অডিও-ভিস্যুয়াল বিনোদন এখন আর সিনেমা বা ছোট পর্দার ধারাবাহিকের মধ্যে আটকে নেই। টিভি সিরিজ় এবং ওয়েব সিরিজ় এসে সেই সংজ্ঞা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বদল যে ক্রমাগত, তা বোঝা যাচ্ছে। কারণ টিভি-ওয়েব সিরিজ়ও নিজের ভাষা বদলে চলেছে।

নব্বইয়ের দশকে যে ধরনের টিভি সিরিজ় চলত, এখন তার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। 

২০০৭-০৮ থেকেই মূলত সেই বদল। নেটফ্লিক্সের মতো অনলাইন স্ট্রিমিং চ্যানেল আসার পর থেকেই বিনোদনের পরিভাষায় বৈপ্লবিক বদল আসে। নেটফ্লিক্সের দেখাদেখি এইচবিও, হটস্টার, অ্যামাজ়ন প্রভৃতি সংস্থা অনলাইন স্ট্রিমিং শুরু করে। কিন্তু ২০০৪ সালে দর্শক যে ধরনের শো দেখতেন, ২০১২ নাগাদ সেই ধাঁচ বদলে যায়। ২০১৭-১৮ নাগাদ এসে সিরিজ়গুলো আরও বড় লিপ নিয়েছে। ‘হাউস অব কার্ডস’ থেকে ‘সেন্স এইট’-এর জার্নি দেখলেই সেটা স্পষ্ট হয়। 

পলিটিক্যাল থ্রিলার ওয়েব-টিভি সিরিজ় ‘হাউস অব কার্ডস’ যেমন অনেক ধীর লয়ের শো। কিন্তু বছর দুয়েক ধরে যে সিরিজ়গুলো জনপ্রিয় হচ্ছে, প্রত্যেকটা ভীষণ দ্রুত গতির। ‘স্ট্রেঞ্জার থ্রিংস’, ‘সেন্স এইট’, ‘ডার্ক’ যেমন। সেই কারণেই হয়তো ২০১৯-এ ‘হাউস অব কার্ডস’-এর সিক্সথ সিজ়নে এপিসোড সংখ্যা ১৫ থেকে কমিয়ে ৮-এ নিয়ে আসা হয়। ভুললে চলবে না ‘গেম অব থ্রোনস’-এর কথা। ২০১০ সালে শুরু হওয়া এই সিরিজ়ের প্রত্যেকটা সিজ়ন সমান জনপ্রিয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে টানটান গল্প, টাইম-স্পেস নিয়ে খেলা... এগুলো দর্শক এই মুহূর্তে বেশি পছন্দ করছেন। 

পরিচালক মৈনাক ভৌমিক যেমন বলছেন, ‘‘এখন লোকজনের হাতে সময় খুব কম। আগে একটা এপিসোডের যে সময়সীমা ছিল, এখন তার চেয়ে আরও কম হয়ে গিয়েছে। আর প্রথম ১০ মিনিটের মধ্যে দর্শককে আকর্ষণ করতে না পারলে সে আর শো দেখবে না।’’ তাঁর মতে এই পালা বদলের সূত্রপাত ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর মতো সিরিজ় দিয়ে। একই কথা বলছেন অভিনেতা অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। তিনি ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর সঙ্গে ‘প্রিজ়ন ব্রেক’-এর কথাও উল্লেখ করে বললেন, ‘‘সময়ের সঙ্গে সিরিজ়ের ধারা বদলেছে। প্রথমত, দর্শক থ্রিলার দেখতেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। দ্বিতীয়ত, গল্প খুব দ্রুত এগোতে হবে। দর্শকের ধৈর্য এখন কমে গিয়েছে। আর এপিসোডের সময়ও এখন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’’

একটি সিরিজ়কে জনপ্রিয় করতে হলে তার প্রত্যেকটি সিজ়নই কিন্তু সমান টানটান হতে হবে। ‘নার্কোস’-এর প্রথম তিনটি সিজ়ন বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু ‘নার্কোস মেক্সিকো’ ততটা নয়। যদিও নির্মাতারা নতুন সিজ়ন আনছেন। একই কথা প্রযোজ্য ‘ফার্গো’র ক্ষেত্রেও। তবে এ ক্ষেত্রে প্রথম সিজ়নের চেয়ে পরের দু’টি সিজ়ন বেশি জনপ্রিয়। আবার ‘থার্টিনস রিজ়নস হোয়াই’-এর প্রথমটি যেমন বেশি জনপ্রিয়।

আর একটি বদল হল, অনলাইন চ্যানেলের জন্য সিনেমা তৈরি হওয়া। ‘রোমা’র মতো ছবির পাশাপাশি ‘বার্ড বক্স’ও হচ্ছে। দর্শক রুচি অনুযায়ী বেছে নেবেন। ঘটনাচক্রে ‘বার্ড বক্স’-এর মতো ছবি নিয়েই আগ্রহ বেশি। ‘ব্ল্যাক মিরর’ এমনিতেই জনপ্রিয় সিরিজ়। তারাই নিয়ে এসেছে ইন্টারঅ্যাক্টিভ ফিল্ম ‘ব্যান্ডারস্ন্যাচ’। এই ছবিটি বিনোদনের নতুন দিক খুলে দিয়েছে বলা হচ্ছে। অনিন্দ্য যেমন বললেন, ‘‘দর্শক মনে করছেন তিনিই পরিচালক। ‘ব্যান্ডারস্ন্যাচ’-এ ন্যারেশন কী ভাবে এগোবে তা তাঁরা ঠিক করছেন। এই ফর্মুলা ছবিটিকে রাতারাতি হিট করে দিয়েছে।’’

মৈনাক অবশ্য এই নতুন ফর্মুলা নিয়ে বেশি উৎসাহী হন। ‘‘একটা সময়ে ডিভিডি বিক্রির কৌশল হিসেবে তিন রকমের ক্ল্যাইম্যাক্স রাখা হতো অপশনে। ‘ব্যান্ডারস্ন্যাচ’কে আমি একটা চমক হিসেবেই দেখছি।’’ পরিচালকের মতে, সিরিজ় এবং অনলাইন ছবির জনপ্রিয়তার বড় কারণ, হলিউডের সেরা লিখিয়েরা এখন এ দিকে মন দিয়েছেন। 

কিছু দিন আগে একটি মিম ভাইরাল হয়েছিল। যেখানে দেখা যাচ্ছিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নাম ‘হলিউড’ সরিয়ে ‘নেটফ্লিক্স’ করে দেওয়া হচ্ছে! নেহাত মজার ছলে হলেও অনলাইনের দাপট বলে দিচ্ছে, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি কোণঠাসা।