১৯৮৬-র মে মাস।

রবীন্দ্রনাথের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপনের সময়।

তখন ইংল্যান্ডের নানা শহরের আসরে-বাসরে (দিবস অর্থে) কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে একটা কথা খুব মনে আসত। যেখানেই যান মহিলার কোঁচড়ে বাঁধা থাকে শান্তিনিকেতন।

ভাবনাটা ইদানীং ফিরে আসে টুইডের জ্যাকেট-ট্রাউজার বা বুশ শার্ট-ট্রাউজারের মতো বিলিতি পোশাকে শান্তিনিকেতনে ঘুরতে দেখলে অমর্ত্য সেনকে।

কী রকম যেন শান্তিনিকেতন, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড মেলানো-মেশানো একজন সাহেববাবু।

ইংরেজিতে যাকে বলে ‘লর্ডলি স্টুপ’, অভিজাত সাহেবদের ওই ঈষৎ ঝুঁকে নিজের উপস্থিতিকে আরেকটু মান্য করা, তেমন একটা ভাব তিরাশি হওয়া পণ্ডিতের।

তবু ঢালু করা পাটাতন দিয়ে ডায়াসে উঠলেন না, উঠলেন লাফ কষে।

বললেন, ‘‘ইস্পাত বসানো পায়ে ঢালু জমি দিয়ে চড়া বিপদ। তার চেয়ে এই ভাল।’’

কণিকাদি’র তুলনাটা মাথায় ছিল বলেই ওঁকে নিয়ে কণিকাদি’র কথাটা জিজ্ঞেস করলাম।

কণিকাদি বলেছিলেন, ‘‘কী তোমরা এত অমর্ত্যর জ্ঞানগম্যি, বিদ্যাবুদ্ধির কথা বলো, জানো ও কী সুন্দর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত আশ্রমে? ছেলেমেয়েদের মধ্যে একদম প্রথম সারিতে বসে।’’

অমর্ত্য ওঁর অমায়িক বাঙালি হাসিটা হাসলেন।—‘‘ওটা মোহরদি আমার প্রতি স্নেহ-ভালবাসা থেকে বলেছেন। আমি কোনও দিনই কিছু একটা গাইয়ে ছিলাম না। তবে গান শুনতে বরাবর খুব ভালবেসেছি। সঙ্গীত-শিল্পীদেরও। এক বার রবিশঙ্কর যখন হার্ভার্ডের ডি’লিট নিতে এসেছেন, ওঁকে বাড়িতে ডিনারে এনেছিলাম।’’

অমর্ত্য সেন এরকমই।

চট করে প্রশংসা নেবেন না।

ইংরেজদের মতো নিজেকে একটু কমিয়ে বলতেই স্বচ্ছন্দ।

শান্তনিকেতনে ছাত্র সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে বলতে গিয়ে সত্যজিতের জীবনীকার অ্যান্ড্রু রবিনসনকে যেমন বলেছিলেন...

‘‘তখন ওঁকে চিনতাম প্রধানত সুকুমার রায়ের ছেলে হিসেবে— সেই মহান সুকুমার রায়! এর-ওর থেকে শুনতাম ছেলেরও নানা দিকে ট্যালেন্ট। কিন্তু বয়সে (দশ-বারো বছরের), বিদ্যেবুদ্ধিতে এতই ছোট আমি যে মেশার চেষ্টা করিনি।’’

নিজেকে নিয়ে বলার আরেকটা অপূর্ব ধরন আছে অমর্ত্যর।

স্মৃতিতে ধরা ঘটনাবলিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিটেলে নিটোল গল্পের মতো বলতে পারা।

যে গল্পগুলোই একটু একটু করে ওঁর ভাবনা ও যুক্তির অস্ত্র হয়ে ওঠে। সেই সব গল্প ও যুক্তিতে যাবার আগে আরেক জনের কথা বলব।

অমর্ত্য সেনের বই পড়তে গেলে যাঁর পড়ানোর স্টাইল ও একটা কথা খুব মনে পড়ে।

যেসুইট পাদ্রি ও পণ্ডিত ফাদার পিয়ের ফালঁ।

যিনি মরাল সায়েন্স পড়ানোর অজুহাতে আমাদের দর্শন পড়াতেন। পাস্কাল, কামু, তেইয়ার দ্য শারদ্যাঁ। কীরকম গল্প দিয়ে দিয়ে, আর বলতেন, ‘‘আ ম্যান ইজ অ্যাজ ইন্টারেস্টিং অ্যাজ দ্য স্টোরিজ হি হোল্ডজ।’’ একটা মানুষ ততটাই চিত্তাকর্ষক যতটা মনোগ্রাহী তার জীবনের কথাগুলো।

অমর্ত্য সেনের জীবনের এক অতি চিত্তাকর্ষক গল্প দিয়ে শুরু হয়েছে ওঁর যুক্তি ও রসবোধে ঢালা ‘আইডেন্টিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স’ বইয়ের ভূমিকা। লিখছেন...

‘‘কয়েক বছর আগে যখন একটা ছোট্ট সফর সেরে ইংল্যান্ডে ফিরেছি (আমি তখন কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের ‘মাস্টার’ পদে) হিথরো বন্দরের ইমিগ্রেশন অফিসার আমার ভারতীয় পাসপোর্টটা খুব খতিয়ে দেখে বেশ জটিল দার্শনিক প্রশ্ন করে বসলেন। অভিবাসন পত্রে আমার বাড়ির ঠিকানায় চোখ রেখে (মাস্টার্স লজ, ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজ) জিজ্ঞেস করলেন, যে-মাস্টারের আতিথেয়তায় আমি স্পষ্টত আছি, তিনি নিশ্চিত খুব ভাল বন্ধু আমার।

তাতে আমি একটু থমকে গেলাম, কারণ ঠিক ঠাউরে উঠতে পারছিলাম না আমি নিজেকে নিজের বন্ধু বলে দাবি করতে পারি কিনা। কিছুটা ভেবে এই সিদ্ধান্তে এলাম যে ওঁর প্রশ্নের উত্তরটা হ্যাঁ-ই হবে। কারণ, নিজের প্রতি তো সচরাচর আমি বন্ধুভাবাপন্নই থাকি, আর বিশেষ করে যখনই ভুলভাল বকে ফেলি, সঙ্গে সঙ্গে টের পাই যে আমার এমন একখানি বন্ধু থাকতে শত্রুর কী প্রয়োজন!

তো এই ভাবনাচিন্তা করতে যে সময় ব্যয় হল তাতে অভিবাসন অফিসার প্রশ্ন তুললেন, এইটা জানাতে এত সময় লাগার কারণ কী। নাকি আমার ব্রিটেনে থাকার মধ্যেই কোনও গোলযোগ আছে।

যা হোক, সমস্যাটা এক সময় চুকলো ঠিকই, কিন্তু ওই কথোপকথনে একটা ব্যাপার পরিষ্কার হল। যে, পরিচয়-পরিচিতি বেশ গোলমেলে ব্যাপার।’’

এ তো গেল এক জন ব্যক্তি মানুষের পরিচয়ের পরিস্থিতি। কিন্তু সেই ব্যক্তিপরিচয় থেকে মানুষ যখন আরও অসংখ্য মানুষের সঙ্গে একটা গোষ্টী পরিচয়ে সম্পৃক্ত হতে যায়, তখন সঙ্কট আরও ঘনিয়ে ওঠে।

অমর্ত্য সেনের বক্তব্য হল, আজকের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার অনেকটাই ঘোরাফেরা করে বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিবিধ পরিচয়ের আস্ফালন ঘিরে। কারণ মানুষের ভাবনা এবং কাজকে বিচিত্র ভাবে প্রভাবিত করে তার আত্মপরিচয় বা গোষ্ঠী পরিচয়ের ধারণা।

অথচ আমাদের রোজকার জীবনে তো আমরা কত গোষ্ঠীর সদস্য। কোনও দ্বন্দ্বের প্রশ্রয় না দিয়েই তো এক জন একই সঙ্গে ভারতীয় ও বাঙালি হতে পারেন। আবার এমন বাঙালি যাঁর পূর্বপুরুষ অধুনা বাংলাদেশের। তিনি হতে পারেন একজন নারী, ধর্মবিশ্বাসে বৌদ্ধ, খাদ্যাভ্যাসে নিরামিষাশী, পেশায় শিক্ষিকা, নেশায় কবি, জীবনানন্দের ভক্ত, শচীনকর্তার গানের অনুরাগিণী, ক্রিকেট-উচ্ছ্বাসী, সিপিএম-এর ভোটার, আবার পরজন্মে বিশ্বাসী। এই কোনও পরিচয়ই মহিলার একমাত্র পরিচয় নয়, এবং এই সব কিছু নিয়েই তিনি এক জন পূর্ণ ব্যক্তিসত্তা, এবং এই নানা পরিচয়ের অনেকটাই তাঁর পছন্দ করে অর্জিত।

এই পরিচয় ধারণ নিয়ে এক অপূর্ব রসময় গল্প শুনিয়েছিলেন অমর্ত্য, যা বিশের দশক থেকে চরে আসছে ইতালিতে। যেখানে ওই সময়টাতে বেজায় গতিতে ছড়াচ্ছিল ফ্যাসিবাদ।

ফ্যাসিস্ট পার্টিতে গ্রামবাসীদের নাম লেখানোর জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে এক দলীয় কর্মী। সামনে পেয়ে গেল এক সমাজতান্ত্রিক দলের সদস্যকে। তাকে নাম লেখানোর প্রস্তাব দিতেই বলল, ‘‘আমি কী করে তোমার দলে যাব? আমার বাবা ছিলেন সমাজতান্ত্রিক। আমার ঠাকুর্দা ছিলেন সমাজতান্ত্রিক। আমি তোমাদের ফ্যাসিস্ট দলে যেতে পারি না।’’

তখন সেই ফ্যাসিস্ট দলের কর্মী বলল, ‘‘এ আবার কেমন ধারা যুক্তি? ধরো তোমার বাবা যদি খুনি হতেন। তোমার ঠাকুর্দাও হতেন খুনি। তখন তুমি কী করতে?’’

ফ্যাসিস্ট দলের নৃশংস অত্যাচার ও হত্যার অপকীর্তি মাথায় রেখে সোশ্যালিস্ট গ্রামবাসী তখন হেসে উত্তর করল, ‘‘ওহ্, তা হলে তো আমি তোমাদের ফ্যাসিস্ট পার্টিতেই নাম লেখাতাম!’’


 

অমর্ত্য সেনের জীবনে এর চেয়েও দগদগে ও মর্মান্তিক একটা স্মৃতি জুড়ে আছে।

তখন নিতান্তই বালক এবং থাকা হয় ঢাকায়। ঢাকার উয়াড়ি পল্লিতে। যা ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় তল্লাট রমনার থেকে খুব দূরে নয়।

ওঁর পিতা আশুতোষ সেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক।

ওই সময় এক দিন এক বীভৎস সন্ত্রাসের দৃশ্য চাক্ষুষ করল বালক। দেখল চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে একটা লোক ঢুকে আসছে গেট দিয়ে। সারা গায়ে রক্ত, পিঠে ছুরি খাওয়া মানুষটি দিনমজুর কাদের মিঞা। বেচারা আশেপাশের কোনও বাড়িতে কাজের সন্ধানে আসছিল, আর আসার পথে এক হিন্দু বসতি পড়ায় সাম্প্রদায়িক গুন্ডাদের হাতে ছুরি খায়।

বাবা যখন ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন, ও সমানে বলে যাচ্ছিল, ওর বিবি ওকে বারবার বারণ করেছিল, রায়টের মধ্যে শত্রু পাড়ায় না যেতে। কিন্তু ওর না গিয়ে উপায় ছিল না, দাঁতে কাটার মতো খাবারের কুটোটি ছিল না বাড়িতে।

অমর্ত্য বলছেন, সেই অর্থনৈতিক বন্দিদশার মূল্য চোকাতে হল মৃত্যু দিয়ে। যেটা ঘটল হাসপাতালে।

‘অর্থনৈতিক বন্দিদশা’ বোঝাতে অমর্ত্য যে-কথা ব্যবহার করেছিলেন তা হল ‘ইকনমিক আনফ্রিডম’।

প্রয়োগটা অভিনব বলতে অমর্ত্য বলে উঠলেন, ‘‘কয়েনিংটা আমার নয়, কার্ল মার্ক্সের!’’

যাই হোক, বাল্যের ওই অভিজ্ঞতা ভেতরে ভেতরে অমর্ত্যকে ছারখার করে দেয় এবং মানুষের পরিচয়-পরিচিতির ক্ষুদ্র বৃত্তগুলো সম্পর্কে সজাগ করে তোলে। ভাবিয়ে তোলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আর চরম দারিদ্র্যর মারণকামড় নিয়ে। যে-চিন্তাগুলো আর কাদের মিঞার আর্ত মুখটা বারবার ফিরে এসেছে ওঁর বড় বয়েসের লেখায় লেখায়।

অমর্ত্যর ছেলেবেলার আরেক স্মৃতি বড়বেলার চিন্তায় কাজে দিয়েছে।

যখন আন্তর্জাতিক উদ্যোগে দেড় হাজার বছর পর নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে, অমর্ত্য সেন তখন তার মেন্টর গ্রুপের (পরে গভর্নিং বোর্ড-এ পরিণত) চেয়ারম্যান।

যে দিন পৃথিবীর এই প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে পঠনপাঠন শুরু হল অমর্ত্যর মনের পর্দায় খেলছিল সত্তর বছর আগের সেই দৃশ্য।

বলছেন, ‘‘সেই বাল্যে (এগারো বছর বয়েস) আমি অবাক চোখে চেয়ে আছি নালন্দার ধ্বংসাবশেষের দিকে। আর ভাবছি আর কি কখনও এ জায়গাটা প্রাণ ফিরে পাবে না?

 আমি এসেছি দাদু পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেনের সঙ্গে। যিনি আমার সংস্কৃত শিক্ষক এবং যাঁর কাছে আমার ইতিহাসের প্রথম পাঠ।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, জিনিসটা কি একেবারেই হারিয়ে গেল?

বৃদ্ধ মানুষটি— যাঁর মধ্যে সংস্কৃতি নিয়ে আশান্বিত থাকার কোনও বিরাম ছিল না— বললেন: ‘‘হয়তো না। আজও অনেক সুফল দিতে পারে।’’

অপূর্ব সুফল তো দিচ্ছিল নবধ্যায় নালন্দা, তা হলে মেন্টর গ্রুপের চেয়ারম্যান অমর্ত্য সেনকে যে সরে যেতে হল...

আমার কথা শেষ করতে দিলেন না হার্ভার্ড-কেমব্রিজের অধ্যাপক, বললেন, ‘‘ওই প্রসঙ্গ থাক। আমি ঠিক করেছি নালন্দা নিয়ে আর একটা কথাও বলব না।’’

ঢাকায় যদিও কিছুটা বাল্য কেটেছে অমর্ত্যর, ওঁর জন্ম কিন্তু রবীন্দ্ররঞ্জিত শান্তিনিকেতনে। যদিও আবার ওঁর পরিবার এসেছিল ঢাকা থেকে। বিশ্বভারতীর প্রাঙ্গণে জন্মে বিশ্বের প্রিয় পণ্ডিতটির সারাটা জীবন কেটেছে দেশে-দেশে বি‌শ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে-ক্যাম্পাসে। বিশ্বভারতী, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড, এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড, বার্কলি, কর্নেল।

শৈশবে আবার তিনটে বছর (তিন থেকে ছয় বছর বয়েস) কেটেছে বর্মা-র মান্দালয়ে। যেখানে বাবা আমন্ত্রিত অধ্যাপক ছিলেন, আর তার এক দশক আগে কারাবন্দি ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু।

তো এই বাইরে বাইরে থেকে বিশ্বকবিকে দেখার সুযোগ হত?

‘‘অবশ্যই!’’ বললেন অমর্ত্য, ‘‘ঢাকায় থাকতে পুজোটুজো, নানা ছুটিছাটাতে আসা হতই।’’

তার পর তো এক সময় ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি’জ স্কুলের পাট চুকিয়ে ফিরে আসা হল শান্তিনিকেতনে। যেখানকার বিদ্যালয়ের আনন্দপাঠ বালকের মনে ধরেছিল।

ছেলেমেয়েদের সহপাঠ ছাড়াও নানা ভাবে বেশ প্রগতিশীল ছিল কবির ইস্কুল। যেখানে পড়ুয়াদের মধ্যে জিজ্ঞাসু ভাব তৈরি করারই চেষ্টা ছিল বেশি, পরীক্ষার প্রতিদ্বন্দ্বিতা সঞ্চার করার চেয়ে।

এ নিয়ে ভদ্রলোকের একটা সুন্দর গল্প আছে। শুনুন...

‘‘ঔৎসুক্য থাকাটাকেই মান্য করা হত, পরীক্ষার নম্বর-টম্বরকে পাত্তা দেওয়া হত না। আমার মনে আছে, আমার সহপাঠিনী সম্পর্কে আমাদের এক শিক্ষকের মন্তব্য। বলেছিলেন, ‘যদিও ওর পরীক্ষার মার্কস-টার্কস খুবই ভাল, ও কিন্তু সিরিয়াস চিন্তাভাবনাও করতে পারে।’

যদিও আমিও যথেষ্ট ভাল ছাত্র ছিলাম আমাকে বেশ চেষ্টা করে শুধু মার্কস পাওয়া ভাল ছাত্রের দুর্নামটা ঘোচাতে হয়েছিল।’’

অমর্ত্য সেনের বিস্তীর্ণ পড়াশুনো নিয়ে সারা দুনিয়ায় এখন চর্চা হয়।

শান্তিনিকেতনে যখন মুখোমুখি সেই দিনগুলোতেও তিনি একটা গবেষণাপত্রের লেখায় ডুবে আছেন, ওঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতীচী ট্রাস্টের অধিবেশনে যোগ দিতে এসেছেন একটি বিদেশি দল।

তাঁদের নিয়েও কেটে যায় দিনের অনেকটা সময়।

তা হলে পড়েন কখন? জানালেন, নৈশাহারের পর থেকে গভীর রাত অবধি।

জিজ্ঞেস করলাম, কী পড়ছেন এখন?

বললেন, ‘‘হাতের লেখাটা সম্পর্কিত যাবতীয় কিছু।’’

জানতে চাইলাম, প্রিয় পাঁচটি বই কী?

বললেন, ‘‘বলতে পারব না। এক এক সময় এক একটা বই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।’’

—ধরা যাক ‘ওয়র অ্যান্ড পিস’। এটা কি সর্বসময়ের পছন্দের মধ্যে থাকবে না?

—ইতিহাস ও যুদ্ধ নিয়ে ভাবছি যখন তখন তো নিশ্চয়ই। কিন্তু ভাল লাগার মতো অনেক কিছুই তো ভেতরে থাকে। সে ভাবেই বইয়ের পছন্দ ঘোরে ফেরে।

পছন্দের বই নিয়ে অমর্ত্য সেনের এই পর্যবেক্ষণে (নাকি স্বীকারোক্তি) আমি আশ্চর্য হইনি, কারণ ওঁর লেখাতেই পড়েছি...‘‘আমার অল্প বয়েসে পড়শুনো নিয়ে পরিকল্পনা থেকে থেকেই বদলেছে। তিন থেকে সতেরো বছর বয়েস অবধি আমি খুব সিরিয়াসলি নাড়াচাড়া করেছি কখনও সংস্কৃত, কখনও অঙ্ক, কখনও পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে, তারপর শেষে থিতু হলাম অর্থনীতির খামখেয়ালি মোহিনীমায়ায় বশ হয়ে। অবিশ্যি কালে-কালে আমি যে শিক্ষক এবং গবেষক হব, তা নিয়ে বিশেষ দোলাচলে থাকিনি। এই ধারার লোকদের বোঝাতে যে-ইংরেজি শব্দটা ব্যবহার করা হয়— Academic— তার আমি মানে করি ‘নির্ভরযোগ্য’; অভিধানের পুরনো মানেগুলো—‘অব্যহারিক’, ‘তাত্ত্বিক’, ‘আনুমানিক’— আমার পছন্দ নয়।’’

‘সিরিয়াসলি নাড়াচাড়া’ বোঝাতে অমর্ত্য ওঁর স্বভাবদুরস্ত স্টাইলে যে ইংরেজি শব্দটা ব্যবহার করেছেন তা হল ‘flirt’, যা বোঝায় ছেনালি বা প্রণয়রঙ্গ। আর ‘অর্থনীতির খামখেয়ালি মোহিনীমায়া’ বুঝিয়েছেন এ ভাবে— ‘eccentric charms of economics’! এই মুহূর্তে পৃথিবীর এক শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদদের বয়ানে এই বিবরণগুলো এক মধুর সংগতি পায়।

১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ অমর্ত্য অর্থনীতি পড়েছেন প্রেসিডেন্সি কলেজে।

তখনও ওঁর মনে দগদগে স্মৃতি ১৯৪৩-এর বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষ। জমিহীন কৃষকরাই মস্ত বলি সে-দুর্ভিক্ষের। কলকাতার থেকে দূরে শান্তিনিকেতনে বসেও বছর দশকের ছেলেটি হয়তো আভাস পেয়েছিল শহরের রাস্তাজোড়া সেই ডাকের—‘মা ফ্যান দাও!’

অর্থনীতির বিধিসম্মত গবেষণায় লিপ্ত হওয়ার অনেক আগে থেকে যে-সব বিষয়, তত্ত্ব ও যুক্তি ওঁকে ভাবিয়ে আসছে তা হল কল্যাণমূলক অর্থনীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দারিদ্র্য (যার চরম অভিপ্রকাশ হল দুর্ভিক্ষ) এবং যুক্তিভিত্তিক, সহনশীল, গণতান্ত্রিক, সামাজিক মনোনয়ন, নির্বাচন ও পছন্দ।

খামখেয়ালি মোহিনীমায়ায় বশ করে অর্থনীতিশাস্ত্র এক সময় অমর্ত্যকে এনে দাঁড় করালো দুঃখ, দারিদ্র্য, অনাহার, অশিক্ষা, অসাম্য, রুদ্ধস্বর, দুর্নীতি, অবনতি, হানাহানি, মৃত্যুর সামনে।

যাঁর আরেক নাম জীবন।

আর প্রেসিডেন্সিতে অর্থনীতি পড়তে পড়তে আরেকটা নতুন জগতের ইশারাও দেখলেন সদ্য প্রকাশিত একটা বই হাতে আসতে, সামাজিক নির্বাচন নিয়ে কেনেথ অ্যারো-র পথপ্রদর্শক কীর্তি ‘স্যোশ্যাল চয়েস অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়াল ভ্যালুজ’। সামাজিক নির্বাচন ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধ।

এই বইটা পড়া নিয়েও একটা সুন্দর গল্প আছে অমর্ত্য সেনের...

‘‘১৯৫১ সনে কেনেথ অ্যারো-র বইটা প্রকাশ পাওয়ার অল্প দিনের মধ্যে কলেজে আমার উজ্জ্বল সহপাঠী সুখময় চক্রবর্তী বইটির প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সেই সঙ্গে বইয়ে প্রস্তাবিত অ্যারো-র ইম্‌পসিবিলিটি থিওরেম বা অসম্ভব উপপাদ্যের প্রতি।

সুখময়ের মোটামুটি একটা আনুগত্য ছিল বামপন্থার প্রতি, আবার দুশ্চিন্তাও ছিল রাজনৈতিক প্রভুত্ববাদ নিয়ে। তাই দু’জনে আমরা আলোচনাও করলাম অ্যারো-র প্রস্তাবনা নিয়ে। প্রস্তাবনাটা কী? না, কর্তৃত্ববাদী নয় এমন কোনও সামাজিক নির্বাচন ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সামাজিক সিদ্ধান্ত জোগাতে পারবে না। তাতে কি বামপন্থী বা দক্ষিণপন্থী প্রভুত্ববাদের সাফাই গাওয়া হল না?

আমার বিশেষ করে মনে পড়ে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের এক দীর্ঘ দুপুর, যখন শীতের নরম রোদে জানলার পাশে বসে ওর ওই গভীর বিচক্ষণ মুখ নিয়ে সুখময় ওর ব্যাখ্যা শুনিয়ে যাচ্ছে। স্মৃতিটা মাঝে মাঝেই আমাকে তাড়া করে কয়েক বছর আগে হঠাৎ করে ওর মৃত্যু হওয়ার পর থেকে।’’

সংস্কৃত, অঙ্ক, পদার্থবিদ্যা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে অমর্ত্য যেমন এক সময় অর্থনীতির খেয়ালি মায়ায় জড়িয়েছিলেন সেই তিনিই কেমব্রিজে অর্থনীতির গবেষণা করতে করতে জড়ালেন দর্শনচর্চায়।

কীভাবে? সেও এক মজার গল্প।

কেমব্রিজে ওঁর ‘চয়েস অব টেকনিক্স’ নিয়ে তিন বছরের গবেষণা এক বছরে শেষ করে ফাঁকা হয়ে গিয়েছিলেন।

কপাল গুণে প্রাইজ ফেলোশিপ নামে একটা চমৎকার বৃত্তিও পেয়ে যান। যাতে চার বছরের জন্য নিজের পছন্দসই যে-কোনও বিষয় নিয়ে পড়শুনোর সুযোগ হল। অমর্ত্য ওঁর পড়ার বিষয় বাছলেন দর্শন।

২০০৯ সালে প্রকাশ হওয়া ওঁর ‘দ্য আইডিয়া অব জাস্টিস’ (ন্যায়বিচারে ধারণা) বইটার একটা কপি ওঁর সামনে এগিয়ে দিয়ে বললাম, ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে শহরে ঢোকার পথে লম্বা সময় আটকেছিলাম ট্র্যাফিক জ্যামে। তখন একটা বাচ্চা ছেলে এক কাঁড়ি বই হাতে নিয়ে দাঁড়াল। তার মধ্যে দেখি আপনার ‘আইডিয়া অব জাস্টিস’।

লেখক উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কতয় পেলেন?’’

বললাম, ভারতীয় ছ’শ টাকার বই বাংলাদেশী দু’শ টাকায়।

অমর্ত্য সেন সোৎসাহে বললেন, ‘‘আমি তো বম্বেতে ট্র্যাফিক জ্যামে দাঁড়িয়ে কিনেছি একশো টাকায়!’’

তার পরই বলে গেলেন, ‘‘ভাবতে পারেন, পাইরেটেড এডিশনে রয়্যাল্টি মার খেয়েও এত খুশি কেন? আমি দেখছি বই বিক্রি হচ্ছে এবং পাঠক তার সাধ্যের মধ্যে পেয়ে যাচ্ছে। এতে আমার আপসোস নেই।’’

জিজ্ঞেস করলাম, পনেরো-ষোলোটা বই হয়ে গেল, কী আরও বেশি, এর মধ্যে কোনটা বেশি প্রিয় মনে হচ্ছে?

অমর্ত্য বললেন, ‘‘বলতে পারব না। ও ভাবে ভাবিনি।’’

অর্থনীতিবিদ, তাই অর্থনীতি, দারিদ্র্য বা মন্বন্তর নিয়ে লেখা বইকেই হয়তো গুরুত্ব দেবেন। কিন্তু এই যে ন্যায়বিচারের তত্ত্ব নিয়ে পরিণত বয়সে একটা দার্শনিক বই লিখলেন তার পিছনেও তর্কপ্রিয়, যুক্তিধারী অমর্ত্যর একটা গভীর ভাললাগা কাজ করেছে, যা এক দীর্ঘলালিত মনোবাসনা হয়ে ছিল।

অমর্ত্যর মতে সে-বাসনার শিকড়ে দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট-এর একটি অন্তর্দৃষ্টি।

যা বলে: জগৎ ন্যায় ও যুক্তি প্রতিষ্ঠা অধিবিদ্যার নয়, নীতিতত্ত্বের কাজ। আর তাতেই লিপ্ত মানব সমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা।

সেই আশা ও আকাঙ্ক্ষার একটা ছবিও তিনি খুঁজে পেয়েছেন কবি শেমস হিনি-র একটি স্ববকে:

History says, Don’t hope

On this side of the grave

But then, once in a lifetime

The longed-for tidal wave

Of justice can rise up,

And hope and history rhyme.

ইতিহাস বলে কবরের এ পিঠে

দাঁড়িয়ে,

আশায় ভুলো না।

অথচ, অন্তত একবার

জীবনে,

বিচারের কাঙ্ক্ষিত সে-

ঝড়ো ঢেউ

জেগে উঠতে পারে;

মিল হতে পারে

আশা ও ইতিহাসে।

 

এক এক সময় এক-একটা বই যেমন পছন্দের শীর্ষে উঠে আসে অমর্ত্যর, তেমনই ধারা নাকি ওঁর গান ভাল লাগার।

রবীন্দ্রনাথের কোন গান বেশি প্রিয়?

বললেন, ‘‘বলা যাবে না। এক এক সময়, মনের এক এক পরিস্থিতিতে এক এক গান।’’

জিজ্ঞেস করলাম, প্রিয়তম কবিতা হিসেবে যে-দুটি নির্বাচন করেছিলেন এক সময়, তার একটি শেক্সপিয়ারের সনেট ও অন্যটি রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। সে ভাবে কবির কোনও গান উঠে আসতে পারে না?

অমর্ত্য বললেন, ‘‘কেন প্রিয় বলেছি, একটা যুক্তিও দিয়েছি সঙ্গে। গান ভাল লাগার সঙ্গে ভাল লাগার মুহূর্ত ও পরিবেশও জড়িয়ে যায়। তাই বলাটা জটিল হয়ে পড়ে।’’

কবিতার কথাতেও একটা মজার গল্প আছে অমর্ত্য সেনের।

ওঁর প্রথমা স্ত্রী নবনীতা দেবসেনের পাণ্ডিত্য ও কবিখ্যাতির দরুণ ওঁদের বাড়িতে ভক্তের ভিড় লেগেই থাকত।

এক বার এক কবি তাঁর একশ’ নতুন কবিতা নিয়ে হাজির হলেন ওঁকে পড়ে শোনাবেন বলে, শুনে মতামত জানাতে হবে।

অমর্ত্য বলছেন, ‘‘যে হেতু নবনীতা সে-সময় বাড়ি ছিল না, কবি আমাকেই পাকড়াও করলেন কাব্য শোনানোর জন্য। আমি কঁকিয়ে উঠলাম, আমার অত কবিতার বোঝদারি নেই। তাতে স্থিরপ্রতিজ্ঞ কবি আমাকে আশ্বস্ত করলেন, আরওই ভাল হল! আমার তো জানা চাই সাধারণ মানুষ কী ভাবে নেয় আমার কবিতা।

গর্বের সঙ্গে বলতে পারি সে দিন সেই সাধারণ মানুষটি দিব্যি সংযম ও ভদ্রতার সঙ্গে ব্যাপারটা সামলে দিয়েছিলেন।’’

‘সামলে’ দেওয়ার প্রসঙ্গে অমর্ত্য সেনের জীবনের আরও একটি বৃত্তান্তে না গেলেই নয়।

ঘটনাটি ১৯৫২ সালের।

অমর্ত্যর বয়স যখন আঠারো এবং তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র। পরিণত বয়সে মানুষের সুস্বাস্থ্যের ভিত্তিতে যখন সমাজের গুণাগুণ বিচার করার কাজে ব্যস্ত হয়েছেন তখন এই ঘটনাটিই বারবার ওঁর স্মরণে এসে রেফারেন্সের কাজ করেছে। ঘটনাটি এই...

আঠারো বছর বয়েসে অমর্ত্যর মুখে ক্যানসার ধরা পড়ে। সে-সময় আদ্যিকালের চিকিৎসা পদ্ধতির হাসপাতালে কড়া তেজস্ক্রিয় রশ্মিপাতে ওঁর কর্কট নিরাময়ের কাজ হয়।

তাতে ক্যানসার দূর হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে ওঁর টাকরার হাড়গুলোও নষ্ট করে দেয়।

১৯৭১ নাগাদ ফের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল ক্যানসারটা বোধহয় ফিরে এল। অথবা মুখের সেই ক্ষতিগ্রস্ত টাকরার হাড়ের নেক্রোসিস বা বিনষ্টি শুরু হল, ইংল্যান্ডের হাসপাতালে যখন ভর্তি হলেন, ওঁর ডাক্তারদের লক্ষ্য ছিল দুটো। হয় নিছক প্লাস্টিক সার্জারি করে টাকরার মেরামতি (অপারেশনটা জটিল, কিন্তু প্রাণসংশয় নেই), নয়তো এক প্রস্ত ক্যানসার আটকানো।

প্রায় সাত ঘণ্টার সার্জারির পর অ্যানেস্থিসিয়ার প্রভাব কাটিয়ে ভোর চারটেয় ঘুম কাটল যখন, স্বভাবত অস্থিপ্রকৃতির পণ্ডিত জানার জন্য ব্যাকুল ডাক্তাররা কী ব্যামো ঠাউরেছেন। ডিউটিতে থাকা নার্স কিন্তু কিছুতেই বলেন না।

বলার মধ্যে শুধু: ‘‘ন’টায় ডাক্তার এলেই জানতে পারবেন।’’

তাতে তো পণ্ডিতের অস্থিরতা বেড়েই চলল। সেটা নজর করে নার্সেরও ভেতরটা বেশ উশখুশ করছিল। অথচ রোগীকে রোগ নিয়ে কিছু বলা নিষেধ। শেষে একটা সুন্দর হেঁয়ালি ধরলেন  নার্স, বললেন, ‘‘জানেন তো, ডাক্তাররা খুব প্রশংসা করছিলেন আপনার।’’ অর্থাৎ আড়েঠাড়ে বুঝিয়ে দিলেন যে নতুন করে আর ক্যানসার ধরা পড়েনি। আর সেটাই যে রোগীর প্রশংসিত হওয়ার কারণ সেটা আর না বললেও চলছিল।

প্রশংসায় আশ্বস্ত ও মুগ্ধ হয়ে অমর্ত্য সেন ফের ঘুমে ঢলে পড়েছিলেন।

তবে এই ’৭১-এ লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স-এ পড়াতে এলেন এবং বিলিতি চিকিৎসায় নীরোগ হলেন, এরও একটা মূল্য ধরা ছিল।

এই সময়েই স্ত্রী নবনীতার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। এবং জীবনে আসেন দ্বিতীয়া স্ত্রী এভা কলোর্নি। ওঁদের একসঙ্গে বসবাস শুরু ১৯৭৩ থেকে।

মনোনয়ন, পছন্দ নিয়ে যাঁর গবেষণা বরাবর— ‘সোশ্যাল চয়েস’, ‘চয়েস অব টেকনিক্স’-এর নির্ণায়ক সহধর্মিনী নির্বাচন করেছেন মেধা দেখে।

এভা সব সময় চেয়েছেন স্বামী যুগের বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করুন। দারিদ্র্যের পরিমাপ, অসাম্য নির্ণয়, বঞ্চনার তারতম্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মৌল অধিকারভঙ্গ এবং লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে স্বামীর ধারাবাহিক গবেষণা ও রচনার বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন অর্থনীতিজ্ঞ স্ত্রী। অমর্ত্য ওঁর গভীর মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশংসা করেছেন।

তবে যে-কর্কট রোগ থেকে তিনি নিজে রক্ষা পেয়েছিলেন বছর চোদ্দো আগে, সেই কর্কটই প্রাণহরণ করল এভা’র ১৯৮৫-তে। কিন্তু মুখের নয়, পেটের।

তবে মৃত্যুর আগে প্রথমা স্ত্রীর মতো দুটি সুন্দর সন্তান দিয়ে গেছেন বরকে। অমর্ত্য-নবনীতার দুই কন্যা— অন্তরা ও নন্দনা। অমর্ত্য-এভার এক মেয়ে ইন্দ্রাণী,  এক ছেলে কবীর।

মায়ের জন্য মনকেমন করা থেকে ওদের একটু স্বস্তি দিতে এই সময় আমেরিকায় হার্ভার্ড-এ যোগ দেবার কথা ভাবেন। বাবার মতো পুত্রকন্যারও যাতায়াত ও শুরু ক্যাম্পাসে-ক্যাম্পাসে। স্ট্যানফোর্ড, বার্কলি, ইয়েল,  প্রিন্সটন, হার্ভার্ড, ইউসিএলএ, অস্টিন। এবং এক সময় ফিরেও এলেন একেবারে পুরনো পাড়া ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজে।

পুরনো পাড়ায় নতুন বউ এমা রথশিল্ডকে নিয়ে নতুন এক জীবন শুরু হল।

শুধু ট্রিনিটির ‘মাস্টার’ হলেন বলে যে তৃপ্তি হল, তাও নয়। (মাস্টারের পদের সঙ্গে একটা ওয়াইন  সেলারও আসে যেখানে কয়েক হাজার মহার্ঘ্যতম ওয়াইনের বোতল মজুদ! মাস্টারের তৈলচিত্র আঁকিয়েও ঝোলানো হয় অফিসে)...তাও নয়। স্ত্রী এমার কাজের জায়গা ট্রিনিটির পাশের বাড়ি কিংস কলেজ, যেখানে তিনি সেন্টার ফর হিস্ট্রি অ্যান্ড ইকনমিক্স-এর ডিরেক্টর। এবং তখন নিরত আছেন অর্থনীতির পিতৃসুলভ অ্যাডাম স্মিথকে নিয়ে বই লেখায়।

তারপর অনেক জল বয়ে গেছে কেমব্রিজের নদী ক্যাম আর শান্তিনিকেতনের পাশ বেয়ে চলা কোপাই ও অজয় দিয়ে।

ওই সময়ের আগে পরে অর্থনীতির নোবেল পুরস্কারও হাতে এসেছে। যে-টাকায় প্রতীচী ট্রাস্ট  গড়েছেন ভারত ও বাংলাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থা ও লিঙ্গসমতার কাজ আরও একটু এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে।

তাতে একটা বড় উপকার বর্তেছে সমাজের। তাঁর দুই পরম আদর্শের একজন রবীন্দ্রনাথের মতো (অন্যজন গাঁধী) তিনিও ভাল রকম বাঁধা পড়েছেন শান্তিনিকেতনে।

যত দূরেই যান, পায়ে পায়ে নূপুরের মতো বেজে চলে কোপাই। ইয়াসনায়া পোলিয়ানায় অধিষ্ঠিত দেবতার মতো লিও টলস্টয় যেমন সদর্পে মাটিতে পা ঠুকে বলতে পেরেছিলেন ‘এই আমার জায়গা!’ তেমন কিছু বলার সুযোগ আছে ‘দ্য আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’-এর রচয়িতার ভুবনডাঙার মাঠে দাঁড়িয়ে।

কিন্তু বিস্মিত বালকের স্বভাবের অমর্ত্য সেন তেমন কিছু বলতে পারেন না; নাকি চান না?

এ নিয়েও ওঁর একটা মিষ্টি গল্প আছে, বছর কয়েক আগে কলকাতার এক সভায় শুনিয়েছিলেন।

অনেক দিন আগে দক্ষিণ কলকাতায় কাকে একটা খুঁজতে গেছেন।

বাড়িতে কড়া নাড়তে একটা বাচ্চা মেয়ে বেরিয়ে এল।

তাকে জিজ্ঞেস করতে গেটের মুখে দাঁড়িয়ে সে উল্টে জিজ্ঞেস করল, ‘‘তোমার নাম কী? এটা আমার বাড়ি!’’

 

এই সংখ্যার কিছু ছবি: সৌজন্যে ‘প্রতীচী’