জব হ্যারি মেট সেজল

পরিচালনা: ইমতিয়াজ আলি

অভিনয়:  শাহরুখ খান, অনুষ্কা শর্মা

৪.৫/১০

 

শাহরুখ খানের কাছ থেকে এই মুহূর্তে দর্শক কী আশা করেন? 

রোম্যান্স কিঙ্গ এখনও সেই কুড়ি বছর আগের মতো নায়িকাদের সঙ্গে একই ভাবে প্রেম করে যাবেন? হ্যাঁ এতে দ্বিমত নেই যে, তাঁর মতো অত গভীর ভাবে প্রেমিকার দিকে তাকাতে অন্য কোনও হিরো পারেন না। তেরো বছর আগে ‘জারা’র কিংবা এখনকার ‘সেজল’-এর কপালের উপর থেকে চুল সরিয়ে দেওয়াটা যেন আর্ট। আবার ধরুন প্রিয়তমার কোমরে টান দিয়ে তাকে এতটাই কাছে নিয়ে আসা যে নিঃশ্বাসের স্পর্শ পাওয়া যায়... এ সবই শাহরুখের সিগনেচার স্টাইল। দর্শক মনে রেখেছেন। কিন্তু তার পর? মুশকিলটা এখানেই। তার আর পর নেই। যে জায়গার আপনি রাজা সেখানটাই যেন বারবার জয় করে দেখতে চাইছেন, একান্ন বছরেও আগের মতো সেটা করতে পারেন কি না! জিতে নেওয়ার মতো আরও যে নতুন রাজ্য পড়ে আছে, তাতে রাজার নজর নেই। এ দিকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিজেদের লুক, ক্যারেকটারে ভাঙচুর করে সেটাই করতে চেষ্টা করছেন। হ্যাঁ, শাহরুখ বদল এনেছেন বই কী! চেহারায়। আগের পেশি-বিহীন টোনড চেহারাটা বোধ করি ভাল লাগছে না, মাসল-টাসল বানিয়ে মাচো হতে চাইছেন। কিন্তু বয়স দিব্যি জানান দিচ্ছে তাঁর মুখে, গলায়, হাতের অসংখ্য শিরা-উপশিরায়... 

যাই হোক, ‘জব হ্যারি মেট সেজল’ ঘিরে প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশছোঁয়া। অভিনয়ে শাহরুখ, অনুষ্কা, পরিচালনায় ইমতিয়াজের মতো হেভিওয়েটদের নাম। কিন্তু তাঁরা কী দিলেন দর্শককে? ছবির গল্পটা বলি। ওহ! কী বলব, নামেই তো বলা হয়ে গিয়েছে। জব হ্যারি মেট সেজল! তারা ছাড়া ছবিতে সাবপ্লট বা সহযোগী কোনও চরিত্র নেই। বিদেশে বেড়াতে এসে এনগেজমেন্ট আংটি হারিয়ে ফেলে সেজল। ট্যুর গাইড হ্যারির সাহায্যে তা খুঁজতে প্রাগ, বুদাপেস্ট, আমস্টারডাম কোথায় না কোথায় চষে ফেলে। তার মধ্যে অনর্থক কতগুলো গান এবং নাচ দর্শকের বিরক্তি বাড়িয়েছে। একমাত্র অরিজিৎ সিংহের গাওয়া ‘হাওয়ায়েঁ’ গানটি ধৈর্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। অত্যন্ত ধনী পরিবারের মেয়ে আধুনিকা সেজল যে ভাবে গুজরাতি অ্যাকসেন্টে ইংরেজি বলে, তা শুনলে প্রথমে হাসি, কিছুক্ষণ পর থেকে বিরক্তি লাগে। সেজল নানা ভাবে হ্যারিকে উত্তেজিত করে শরীরী সম্পর্ক স্থাপনের জন্য। কিন্তু হ্যারির মধ্যে আছে মূল্যবোধ। সে অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে পারলেও ‘সফট বিউটিফুল’ সেজলের সঙ্গে ‘ও সব’ করতেই পারে না। এ দিকে আকছারই তারা আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়, একই বিছানায় শুয়ে থাকে পরস্পরকে জড়িয়ে... সেজলকে হ্যারি জানায়, ‘তুম উস টাইপ কি লড়কি হো হি নেহি’। অবাক লাগে ‘লভ আজ কাল’ যে পরিচালক বানিয়েছেন, তাঁর ছবিতে এ হেন বোকা বোকা সংলাপও থাকে!

এ ছবির সমস্যা শুধু শাহরুখের রিপিটেটিভ হওয়া নয়, ইমতিয়াজের কনফিউজড প্রেম আর নিজের সত্তাকে খুঁজে বেড়ানো... দেখে-দেখেও দর্শক হা-ক্লান্ত। টাকা এবং ১৫৪ মিনিট খরচ করার পর ঝুলি অপ্রাপ্তিতে পূর্ণ বলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট নিন্দেমন্দে ভেসে যাচ্ছে। দর্শকের দোষ নেই। ‘সেজল’ চরিত্রটা অনুষ্কা শর্মার মতো ভাল অভিনেত্রীর কাছেও সম্ভবত পরিষ্কার ছিল না। থাকা কি সম্ভব? কখন তাকে ‘সেলফিশ’ এবং কখন ‘উসকি লায়ক’ (অর্থাৎ শরীরী সম্পর্কের যোগ্য) হতে হবে, তাতে তিনি ঘেঁটে ঘ! সঙ্গে দর্শকও। চন্দন রায় সান্যালকে যে ভাবে বাংলাদেশি ভিলেনের চরিত্রে দেখানো হয়েছে তা রীতিমত দৃষ্টিকটু। পৃথিবী জুড়ে শাহরুখের যা ফ্যান ফলোয়িং, তাতে এটুকু দায়িত্ব সচেতনতা তাঁর ও পরিচালকের কাছ থেকে কাম্য। আর লোকেশন! সেটাও এ ছবির প্লাস পয়েন্ট হতে পারেনি। প্রাগ, বুদাপেস্ট-সহ কত জায়গায় শ্যুট হয়েছে। কিন্তু সে কি ছাই দেখে বোঝার উপায় আছে! ছবিতে ম্যাপে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে অমুক জায়গা থেকে তমুক জায়গায় যাওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক বৈচিত্র বলে যে একটা ব্যাপার আছে, তা এ ছবি দেখে আপনি জানতে পারবেন না। পরিশেষে আবার শাহরুখে ফিরি! তাঁর ছবি নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন ছিলই, তা আরও গাঢ়তর হচ্ছে। তিনি মানুন বা না-মানুন, একটা ছবির পিছনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আর এক খান যে সময়, ভাবনা, নতুন কিছু করার প্যাশন অনুভব করেন, শাহরুখও কি ততটাই করেন? নাকি আইপিএল টিম, প্রোডাকশন হাউস, স্টেজ শো সর্বোপরি নিজের মুকুট ধরে রাখার চিন্তায় পাখির চোখ থেকে তাঁর লক্ষ্য সরে গিয়েছে! ভেবে দেখবেন মি. খান।