সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

খেলতে খেলতে খেয়ালে

প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী এ টি কানন চেয়েছিলেন ক্রিকেট খেলতে। কিন্তু নিয়তি তাঁকে ধ্রুপদী সঙ্গীতের জগতে সম্রাটের আসনে বসিয়েছিল। ছাত্রঅন্তপ্রাণ এই বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পীকে নিয়ে লিখছেন সুদেষ্ণা বসু

AT Kanan

তিনি জানতেন, খেলাই জীবন। ছোট থেকে তাঁর মন ছিল খেলার দিকে। পড়াশোনার চেয়ে সারাদিন খেলে বেড়াতেই অভ্যস্ত ছিলেন। লং জাম্প, হাই জাম্প, সাঁতার, সবেতেই সেরা। পুরস্কারের ছড়াছড়ি। এ দিকে তাঁর বাবা ইল্লেত আলোয়ার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বিশেষ আগ্রহী। কর্নাটকি ধারায় বেহালা বাজাতেন। তিনি বুঝেছিলেন ছেলের গলায় সুর আছে। গায় যখন শুনতে ভাল লাগে। তবে সে সব সিনেমার গান। বিশেষত পঙ্কজ মল্লিক ও সায়গলের গান। বন্ধু-আত্মীয়রাও সেই গানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু তবু তিনি কখনও ছেলেকে সঙ্গীতের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য জোর করেননি। ঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন। সেই সময় এসেছিল অনেক পরে, ক্রিকেট খেলার ফাঁকে। অদ্ভুত এক মজার ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজের নিয়তির সঙ্গে দেখা হয়েছিল অরকুট কান্নাভিরামের। বয়স তখন তাঁর আঠারো।  

কান্নাভিরাম বা সংক্ষেপে কাননের জন্ম ১৮ জুন ১৯২০ চেন্নাইয়ের মইলাপুরে। যদিও তাঁদের আদি বাড়ি ছিল সেকেন্দ্রাবাদ। মা জয়লক্ষ্মীর আদর-যত্নে সেকেন্দ্রাবাদেই কাননের শৈশব কাটে। গোবিন্দন রাজন নামে তাঁর এক ভাইয়ের কথা জানা যায়। বাবা আলোয়ার ছিলেন রেলের কর্মচারী। মেহবুব কলেজ থেকে এসএসএলসি পাশ করার পরে বাবার পরিচিত এক সাহেব অফিসারের সুপারিশে (খেলার দৌলতে) রেলের সিগনাল ইঞ্জিনিয়ারের কাজ পান কানন। তার পর রেলের ক্রিকেট টিমের হয়ে খেলতে শুরু করেন। এই খেলার সূত্রেই ১৯৪০ সালে তিনি গিয়েছিলেন মুম্বইতে। রেলের হয়ে রঞ্জি ট্রোফির ম্যাচ খেলতে। খেলার মাঝে বিরতির দিন তাঁর ইচ্ছে হয়েছিল রেডিয়ো স্টেশন দেখতে যাওয়ার। মুম্বইয়ের সেই নবনির্মিত রেডিয়ো স্টেশন দেখার অভিজ্ঞতার কথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন, “রেডিয়ো স্টেশন একটা দর্শনীয় বস্তুই ছিল। স্টুডিয়ো ঘুরে দেখতে-দেখতে খুব আগ্রহ হয়েছিল গান গাইবার। মানে নিজের গলাটা কেমন তা পরখ করার। মিউজ়িক প্রোডিউসর দিনকর রাওকে মনোবাসনা প্রকাশ করতে, উনিও মজাটা করতে রাজি হয়ে গেলেন। তানপুরা নিয়ে একজন বললেন, ‘কোন স্কেল’? আমি বললাম, আব্দুল করিম খাঁর স্কেল। তবলা, সারেঙ্গি বসে গেল। পরে জেনেছি, তাঁরা দু’জন ছিলেন আল্লারাখা এবং হামিদ হোসেন। ও সব যন্ত্রে বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না আমার। আমি নিজের মতো মাইক্রোফোনের সামনে বসে করিম খাঁর গান আবৃত্তি করার মতো গেয়ে গেলাম। গান শেষ হতেই হইচই। দিনকর রাও বললেন, ‘তোমার এমন পাওয়ারফুল গলা এ ভাবে নষ্ট করছ!’ ”

আব্দুল করিম খাঁর স্কেল বেছে নেওয়ার নেপথ্যে এক মর্মস্পর্শী কাহিনি লুকিয়ে আছে, যার খবর দিলেন কাননসাহেবেরই এক ছাত্রী তুলিরেখা দত্ত। “গুরুজির মুখেই শোনা ঘটনাটা। তাঁর বাবা একবার তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন মহীশূরের রাজদরবারে আব্দুল করিম খাঁয়ের গান শোনাতে। করিম খাঁ ছিলেন ‘কিরানা ঘরানা’র প্রতিষ্ঠাতা। তবে তাঁর কর্নাটকি সঙ্গীত সম্পর্কেও আগ্রহ ছিল এবং মহীশূর রাজদরবারে যাতায়াত ছিল। করিম খাঁকে ‘সঙ্গীত রত্ন’ উপাধিতে সম্মানিতও করেছিলেন মহীশূররাজ। সেই আসর ছিল গুরুজির জীবনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনার প্রথম অভিজ্ঞতা। করিম খাঁর কণ্ঠস্বর এতই মধুর ছিল যে, তা শ্রোতাদের মনে এক আধ্যাত্মিক অনুভূতির জন্ম দিত। তাঁর গান শুনতে-শুনতে শ্রোতাদের নাকি বাহ্যজ্ঞান লোপ পেত। গুরুজির মনেও সেই অনুভূতিই হয়েছিল। গান শুনে তিনি চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। অঝোরে কেঁদেছিলেন।”  

তাই করিম খাঁ ও কিরানা ঘরানা যে কাননসাহেবের জীবনের অঙ্গ হয়ে যাবে, সেটাই স্বাভাবিক। যদিও তখনও তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগৎ থেকে অনেক দূরে। তবু সেই ঘটনা যে তাঁর মনে দাগ রেখে গিয়েছিল, তার প্রমাণ রেডিয়ো স্টেশনে করিম খাঁর স্কেলকেই বেছে নেওয়া এবং তাঁর মতো করে গাওয়ার চেষ্টা করা! এই ঘটনা তাঁর জীবনকে একেবারে বদলে দিয়েছিল। তাঁর নিজের কথায়, “এর পর আশাতীত এক ব্যাপার ঘটল। আমাকে বোম্বের রেডিয়োতে গাইবার অফার দিলেন তিনি (দিনকর রাও)। ছ’মাস বাদে প্রোগ্রাম, ইতিমধ্যে আমাকে সকাল-সন্ধের তিনটে রাগ শিখে নিতে হবে। গানের জন্য পনেরো টাকা পাব, কিন্তু যাতায়াতের গাড়ি ভাড়া নিজেকেই দিতে হবে।” 

আমির খাঁ

ই অনুষ্ঠানের তাগিদেই হায়দরাবাদে ফিরে কাননসাহেব একজন গুরুর সন্ধান শুরু করেন প্রথাগত তালিম নেওয়ার জন্য। বন্ধুদের সাহায্যে তিনি এক মরাঠি সঙ্গীত শিক্ষক লহানুবাবু রাওয়ের কাছে শিখতে শুরু করেন। যদিও লহানুবাবু রাওকে তাঁর প্রথম গুরু বলা ঠিক হবে না। সে যাত্রায় রেডিয়ো প্রোগ্রাম উতরে দিয়েছিলেন অরকুট কান্নাভিরাম। কিন্তু এ বার তাঁর মন মজল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিপুল সাগরে অবগাহনের বাসনায়। তাই এই ঘটনার অল্প পরেই তিনি যখন রেলের কাজে ট্রেনিং নিতে বদলি হলেন কলকাতায়, তা যেন এক আশীর্বাদের মতোই এল তাঁর জীবনে। 

নিজে দক্ষিণ ভারতের মানুষ হলেও কাননের মন মজেছিল উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতে। এর কারণ নিশ্চয়ই আব্দুল করিম খাঁ। করিম খাঁয়ের গায়ন আজীবন তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। তিনি যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা করতে গিয়ে নিজের কণ্ঠবাদনের উপর ভরসা রেখেছিলেন, তা-ও এই করিম খাঁয়ের জীবন ইতিহাস থেকেই নেওয়া বলে মনে হয়। করিম খাঁ প্রথমে সারেঙ্গি বাজাতেন। পরবর্তী কালে তাঁর মনে হয় যন্ত্রবাদন কণ্ঠবাদনের চেয়ে মাত্রাগত ভাবে লঘু পর্যায়ের। ফলে যন্ত্র ছেড়ে তিনি তাঁর মধুর কণ্ঠকেই ব্যবহার করে সঙ্গীত চর্চা শুরু করেন।

কলকাতায় আসার পরে এন্টালিতে সারা দিন ধরে রেলের কাজের ট্রেনিংয়ে ব্যস্ত থাকতেন কানন। অন্য সময়ে ক্রমশ জড়িয়ে পড়তে শুরু করেন অচেনা এই শহরের গানবাজনার জগতের সঙ্গে। যখনই খবর পেতেন কোথাও গানবাজনার আসর বসেছে, তিনি পৌঁছে যেতেন। একবার কলকাতার মির্জাপুর স্ট্রিট অঞ্চলে এক সারা রাতের উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের আসরে শ্রোতা হয়ে তাঁর মনে হয়েছিল, “আমার নিজের গানের মান তত নিচু তো নয়। এই ভাবনা নিয়েই সাহস করে উদ্যোক্তাদের গিয়ে বিনীত ভাবে বললাম, আমি হায়দরাবাদ থেকে এসেছি। গানবাজনা করি। আমাকে যদি কিছুক্ষণ গাওয়ার সময় দেন! কেন তাঁরা সদয় হয়েছিলেন জানি না, তবে স্টেজে বসার সুযোগ পেয়েছিলাম কুড়ি মিনিটের জন্য। এফ শার্পে গাইতাম তখন। মেয়েদের তানপুরা বেঁধে নিয়ে ধরলাম মালকোষ। সময় কম, ফলে সহযোগী বাজিয়েদের কথা না ভেবেই পনেরো মিনিটের মধ্যে তানটান করে একটা হইচই বাধিয়ে দিয়েছিলাম। পাঁচ মিনিট গেয়েছিলাম ঠুমরি। শ্রোতারা মুগ্ধ। আরও গাইবার অনুরোধ আসতে লাগল। কিন্তু আমি রাজি হলাম না... সকলের কাছে আমার পরিচয় হয়ে গেল ‘হায়দরাবাদের ওস্তাদ’।” 

এই হায়দরাবাদের ওস্তাদের একজন গুরুর খুব প্রয়োজন ছিল। “...কলকাতায় আসার আগে খোঁজখবর নিয়েছি কার কাছে শেখা যায়। গিরিজাবাবু তখন রেডিয়োতে সঙ্গীতশিক্ষার অনুষ্ঠান করতেন। সেই সূত্রেই ওঁর সম্পর্কে আগ্রহ ছিল।” এই গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী নিজে শুধু একজন বিরাট মাপের গায়কই ছিলেন না, শিক্ষক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল ভারতজোড়া। তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যামিনী গঙ্গোপাধ্যায়, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, তারাপদ চক্রবর্তী, সুখেন্দু গোস্বামীর মতো স্বনামধন্য শিল্পীরা ছিলেন।

এ হেন একজন গুরুকে কানন খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর কলকাতার প্রথম আস্তানার খুব কাছেই। “আমি থাকতাম কলেজ স্ট্রিট ওয়াইএমসিএ-র বাড়িতে। দিলখুশা কেবিনের কাছে। একটা ছুটির দিন সকালে ওঁর বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। সেখানে যামিনী গাঙ্গুলি, সুখেন্দু গোস্বামী, সুধীরলাল চক্রবর্তী এমন অনেক বড়-বড় শিল্পীর ভিড়, তবু শেষ পর্যন্ত মনের কথাটা বলেই ফেললাম, ‘আমি শিখতে চাই’। গিরিজাবাবু শেখাতে রাজি হলেন না।” এমন ঘটনা অবশ্য ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে আগেও ঘটছে। শিষ্যের হাজার অনুরোধ উপরোধেও গুরু কিছুতেই শেখাচ্ছেন না, এমন যন্ত্রণা অনেক নামীদামি শিল্পী প্রথম জীবনে পেয়েছেন। ভাস্করবুয়া বাখলের মতো বাঘা ওস্তাদের জীবনেও এমন ঘটেছিল বলে জানা যায় কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের লেখা থেকে।

ভাস্করবুয়ার মতো কাননও হাল ছাড়েননি। দিনের পর দিন গিয়ে বসে থেকেছেন। শেষে একদিন মিনতি করলেন, হায়দরাবাদ থেকে এসেছেন, গানবাজনা শেখার খুব ইচ্ছে। গিরিজাবাবু যদি না-ও শেখান, গান শুনে যদি একটু বলে দেন, তাঁর দ্বারা আদৌ গান হবে কি না। নেহাত বাঙালি ভদ্রতার খাতিরে গিরিজাশঙ্কর রাজি হয়েছিলেন কাননের গান শুনতে। সে দিন কানন শুনিয়েছিলেন রাগ টোড়ি। গাইতে-গাইতে কানন লক্ষ করেছিলেন, গিরিজাশঙ্কর চোখ বন্ধ করে  শুনছেন তাঁর গান। এক সময়ে কানন থেমে যান। 

স্ত্রী মালবিকা কাননের সঙ্গে এ টি কানন

ন্তু শোনেন চোখ বুজেই গিরিজাশঙ্কর বলছেন “থামলে কেন?” সাহস পেয়ে কানন আবার গাইতে শুরু করেন। গাইতে-গাইতে তিনি বিভোর হয়ে যান টোড়ির সুরমূর্ছনায়। তার পর হঠাৎ খেয়াল করেন গিরিজাশঙ্করের বোজা চোখ বেয়ে নেমে আসছে অশ্রুধারা। সেই মুহূর্তে কি কাননের মনে করিম খাঁর গান শোনার স্মৃতি ফিরে এসেছিল? আমরা কেউ তা জানি না। শুধু এ টুকু বুঝে নেওয়া যায়, কানন, করিম ও কিরানা সেই দিন এক হয়ে গিয়েছিল। তাঁর গাওয়া শেষ হলে কাননকে জড়িয়ে ধরে অসামান্য শিক্ষক গিরিজাশঙ্কর আক্ষেপ করেছিলেন, “দশ বছর আগে এলে না কেন?”

গুরু হিসেবে গিরিজাশঙ্করকে বছর দুয়েকের বেশি কানন পাননি। তাঁর সঙ্গে গিরিজাশঙ্করের এই সাক্ষাৎ ঘটেছিল চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে। ওই দশকের শেষে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রয়ারি ৬৩ বছর বয়সে গিরিজাশঙ্কর মারা যান। তবু তারই মধ্যে ছাত্রবৎসল এই মানুষটি ভিনদেশি কাননকে নিজের বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ওই বয়সেও তিনি তাঁকে গান যেমন দিয়েছিলেন, তেমনই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাওয়ার সুযোগও করে দিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালে কলকাতায় ‘অল বেঙ্গল মিউজ়িক কনফারেন্স’ এর মঞ্চে কানন প্রথমবার জনসাধারণের সামনে গেয়েছিলেন গিরিজার আগ্রহেই। 

সেই অনুষ্ঠানের পর কানন কলকাতার সঙ্গীত সমাজের একজন হয়ে ওঠেন। কিন্তু এমন সময়ে রেল কোম্পানি তাঁকে আবার বদলির নির্দেশ দেয়। কলকাতার সঙ্গীত সমাজ বনাম নিশ্চিন্ত সরকারি চাকরি, এই দুয়ের একটিকে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। কানন রেলের চাকরি ছেড়ে কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যাওয়াই বেছে নেন। এই সময়েই পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের সঙ্গে কাননের পরিচয় হয়। সরোদিয়া অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় কাননের নামের সঙ্গে ‘টি’ জুড়ে যাওয়ার রহস্য সমাধান করে দিয়ে জানালেন, “কানন সাহেবের গুণে মুগ্ধ হয়ে সকলের সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে জ্ঞানপ্রকাশ বলতেন ‘এটি কানন’। আর সেই থেকেই নাকি এ কানন হয়ে যান এ টি কানন!”

বকুলবাগানে তখন কানন থাকেন। বাড়িতে ছাত্রছাত্রী থেকে সঙ্গীত জগতের দিকপাল ব্যক্তিদের অবাধ যাতায়াত ছিল। রবিশঙ্কর অনেক সময়েই নিরিবিলিতে রেওয়াজ করবেন বলে সেতার নিয়ে চলে আসতেন। ছাদের ঘরটি ছিল তাঁর আস্তানা। প্রখ্যাত হারমোনিয়াম বাদক জ্যোতি গোহ ১৯৭৪ সাল থেকে এ টি কাননের কাছে শিখতে শুরু করেন। তার পর আমৃত্যু অর্থাৎ ২০০৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ তিরিশ বছর তিনি তাঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকেছেন। তিনি জানালেন, “গুরুজির সুখ, দুঃখ, সঙ্গীতের প্রতি নিবেদিত প্রাণ, অসাধারণ মনীষা সব কিছুর একজন নিকটতম সাক্ষী থেকেছি। আমি সে সময়ে সকাল সাড়ে আটটায় গুরুজির ভবানীপুরের বাড়ি গিয়ে হাজির হতাম। দুপুরে ঘণ্টা দুয়েকের ব্রেক। তখন বাড়িতে খেতে আসতাম। রাতে ছাড়া পেতে-পেতে ন’টা-সাড়ে ন’টা বেজে যেত। মিষ্টভাষী এই মানুষটি দক্ষিণ ভারতীয় টানে বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজিতে কথা বলতেন। তাঁর কাছে আসা খুব সহজ ছিল। যে কোনও অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি পৌঁছে যেতেন। মঞ্চে তাঁর প্রবেশ ঘটত প্যান্ট, শার্ট ও একটি জ্যাকেট যেমন তেমন করে চড়িয়ে। তাঁর তানপুরা নিখঁুত ভাবে বাঁধা থাকত। সঙ্গীত পরিবেশন শেষ করে তিনি আর দাঁড়াতেন না। বেরিয়ে পড়তেন ছাত্রদের শেখানোর কাজে। শিক্ষক হিসেবে তিনি তাঁর সব ছাত্রছাত্রীদের কাছে ছিলেন পিতৃতুল্য।” 

জ্যোতি আরও বললেন, “গুরুজির চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য হল, ছাত্রঅন্তপ্রাণ। সারা জীবন ধরে প্রাণপাত করে ছাত্রছাত্রীদের শিখিয়ে গিয়েছেন। তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমি যখন একটু একটু সঙ্গত করতে পারছি, সেটা ১৯৭৭ সাল হবে, তখন থেকেই উনি এবং গুরুমা মালবিকা কানন আমাকে নিয়ে অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে যেতে শুরু করেন। শুধু গান নয়, গুরুজি বহু ছাত্রছাত্রীকে অন্যান্য ভাবেও এমনকি টাকাপয়সা দিয়েও সম্পূৰ্ণ অযাচিত ভাবে সাহায্য করতেন। আমি দেখেছি কোনও দুর্বল চেহারার ছাত্রকে অযাচিত ভাবে টাকা দিয়ে বলতেন, ‘তুমি রোজ মুসুম্বি লেবু খাবে। তোমার শরীর দুর্বল। আর টাকা ফুরিয়ে গেলে বলবে, আমি আবার তোমাকে টাকা দেব।’ কারও আর্থিক অবস্থা আন্দাজ করে নিজেই বলতেন, ‘শোনো তোমাকে মাইনে দিতে হবে না, এমনিই তুমি আমার কাছে শিখতে এসো। কোনও সঙ্কোচ কোরো না।’ এ রকম সব ছাত্রছাত্রীই তাঁর দৌলতে বহু জায়গায় গাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।”

কাননসাহেবের গান শেখানোর উৎসাহ কোন পর্যায়ের ছিল, সেটা বোঝানোর জন্য একটি ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। এটি ‘সঙ্গীত রিসার্চ অ্যাকাডেমি’র স্টাফ তবলচি  চন্দ্রভানজির কাছ থেকে শুনেছিলেন জ্যোতি। “চন্দ্রভানজি একদিন গুরুজির এসআরএ-র কোয়ার্টারে বাজাতে আসছেন। হঠাৎ বাইরে থেকে শুনলেন তিনি কাউকে একটা বলছেন, ‘এ বার ‘সা’ বলো।’ কিন্তু কেউ কোনও শব্দ করছে না। আবার গুরুজির গলা, ‘বলো ‘সা’ বলো।’ আবার কোনও শব্দ নেই। চন্দ্রভানজি ভাবলেন, এটা কোন বেয়াদপ রে! এত বড় সাহস কার দেখি তো! ভিতরে ঢুকে চন্দ্রভানজির চোখ ছানাবড়া। ঘরে কেউ নেই, গুরুজি পোষা বিড়ালটাকে কোলে বসিয়ে গান শেখানোর চেষ্টা করছেন!”

তাঁর গুরু গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী

ননসাহেবের দুটো পোষা বিড়াল ছিল। তিনি যখন গাইতেন, চুপ করে বসে ওরা তাঁর গান শুনত। আর গান শেষ হয়ে গেলে চুপচাপ উঠে চলে যেত। এমন গানভক্ত বিড়াল সারা এসআরএ-তে এত বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল যে, তাদের মধ্যে একজন যখন মারা যায়, এসআরএ-র স্টাফরা তার জন্য রীতিমতো ক্লাসিক্যাল গান সহযোগে শোকযাত্রায় শামিল হয়েছিলেন।

আবার এমনও দেখা গিয়েছে কনিষ্ঠদের কাছ থেকে শিখছেন কাননসাহেব। বয়স্কদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। নতুন সঙ্গীত শিল্পীদের কথা জনেজনে বলে বেড়াচ্ছেন। এমনকি কারও রেকর্ডিং থাকলে নিজে উদ্যোগী হয়ে পৌঁছে যেতেন তাকে অভয় দিতে। ছাত্রী তুলিরেখা দত্ত তাঁর প্রথম রেডিয়ো অডিশন দিতে গিয়ে দেখেন, তাঁর স্টুডিয়োতে পৌঁছনোর আগেই গুরুজি, গুরুমা পৌঁছে গিয়ে, তানপুরা বেঁধে সব রেডি করে তাঁর অপেক্ষায় বসে রয়েছেন। সে দিন তুলিরেখা লজ্জায় ও আনন্দে মাটিতে মিশে গিয়েছিলেন। এ-ও বাহ্য! শিলিগুড়ির রাস্তায় স্ত্রী মালবিকা কাননকে রিকশায় বসিয়ে, কাননসাহেবকে সেই রিকশা টানতেও দেখেছিলেন বড়ে গোলাম আলি খানের শিষ্যা সঙ্গীতশিল্পী মীরা বন্দ্যোপাধ্যায়।

পরের উপকার করতে গিয়েই অরকুট কান্নাভিরামের সঙ্গে আলাপ হয় শান্তিনিকেতনের সঙ্গীতভবনের ছাত্রী মালবিকা রায়ের, যাঁকে কাননসাহেব বিয়ে করেন ১৯৫৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। কলকাতার মহারাষ্ট্র নিবাসের সেই বিয়েতে সানাই বাজিয়েছিলেন আলি আহমেদ হোসেন। যুগলবন্দিতে মেতে উঠেছিলেন ভীমসেন জোশী ও পাত্র স্বয়ং! তাঁদের আলাপ সম্পর্কে বলতে গিয়ে মালবিকা জানিয়েছেন, “কোনও পরিচিতকে শান্তিনিকেতনে ভর্তি করানোর জন্য আমার কাছে অনুরোধ নিয়ে আসেন কাননসাহেব। আমি তদ্বির করেছিলাম। মেয়েটি ভর্তিও হয়েছিল। আর কাননসাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়ে গেল।” ক্রমে দু’জনে সম্পর্ক গভীরতা পায়। বিভিন্ন জায়গায় একসঙ্গে অনুষ্ঠানে গান গেয়েছেন। যদিও এই বিয়েতে মালবিকার বাবা সঙ্গীতশিল্পী রবীন্দ্রলাল রায় রাজি ছিলেন না। তাঁর আশঙ্কা ছিল, ‘উনি মাদ্রাজি, তোমাকে যদি সেই গান গাইতে বাধ্য করেন কিংবা বাঙালি কালচারের সঙ্গে সংঘাত বাধে,’ এই ছিল রবীন্দ্রলালের আপত্তির জায়গা। কিন্তু মালবিকার মনে হয়েছিল, “উনি একেবারে নির্বিরোধী মানুষ। উদার, প্রাণবন্ত আর প্রকৃত শিল্পী স্বভাবের। মনে হল গানের জন্য উনি, যেমনটা আমি। আর বাধা রইল না। সঙ্গীতকেই আমি জীবনে গ্রহণ করলাম।”

সখ্যের আরও এক বড় পরিচয় রয়েছে কাননসাহেবের সঙ্গে আমির খাঁয়ের বন্ধুত্বের মধ্যেও। “আমির খাঁ প্রায় আমার বন্ধুর মতোই ছিলেন। তবে আমাদের দু’জনের গাওয়ার ভঙ্গিটা একেবারেই আলাদা।” তবু আমির খাঁয়ের শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন কাননসাহেব ‘গান্ডা’ বেঁধে। অনেকেই জানেন কাননসাহেব বাংলা সিনেমায়ও গান গেয়েছেন, যার মধ্যে ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় গাওয়া ‘লাগি লগন পতি সখি সঙ্গ’ আজও অমর হয়ে আছে। এই গানটি গাওয়া নিয়ে কাননসাহেব জানিয়েছেন, “ওতে আমার কৃতিত্ব যতটা, তার চেয়ে বেশি পরিচালকের। বাহাদুর খাঁর বাড়িতে একবার দীর্ঘক্ষণ গান গেয়েছিলাম। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ঋত্বিক ঘটক। উনি বিভোর হয়ে শুনে গানের শেষে বললেন, আমার মাথায় একটা ছবির আইডিয়া আছে, সেই ছবিতে গাইতে হবে আপনাকে।” 

নির্দিষ্ট দিনে কাননসাহেবকে স্টুডিয়োতে নিয়ে গিয়ে ঋত্বিক বেশ কিছু খেয়াল, ঠুমরি তাঁকে দিয়ে গাইয়ে নেন। “তবে তা থেকে কিছু অংশ ব্যবহার করে দৃশ্যকে তাৎপর্যবাহী করে তোলাটা তাঁরই ক্রেডিট।” প্রসঙ্গত এই গানটি আমির খাঁ গাইতেন এবং তা শ্রোতাদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু ঋত্বিকের ছবিতে কানন গাইবার পর এই গান এতই জনপ্রিয় হয়ে যায় যে, আমির খাঁ ওই গান গাওয়া বন্ধ করে দেন। গুরু শিষ্যের এমন সখ্য দেখা যায় না!

অরকুট কান্নাভিরামের গায়নরীতির মধ্যে নিজস্বতা ছিল। যে গায়নে কিরানা, গ্বালিয়র, আগ্রা ঘরানা এসে মিলে যেত। তাঁর গলায় রাগ হংসধ্বনি, রাগেশ্রী, যোগ ইত্যাদি তাঁকে বাংলা তথা সারা ভারতে জনপ্রিয় করেছিল। যাঁরা শুনেছেন তাঁরা বাকি জীবনে ভুলতে পারেননি। আকাশবাণীর প্রথম স্তরের শিল্পী ছিলেন কানন। সারা ভারতে সমস্ত সঙ্গীত সম্মেলন, কনফারেন্স বা রেডিয়ো সম্মেলনে তিনি গেয়েছেন।  

ছাত্রী তুলিরেখা দত্তর প্রথম অনুষ্ঠানে এ টি কানন​

চমকপ্রদ এক ঘটনার কথা জানালেন তুলিরেখা ও বনানী। “গুরুজির অত্যন্ত প্রিয় গায়িকা ছিলেন বেগম আখতার। আখতারি বাইয়ের ঠুমরি, দাদরা, কাজরী ওঁকে মুগ্ধ করত। উনি তা শিখতেও চেয়েছিলেন আখতারি বাইয়ের কাছে। কিন্তু একবার এক অনুষ্ঠানে গুরুজির গান শুনে বেগমই তাঁর কাছে শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। যা শুনে গুরুজিই খুব বিড়ম্বনায়  পড়ে গিয়েছিলেন।”  

কাননসাহেবের ছাত্রছাত্রীরা সব দল বেঁধে বাসে করে অনুষ্ঠান করতে যেতেন। সে ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। “একটা বড় এসি বাস ভাড়া করে আমরা কখনও পটনা, কখনও বারাণসী বা পার্শ্ববর্তী রাজ্যের এ রকম কোনও শহরে প্রোগ্রাম করতে বেরিয়ে পড়তাম। সারা রাত ধরে বাস চলত। বাসের সিট তুলে দিয়ে গদি করে রাতে শোওয়ার ব্যবস্থাও থাকত। সিনিয়ররা শুয়ে পড়তেন। আমরা সঙ্কোচ করে শুতে পারতাম না। দিনের বেলা আমাদের দলটা হিন্দি ফিল্মি গানের অন্ত্যাক্ষরী খেলতাম। আমাদের লিডার ছিল জ়াকির হুসেন। দলে থাকতাম আমি, অজয় চক্রবর্তী, আনন্দ গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়, রাশিদ খান, শুভ্রা গুহ, মুসকুর খান, অরুণ ভাদুড়ীর মতো তৎকালীন জুনিয়ররা। সিনিয়ররা হিন্দি গান বিশেষ জানতেন না। ওঁরা আর গুরুজি মুচকি-মুচকি হাসতেন। ওদের দলে থাকতেন গুরুজি, গুরুমা, পণ্ডিত ভি জি যোগ,  বিজয় কিচলু, শিবকুমার শর্মার মতো প্রবাদপ্রতিম মানুষেরা,” জানালেন জ্যোতি গোহ।

পঞ্চাশের দশকে কাননসাহেব ‘ক্যালকাটা মিউজ়িক সার্কল’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৭ সালে ‘সঙ্গীত রিসার্চ অ্যাকাডেমি’ চালু হয়। কানন ও মালবিকা ছিলেন তার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম। তাঁদের অনুরোধেই নিসার হুসেন খান, গিরিজা দেবী, হিরাভাই বরোডেকররা এসআরএ-তে যোগ দেন। এ ছাড়া কলকাতা ডোভার লেন সঙ্গীত সম্মেলনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন তিনি। ১৯৯৩/৯৪ সালে তাঁকে ‘আইটিসি পুরস্কার’ দেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে তাঁকে ‘সঙ্গীত নাটক আকাডেমি’ পুরস্কার দেয় ভারত সরকার।

১৯৮৭ সালে কাননের প্রস্টেট ক্যানসার ধরা পড়ে, যা তাঁর অনুরাগীদের মনের উপর ভীষণ চাপ ফেলে। অনেকেই তাঁকে আর্থিক ভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মালবিকা ও কাননসাহেব রাজি হননি। মুম্বই থেকে চিকিৎসা করিয়ে ফিরে এসে কানন প্রায় দশ বছর পুরো সুস্থই ছিলেন। পরে তাঁর শরীর খারাপ হতে আরম্ভ করে। মাঝেমাঝেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হত। শেষে ডাক্তার বুঝলেন, অপারেশন করা ছাড়া গতি নেই। তাঁর ডাক্তার নিজেও সঙ্গীতপ্রেমী ছিলেন। তাঁর মা ছিলেন কাননের ছাত্রী। জ্যোতি বলে চলেন, “সার্জন সকালে রাউন্ড শুরু করার আগে গুরুজির কাছে আসতেন। তাঁকে অনুরোধ করতেন দু’কলি গেয়ে শোনানোর জন্য। গুরুজির গলা তখনও ছিল অত্যন্ত জোরালো। উনি বলতেন, ওই রোগীদের মাঝে গান করলে অনেকের অসুবিধে হতে পারে। কিন্তু দেখা যেত, সে সময় আশপাশের রোগীরাও তঁার গান শুনতে চাইতেন। মনে আছে, গুরুজিকে যখন অপারেশন করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, উনি গাইতে গাইতে অপারেশন থিয়েটারের দিকে চলেছেন। অপারেশন হয়ে যাওয়ার পর ডাক্তাররা বেরিয়ে এসে বললেন, ওঁকে অজ্ঞান করার আগে পর্যন্ত গাইছিলেন। শেষ পর্যন্ত জোর করেই থামানো হয়।”

কিন্তু তার পরে তাঁর চেতনা আর সে ভাবে ফিরে আসেনি। অপারেশনের পরের দিন, অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বর, ২০০৪ অরকুট কান্নাভিরাম আমাদের ছেড়ে চলে যান। কাননসাহেব বলতেন, গানই তাঁর জীবন। “গাইতেই-গাইতেই আমি চলে যেতে চাই।” তাঁর শেষ ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছিল।

কৃতজ্ঞতা : জ্যোতি গোহ, বনানী মিশ্র সান্যাল, তুলিরেখা দত্ত, অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন