সদ্য শুরু হয়েছে উনিশ শতক। লর্ড ওয়েলেসলির পরিকল্পনায় কলকাতা থেকে মাত্র ষোলো মাইল উত্তরে ব্যারাকপুরে সূচনা হল গভর্নমেন্ট হাউসের। ১৮২৩-এ মার্কুইস অব হেস্টিংস তা সম্পূর্ণ করলেন। প্রথমে গভর্নর জেনারেল, আর পরে ভাইসরয়দের সপ্তাহান্তিক বিশ্রামের এটাই ছিল প্রিয় জায়গা। নিয়মিত বেড়াতে আসতেন অতিথি-অভ্যাগতরাও। শতাব্দীশেষে শিমলার আকর্ষণের কাছে ব্যারাকপুর দ্রুত ম্লান হয়ে গেলেও ব্রিটিশ প্রশাসকদের পছন্দের তালিকা থেকে তা কখনওই একেবারে মুছে যায়নি। স্বাধীনতার পর হুগলি নদীর তীরে ক্লাসিক্যাল স্থাপত্যের লাটভবন-সহ তিনশো একরের মতো জমি (ব্যারাকপুর পার্ক) রাজ্য সরকারের হাতে আসে। বাড়িটি পরিণত হয় পুলিশ হাসপাতালে, শুরু হয় তার দুঃখের দিন। রাজ্যপালের জন্য সংরক্ষিত থাকে ফ্ল্যাগস্টাফ হাউস আর জাভা অভিযানে নিহতদের স্মৃতিতে লর্ড মিন্টোর তৈরি করা সেনোটাফ সংলগ্ন এলাকা, যেখানে পরে স্থানান্তরিত হয় কলকাতার মাঠ-ময়দান-রাস্তা থেকে নির্বাসিত ব্রিটিশদের কিছু মূর্তি। চিড়িয়াখানা, পাখিরালয় তো অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছিল, মোতিঝিল প্রায় বুজে আসার অবস্থা, তার উপর লেডি হার্ডিং ব্রিজ জরাজীর্ণ, বাংলোগুলিও লুপ্তপ্রায়। ছিল শুধু সেই বিখ্যাত বটগাছ, যার ছায়ায় অনেক দুপুর কাটিয়ে গিয়েছেন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা বহু বিশিষ্ট শ্বেতাঙ্গ নারীপুরুষ। অমিতাভ কারকুনের মতো কিছু আগ্রহী মানুষ নিয়মিত লেগে থেকেছেন যাতে ব্যারাকপুর পার্ক তার স্থাপত্য আর ঐতিহ্য নিয়ে একেবারে হারিয়ে না যায়। চিঠি দিয়েছেন হেরিটেজ কমিশনে। তাঁরাই ঝোপজঙ্গলের মধ্যে খুঁজে খুঁজে বার করেছেন চিড়িয়াখানা আর পাখিরালয়ের ধ্বংসাবশেষ, কিংবা আগরা দুর্গ থেকে হেস্টিংসের তুলে আনা মার্বেলের সেই ফোয়ারা! লেডি ক্যানিং মারা গিয়েছিলেন কলকাতায় (১৮৬১), তাঁকে সমাহিত করা হয় ব্যারাকপুরে। ১৮৬৪-তে তৈরি সমাধিস্মারকটি দ্রুত নষ্ট হতে বসায় শেষমেশ স্থানান্তরিত হয় কলকাতার সেন্ট জন‌্‌স চার্চে। ব্যারাকপুরে স্থাপিত হয় তারই রেপ্লিকা। তিনিই বোধ হয় ব্যারাকপুরের প্রাসাদ আর বাগানকে সব থেকে বেশি ভালবাসতেন। নিজের পরিকল্পনায় নতুন রূপ দিয়েছিলেন বাগানকে। তাঁর সমাধির খুব কাছেই পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছিল লর্ড ক্যানিং-এর অশ্বারূঢ় মূর্তিটিকে (সঙ্গের ছবি)। আজ সে ছবি অনেকটাই বদলেছে। কোনও জাদুকাঠির ছোঁয়ায় নয়, পুলিশকর্তা সৌমেন মিত্রের জেদ, সঙ্গে আরও অনেকের অক্লান্ত চেষ্টায়। আছেন অধ্যাপিকা মনাবি মিত্রও, সৌমেন আর তিনি মিলে লিখে ফেলেছেন সেই ভোলবদলের গল্প— আন্ডার দ্য বেনিয়ান ট্রি/ দ্য ফরগটন স্টোরি অব ব্যারাকপুর পার্ক (আকার বুকস, নয়াদিল্লি)। বিভিন্ন সূত্র থেকে খুঁজে বার করেছেন অজস্র দুর্লভ ছবি ও নথি, সাজিয়ে দিয়েছেন সযত্নে দুই মলাটে। মা কী ছিলেন থেকে মা কী হইয়াছেন তার সবটাই এই বইয়ে হাজির। লাটপ্রাসাদ এখন অনেকটাই পুরনো চেহারায় ফিরেছে, সেখানে তৈরি হয়েছে সংগ্রহশালা। মোতিঝিল নতুন করে খোঁড়া হয়েছে, ব্রিজও সারানো হয়েছে। পুরনো একটি বাংলো এখন ঝকঝকে। আগরা দুর্গের ফোয়ারা ফিরে পেয়েছে তার পূর্ব গৌরব। তবে এখনও অনেক কাজ বাকি। পাখিরালয়ের অবশেষ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। উদ্যোগ থেমে নেই, কাজ চলছে। সেই সব হারানো দিনের গল্প ক’জন উৎসাহী মানুষের চেষ্টায় আজ জীবন্ত ইতিহাস হয়ে উঠেছে। 

স্মৃতিসন্ধানে 

• লখনউতে প্রথম যে দিন অতুলপ্রসাদকে গান শুনিয়েছিলেন পাহাড়ী সান্যাল, ভজন ছাড়াও কয়েকখানি গজল গেয়েছিলেন, শুনে উচ্ছ্বসিত অতুলপ্রসাদ বলে উঠেছিলেন ‘‘সুভান্‌আল্লা!... উর্দু ভাষার এমন উচ্চারণভঙ্গি বাঙালিদের মধ্যে বড় একটা শোনা যায় না।’’ আর এক দিন অতুলদা তাঁর পাহাড়ীকে তুলিয়েছিলেন সেই বিখ্যাত গানখানি: ‘কত গান তো হল গাওয়া/ আর মিছে কেন গান গাওয়া’। এমনই টুকরো টুকরো আনন্দ-বিষাদের স্মৃতিতে গাঁথা পাহাড়ী সান্যালের মানুষ অতুলপ্রসাদ (সপ্তর্ষি)। ১৮৭১-এ ঢাকায় জন্মানো হেমন্তশশী ও রামপ্রসাদ সেনের পুত্রের সারস্বত জীবন যেন বইটি জুড়ে। ২০ অক্টোবর তাঁর (সঙ্গের ছবি) জন্মদিন উপলক্ষে প্রাক্জন্মসার্ধশতবর্ষে সূত্রধর-এর আয়োজন: ‘স্মৃতিসন্ধানে অতুলপ্রসাদ’। ৩১ অক্টোবর সন্ধে ৬টায় ছাতুবাবু-লাটুবাবুর ঠাকুরদালানে। সুমন ভৌমিক সম্পাদিত পত্র-প্রভায়: রবীন্দ্রনাথ ও অতুলপ্রসাদ প্রকাশ পাবে সে সন্ধ্যায়, এবং একটি সিডি-ও— তাতে অতুলপ্রসাদের স্বকণ্ঠের গান ছাড়াও আছে হেমন্ত-প্রতিমা-সন্ধ্যা গীতা ঘটক কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া তাঁর গান। আলোচনায় শ্রুতি গোস্বামী কবিতা চন্দ ও গানে নূপুরছন্দা ঘোষ।

ঋতুপর্ণ স্মরণ 
• শুধুই ছবি-করিয়ে নয়। ঋতুপর্ণ ঘোষ সেই শিল্পীর নাম, অগণিত চেনা-অচেনা মানুষের অস্তিত্ব ও অধিকার নিয়ে যিনি নিরন্তর কথা বলেছেন— কখনও চিত্রভাষায়, কখনও স্ব-বয়ানে। ভাবিত ছিলেন নারীর নির্মিতি, পুরুষের ধারণা বা লিঙ্গ-পরিচয়ের তৃতীয় পরিসরটির সঙ্কট নিয়ে। তাঁর স্মরণে ২০১৪ থেকে ‘ঋতুপর্ণ ঘোষ স্মারক বক্তৃতা’ আয়োজন করে আসছে ‘প্রত্যয় জেন্ডার ট্রাস্ট’, এই শহরের গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সজেন্ডার কালেক্টিভ। ফি-বছর এমন এক জনকে আমন্ত্রণ জানায় এই ট্রাস্ট, যাঁর অক্লান্ত স্বর ও কাজ আমাদের চার পাশের থিতিয়ে-পড়া মননকে ক্রমাগত আক্রান্ত ও উদ্বুদ্ধ করে; প্রায়-অসম্ভব পরিস্থিতিতেও নিয়ে আসে সংলাপের সম্ভাবনা। একই উপলক্ষে কলকাতা এর আগে শুনেছে ফ্লাভিয়া অ্যাগনেস, পি সাইনাথ বা কাঞ্চা ইলাইয়া শেফার্ডের ভাষণ, দেখেছে সাবিত্রী হেইসনাম-এর ‘দ্রৌপদী’। এ বছর বলবেন রামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক রবীশ কুমার। অনুষ্ঠান ১৯ অক্টোবর সন্ধে ছ’টায়, দক্ষিণ কলকাতার বসুশ্রী হল-এ।

এ বার চিনেছি মা
• আশ্বিনের আকাশ এমন মুখ ভার করেছিল, যে মেঘ ঘনিয়েছিল চিনু হাজরার চোখেমুখেও। তিনি যে কানাই ধর লেনের পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা। মাঝারি মাপের হলেও এই পুজোর বিস্তার যে অনেক। মণ্ডপে ওষুধ-কম্বল-মশারি বিতরণ হয়। উপকৃত হন বহু মানুষ। বৃষ্টি সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বলে তৈরি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দেবীপক্ষের শুরুতেই বাঁচিয়ে দিলেন দুর্গতিনাশিনী দশভুজা। যেমন তিনি রক্ষা করলেন অসীমা ও ঝর্নাকে। মহাজনের থেকে চড়া সুদে ঋণ করে, কালিন্দীর মোড়ে ঘুগনি-পাঁউরুটি আর ডিমভাজার দোকান দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, উৎসবের জনজোয়ারই তাঁদের লাভের খাতাটি ভরিয়ে দেবে। কিন্তু পুজোর মুখে বর্ষার তর্জনগর্জনেই হৃৎকম্প। ফের সন্তানের ত্রাণে বিপত্তারিণী। দেখা দিল শরতের চেনা নীলাম্বর। সেই সুযোগে সৌরভ-সম্রাট-বাবলু ত্রয়ী চার দিনে তিলোত্তমার সব প্রতিমা দেখে ফেলেছেন। আর এই ক’দিন প্রাণের আনন্দে দক্ষিণের দুর্গাবাড়িগুলিতে আগমনি শুনিয়েছেন ভাস্কর মজুমদার। মায়ের গান গাইতে প্রবীণ সন্তান কানাকড়ি নেন না।
তৃপ্তিভরে হাসছেন দেবাশিস কুমারও। বলছেন, ‘‘বাজেট ছেঁটে মানুষের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছি এ বার।’’ উদ্যোক্তা সংযমী হলেও বাঁধ ভেঙে খরচ করেছেন সাধারণ বঙ্গবাসী। তাই এক্ষণে লক্ষ্মীদেবীর কাছে করজোড়ে কৃপাপ্রার্থনায়। মা যে ফেরান না। বর্ষা দেরিতে এলেও বাংলার জলভাণ্ডার পরিপূর্ণ আজ। এ বারের বৃষ্টির মতোই রেকর্ড ভেঙেছেন শক্তিরূপিণী মেরি কমও। আর দিগন্তে ওই ফুটে উঠছে আতসবাজির নকশা ভরা কালী মায়ের রাত। পুজোপ্রেমী বাঙালিকে দেবীর স্নেহাশিস হল এ বারের এই আবহাওয়ার ম্যাজিক।

সার্ধশতবর্ষে
• তাঁকে আফিম খেতে হত। নেশায় নয়, বাতের যন্ত্রণায়। গাঁধীজি যখন মাদক বর্জনের ডাক দিলেন, ছেড়ে দিলেন আফিম সেবন। আলিনান লবণ-কেন্দ্রে লবণ প্রস্তুত করে আইন অমান্য করেন। চৌকিদারি কর বন্ধ আন্দোলনে যোগ দিয়ে ছয় মাস বহরমপুর জেলে বন্দি ছিলেন। নিরন্নকে অন্নদান, মহামারিগ্রস্ত গ্রামে সেবা ছিল তাঁর জীবনধর্ম। মাতঙ্গিনী হাজরার (১৯ অক্টোবর ১৮৭০–২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪২) পরিচয় ছিল ‘গান্ধীবুড়ি’ বলে। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ে তমলুকে থানা দখল অভিযানে নেতৃত্ব দেন বাহাত্তরের মাতঙ্গিনী। পুলিশের গুলি রক্তাক্ত করে দিলেও হাতের তেরঙ্গা পতাকা ভূলুণ্ঠিত হতে দেননি। আগামী ১৯ অক্টোবর তাঁর ১৫০তম জন্মবর্ষের সূচনা। অহর্নিশ পত্রিকা উদ্‌যাপন করছে এই বীরাঙ্গনার সার্ধশতবর্ষ। অনুষ্ঠান হবে ২০ অক্টোবর বিকেলে অশোকনগরে। আলোচনায় অনুপা ঘোষ ও শুভাশিস চক্রবর্তী। সহযোগিতায় ‘মানব জমিন’।

বৈঠকি আড্ডা  
• ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ওবিন ঠাকুরের লেখাও ছিল তাঁর ছবির মতো। তাঁর পৌত্র অমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু চিত্রকর নন। তিনি চিনা ভাষার বিশেষজ্ঞ। হেয়ার স্কুলের পাট চুকিয়ে বি কম পাশ করে জাপানি বোমা পড়ার ভয়ে পরিবারের সঙ্গে এক সময় পাড়ি দেন শান্তিনিকেতনে। সেখানে তান সাহেবের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। চিনা ভবনে শুরু হয় তাঁর চিনা সাহিত্য এবং চিনা ভাষা শেখা। স্বাধীনতার কয়েক বছর আগে শান্তিনিকেতন থেকে এক প্রতিনিধি দল যায় চিন দেশে। সেই দলে তিনিও ছিলেন। পরে দীর্ঘ ২৩ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিনা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনা করে দেশে ফেরা। জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই তাঁর জন্ম, দেখেছেন কর্তাবাবা অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথকে। দাদামশাই অবনীন্দ্রনাথের শাসন আর স্নেহের কথা আজও অমিতেন্দ্রনাথের (সঙ্গের ছবি) স্মৃতিতে উজ্জ্বল। গত ৯ অক্টোবর ছিল তাঁর ৯৮তম জন্মদিন। সেই উপলক্ষে ২৩ অক্টোবর কসবার মায়া আর্ট স্পেসে আয়োজিত হয়েছে এক আড্ডা, সেখানে তিনি শোনাবেন নানা গল্প। সম্মান জ্ঞাপন করা হবে তাঁকে, কথোপকথনে অরিজিৎ মৈত্র।  

ধর্ম ও বিজ্ঞান
• ধর্ম ও বিজ্ঞান কি পরস্পর-বিরোধী? না কি এই দুইয়ের মধ্যে আছে কোনও আন্তঃসম্পর্ক? ধর্ম যখন প্রাতিষ্ঠানিক তখন তার রীতিনীতিতে থাকে অযৌক্তিক অবৈজ্ঞানিক আচার-আচরণ। কিন্তু ধর্ম যখন ধারণশক্তি— মানবতাবাদী, তখন বিজ্ঞান তার সহায়ক হলেও হতে পারে। এই দুইয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে ২১ অক্টোবর সন্ধে ৬টায় জীবনানন্দ সভাঘরে এক আলোচনাচক্রের আয়োজন করেছে ‘হারমোনিকা’ সংস্থা। আলোচনায় পথিক গুহ ও আশীষ লাহিড়ী। সঞ্চালনা অভ্র ঘোষ।   
 
অখিলবন্ধু 
• ও দয়াল বিচার করো, ওই যে আকাশের গায়ে, যেন কিছু মনে কোরো না কেউ যদি কিছু বলে— গানগুলি বর্তমান প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয়। কিন্তু, অনেক সময়ই তা শোনা রিমেক-অবতারে। এই গানগুলিতে প্রথম কণ্ঠদান করেছিলেন যিনি, সেই গায়ক-সুরকার অখিলবন্ধু ঘোষ জীবদ্দশায় উপযুক্ত সম্মান পাননি। কী আয়াসে তিনি আধুনিক সঙ্গীতের অঙ্গে রাগচূর্ণগুলি বপন করেছিলেন, তাও বুঝি বিস্মরণে। ২০২০ সালে শিল্পীর জন্মশতবর্ষ। ২০ অক্টোবর, তাঁর প্রাক্‌শতবার্ষিক জন্মদিনে এক সঙ্গীত-স্মরণিকার আয়োজন করেছে ভবানীপুরের অখিলবন্ধু ঘোষ স্মৃতিসংসদ। ২২/৩/এ চন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে স্মৃতিসংসদ কক্ষে, সন্ধে ৬টায়। অংশগ্রহণে শিখরেশ বসু, মাধবেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপ দাস প্রমুখ। 

সেই গান 
• গানপাগল বাঙালির কাছে স্বর্ণযুগের গান অমূল্য সম্পদ। ৭৮ আরপিএম রেকর্ডে প্রকাশিত তিন জন কালজয়ী শিল্পীর গান নিয়ে সম্প্রতি হিন্দুস্থান রেকর্ডস প্রকাশ করল নতুন তিনটি সিডি অ্যালবাম। সুধীরলাল চক্রবর্তী, রেণুকা দাশগুপ্ত এবং অনুপম ঘটক। ‘শুকনো পাতা ঝরে পাতা’ অ্যালবামে রয়েছে সুধীরলাল চক্রবর্তীর গাওয়া ২০টি গান। রয়েছে হিন্দি ও উর্দুতে গাওয়া শিল্পীর আটটি গীত ও ভজন। সে যুগে অতুলপ্রসাদী গানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী রেণুকা দাশগুপ্ত। ‘পাগলা মনটারে তুই বাঁধ’ অ্যালবামে রয়েছে অতুলপ্রসাদ, রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুল প্রমুখের ২২টি গান। অনুপম ঘটক হিন্দুস্থান রেকর্ডের জন্মলগ্ন থেকে প্রধান সুরকার ও রেকর্ডিং অধিকর্তা ছিলেন। ‘মাধবী উতলা বায়’ ডাবল সিডি অ্যালবামের প্রথমটিতে রয়েছে শিল্পীর গাওয়া ২২টি গান। দ্বিতীয় সিডিতে তাঁরই সুরারোপিত গানগুলি রয়েছে সত্য চৌধুরী, সুধীরলাল চক্রবর্তী, অখিলবন্ধু ঘোষ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। গানগুলি সঙ্কলন করেছেন অমল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পুরনো রেকর্ড দিয়ে সাহায্য করেছেন সুশান্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, শ্রীকানাইলাল, মহম্মদ সফি এবং অভিমন্যু দেব।

দুই সত্তা  
• জন্ম উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙায়। ছোটবেলায় বিজ্ঞান ক্লাবে অসংখ্য মৌলিক মডেল তৈরি করেছেন, পেয়েছেন সত্যেন বসুর সার্টিফিকেট। পরে পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার হয়ে উঠলেন বিশিষ্ট চক্ষু-চিকিৎসক। ১৯৯৫ সালে স্থাপন করলেন অত্যাধুনিক চোখের হাসপাতাল। পাশাপাশি তিনি তন্নিষ্ঠ গবেষকও। দিনের ব্যস্ততার শেষে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাঁর গবেষণা। বিপুল পরিশ্রমে তৈরি করেছেন সমস্ত রবীন্দ্রসঙ্গীতের ডিজিটাল সঙ্কলন ‘গীতবিতান আর্কাইভ’, তার পর সমস্ত রবীন্দ্রকবিতার ডিজিটাল সঙ্কলন ‘রবীন্দ্রকবিতা আর্কাইভ’। সমস্ত রবীন্দ্রানুরাগীর কাছে এর মূল্য অপরিসীম। চলছে লেখালিখিও। চোখের খুঁটিনাটি নিয়ে লেখার সঙ্গে প্রকাশের পথে গীতবিতান তথ্যভাণ্ডার— প্রতিটি রবীন্দ্রসঙ্গীত বিষয়ক তথ্য দুই মলাটে। চিকিৎসক-সত্তা ও গবেষক-সত্তার মধ্যে এক সুন্দর ভারসাম্য গড়ে তুলেছেন ডা. পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার। 
  
সোমপ্রকাশ  
• ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ নভেম্বর ‘সোমপ্রকাশ’ সাপ্তাহিকপত্রের আত্মপ্রকাশ। প্রথম থেকেই সম্পাদনা, প্রকাশনার ভার ছিল দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের উপর। দ্বারকানাথ সংস্কৃত কলেজে পাঠগ্রহণ করে বিদ্যাভূষণ উপাধি পান। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও পরে সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা করেন। নীল ও চা চাষের বিপক্ষে, জমিদারি প্রথা, দেশীয় সংবাদপত্র আইন, বাল্যবিবাহ, কৌলীন্যপ্রথা, ‘পেটে পেটে সম্বন্ধ’ ইত্যাদির বিরুদ্ধে, নারী শিক্ষা ও বিধবাবিবাহের পক্ষে ছিলেন দ্বারকানাথ। ১৮৮৬ সালে তিনি প্রয়াত হন। তাঁর দ্বিশতবার্ষিকী উপলক্ষে সাহিত্য অকাদেমি এবং অশোকনাথ গৌরীনাথ শাস্ত্রী স্মারক সমিতির যৌথ উদ্যোগে সম্প্রতি বিবেকানন্দ সোসাইটিতে এক আলোচনাসভায় বিদ্যাভূষণের ব্যতিক্রমী চরিত্রের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদিত হল।

দুর্গা এলেন মর্তে  
• মণ্ডপে দুর্গাপুজো শেষ হলেও, মঞ্চে তাঁর আজই বোধন! শহরের পুজোমণ্ডপগুলিতে বোধন থেকে বিসর্জনে ভক্তদের আড়ম্বর থাকলেও দেবী দুর্গা কি উপেক্ষিতা? বিদ্যার দেবী সরস্বতীর সংস্কৃতি, কার্তিকের বীরত্ব কি সম্মানিত? লক্ষ্মীর অবমাননা, গণেশ-সহ কলা বৌয়ের লাঞ্ছনা দেবী দুর্গাকে করেছে কি মর্মাহত? অসুরদলনী দেবী দুর্গা কি নির্বাক মাটির প্রতিমা হয়েই রইলেন? উত্তর জানা যাবে শিশির মঞ্চে, আজ, ১৪ অক্টোবর, সন্ধে সাড়ে ৬টায়, মডার্ন মাইম সেন্টারের একটি নতুন ভাবনা ‘দেবী দুর্গা এলেন মর্তে’ শীর্ষক মাইম শো-এ। পরিচালনা কমল নস্কর। সঙ্গে তারই একটি দৃশ্য।

ব্যতিক্রমী  
• সাদামাটা পোশাকের উপর গলায় আলতো করে গামছা জড়ানো, নিজেকে ‘ছোটলোকের সাহিত্য চর্চাকারী’ হিসেবে অভিহিত করেন (সঙ্গের ছবি)। ছিন্নমূল প্রান্তিক হাড়ভাঙা খেটে খাওয়া সমাজে প্রবঞ্চনা হেনস্থার শিকার দলিতদের সাহিত্যকে ভাষা দিতে কলম ধরেছেন। বাংলাদেশের বরিশাল থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এ পার বাংলার বিভিন্ন ক্যাম্পে দিনযাপন, নকশাল আন্দোলনে যুক্ত হয়ে জেলও খাটতে হয়েছে। জীবিকার প্রয়োজনে চায়ের দোকানে কাপপ্লেট ধোয়া, গরুছাগল চরানো, শ্মশানে ডোমের কাজে সাহায্য, স্কুলে মেথরের কাজ, রাতপাহারা, শহরের রাস্তায় রিকশা টানা, কোলে মার্কেটের রাস্তায় নারকেল বিক্রি-সহ হরেক কাজে কাটাতে হয়েছে জীবনচক্র। পাশাপাশি সাহিত্য রচনার জন্য সংগ্রাম। জেলজীবনে অনেক কিছু শিখেছেন জেনেছেন, তাই বলেন জেলের ভিতরে ভালমন্দ লোক চেনা যায়, কিন্তু বাইরের জগতে পোশাকে ঢাকা মোড়কে দুর্বৃত্ত চেনা মুশকিল। বাংলা আকাদেমি পুরস্কার-সহ সাহিত্য সংক্রান্ত পঞ্চাশের অধিক পুরস্কার এখন তাঁর ঝুলিতে। এ পর্যন্ত বইয়ের সংখ্যা সতেরো। দুটো হাঁটু প্রতিস্থাপিত হয়েছে, শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও দিন গুজরান করেন মুকুন্দপুরের হেলেন কেলার ইনস্টিটিউটে রান্নার কাজে। সম্প্রতি এ-হেন মনোরঞ্জন ব্যাপারীর লেখা ‘ওয়েস্টল্যান্ড একা’ প্রকাশনার ‘ছেঁড়া ছেঁড়া জীবন’, ‘ছন্নছাড়া’, ‘বাতাসে বারুদের গন্ধ’ বই তিনটি প্রকাশ পেল অক্সফোর্ড বুক স্টোরে, লেখকের সঙ্গে আড্ডায় ছিলেন সুবোধ সরকার, জয়দীপ ষড়ঙ্গী, স্বাতী মৈত্র। 

বাংলায় মেঘদূত
• তালিকাটা দীর্ঘ। কান্তিচন্দ্র ঘোষ, কাজী নজরুল, নরেন্দ্র দেব, বুদ্ধদেব বসু থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়— কালিদাসের মেঘদূতের বাংলা অনুবাদ অনেকেই করেছেন। কিন্তু অনেকেই জানতেন না, এই তালিকায় রয়েছেন শক্তিশালী গল্পকার অজয় দাশগুপ্ত (১৯৩২-২০০৭)। যাঁর সম্পর্কে বিমল কর বলেছেন, ছোট গল্পে নতুন রীতি প্রয়োগের অন্যতম উদ্যোগী। বহু বছর আগে অজয় দাশগুপ্ত কৃত মেঘদূতের অনুবাদের পাণ্ডুলিপি পড়ে চমকে যান সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কারণ কবি নন, গল্পকার অজয়কেই তিনি জানতেন। মন্তব্য করেন, ‘‘অজয় দাশগুপ্ত মেঘদূত পাঠের ভাল লাগাটাই এই অনুবাদে ধরে রাখতে চেয়েছেন।’’ এই অনুবাদের গোটাটাই মূলের অনুরূপ মন্দাক্রান্তা ছন্দে লেখা। এই ছন্দেই আংশিক মেঘদূত অনুবাদ করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। এ-হেন একটি বিস্মৃত কাজ সম্প্রতি নতুন করে গ্রন্থস্থ হল কবি কালীকৃষ্ণ গুহের সম্পাদনায় (কাব্যসংগ্রহ, অজয় দাশগুপ্ত, কমলিনী)। শুধু মেঘদূতের অনুবাদ নয়, তাঁর আরও কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে এই সঙ্কলনে। 

নতুন আঙ্গিকে  
• লোকসঙ্গীতের গবেষক ও শিল্পী সুখবিলাস বর্মা। জন্মভূমি উত্তরবঙ্গের প্রধান লোকগোষ্ঠীর সংস্কৃতি তথা ইতিহাস নৃতত্ত্ব ভাষা নিয়ে তাঁর গবেষণা। ইতিমধ্যে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দশ এবং উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া, চটকা, ভাটিয়ালি নিয়ে প্রকাশিত সিডি-র সংখ্যাও দশের বেশি। লোকসঙ্গীতের মূল বৈশিষ্ট্য রক্ষায় উদ্যোগী এই ব্যক্তিত্ব ক’জন লোকসঙ্গীতপ্রেমীকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৮৯ সালে ‘আব্বাসউদ্দিন স্মরণ সমিতি’ গঠন করেন। এ বারে লোকসংস্কৃতির আর এক অঙ্গন ‘বাউল-ফকিরি-দরবেশি’র উপর গবেষণালব্ধ তথ্য নিয়ে লিখেছেন নতুন আঙ্গিকের বই ‘বাউল ফকিরি তুক-খা’। খুঁজে পেয়েছেন উত্তরবঙ্গের ময়নাগুড়ি, ধূপগুড়ি, ফাঁসিদেওয়া, খড়িবাড়ি এলাকায় প্রচলিত বাউলের তন্ত্র বৈশিষ্ট্যের গান ‘তুক-খা’। 

শেষ টেম্পো  
• আমাদের জীবন থেকে যেমন টেলিগ্রাম-চার আনা-আট আনা-জ্যোতি ও এলিট সিনেমা হল বিদায় নিয়েছে, তেমনই নীরবে টেম্পোও বিদায় নিয়েছে। টিয়াপাখির মতো দেখতে ছিল তাকে। এই তিন চাকার যানটি এক সময় বাংলার পরিবহণ জগৎ দাপিয়ে বেড়িয়েছে। পুজোর সময় ঠাকুর আনতে যাওয়া, বিসর্জন এবং আরও নানা সামাজিক কাজে তার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। স্টার্ট দেওয়ামাত্র ‘গর গর’ শব্দ তুলে সে এগিয়ে চলত। বিরাট বেলুনরূপী কালো বা লালচে-মেরুন রঙের রাবারের হর্ন টিপলেই ‘ভ্যাম প্যাঁ প পোঁ’ শব্দ বেরিয়ে আসত। না, এখন সে কোত্থাও নেই। রাজাবাজারে এই সে দিনও একটা ‘টেম্পো’ পড়ে ছিল। মালিকের খেদ— লোহালক্কড়কে দামসে উসকো বেচ দিয়া। কেয়া ফায়দা ফির বাত করনেসে...

দূরের মানুষ 

তাঁর সঙ্গে দেখা করার সময় চাইলে তিনি বলেন পাবলো নেরুদার কথা। ‘এত লেখেন কখন’ প্রশ্নের উত্তরে মহাব্যস্ত কূটনীতিক নেরুদা নাকি বলেছিলেন, আমি তো আসলে কবি, মাঝেমধ্যে আমলার কাজ করি। আর কুড়ি-একুশটা উপন্যাসের লেখক শাহ্‌যাদ ফিরদাউস বলেন, তাঁর অখণ্ড সময়, তিনি মাঝেমধ্যে লেখেন। চার পাশের আত্মপর সমাজ, প্রচারসর্বস্ব লেখক-স্তাবকবৃত্ত থেকে বহু দূরে, অথচ এই শহরেই থাকেন তিনি, রোজ নিয়ম করে হাঁটেন সন্ধের রবীন্দ্র সরোবরে। ‘ব্যাস’, ‘প্লেগ’, ‘শাইলকের বাণিজ্য বিস্তার’-এর মতো উপন্যাসের স্রষ্টা নিজেকে বলেন এই দেশ-কালে মূর্তিমান ‘মিসফিট’। ষোলো বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন, প্রথম বই বেরোয় যখন বয়স পঁয়তাল্লিশ। জীবনের বিচিত্রতা নিয়ে বলতে অনীহা, বরং তিনি বলেন নিজের পাঠ-অভিজ্ঞতা— প্লেটো পড়ে অভিভূত হওয়া, গ্রিক দর্শন থেকে যুক্তি ও ভাবনার নিখুঁত নির্দেশনা শেখার কথা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা নুট হামসুন-এর মতো ‘সক্রিয়’ লেখকেরা তাঁর প্রিয়। মহাকাব্য, লোককথা, রূপকথা তাঁর কাছে লেখার আঙ্গিকের উৎস; বিশ্বাস করেন— শুধুই সঙ্গীতময় বা কেবল শব্দসর্বস্ব হওয়াটা আখ্যানের ব্যর্থতা, তাকে আত্মস্থ করতে হয় ভাষা ও সঙ্গীত দুই-ই। বাংলাদেশ ভারত দুই দেশেই প্রকাশিত এমনকি অনূদিতও তাঁর লেখা, অথচ এও বলেন যে তিনি প্রকাশকপ্রিয় নন। সীমিত তাঁর পাঠকও, অথচ তাঁর লেখনীমুগ্ধ ক’জন একদা তৈরি করেছিলেন ‘শাহ্‌যাদ ফিরদাউস পাঠক সংঘ’, বইও প্রকাশ পেয়েছে সেই সঙ্ঘ থেকে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর ৭০তম জন্মদিনে গোর্কি সদনের প্রোগ্রেস লিটারারি ক্লাব আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রকাশিত হল শাহ্‌যাদের নতুন উপন্যাস ‘ইহ দেহ’। স্বপ্ন ও বাস্তব, অলীক ও রূপকের মধ্যে সতত চলাচল করে এই বইয়ের চরিত্র ভাইদা। লেখকের মতে, এই বই এক শিল্পীর— কিছুটা হয়তো তাঁরই— দর্শনের আয়না।

জীবনসায়াহ্নে শুধুই আঁধার

• প্রদীপের নীচেই যত অন্ধকার। সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন শিল্পের জন্য। এক সময় কুমোরটুলিতে চোখ আঁকিয়ে হিসেবে নাম ছিল। অনেক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে বহু বছর ধরে দুর্গাপ্রতিমার রূপদান করেছেন হারাধন (হারু) পাল। বহু প্রাচীন ঠাকুরদালান সেজে উঠেছে তাঁর শিল্পসৃষ্টিতে। কুমোরটুলিতে জন্ম, এই আশ্বিনে বয়স পঁচাশি ছুঁয়েছে। পূর্বপুরুষের শিকড় কৃষ্ণনগর গোয়াড়ি। বয়স পাঁচ হতেই মাতৃবিয়োগ। বাবা মৃৎশিল্পী তারাপদ পাল শোভাবাজার রাজবাড়ির ছোট তরফের দুর্গা মূর্তি গড়তেন, একবার কাঠামো পড়ে মাথা ফাটতেই তাঁর মূর্তি গড়ায় ইতি। বর্তমানে বাবা-সহ দুই দাদা প্রয়াত। নিজের সংসার জীবনে ছেলেমেয়ে শৈশবে অকালেই প্রয়াত। স্ত্রী বাসন্তীকেও হারাতে হয়েছে চল্লিশ বছর আগে। এখন সহায়সম্বল ভাইপো মৃৎশিল্পী কার্তিক পাল, তাঁদের কাছেই কুমোরটুলির একচিলতে ঘরে থাকা-খাওয়া। শৈশবে মাতৃহারা জীবনে পুঁথিগত শিক্ষার তেমন সুযোগ হয়নি। তবে রামায়ণ মহাভারত গীতা বাইবেল-সহ নানা ধর্ম সংক্রান্ত বই, এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্র বিভূতিভূষণ তারাশঙ্কর শরৎচন্দ্র-সহ বাংলা সাহিত্যের অনেক কিছুই আত্মস্থ করেছেন। কাকা দুর্গাচরণ পালের কাছে মৃৎশিল্পে হাতে খড়ি। বংশপরম্পরায় প্রায় পঁয়ষট্টি বছর মূর্তি গড়ছেন কুমোরটুলির কবিরাজ গঙ্গাপ্রসাদ সেন ও বেনিয়াটোলার অধরলাল সেন বাড়ির দুর্গার, যে দুই বাড়ি শ্রীরামকৃষ্ণের পদধূলিধন্য, সঙ্গে আর এক ঐতিহ্যবাহী শোভাবাজার রাজবাড়ির বড় তরফের প্রতিমা, তাও কুড়ি বছর ধরে। মিতভাষী মৃৎশিল্পী জানান, সৎ ভাবে জীবন যাপনের পড়ন্ত বেলায় আজ তালপুকুরে ঘটি ডোবে না, তথাকথিত ভদ্রলোকদের কাছে হেনস্থা লাঞ্ছনা ও কটু ব্যবহারে শিল্পীমন ভারাক্রান্ত। নকশাল আমলে নিজস্ব স্টুডিয়ো বেহাত হয়। ইচ্ছে ছিল আবার নিজস্ব স্টুডিয়ো হবে। অর্থ সঙ্কটে সে ইচ্ছাপূরণ বিশ বাঁও জলে থেকে গিয়েছে। হাঁটুর যন্ত্রণায় একবার বসলে ওঠার ক্ষমতা নেই, লাঠি ভর করে এগিয়ে চলা জীবন। ডান চোখের সমস্যায় কাজে অসুবিধা, অর্থাভাবে কর্নিয়া গ্রাফটিং স্থগিত। ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। মোটা ফ্রেমের চশমা সরিয়ে হতাশায় চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য...’’ বা ‘‘এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না যাতে মুক্তো আছে....’’ এই কথাগুলো কি গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ! এই মৃৎশিল্পীর জন্য কোনও সহৃদয় মানুষ বা সংগঠন কি সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারেন না?