১৮৭৪-এ আমেরিকার বিখ্যাত একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে মেটিয়াবুরুজে নবাবের জীবনযাত্রার বর্ণনায় লেখা হচ্ছে— ‘‘তিনি দিন কাটান তাঁর চিড়িয়াখানায় আর ছবি এঁকে, কবিতা লিখে। ওঁর রচিত গান নাকি চমৎকার, অন্তত দেশীয় রুচিমতে।’’
ওয়াজিদ আলি শাহের সন্ধে কাটত গাইয়ে-বা়জিয়েদের আর নর্তকীদের সঙ্গে। তখন প্রাসাদ জ্বলে উঠত অগুনতি ছোট ছোট রঙিন বাতিতে, যা সমানে প্রতিফলিত হত কড়িবর্গা থেকে ঝোলানো কাচের বলে। এখনও সযত্নে রা‌খা আছে সেই সব বাতিদান ও বল।
নবাব তাঁর তিন বাড়ির একেকটাকে বেছে নিতেন একটা গোটা দিনের আঁকাজোঁকা, কবিতা ও সন্ধের আমোদপ্রমোদের জন্য।—‘‘সামান্য দূরের কলকাতা কিছুই খবর রাখত না ওঁর এই জীবনধারার, উল্টে তিনিও এমন এক ঘোরের মধ্যে ছিলেন যেন এই জীবনও অতিবাহিত হচ্ছে অবধে।’’
নবাবের চরিত্রের যেটা আশ্চর্য বিশেষত্ব তা হল জীবনের শেষ দিন অবধি সময়ের কোনও পরিবর্তন মেনে নেননি।
তাঁর এক চিলতে নগরীর দেওয়াল ডিঙোলেই ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা, তার চার লক্ষ জনসংখ্যা নিয়ে উপমহাদেশের বৃহত্তম মহানগর। সেখানে কবি, লেখক, সঙ্গীতকার, বিপ্লবী, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, বাণিজ্যকারদের ছড়াছড়ি। তত দিনে বেঙ্গল চেম্বার্স অফ কমার্স (১৮৫৬) স্থাপনা হয়ে গেছে, ১৮৪০-এর দশক থেকে সক্রিয় আছে কর্পোরেশন, আর তারও বহু আগে থেকেই মহানগর শোভা করে আছে এশিয়াটিক সোসাইটি ও ভারতীয় জাদুঘর। কিন্তু সে-সব নিয়ে এতটুকু হেলদোল নেই নবাবের। হিন্দু নেতৃত্বের বেঙ্গল রেনেসাঁ নিয়ে না হয় নাই বা ঔৎসুক্য রইল মুসলমান নবাবের— বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ ও মন্তব্য করছেন রোজি লেওয়ালিন জোন্স— কারণ তিনি তখনও তাঁর মুঘল ঐতিহ্যে মজুদ, তা বলে কলকাতার সেকালের নাট্যকলা, চিত্রকলা, কাব্যকলাও তাঁর নজর কাড়তে পারল না!  বরং নবাব তখন তাঁর পরিবার পরিজনের বিনোদনের জন্য স্বরচিত নাচ-গান-নাটক মঞ্চস্থ করতে ব্যস্ত। সুলতানখানার ২৪ জন নটনটী, খাস মঞ্জিলের ১১ জন শিল্পী ছাড়াও নকিওয়ালিয়াঁ বা ভাঁড়, তামাশাওয়ালিয়াঁ এবং মুহুররমে আবৃত্তিকার মারসিয়া দলদেরও ডেকে নিচ্ছেন প্রযোজনায়।
তাতে অভিনেতাদের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২১৬, গাইয়ে বাজিয়ে সংখ্যায় ১৪৫, তাদের মাসিক মাইনে ১৩০০ পাউন্ড। তার পরেও তো সিনসিনারি, সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্থ আছে। এভাবেও যে লখনউয়ের ক্যায়সরবাগের পুরনো সেই দিনগুলো ফিরে এসেছিল তা নয়, তবে নবাবের মায়াপুরী নিজের জন্য এক ভিন্ন সময় গড়ে নিতে পেরেছিল। এই সময়ের এক স্মরণীয় নিবেদন ‘রাধাকৃষ্ণ’ নাটক।

সে-নাটকে অভিনেতাদের পোশাক ও গয়না চোখ ধাঁধিয়ে দেবার মতো ছিল। কোরাসের পরিদের পরনে ছিল ভারতীয় পরিধান আর পিশাচ ইফ্রিত মঞ্চে এসেছিল কালো স্যুটবুট ও হাতে গ্লাভস পরে পুরো এক ইংলিশম্যানের সাজে! তাতে দর্শকমহল তো হেসে কুটোপুটি। এসবই উল্লেখিত হচ্ছে মেটিয়াবুরুজে বসে নবাব রচিত তাঁর শেষ প্রধান কাজ ‘মুসম্মত বন্নি’-তে। যা প্রকাশ পেল ১৮৭৫-এ।

জীবনে সুখ বা দুঃখ যা-ই আসুক তা ওঁর ওই অমলধবল অনুভবে কী অপূর্ব লিখে গেছেন নবাব সারাটা জীবন, যা আজও রোমাঞ্চ ও শ্রদ্ধা বিতরণ করে পাঠক মহলে। উনবিংশ শতকের এক অকপটতম আত্মজীবনীও তো এই আমুদে, স্বপ্নিলনয়ন নবাবই লিখেছিলেন! জনমানসে যে-কিতাব থেকে গেছে ‘পরিখানা’ নামে। যার অর্থ পরিদের বাড়ি। যা আসলে পিতার প্রাসাদে ভালবাসায়-ভালবাসায়, যৌনতায়-যৌনতায় বিতোনো তাঁর বাল্য ও যৌবনের গাথা।