হালে পরপর বেশ কিছু ছবি বাংলা-হিন্দি দুই ইন্ডাস্ট্রিতেই হচ্ছে, যেখানে চরিত্রদের লুকের ভোল পাল্টে দিচ্ছে প্রস্থেটিক মেকআপ। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে কী? ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেকআপ শিল্পীদের নিখুঁত হাতের কাজে এক জন অভিনেতার চেহারা আমূল বদলে ফেলার পদ্ধতি? নাকি তার ভিতরেও থাকে কেমিক্যাল এবং আরও বিভিন্ন খুঁটিনাটি প্রক্রিয়া, যা কিনা একটু ভুলচুক হলে চূড়ান্ত ক্ষতিও ডেকে আনতে পারে? 

সম্প্রতি ভূমি পেডনেকর একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখানে তাঁর মুখে একাধিক পোড়া দাগ। পরবর্তী ছবি ‘সন্ড কী আঁখ’-এ প্রস্থেটিক মেকআপের কেমিক্যাল বিক্রিয়ার ফলেই দুর্ঘটনা। ছবিতে নিজের চরিত্রটির জন্য রোজই প্রায় তিন ঘণ্টা মেকআপ সেশনে বসতে হচ্ছিল ভূমিকে। উত্তরপ্রদেশের গনগনে রোদে আট ঘণ্টা করে শুটিংও করতে হচ্ছিল। রোদ্দুর এবং ধুলোবালির ফলে প্রস্থেটিকের খারাপ রিঅ্যাকশন হয়েছে তাঁর ত্বকে। 

সমস্যায় পড়েছেন দীপিকা পাড়ুকোনও। এই মুহূর্তে ‘ছপক’-এর শুটিং করছেন। রোজ ছ’ঘণ্টা করে মেকআপ করতে হচ্ছে তাঁকে। এবং দীপিকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন যেটা, তা হল বেশ কয়েকটি পর্যায়ে প্রস্থেটিক লুক সেট করা হয়েছে তাঁর জন্য। একটি পর্যায়ে চরিত্রটির মুখে অ্যাসিড ছোড়া হয়, যার ফলে মুখটা পুরো লাল হয়ে যায়। তার জন্য এক রকম মেকআপ। মুখটা ঝলসে যাওয়ার পরে এক রকম মেকআপ। সার্জারির পরে শুকিয়ে গেলে আর এক রকম। আলাদা আলাদা মেকআপ নিয়ে সারা দিন ১২-১৩ ঘণ্টা করে শুটিং করতে গিয়ে দীপিকার ত্বকে কিছু ইরিটেশন হচ্ছে বলেও শোনা গিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী দীপিকাকে এয়ার কন্ডিশনড ঘরে, জোরে ফ্যান চালিয়ে তার সামনে বসে মেকআপ শুকিয়ে নিতে হবে। কিন্তু আউটডোরে রোদের মধ্যেও শুটিং করতে হবে তাঁকে। আর তার মধ্যে মেকআপ টিকিয়ে রাখাটাই মেকআপ আর্টিস্ট ক্লোভার উটনের কাছে চ্যালেঞ্জ।  

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

কিন্তু এক জন অভিনেতার কাছে তো তাঁর মুখটাই সবচেয়ে মূল্যবান অ্যাসেট। তা নিয়ে এমন ঝুঁকির খেলা? প্রস্থেটিকের গোটা বিষয়টার দিকে আলোকপাত করার চেষ্টা করলেন পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। তিনি ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘আমাজন অভিযান’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’-এ বারবার প্রস্থেটিক ব্যবহার করেছেন। জানালেন, আগামী ছবি ‘পাসওয়ার্ড’-এ দেব, পরমব্রত, পাওলি এবং রুক্মিণী সকলের মুখেই প্রস্থেটিক ব্যবহার করার কথা রয়েছে। কমলেশ্বরের কথায়, ‘‘প্রস্থেটিক মেকআপ করতে বেশ কিছু কেমিক্যাল লাগে। যেমন সিলিকন, লিকুইড ল্যাটেক্স, ফোম ল্যাটেক্স, জেলাটিন, কোল্ড ফোম, গ্লু। আর লাগে প্রস্থেটিক অ্যাডহেসিভ রিমুভার। বাকিটা প্রকৃত স্থাপত্যশিল্পীর হাতের কাজ— কে কত নিখুঁত প্রস্থেটিক করতে পারেন।’’ বেশ কিছু সমস্যার কথাও উল্লেখ করলেন তিনি, যেগুলো দীপিকা বা ভূমির ক্ষেত্রে ঘটেছে। ‘‘গরমে মেকআপ গলে যেতে পারে। মেকআপ তোলার সময়ে চামড়াও উঠে যেতে পারে। কারও কারও প্রস্থেটিক কেমিক্যালে অ্যালার্জি থাকে। আর দীর্ঘক্ষণ এর ব্যবহারে ত্বকের ক্ষতিও হতে পারে,’’ ব্যাখ্যা পরিচালকের।

আবীর চট্টোপাধ্যায় ‘বিদায় ব্যোমকেশ’-এ প্রস্থেটিক ব্যবহার করে বৃদ্ধ সেজেছিলেন। চার-পাঁচ ঘণ্টা করে মে‌কআপ নিতে হতো অভিনেতাকে। মুম্বই থেকে ধনঞ্জয় প্রজাপতি এবং তাঁর টিম এসেছিল তাঁর লুক সেট করতে। আবীর বলেছেন, ‘‘মেকআপ করার চেয়েও তোলাটা অনেক বেশি কঠিন ছিল। এক চুল এ দিক-ও দিক হলে র‌্যাশ বেরিয়ে যাওয়া বা মুখের চামড়া উঠে আসা অনেক কিছুই হতে পারত। আমার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি অবশ্য।’’ গরমে মেকআপ গলে যাওয়ার সমস্যা থেকেও রেহাই পেয়েছিলেন কারণ, শুটিং হয়েছিল শীতকাল নাগাদ। টেলিভিশনে রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘স্বপ্নউড়ান’ ধারাবাহিকের জন্য এক বার প্রস্থেটিক ব্যবহার করেছিলেন। ‘‘একটা ছোট অংশের জন্য করতে হয়েছিল। তবে প্রচুর সময় লেগেছিল মেকআপ করতে। র‌্যাশ বেরোনো বা চামড়া উঠে আসার মতো সমস্যা হয়নি কারণ, বালক-অঞ্জন বলে যে দু’জন আমার প্রস্থেটিক করেছিল, তারা দারুণ কাজ করেছিল।’’ সুতরাং মেকআপের ডিগ্রি এবং শিল্পীর হাতযশের উপরেই নির্ভর করছে প্রস্থেটিকের পারফেকশন এবং অভিনেতার সুরক্ষা।