পরিচালক প্রতিম ডি গুপ্ত প্রশ্ন তুলেছিলেন ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’-এর চিত্রনাট্য নিয়ে। তাঁর দাবি, তিনি এবং ঋতুপর্ণ ঘোষ এই স্ক্রিপ্টটি লিখেছিলেন, নাম ছিল ‘অন্য নায়ক’। কিন্তু আজ সেই গল্প নিয়ে যখন ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ ছবিটি তৈরি হচ্ছে, সেখানে তাঁর নাম কোথাও নেই। প্রতিমের বক্তব্য ছিল, চিত্রনাট্য যদি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় সম্পূর্ণ নতুন ভাবেই লিখে থাকেন, তা হলে ঋতুপর্ণর নাম কেন ব্যবহার করা হচ্ছে? ঋতুপর্ণর ভাই ইন্দ্রনীল ঘোষের দিকেও ছিল তাঁর অভিযোগের তির। 

প্রতিমের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং ইন্দ্রনীল ঘোষেরও রয়েছে মতামত। আমরা এখানে সেটাই তুলে দিলাম...

 

কৌশিক: ঋতুপর্ণর বাড়িটা ছিল একটা পাঠশালা। আমি, মৈনাক (ভৌমিক) এবং আরও অনেকেই একসঙ্গে বসে স্ক্রিপ্ট ডেভেলপ করতাম। ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’-এ বহু সংলাপ ঋতুপর্ণ ঘোষের লেখা। কিন্তু নাম তো গিয়েছে আমার। ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’-এ বুম্বাদারও আইডিয়া রয়েছে। আমার খুব অপমানিত লেগেছে। দর্শক জানেন, ঋতুপর্ণ ঘোষের আদৌ কো-রাইটার প্রয়োজন হয় কি না। প্রতিম কাকে অপমান করছে? তোর আমাকে চোর বলতে খারাপ লাগছে না? আমি তোর চেয়ে সিনিয়র। ২৩টা ছবি বানালাম নিজের গল্প নিয়ে। কী প্রয়োজন পড়ে ঋতুপর্ণ ঘোষের গল্প নিয়ে ব্যবসা করার? মাত্র পাঁচটা ছবি বানিয়ে কৌশিক গাঙ্গুলিকে মিথ্যেবাদী প্রতিপন্ন করছিস! কলকাতায় এই একটা মানুষই আছে, যার সব ছবি নিজের গল্পে। ও এত মারাত্মক লেখে যে, বারবার ওর গল্পই বেহাত হয়! তা হলে সে রকম একটা ছবিও বানাক। ঋতুপর্ণ ঘোষের ছাত্র হিসেবে শুধু আমারই অধিকার আছে। গর্ব করছি না, আজ যেটুকু সম্মান পেয়েছি, তাতে ঋতুপর্ণ ঘোষ নামটা বিক্রি করার আমার প্রয়োজন হয় না। এটা আমার গুরুদক্ষিণা বলতে পারেন। যে মানুষটা (ইন্দ্রনীল ঘোষ) এক পয়সা নিল না স্ক্রিপ্টটা দেওয়ার সময়ে, তার কিনা ‘ভেস্টেড ইন্টারেস্ট’ আছে! পোস্টারটা পড় ভাল করে। চিঙ্কুদা এ ছবিতে কাজই করেনি। ছবিটা দেখলে বুঝবেন, এটা চুরি করার মতো বিষয় নয়। জলের মতো একটা সোজা লাইন। ওই লাইনটুকু পেলেই একটা স্টোরি হয়ে যায়। প্রত্যেকটা গল্পের একটা জ্যামিতি থাকে। তাতেই গল্প বসিয়ে দেওয়া যায়। তাই গল্পের নিউক্লিয়াস ঋতুপর্ণ ঘোষের। সিনিয়রদের এ ভাবে অপমান করে প্রতিম হয়তো কিছু মানুষের তারিফ পাবে। কিন্তু পরিচালক হিসেবে নিজের জায়গাটা প্রমাণ করতে হবে। আর ও কাদের অপমান করল, যারা ওকে সৌজন্য দেখিয়েছিল? ঋতুপর্ণর সঙ্গে কনসেপ্ট ডেভেলপমেন্টে ওর নাম দেব বলেছিলাম। সেটা নিতান্ত ওর কথায়, কোনও প্রমাণের ভিত্তিতে নয়। এত কিছুর পরে আমি আর ওই সৌজন্যটুকুও দেখাব না। 

প্রসেনজিৎ: সবচেয়ে খারাপ লাগছে চিঙ্কুর জন্য। ঋতুর যা কিছু রয়েছে, তার সবটুকুর আইনি মালিকানা ওর। লোকটা সম্পর্কে কেউ বলতে পারবে না, ঋতুর কিছু বিক্রি করেছে ও। চিঙ্কু ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড জেতা আর্ট ডিরেক্টর। ঋতুর নাম ব্যবহার করে ছবিটা তো একশো কোটি টাকা রোজগার করবে না! ছবির ভাবনাটা গোড়া থেকেই জানতাম। আমার মা মারা গিয়েছেন, ফোটোগ্রাফাররা বলছেন, ‘মাকুদি, দাদা... এখানে এক বার বসবেন?’ ওই সময়টায় ঋতু আমার বাড়িতে পাঁচ দিন থেকেছিল। বলেছিল, ‘এই ক’দিন যা দেখলাম না রে, তা দিয়ে সিনেমা বানাব।’ পরে ‘অটোগ্রাফ’ সাইন করে ঋতুকে বললাম, ‘পরপর দুটো সুপারস্টারের চরিত্র করব না।’ আর রাইটসের কথা? একটা পথ আলোচনা। অন্যটা প্রমাণ করা। ও প্রমাণ করুক তা হলে। আর পরপর প্রতিমেরই স্ক্রিপ্ট চুরি হচ্ছে? এমনও হয়, একটা গল্প নিয়ে হয়তো ভাবছি। কানাঘুষোয় শুনলাম, অন্য কেউ হয়তো সেই লাইনে ভাবছে। আলোচনা করে ছেড়ে দিই গল্পটা। কোনও ইনপুট দিলে সেই গল্পটা তার হয়ে যায় না।

ইন্দ্রনীল: দাদাকে বেচে বড় হতে হবে, সে দরকার কোনও দিন পড়েনি। আজ এমন এক জনের কাছে শুনতে হল, দাদাকে নিয়ে ব্যবসা করছি, যাকে বলেছিলাম, স্ক্রিপ্টটা নিয়ে যেতে। তার দু’বছর পরে একটা লোক সেই স্ক্রিপ্ট নিয়ে ছবি বানাচ্ছে। সেটা দেখে প্রতিম সবাইকে অপমান করছে! দাদা নেই, অথচ ও সংবাদপত্রে ওপেন স্টেটমেন্ট দিয়েছে, ‘বাইশে শ্রাবণ’ যে কপি, সেটা নাকি দাদা ওকে ফোন করে বলেছে! এই নোংরামোটা বন্ধ হোক। ঋতুপর্ণ ঘোষ ধরে ঝুলে পড়লে কিস্সু হবে না। ‘বাইশে শ্রাবণ’ গল্পটা প্রতিমের? সেটাও তো অন্য একটা গল্প থেকে নেওয়া! ‘ভ্যানিশ’ও অন্য গল্প থেকে নেওয়া। তার মানে সবাই অন্য গল্প থেকে নিয়ে কাজ করে? স্ক্রিপ্টটা দিয়েছি, ওখানেই আমার ভূমিকা শেষ। 

...তিক্ততা ক্রমশ বাড়ছে। তাই প্রসেনজিৎ, কৌশিক এবং ইন্দ্রনীলের সিদ্ধান্ত, এর পর থেকে এ বিষয়ে আর কোনও কথা নয়।

পারমিতা সাহা