সকাল-সকাল গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেনের বাড়ি থেকে ফিটন গাড়িতে বেরিয়েছিলেন তিনি। জটিল অস্ত্রোপচার ছিল হাসপাতালে। কয়েক ঘণ্টায় দক্ষতার সঙ্গে তা শেষ করলেন। দুপুরে যখন ফিরলেন, তখন তিনি ক্লান্ত কিন্তু তৃপ্ত। পুত্রবধূ সরলাকে বলেছিলেন, ‘‘আজকের অপারেশন দেখলে আর কেউ বলতে পারবে না যে, ডাক্তার গাঙ্গুলির আর অপারেশনের হাত নেই।’’ 

সরলাকে খাবার বাড়তে বলে স্নান করতে গেলেন। খাবারের থালা সাজিয়ে নীচের তলায় সরলা অনেকক্ষণ বসে আছেন। শাশুড়ি আসছেন না দেখে দোতলায় তাঁর শোওয়ার ঘরে গিয়ে দেখেন, বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। হার্ট অ্যাটাক! মুহূর্তে নিস্পন্দ হয়ে গেলেন। শেষ হল ব্যতিক্রমী এক পথ-প্রদর্শকের অভূতপূর্ব জীবন। ১৯২৩ সালের ৩ অক্টোবর। 

 

মেডিক্যাল কলেজের প্রথম ছাত্রী

যে সময়ে ভারতীয় মেয়েদের কর্মজগতের রেখচিত্র তেমন ভাবে তৈরিই হয়নি, ঘরের আঙিনা পেরিয়ে বহির্জগতে পা রাখতে ইতস্তত করছেন অধিকাংশ মহিলা, সেই সময়ে তিনি চুটিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেছেন কলকাতায়। রাতবিরেতে রোগী দেখতে গিয়েছেন ফিটনে চেপে, প্রাইভেট চেম্বার খুলে কাগজে তার বিজ্ঞাপন দিয়েছেন এবং নিয়মিত অস্ত্রোপচার করেছেন। মৃত্যুর পরে তার ব্যাগে পাওয়া গিয়েছিল শেষ ভিজ়িটের ৫০ টাকা। ইতিহাস সৃষ্টিকারী চিকিৎসকের সম্মানে সেই টাকা খরচ করা হয়েছিল তাঁর শেষকৃত্যে। তিনি কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের প্রথম ছাত্রী। ঈর্ষাকাতর, প্রাচীনপন্থী বিরুদ্ধবাদীরা প্রবল কলকাঠি নেড়ে তাঁর কাছ থেকে প্রথম বাঙালি  মহিলা চিকিৎসকের আসন কেড়ে নিয়েছিলেন। ডাক্তারি ডিগ্রির বদলে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ‘গ্র্যাজুয়েট অফ দ্য মেডিক্যাল কলেজ অব বেঙ্গল’ বা জিএমসিবি উপাধি। কিন্তু অদম্য এই মহীয়সীর অবিস্মরণীয় উত্থান তাতে আটকানো যায়নি।

বিশিষ্ট লেখিকা লীলা মজুমদার ছিলেন কাদম্বিনীর আত্মীয়া। কাদম্বিনীর সৎ মেয়ে বিধুমুখী হলেন লীলা মজুমদারের জেঠিমা। কৈশোরে মাতৃহীন হওয়ার পরে বিধুমুখী আর তাঁর স্বামী উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর আশ্রয়েই লীলার মা সুরমা দীর্ঘদিন ছিলেন। কাদম্বিনীর মৃত্যুর মাত্র তিন বছর আগে লীলা তাঁকে সামনাসামনি দেখেছিলেন এবং মুগ্ধ হয়েছিলেন। ‘পাকদণ্ডী’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন সেই মুগ্ধতার কথা—‘‘....তাঁর জীবনটাই এক আশ্চর্যের ব্যাপার। আমি যে সময়ের কথা বলছি, তার অনেক আগেই তিনি বিধবা হয়েছিলেন। বয়সে জ্যাঠাইমার চাইতে সামান্য বড় ছিলেন, দেখে মনে হত অনেক ছোট। মস্ত দশাশই চেহারা, ফুটফুট করত গায়ের রঙ, থান পরে এবং এত বয়সেও রূপ চাপা পড়ত না, তবে কেমন একটু কড়া ধরনের ভাব। আমরা দূর থেকে দেখতাম।’’

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

আবার সেই কড়া, ব্যস্ত চিকিৎসকের ব্যক্তিত্বের অন্য পরতে ছিল স্নেহশীল, শৌখিন, শৈল্পিক মন। বিধুমুখীর মেয়ে পুণ্যলতা চক্রবর্তী তাঁর ‘ছেলেবেলার দিনগুলি’ বইয়েই লিখেছিলেন—‘‘এক দিকে খুব সাহসী আর তেজস্বীনা, অন্য দিকে ভারি আমুদে মানুষ ছিলেন তিনি। যেখানে বসতেন হাসি, গল্পে একেবারে মাতিয়ে তুলতেন। সঙ্গে সঙ্গে হাতও চলত। আমরা হাঁ করে তাঁর গল্প শুনতাম আর তাঁর আঙুলগুলির খেলা দেখতাম। কী অদ্ভুত ভাবে তাড়াতাড়ি কী সুন্দর লেস বোনা হচ্ছে।’’ পুণ্যলতা এবং তাঁর ভাইবোন সুকুমার, সুখলতা, সুবিনয়রা ছোটবেলায় কেউ জানতেনই না যে, কাদম্বিনী তাঁদের নিজের দিদিমা নন, মায়ের বিমাতা।

 

সন্তানদের ফেলে বিদেশে ডাক্তারি পড়তে যাওয়া

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে বিরুদ্ধবাদীদের যোগ্য জবাব দিতে আট সন্তানকে সেই যুগে বাড়িতে রেখে তিনি বিলেত গিয়েছিলেন ডাক্তারির ডিপ্লোমা নিতে! ১৮৯৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মিস প্যাশ নামে মহিলার সঙ্গিনী হয়ে জাহাজে একা বিদেশযাত্রা করেন। লন্ডন পৌঁছন ২৩ মার্চ। তার পরে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মাত্র তিন মাসে প্রার্থিত তিনটি ডিপ্লোমা সংগ্রহ করে দেশে ফেরেন। শোনা যায়, কাদম্বিনী ফিরে এসে ছোট ছেলে জংলুকে (প্রভাতচন্দ্র) কোলে নিতে গেলে বছর দেড়েকের ছেলে দীর্ঘ অদর্শনে নিজের মাকে চিনতে পারেনি! দিদিমার গলা আঁকড়ে ছিল। কাদম্বিনী আড়ালে কেঁদেছিলেন। কিন্তু কখনওই সংসার তাঁর কেরিয়ারের অন্তরায় হয়নি।

স্বামী দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়

পরিবারের উন্মুক্ত, আধুনিক পরিমণ্ডল ছোটবেলা থেকেই ব্যক্তি কাদম্বিনীর ভাবধারাকে প্রভাবিত করে। রবীন্দ্রনাথের জন্মসালেই তাঁর জন্ম। ১৮৬১। ভাগলপুরে। দিনটা ১৮ জুলাই।  বাবা ব্রজকিশোর বসু ছিলেন নারীমুক্তি আন্দোলনের নেতা। পূর্ববঙ্গের বরিশালের চাঁদসী থেকে ভাগলপুরে আসেন। শিক্ষকতা করতেন। কাদম্বিনীর যখন দু’বছর বয়স, সেই সময়ে ব্রজকিশোর ও অভয়চরণ মল্লিকের নেতৃত্বে দেশের প্রথম মহিলা সমিতি ‘ভাগলপুর মহিলা সমিতি’ স্থাপিত হয়। পিসতুতো দাদা কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার মনোমোহন ঘোষ নারীশিক্ষা প্রসারের কাণ্ডারী ছিলেন। বাবা ও দাদার প্রভাব পড়েছিল কাদম্বিনীর মধ্যে।

মনোমোহন, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, দুর্গামোহন দাসের মতো সেই সময়কার স্ত্রী স্বাধীনতার সমর্থকেরা একটি উচ্চমানের মেয়েদের স্কুল তৈরির জন্য বদ্ধপরিকর ছিলেন। অ্যানেট অ্যাক্রয়েড নামে এক বিদেশিনি শিক্ষয়িত্রীকে তাঁরা সঙ্গে পেলেন। ২২ নম্বর বেনিয়াপুকুর লেনে ১৮৭৩ সালে এই স্কুলটি স্থাপিত হয়। নাম হয় ‘হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়’। মূলত বোর্ডিং স্কুল। কাদম্বিনীর স্কুল শিক্ষায় পদার্পণ এখানেই। যত দূর জানা যায় তখন তাঁর বয়স ১৩। কিন্তু স্থাপন হওয়ার আড়াই বছরের মধ্যে স্কুলটি উঠে যায়। ফের ১৮৭৬ সালে ১ জুন ওল্ড বালিগঞ্জ রোডে ‘বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়’ নামে স্কুলটি পুনরুজ্জীবিত হয়। এটি ছিল বাঙালি মেয়েদের প্রথম ইংলিশ বোর্ডিং স্কুল। কিন্তু এই স্কুলেরও উঠে যাওয়ার অবস্থা হল। 

শেষ পর্যন্ত বহু টানাপড়েনের পরে স্কুল বাঁচাতে ১৮৭৮ সালে বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়কে মিশিয়ে দেওয়া হল বেথুন স্কুলের সঙ্গে। কাদম্বিনী ছিলেন এই স্কুল থেকে প্রথম এন্ট্রান্স বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসা মেয়ে। মাত্র এক নম্বরের জন্য প্রথম বিভাগ না পেলেও সমস্ত সমালোচকের মুখ বন্ধ করেছিলেন। খোদ লর্ড লিটন তাঁর প্রশংসা করেন। লেডি লিটনের হাত দিয়ে তাঁকে পুরস্কার ও সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। কিন্তু ‘সংবাদ প্রভাকর’ এ বার মোক্ষম প্রশ্নটি তোলে— ‘কাদম্বিনী এক্ষণে কোন বিদ্যালয়ে পড়বেন?’

কাদম্বিনীর হাতে ক্রুশের কাজ

কাদম্বিনী নিজে জানিয়েছিলেন, তিনি ফার্স্ট আর্টস পড়বেন। কিন্তু এর জন্য কলেজ তৈরি করতে হবে। বেথুন কমিটি কটক কলেজের নামী প্রফেসর শশীভৃষণ দত্তকে চাইলেন। তিনি ছিলেন ইংরেজি, দর্শন, অঙ্ক, ইতিহাসে দক্ষ। ১৮৭৮-৭৯ সালে ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন এ ডব্লিউ ক্রফট শিক্ষা রিপোর্টে জানালেন, কাদম্বিনীর জন্যই বেথুন স্কুলকে কলেজে রূপান্তরিত করার কথা সরকার ভাবে এবং তা বাস্তবায়িত হয়। বাংলায় সাড়া পড়ে যায়। এক জন ছাত্রী ও এক জন লেকচারার নিয়ে শুরু হল কলেজ। ইংল্যান্ড থেকে এক ব্রিটিশ মহিলা সুপারিন্টেন্ড্যান্টকে আনা হয়।

 

সমাবর্তনে ‘মহিলা’র ডিগ্রি নেওয়া দেখতে ভিড়ে হিমশিম

কাদম্বিনীরও আগে প্রাইভেটে এন্ট্রান্স দিয়ে সফল হয়েছিলেন চন্দ্রমুখী বসু। তিনিও তত দিনে কলকাতার ফ্রি চার্চ নর্মাল মিশন স্কুলে এসে প্রস্তুত হচ্ছেন এফএ পরীক্ষার জন্য। এঁরা দু’জনেই ১৮৭৯তে এফএ পাশ করলেন এবং তাঁদের যুগ্ম সাফল্য বেথুন কলেজে বিএ পড়ানোর দরজা খুলে দেয়। চন্দ্রমুখী নিলেন পলিটিক্যাল ইকনমি আর কাদম্বিনী গণিত। ১৮৮৩ সালের জানুয়ারিতে ইতিহাস গড়ে দু’জনে বিএ পাশ করলেন। দেশের প্রথম দুই মহিলা গ্র্যাজুয়েট। স্ত্রীশিক্ষা বিশেষ করে মহিলাদের উচ্চশিক্ষার উপরে চাপা পড়া জগদ্দল পাথর নড়ে গেল। সে বার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দুই মহিলার ডিগ্রি নেওয়া দেখতে এত ভিড় হয়েছিল যে, পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়েছিল। ভিড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে ট্রামলাইন পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। কবি হেমচন্দ্র এই দুই বিদুষীকে নিয়ে কবিতা লিখে ফেলেছিলেন। চন্দ্রমুখী এ বার বেথুনেই এমএ পড়া শুরু করলেন। কিন্তু কাদম্বিনী সিদ্ধান্ত নিলেন এমবিবিএস পড়বেন। এ বার আরও ভয়ঙ্কর প্রতিরোধ ও লড়াইয়ের ইতিহাসের সূচনা হল।

মেডিক্যাল পড়তে চেয়ে তিনি আবেদন করেন ১৮৮১ সালে। শিক্ষা অধিকর্তা আগ্রহী হলেও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ কাউন্সিলের কোনও হেলদোল দেখা যায় না। কাদম্বিনী হাল না ছেড়ে বিএ পড়ায় মন দেন। তার দু’বছর পরে আবার আবেদন করেন। ডিপিআই ১৮৮৩ সালে ৪ জুন মেডিক্যাল কাউন্সিলে চিঠি পাঠিয়ে জানতে চান, কী উত্তর দেবেন? এর মধ্যে ১২ জুন কাদম্বিনীর বিয়ে হয়ে যায় দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে (সে আর এক কাহিনি, যা তুফান তুলেছিল সে যুগের ব্রাহ্ম সমাজে)। আর বিয়ের কয়েক দিনের মধ্যে ২৯ জুন (মতান্তরে ২৩ জুন) মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন কাদম্বিনী। মেডিক্যালের চিকিৎসকদের একাংশ তা কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারলেন না। তাঁদের অন্যতম ছিলেন রাজেন্দ্রচন্দ্র চন্দ্র। তিনি বিলেতে লর্ড পরিবারের সঙ্গে বিয়ের সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন কিন্তু স্ত্রী শিক্ষার ঘোর বিরোধী ছিলেন। অতি রক্ষণশীল এই চিকিৎসক কাদম্বিনীর মেডিক্যাল পড়ার খোলাখুলি প্রতিবাদ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁর মেডিসিন পেপারে এক নম্বরের জন্য কাদম্বিনীকে ফেল করিয়েছিলেন!

বিদেশেও তখন মেয়েদের ডাক্তারি পড়া আটকাতে কিছু অধ্যাপক ক্লাসে নির্লজ্জ ভাবে মানবদেহের ডেমনস্ট্রেশন দিতেন। বম্বের গ্র্যান্ট মেডিক্যাল কলেজেও ছাত্রীরা ছাত্রদের কাছ থেকে কটূক্তি ও অশালীন আচরণ পেয়েছিলেন। কাদম্বিনীকে সে সব সহ্য করতে হয়েছিল কি না জানা যায় না। তবে তিনি মেডিক্যাল পড়ার সময়ে বৃত্তি পান। খোদ ফ্লরেন্স নাইটিঙ্গল একটি চিঠিতে লিখেছিলেন— ভারতের মতো গোঁড়া দেশের একটি মেয়ে বিয়ের পর ডাক্তারি পড়ছে এবং একটি বা দু’টি সন্তানের জন্মের সময়েও মাত্র তেরো দিন কলেজ কামাই করেছে এবং সম্ভবত একটি লেকচারও মিস করেনি!

 

একাধিক বার ইচ্ছাকৃত ফেল করানো

সেই কাদম্বিনীকে ‘ব্যাচেলর অব মেডিসিন’ বা এমবি পরীক্ষায় পাশ করানো হয়নি! গবেষক নারায়ণ চন্দ্রের লেখানুযায়ী, চিকিৎসক চন্দ্র মেডিসিন পড়াতেন। তিনি কাদম্বিনীকে মৌখিক পরীক্ষায় তাঁর পেপারে এক নম্বরের জন্য ফেল করিয়ে দেন। চিকিৎসক জে এম কোটস ছিলেন তখন মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ এবং তিনিও মেডিসিনের অধ্যাপক ও অন্যতম পরীক্ষক ছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে, কাদম্বিনীর সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সিন্ডিকেটে আলোচনার পরে কাদম্বিনীকে ‘লাইসেনসিয়েট ইন মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি’ বা এলএমএসের সার্টিফিকেট দেওয়া হয় ১৮৮৬ সালের ৭ অগস্টে। কিন্তু দু’বছর এলএমএস পড়ার পরে ফাইনালে ফের চিকিৎসক রাজেন্দ্র চন্দ্রের বিষয়ে তাঁকে ফেল করানো হল। 

তখন অধ্যক্ষ কোটস নিজের অধিকারবলে কাদম্বিনীকে ‘গ্র্যাজুয়েট অফ দ্য মেডিক্যাল কলেজ অব বেঙ্গল’ বা জিএমসিবি উপাধি দেন। ফলে ডাক্তার হয়ে প্র্যাকটিসের ছাড়পত্র পেয়ে যান কাদম্বিনী। ইডেন হাসপাতালে তাঁকে কাজের সুযোগ করে দেন কোটস। কিন্তু যেহেতু ডাক্তারির এমবি বা এলএমএসের ডিগ্রি তাঁর ছিল না, তাই সেখানে তাঁকে নার্সের মর্যাদা দেওয়া হত। রোগ নির্ণয় বা অস্ত্রোপচার করতে দেওয়া হত না। ১৮৯০-এ তিনি লেডি ডাফরিন হাসপাতালে চাকরি পান। বেতন হয় তিনশো টাকা। ১৮৮৮ থেকেই প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেছিলেন।

তিনিই প্রথম মহিলা চিকিৎসক, যিনি খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্র্যাকটিস করতেন। ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ বা ‘বেঙ্গলি’র মতো কাগজে নিয়মিত বিজ্ঞাপন বেরোত। কিন্তু ডিগ্রি না পাওয়াটা সম্ভবত কাঁটার মতো তাঁকে বিঁধছিল। কারণ, বিরোধীরা প্রতি পদক্ষেপে ওই বিষয়টিকে তুলে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে বিদ্রুপ এবং তাঁকে চিকিৎসকের দায়িত্ব দেওয়ার প্রতিবাদ করছিলেন। তখনই বিদেশে গিয়ে তিনি ডাক্তারি ডিপ্লোমা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিলেত যাওয়ার জন্য টাকার সংস্থান করা, বিদেশে থাকার ব্যবস্থা ও দেশে নিজের আট সন্তানের দেখাশোনার ব্যবস্থা করে তাঁকে বিদেশ যেতে হয়। স্বামী দ্বারকানাথের প্রথম পক্ষের মেয়ে বিধুমুখী ও তাঁর স্বামী উপেন্দ্রকিশোরের দায়িত্বে বাকি সন্তানদের রেখে তিনি বিদেশযাত্রা করেন। সৎ মেয়ের সঙ্গে অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক ছিল তাঁর আজীবন। বিলেত যাওয়ার পাথেয় সংগ্রহ করেছিলেন শিকাগো মহাসম্মেলনের প্রদর্শনীতে ভারতীয় মহিলাদের শিল্পকর্ম পৌঁছে দেওয়ার কাজ নিয়ে।

কাদম্বিনীর ব্যবহৃত দেরাজ

কাদম্বিনীর কাঙ্ক্ষিত ডিপ্লোমাগুলি ছিল এলআরসিপি, এলআরসিএস এবং এলএফপিসি। যা সংগ্রহ করেছিলেন অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায়। ক্লাস করতেন এডিনবরায়। ১৮৯৩ সালের জুলাই মাসে স্কটিশ কলেজের তিনটি ডিপ্লোমা লাভ করেন। কলকাতায় ফেরার পরে ‘বামাবোধিনী’ বা ‘ইন্ডিয়ান মেসেঞ্জার’-এর মতো কাগজগুলি তাঁর তুমুল প্রশংসা করে। কিন্তু বিরোধিতায় ইতি পড়েনি তখনও। চিকিৎসক কাদম্বিনী তাঁর যোগ্যতার পদ বা চাকরি পাননি। কিছু দিন ডাফরিন হাসপাতালে সিনিয়র ডাক্তারের চাকরি করে ইস্তফা দিয়ে নিজের বাড়িতে চেম্বার খুলে পুরোপুরি প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেন। পসার জমে ওঠে দ্রুত।

 

কঙ্কালের ঘর, খেলনা পুতুল 

নাতনি পুণ্যলতার লেখায় পাওয়া যায়, ‘‘বিলেত থেকে উপাধি নিয়ে তিনি যখন দেশে ফিরলেন তখন দেশের লোক খুব আনন্দ ও গৌরব বোধ করলেন এবং আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব মিলে বাড়িতে বেশ একটি উৎসবের সাড়া পড়ে গেল। আমাদেরও আনন্দের সীমা রইল না, সুন্দর সুন্দর খেলনা, পুতুল, ছবির বই উপহার পেয়ে। ছোট বড় সকলের জন্যই দিদিমা কিছু-না-কিছু উপহার এনেছিলেন। দিদিমা বিলাত থেকে ফিরলেন, নতুন কায়দায় তাঁর ড্রইংরুম সাজানো হল। দেশ-বিদেশ থেকে আনা কত রকম সুন্দর সুন্দর জিনিস। আমরা সন্তর্পণে ঘরে ঢুকে, সে সব নেড়েচেড়ে দেখতাম।’ 

দিদিমা কতটা শৌখিন তার বিবরণও দিয়েছেন তিনি, ‘কাদম্বিনী বেশ সুন্দরী ছিলেন। তখনকার সবচেয়ে আধুনিক ফ্যাশানের শাড়ি, জামা, জুতো পরে সহজ স্বচ্ছন্দভাবে চলাফেরা ও বাইরের কাজকর্ম করতেন।’ পুণ্যলতা জানিয়েছেন, বাড়িতে একটা ঘরে ছোটরা ঢুকত না। ওটা ছিল কাদম্বিনীর পড়াশোনার ঘর। ছোটরা বলত ‘কঙ্কালের ঘর’। তার দেওয়ালে মানুষের আস্ত কঙ্কাল ঝুলত। আলমারিতে মোটা মোটা বই, তাকের উপরে সারি সারি শিশিবোতল আর কী সব যন্ত্রপাতি। কাদম্বিনী-দ্বারকানাথ ১৩ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের বাড়িতে পনেরো বছরের দাম্পত্য জীবন কাটান। ওই বাড়িরই তিন তলায় তাঁরা থাকতেন। দোতলায় সংসার ছিল বিধুমুখী ও উপেন্দ্রকিশোরের। স্বামীর মৃত্যুর পরে কাদম্বিনী চলে যান ৬ নম্বর গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেনের বাড়িতে।

 

দ্বারকানাথকে বিয়ে, সমালোচনা

দ্বারকানাথের সঙ্গে বিয়ের সময়ে কাদম্বিনীর বয়স ২১, আর দ্বারকানাথের ৩৯। এক সময়ে দ্বারকানাথ কাদম্বিনীর স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, তার উপরে তিনি বিপত্নীক ও দুই সন্তানের পিতা। মেয়ে বিধুমুখী প্রায় কাদম্বিনীর বয়সি। ছেলে সতীশচন্দ্র রিকেটরোগী ও মানসিক প্রতিবন্ধী। শোনা যায়, এই ছেলের চিকিৎসার যাবতীয় ভার নিয়েছিলেন বিমাতা কাদম্বিনী। সুস্থ করতে নিজের হাতে সোনা ব্যাঙের ঝোল রেঁধে সতীশকে খাওয়াতেন। 

কিন্তু বিদুষী, সুন্দরী কাদম্বিনী এমন লোককে বিয়ে করায় ব্রাহ্ম সমাজে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। ১৮৮৩ সালের এই বিয়ে ব্রাহ্ম মতে সম্পন্ন করেন পণ্ডিত রামকুমার বিদ্যারত্ন। কিন্তু বিয়ে মানতে না পেরে অনেক ঘনিষ্ঠই নিমন্ত্রণ রক্ষা করেননি। এঁদের অন্যতম ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী। কিন্তু কাদম্বিনী-দ্বারকানাথের দাম্পত্য ছিল ব্যতিক্রমী। কাদম্বিনী সম্ভবত এমন এক জনকে জীবনসঙ্গী করতে চেয়েছিলেন, যিনি উদারমনস্ক হবেন এবং নারী স্বাধীনতা নিয়ে কেবল বুলি না আউড়ে সত্যিই সেই আদর্শে অটল থাকবেন। সেই দিক থেকেই তিনি দ্বারকানাথকে পছন্দ করেছিলেন। ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকাগোষ্ঠী এক বার স্ত্রী স্বাধীনতাকে কটাক্ষ করে সরাসরি কাদম্বিনীকে ‘চরিত্রহীনা’ বলেন। দ্বারকানাথ ১৮৯১-এ মামলা করলেন শুধু কাদম্বিনীর জন্য নয়, সমস্ত নারী সমাজের জন্য! তিনি জয়ী হলেন। ‘বঙ্গবাসী’র সম্পাদক মহেশচন্দ্র পালের একশো টাকা জরিমানা, ছ’মাসের কারাদণ্ড হল।

দ্বারকানাথের যে দিন মৃত্যু হয়, সে দিন বিকেলে কলকাতার এক জমিদার বাড়ি থেকে কাদম্বিনীকে প্রসব করানোর জন্য ‘কল’ দেওয়া হয়। সকালে স্বামীহারা চিকিৎসক বিকেলে তাঁর ব্যাগপত্র নিয়ে সেখানে রওনা দেন। হতবাক ও অসন্তুষ্ট আত্মীয়দের বলেছিলেন, ‘‘যে গেছে সে তো আর ফিরবে না, যে নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আসছে তাকে তো আনতে হবে!’’ বড় আশ্চর্য ছিল তাঁর জীবন। অন্য ধাতুতে গড়া ছিল মন। নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলতেন সব সময়। পরিবারের সদস্যেরা কেউ রাত ন’টার পরে বাড়ি ঢুকলে রাতের খাবার দেওয়া হত না। 

ব্রাহ্মসমাজের রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে শান্তাদেবী লিখেছিলেন, ‘‘তিনি ব্রাহ্মসমাজের উৎসবাদিতে আমাদের বাড়িতে আসতেন। ...কাদম্বিনী ভাল ডাক্তার ছিলেন এবং খুব কড়া কড়া কথা বলতেন, অপ্রিয় সত্য বলতে ভয় পেতেন না। নিজের ছেলেমেয়েদেরও বাদ দিতেন না।’’ আবার একই সঙ্গে ছিলেন স্নেহময়ী, যত্নশীলা মা ও দিদিমা। ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও তিনি জড়িয়েছিলেন। জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মহিলা প্রতিনিধিদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। কলকাতায় টিভোলি গার্ডেনে কংগ্রেসের ষষ্ঠ অধিবেশনে অংশ নিয়ে ধন্যবাদজ্ঞাপক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সত্যাগ্রহ আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ-বয়কট আন্দোলনেও অংশ নেন তিনি।

তবে সব কিছুর উপরে ছিলেন ‘চিকিৎসক কাদম্বিনী’। নেপালের রাজা জঙ বাহাদুরের মা এক বার খুব অসুস্থ হলেন। শেষ চেষ্টা হিসেবে কাদম্বিনীকে ডেকে পাঠানো হল। তাঁর ওষুধে রাজমাতা সুস্থ হলেন। কাদম্বিনীকে আলাদা প্রাসাদে থাকতে দেওয়া হয়েছিল। সোনা-রুপোর থালাবাসনে খেতে দেওয়া হত। ফেরার সময়ে রাজমাতাকে সারিয়ে তোলার পুরস্কার হিসেবে প্রচুর অর্থ, দামি পাথর বসানো সোনার গহনা, মুক্তোর মালা, রুপোর বাসন, তামা-পিতল-হাতির দাঁতের জিনিস আর একটি সাদা রঙের গোলগাল, জ্যান্ত টাট্টু ঘোড়া দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চেপেই তিনি কলকাতার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রোগী দেখতে ছুটতেন। রাস্তায় যাওয়ার সময়টুকু অনবরত লেস বুনে যেতেন! যে দক্ষতায় অস্ত্রোপচারে ছুরি চালাতেন, সেই দক্ষতাতেই তৈরি করতে পারতেন অপূর্ব সব লেসের নকশা। ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’ প্রবাদকে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি করে, সময় ও সমালোচনাকে পদানত করেছিলেন কাদম্বিনী!

 

তথ্যসূত্র:  মহিলা ডাক্তার ভিন গ্রহের বাসিন্দা: চিত্রা দেব, কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, প্রথম মহিলা ডাক্তার: মালা দত্ত রায় ছেলেবেলার দিনগুলি, পুণ্যলতা চক্রবর্তী, পাকদণ্ডী: লীলা মজুমদার