ভুলে যাওয়াটাই বুঝি আসল? সেই নদী, বর্ষার ব্যাঙ-ডাকা ছাপিয়ে নদীর গর্জন, গরমে তার তিরতিরে চেহারাটা—  বিস্মৃতিটাই আসল হয়ে উঠছে।

নদীটার সেই সব চেহারা মনে পড়ে? পড়লে দিনে দুপুরে এখনও এ  ভাবে নদী চুরি চলত?

শেষতক তাই হল। প্রশাসন দেখেও দেখল আড়াল করল মুখ। বরং নিরুত্তাপ বাসিন্দাদের এখন সেই হারানো  নদীর কচুরি পানার উপরে দাঁড়িয়ে হুটোপুটি করেন— ‘‘জলের উপর হাঁটবি নাকি! চল চল, নদীটা দেখবি চল‍!’’

সত্যি! জলের উপর আবার হাঁটা যায় নাকি? যায়, বিস্মৃতির সেই জলঙ্গির উপরে তো যায়ই।

সেই অবাক করা কাণ্ড দেখতে সম্প্রতি ভিড় জমে গিয়েছিল নদিয়ার চাপড়ার তালুকহুদা গ্রামে। রাতারাতি কচুরিপানা জমে গিয়ে নদীর বুকে তৈরি হয়ে গিয়েছে সেতু। লোকে সদলবলে নেমে পড়ে নদীতে। কেউ কেউ আবার মোটরবাইক নিয়েই। শেষে ভিড় সামলাতে লাঠি হাতে নামতে হয় পুলিশকে। খবর ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামেও। ব্যস, ঝালমুড়ি-আইসক্রিমের পসরা সাজিয়ে জলঙ্গির মরা দেহটার দু’ধারে ছোটখাটো মেলা। সকলের মুখে এক কথা, ‘‘বাপের জন্মে নদীতে এমন কচুরিপানা দেখিনি বাবা।’’

কিন্তু কেন এমন কচুরিপানা? কোথা থেকেই বা এল এগুলো?

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, এক মাত্র বদ্ধ জলে কচুরিপানা জন্মায়। নদীতে এমন কচুরিপানার একটাই অর্থ, কোনও ভাবে স্রোত হারিয়ে ফেলেছে সে। নদীতে স্রোত কমে গেলে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায়। যা কি না জলজ প্রাণিদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। বাড়তে থাকে বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিম্যান্ড (বিওডি)। তখনই ব্যাপক হারে কচুরিপানা জন্মাতে থাকে জলে। ঠিক যেমনটা হয়েছে জলঙ্গিতে।

কিন্তু কী ভাবে স্রোত হারিয়ে ফেলল সে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর জন্য মানুষই দায়ি। নিজেদের সামান্য স্বার্থের জন্য নদীগুলোকে শেষ করে দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারাই।

ডোমকলের কাছে জলঙ্গির উপরে তৈরি হয়েছে বাড়ি।-সাফিউল্লা ইসলাম

অভিযোগটা যে সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়, স্বীকার করে নিচ্ছেন অনেকেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা যেমন জানালেন, এক সময় পদ্মা থেকে বেরিয়ে আসা জলঙ্গি প্রতি বছর দু’পাড় ভাসাতো। বর্ষা মানেই বন্যা। তখন বন্যার হাত থেকে বাঁচতে সবাই মিলে একটা উপায় বের করে। পদ্মা থেকে জলঙ্গিতে জল ঢোকে খরিয়া নালা (অনেকে খইরি বলেন, জলঙ্গিরই একটি অংশ) দিয়ে। সবাই ঠিক করেন ওই নালাটাকেই বুজিয়ে দেওয়া যাক। তা হলেই আর বন্যা হবে না। ব্যস, যেমন ভাবা, তেমনই কাজ। খড়িয়া নালা বুজিয়ে দিয়ে তার উপর তৈরি হয় রাস্তা। চাষিরাও খুশি। আর বন্যা নেই। তা ছাড়া নদীর পাশের উর্বর জমিটাতে ফসলও ভাল হয়।

এর পরেও অবশ্য জলঙ্গিতে জল ছিল। ভৈরব থেকে জল ঢুকতো নদীটাতে। কিন্তু সম্প্রতি একই কাজ করেছে ডোমকলের মানুষও। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মতিন বলেন, ‘‘চারুনগরের জুড়ানপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সাধারণ মানুষের দাবি ছিল, নদী বরাবর একটা রাস্তা করা হোক। সেতু হলেও কিন্তু চলত। কিন্তু তা না করে ভৈরব ও জলঙ্গিকে বিচ্ছিন্ন করে তৈরি হয়েছে রাস্তা।’’ এবং চিরকালের মতো স্রোত হারিয়ে বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে জলঙ্গি। আর তার জেরেই নদীটার এই অবস্থা, বলছেন পরিবেশবিদরা। তাঁদের বক্তব্য, এর পরিণতি হিসেবে ধীরে ধীরে মজে যাবে গোটা নদীটাই। ক্রমে এক সময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

বন্যার হাত থেকে ‘বাঁচতে’ নদী বুজিয়ে রাস্তা তৈরি অবশ্য নতুন কথা নয়। নদী বিশেষজ্ঞরাই জানাচ্ছেন, একই অবস্থা গোবরানালা, ছোট ভৈরব, অঞ্জনা, শিয়ালমারি, কালকুলির মতো ছোট ছোট নদীগুলোর। এ সবের মধ্যেই চলছে অবাধে নদী-চুরি। গরম কালে নদীতে যখন জল কম থাকে অনেকেই বোরো ধান চাষ করেন। কেউ কেউ আবার মাছ চাষও করেন। তার পর এক সময় সেটাকে নিজের জমি বলে দাবি করেন। আইনের ফাঁক গলে জমি দখল করে বাড়িও তুলে ফেলেন অনেকে। করিমপুরেই যেমন এক সময় জলঙ্গি নদীর উপর তৈরি হয়েছিল সেতু। এখনও সেতু আছে, কিন্তু সেতুর নীচে নদী নেই বললেই চলে। একটা অংশে কচুরিপানা ভর্তি। আর একটা অংশে চলছে পাট চাষ। শুধু সেতুটা দেখে বোঝা যায়, এক সময় কতটা জায়গা জুড়ে ছিল জলঙ্গি।

নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রের কথায়, ‘‘যত্রতত্র মানুষের এই দখলদারি বন্ধ হওয়া উচিত। এতে বন্যা কমবে না। বরং বাড়বেই।’’ যা হয়তো টের পাওয়া যাবে ভবিষ্যতে। নদী-বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, মানুষের বিস্মৃতিটাই আসল। ১৯৫৬, ১৯৭৮, ২০০০... বছর ষোলো আগে শেষবার হওয়া সেই ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি মানুষ ভুলে গিয়েছে কবেই। তখন তা-ও বন্যা হলে জল বেরিয়ে যাওয়ার কাজ করত জেলা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় নদীগুলো। কিন্তু এখন তো সেই রাস্তাটাই বন্ধ। পথ আটকে কোথাও তৈরি হয়েছে বাড়ি, তো কোথাও সড়ক। জল বেরোবে কোন পথে? ফলে ভবিষ্যতে বড় বন্যা হলে নদী ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সব। আগে জল নামতে দু’দিন সময় লাগলে, এখন দু’সপ্তাহেও সমস্যা মিটবে না।

কিন্তু এর কোনওটাই বুঝতে পারছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। আর তাই অবাধে চলছে নদী-চুরি কিংবা একেবারে খুন।

যার সর্বশেষ নজির— জলঙ্গি।

সহ প্রতিবেদন: সুজাউদ্দিন

 


 

 

জলঙ্গি মরে যাচ্ছে। জলঙ্গি একটি নদীর নাম। জলঙ্গি তেহট্টে।

আমি গাড়িতে এই তীব্র গরমে ফুল এসি চালিয়ে যাচ্ছি ওই নদী নিয়ে বক্তৃতা করতে এবং ঠিক বুঝতে পারছি না আমার এই বক্তৃতায় জলঙ্গি কী করে বাঁচবে?... জলঙ্গি নদীর উপর আমার আসন্ন বক্তৃতাটায় মনোসংযোগ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু জলঙ্গি তার সমস্ত স্নিগ্ধতা সহ উধাও হয়ে আমার চোখে ভেসে উঠল রায়বাবুর মুখ।... বহু দিনের পরিচয়। কাল রাতে ফোন করেছিলেন। দাদা কাল আসছেন তো? বাঁচান দাদা! আমাদের বাঁচান! আমি ভাবলাম জলঙ্গির উপর তাঁর আশৈশবের অগাধ ভালবাসা তাই অমন আকুতি। একটি নদী মরে গেলে তার জনপদটিও মূল্য হারায়। নদীমাতৃক এই দেশ...আজ প্রায় পনেরো বছর যাই না। ঝিরঝিরে সবুজ সাপের ফণার মতো ঢেউ নাকি কচুরিপানায় বন্দি। জলঙ্গির সেই বিখ্যাত চিংড়ি শুনলাম মহাপ্রস্থান করেছে। নদীর নৌকোরা ভেঙেচুরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে পাড়ে পরাজিত মৃত সৈনিকের মতো। জলে দুর্গন্ধ। দু’ধারে নোংরা আবর্জনা। মনটা খারাপ হল খুব। তাই রাজি হয়ে গেলাম নদী উদ্ধারে।...একটি নদী মজে যায় ভূপ্রকৃতির এক এক আশ্চর্য কারণে। আপনারা জানেন উত্তর ভারতের প্রায় সব নদীই পূর্ববাহিনী। কিন্তু কী এক অদ্ভুত কারণে আপনাদের এই জলঙ্গি পশ্চিমবাহিনী। শুরু পদ্মা থেকে তার পর এঁকে বেঁকে নদিয়ায় এসে গঙ্গায় ঝাঁপ। এখন দেখতে হবে যে নদী আজ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে অতীব নাব্য ছিল; এমনকী এর কুলে ছোট ছোট স্টিমার চলত। এর দু’ধারের শস্য, মাছ এই সব নিয়ে এক উৎকৃষ্ট জনপদের দিশারি ছিল সে হঠাৎই...

 

 

অমিতাভ সমাজপতির লেখা ‘জলঙ্গি’ গল্প থেকে।

সৌজন্যে: আনন্দবাজার আর্কাইভ