প্রত্যেকটি মানুষের মতোই প্রত্যেক বাড়ির নিজস্ব চরিত্র থাকে। আগে তা বোঝা জরুরি। কোন জানালায় কেমন পর্দা মানাবে, কোন দেওয়ালে ট্যাপেস্ট্রি, কোথায় পেন্টিং... তা নির্ভর করবে ঘরের আকার, রং ও আলোর উপরে। ভাল অন্দরসজ্জা হতে পারে বাড়িতে পড়ে থাকা জিনিস দিয়েই। যেমন পুরনো সেলাই মেশিন, ডাবের খোলা, চামড়ার সুটকেস... ঘরের পাশে হেলায় পড়ে থাকে যারা, তারাও অন্দরসজ্জায় মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। 

ঘরের আয়তন: আগে নিজের ফ্ল্যাট বা বাড়ির স্কোয়্যারফুটের হিসেব করে নিন। এ বার বাড়ির কোন দেওয়ালে জানালা, কোন দিকের দেওয়াল পুরো পাবেন তার একটা খসড়া করে নিন। সবশেষে ঘরের কোন কর্নার কী দিয়ে সাজাবেন সেই পরিকল্পনা করতে হবে।

দেওয়ালসজ্জায়: বিভিন্ন প্রিন্টের কাপড় দিয়েও সাজিয়ে ফেলা যায় ঘরের দেওয়াল। ইক্কত, আজরাখ প্রিন্ট বেশ রঙিন হয়। ফলে এই প্রিন্টের কাপড় বাঁধিয়ে ঘর সাজালে ভালই লাগে। কাঁথা স্টিচও বাঁধিয়ে ফেলতে পারেন ফ্রেমে, দেওয়ালেরই এক পাশে বেশ বাঁধানো থাকবে নকশা করা গল্পগাথা। আবার ওয়ালপেপারের মতো ব্যবহার করতে পারেন কাপড়। এখানে সেই কাপড়ের উপরে বেতের কোস্টার ও ছোট ছোট পুতুল ব্যবহার করে সাজানো হয়েছে দেওয়াল। এই দেওয়ালকে ব্যবহার করতে পারেন টিভি ক্যাবিনেটের ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে। বাংলার পটচিত্রও কিন্তু হয়ে উঠতে পারে আপনার দেওয়ালসজ্জার সঙ্গী। 

জ্যাম্বি বাস্কেট: ডিম্বাকার, চৌকো, আয়তাকার ইত্যাদি বিভিন্ন আকারের বাস্কেট কিনতে পাওয়া যায়। রোজকার কাগজ গুটিয়ে রাখা থেকে শুরু করে লন্ড্রি ব্যাগ হিসেবে এই বাস্কেট ব্যবহার করতে পারেন। ছোট, বড় বিভিন্ন সাইজ়ের এই ব্যাগ বাড়ির বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। রান্নাঘরে চামচ, হাতা-খুন্তিও এতে রাখতে পারেন। আবার ছবিতে যেমন বাড়িতে গাছ রাখার জন্য এই বাস্কেট ব্যবহার করা হয়েছে, সে ভাবেও কাজে লাগাতে পারেন। (এই লেখার সঙ্গে রয়েছে হায়দরাবাদ নিবাসী রিমা দাস চৌধুরীর বাড়ির নানা ছবি।) 

বাতিল যারা: ঘরে ঢোকার মুখেই নীলরঙা একটি টেবিলের উপরে শোভা পাচ্ছে গণেশ ঠাকুরের পিতলের মূর্তি। ভাল করে দেখলে বোঝা যায়, পুরনো দিনের পায়ে চালানো সেলাই মেশিনই নীল রঙে রাঙিয়ে নিয়ে রাখা হয়েছে সদর দরজায়। অন্য দিকে আবার ডাবের খোলার মধ্যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ইনডোর প্ল্যান্টস। পুরনো দিনের চামড়ার সুটকেস মনে পড়ে? এ সব জিনিস তো নিশ্চয়ই লফ্টে বন্দি। তাদেরও নামিয়ে ঝেড়েমুছে রেখে দিতে পারেন বৈঠকখানায়। আর মনে পড়ে আচারের বয়াম? সাদা সাদা সেই বয়াম হয়তো রান্নাঘরেই বন্দি। তাদের নামিয়েও গাছ রাখার কাজে লাগাতে পারেন।

রঙের খেলা: ঘর সাজাতে রঙের ভূমিকা অনেকটা খাবার পাতে নুনের মতো। তাকে বাদ দেওয়া যায় না। সঠিক ব্যবহারে রংই হয়ে উঠতে পারে আপনার তুরুপের তাস। ঠিক যেমন ছবিতে আসবাবের নীল রং‌ বাঙ্ময় করে তুলেছে পুরো ঘর। আসবাবে গাঢ় রঙের ব্যবহার থাকলে তা ব্যালান্স করতে দেওয়ালের রং হবে হালকা।

আলোকসজ্জা: ঘর জুড়ে বড় আলো ব্যবহার না করে ছোট ছোট অ্যাম্বিয়েন্স আলোর ব্যবস্থা রাখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বেছে নিতে পারেন হ্যাং লাইট, স্পট লাইট বা টেব্‌ল ল্যাম্প। ছোট বেতের ঝুড়ির মধ্যেও আলো লাগিয়ে নিতে পারেন। এতে যখন আলো সেই ঝুড়ির মধ্য থেকে ঠিকরে পড়বে, বেতের বুনটের ফাঁক দিয়ে সেই আলোই সারা ঘরকে করে তুলবে আরও মায়াবী। পুরনো দিনের কায়দায় ছোট লণ্ঠনের মধ্যেও লম্ফ জ্বালাতে পারেন। পোড়ামাটি বা পিতলদানের উপরে জ্বালিয়ে নিতে পারেন ছোট ছোট মোমবাতি। এতে বিদ্যুতের সাশ্রয়ও হবে অনেকটা।

সবুজের সমারোহ: ঘরে প্রাণের স্পর্শ আনতে পারে একমাত্র গাছ। তাই পিতলের ঘটিতে বা ডাবের খোলায় পুরে সাজিয়ে ফেলতে পারেন টেবিলের উপর বা ঘরের কোনও কোনা। গাছের ফুল এনেও তা ভরে ফেলতে পারেন পিতলের বা কাচের ফুলদানিতে। কাচের বড় ঘেরওয়ালা পাত্রে জলের উপরেও সাজিয়ে রাখা যায়। আর বারান্দা তো থাকছেই গাছপালার জন্য। বারান্দায় সবুজের মাঝেই ব্যবস্থা করুন বসার। 

পরিবেশনে: বাড়িতে অতিথি এলে বা না এলেও পরিবেশনে আনতে পারেন নতুনত্ব। বেতের ট্রে বা কুলো ব্যবহার করতে পারেন খাবার সার্ভ করার জন্য। ছোট হ্যান্ডমেড টুলও ব্যবহার করতে পারেন এই কাজে। তার উপরে খোদাই করে ফুটিয়ে নিন নকশা বা কবিতার লাইন। সার্ভিং ট্রে-র এক পাশে রাখতে পারেন মাইক্রোগ্রিন। দেখতেও ভাল লাগবে, খাবার ইচ্ছেও বাড়বে ।

আমাদের ঘরের মধ্যেই পড়ে থাকে অজস্র জিনিস। তাদের কেউ  বাতিল, কেউ হয়তো অবাঞ্ছিত। শুধু নিজের দেখার ভঙ্গিটা পাল্টালেই দেখবেন তারা পাবে নতুন জীবন আর রূপ খুলবে আপনার অন্দরের।  

ছবি: রিমা দাস চৌধুরী