে হয়। সঙ্গে যায় চোদ্দো বছরের ছেলে আর বারো বছরের মেয়ে।

সেই সন্তানদের মুখ চেয়ে এখন সংসারে ফিরতে চাইছেন রবিউল-নাসিমা। বাদ সেধেছে সালিশি সভা। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সভা বসিয়ে ধর্মীয় সমাজের মাথারা রায় দিয়েছেন, রবিউলের ঘরে ফিরতে গেলে নাসিমাকে ‘নিকাহ্ হালালা’ করতে হবে। এই নিয়ম অমান্য করলে তাঁদের গ্রাম ছাড়তে হতে পারে।

আরও পড়ুন: স্ত্রীর মৃত্যু, নিজের গলা কাটলেন বৃদ্ধ

রঞ্জিতপুরে বাপের বাড়িতে বসে দৃঢ় গলায় নাসিমা বলেন, ‘‘প্রথম কথা, আমার স্বামী যে তালাক কথাটা বলেছেন, তা নিজে শুনিনি। দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্ট তাৎক্ষণিক তিন তালাক নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আমাদের তালাকটাই তো অবৈধ। সেটা শোধরাতে অন্য পুরুষকে নিকাহ্ করতে হবে কেন! এখন ছেলেমেয়েকে ডেকে গাঁয়ের লোকে বলছে— তোর মায়ের বিয়ে, নেমন্তন্ন করবি তো! আমি কি খেলার পুতুল?’’

একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা নাসিমা ভুল বলছেন না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরে তিন তালাক (তালাক-এ-বিদ্দত) নাকচ করতে আইন তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সভার প্রধান আখতার হোসেন অবশ্য বলেন, ‘‘এত সাহস ওই মেয়ে‌র! সুপ্রিম কোর্ট নিষিদ্ধ করেছে তো কী? ওকে নিকাহ্ হালালা করতেই হবে। তবেই সে হালাল (পবিত্র) হয়ে রবিউলের ঘর করার যোগ্য হবে। আর কিছু লোক পাওয়া যায়, যারা বিয়ে করে নেয়। তিন মাস পরে তালাক পেতে অসুবিধা হয় না।’’ ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা রবিউলও বলছেন, ‘‘শরিয়তে যা আছে আর গ্রামের মাথারা যা বলছেন, আমি তাতেই রাজি।’’

নাসিমা কিন্তু লড়াই ছাড়ছেন না। তাঁর পাশে রয়েছেন একটি সংগঠনের সভানেত্রী খাদিজা বানু ও শমসেরগঞ্জের মৌলবি আব্দুল লতিফ। লতিফও বলছেন, ‘‘ওঁদের তালাকই তো বৈধ নয়। কাজেই হালালার প্রশ্ন ওঠে না।’’ আর নাসিমার কথায়, ‘‘শরিয়তের নিয়মের ভুল ব্যাখ্যা করে সমাজের মাথারা আমাকে ধর্ষিতা হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এর শেষ দেখে ছাড়ব।’’