প্রথম আলোয়

বাঙালি, বিশেষত কলকাতার বাঙালি তখন এক অদ্ভুত সময়ে দাঁড়িয়ে। এক দিকে বাবুরা পায়রা ওড়ানো, নিয়মিত গণিকাগৃহে যাতায়াত অথবা সেখানেই আবাস বানানো, বাড়িতে মদের ফোয়ারা ছোটানো, বাইজি-নৃত্যের আসর বসানোয় ব্যস্ত। অল্পবয়সির দল ‘দুষ্কর্ম-পঙ্কে’ পতিত। আর হিন্দু-সমাজের প্রতি পদক্ষেপ নির্ধারিত হয় টিকিধারীদের ‘বিধান’ অনুসারে।

আবার অন্য দিকে ফরাসি বিপ্লবের অভিঘাতে ময়দানে গিয়ে হিন্দু কলেজের একদল পড়ুয়া ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে ওড়ালেন বিপ্লবের তেরঙা পতাকা! বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে বেশ কয়েক বছর হল ঈশ্বর গুপ্ত মারা গিয়েছেন। ‘আধুনিক’ বাংলা সাহিত্য অবশ্য হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘হিন্দু থিয়েটার’।

সাহিত্য থেকে সমাজ, এমনই নানা ঘাত-প্রতিঘাতে হাঁসফাঁস করছে মহানগর কলকাতা। এমন এক সদ্য বোল শিখতে চাওয়া নগরেই জোড়াসাঁকোর বারাণসী ঘোষ স্ট্রিটের বিখ্যাত ও বিপুল ধনী সিংহ পরিবারে ১৮৪০-এর ফেব্রুয়ারিতে জন্ম নিলেন এক মহা-নাগরিক কালীপ্রসন্ন সিংহ। বাবা নন্দলাল সিংহ, যিনি সাতুসিংহ নামেই পরিচিত। মা ত্রৈলোক্যমোহিনী দাসী। কিন্তু ভরা সংসার করা নন্দলালের আর বেশি দিন হল কই? বছর ছয়েকের ছেলে, পরিবার, জমিদারি সব রেখে ১৮৪৬-এ কলেরায় মৃত্যু হল অত্যন্ত শৌখিন নন্দলালের। ছ’বছরের কালীপ্রসন্নের অভিভাবকত্ব ও তাঁর বিপুল সম্পত্তির দেখভালের জন্য এগিয়ে এলেন পড়শি, বিচারক হরচন্দ্র ঘোষ।

কিন্তু বাবার মৃত্যুর জেরে কালীপ্রসন্নের বাল্যশিক্ষায় যে বিশেষ বাধা উপস্থিত হল, এমনটা নয়। তবে স্কুলে মারামারি, ঠাট্টা-ইয়ার্কি আর হইহুল্লোড়ে এ ছেলের জুড়ি মেলা ভার। ক্লাসেও পড়াশোনা কম, সে সবেই মেতে থাকে ছেলেটা। একদিন ক্লাসে শিক্ষক মন দিয়ে কী একটা পড়াচ্ছেন। আচমকা এক ছাত্র যেন ফুঁপিয়ে উঠল। ‘কী ব্যাপার?’ জানতে চাইলেন শিক্ষক। মাথায় বেশ ভাল রকম একখানা চাঁটি পড়েছে ছাত্রটির। মেরেছে সিংহবাড়ির ওই দুষ্টু ছেলেটাই। ‘কেন এমন কাণ্ড?’ শিক্ষককে কালীপ্রসন্নের সটান জবাব, ‘মহাশয়! আমি জাতিতে সিংহ, জাতীয় স্বভাব ত্যাগ করতে পারিনি। তাই একে মেরেছি!’ আসলে ‘পাঠশালা যমালয় হতেও ভয়ানক’, এ কথা হুতোম কি তখনই বুঝেছিলেন?

এ ভাবেই ক্লাস করতে করতে ১৮৫৭য় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে দিলেন হিন্দু কলেজের কিছু দিনের ছাত্র কালীপ্রসন্ন। আসলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পক্ষে এ ছেলেকে বেঁধে রাখা সম্ভব ছিল না। তার পড়াশোনার ধারাটা যে সে খাতে বয় না।

বাড়ির সুশিক্ষার পরিবেশ ইচ্ছে মতো পড়াশোনার পালে হাওয়া জোগাল। টোলে পণ্ডিতের কাছে সংস্কৃত, উইলিয়াম কার্কপ্যাট্রিক সাহেবের কাছে ইংরেজি পড়া শুরু। দুই ভাষাতেই চোস্ত হয়ে উঠল ছেলেটি। সঙ্গত দিল বাড়িতে থাকা বিপুল বইপত্রের সম্ভারও। পাশাপাশি চলতে থাকল ঠাকুরমা আর মায়ের শিক্ষাও। বিশেষ করে বাংলা শিক্ষা। সংস্কৃত ‘মুগ্ধবোধ’-এ দড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মা-ঠাকুরমার মুখে ছেলেটি শুনতে থাকল কৃত্তিবাস, কাশীরাম দাস সৃষ্ট মহাকাব্যের অনুবাদও। শুনেই মুখস্থ হয় যেন সব কিছু। আসলে ‘ফি পয়ার’ পিছু একটি করে সন্দেশ মেলে যে মায়ের কাছ থেকে!

ক্যালকাটা পুলিশ অ্যাক্ট, সম্পাদনা কালীপ্রসন্নের

প্রভূত সম্পত্তি, ততোধিক শিক্ষার অধিকারী হয়েও উনিশ শতকের মধ্যভাগের বাবুয়ানি বা ভেকধরা পাশ্চাত্য-অনুসরণে ভেসে গেলেন না কালীপ্রসন্ন। আর তাই মোটা চাদর, ধুতি আর চটিই হল তাঁর বাহ্যের আবরণ! এ ভাবেই কখন যেন কৈশোর থেকে ধীরে ধীরে তারুণ্যের জোয়ারে ভাসলেন কালীপ্রসন্ন।

আর এই বেড়ে ওঠার এক ফাঁকেই মাত্র বছর ১৪ বয়সে বিয়ের পিঁড়েয় বসলেন বাবু কালীপ্রসন্ন। পাত্রী ‘রঙ্গপুরের সদর আমিন’ বেণীমাধব বসুর কন্যা ভুবনমোহিনী দাসী। কিন্তু সে খেলাঘর টিকল না। বিয়ের কিছু দিন বাদেই ভুবনমোহিনীর মৃত্যু হল। পরে রাজা প্রসন্ননারায়ণ দেবের দৌহিত্রী শরৎকুমার দাসীর সঙ্গে ফের বিয়ে। কিন্তু এই দাম্পত্যের বীণা কোন সুরে বেজেছে, সে সম্পর্কে ইতিহাস এ যাবৎ তেমন কথা বলে না। তবে কালীপ্রসন্নের মৃত্যুর পরে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র বিজয়চন্দ্রকে দত্তক নেন শরৎকুমারী।

আসলে কালীপ্রসন্নের ‘বাইরের জীবন’ এত বেশি বিস্তৃত যে, তাঁর অন্তর্জীবনের খোঁজ করার মতো অবকাশও হয়তো কারও ছিল না। সেই বিস্তৃত জীবন সাহিত্য, সমাজ, বিচারক সত্তা, পত্রিকা সম্পাদনা, নাট্য-সংস্কার, অনুবাদকর্ম, দানধ্যান, সভাসমিতি-সহ আরও নানা কিছুর ঠাস বুনোটে বাঁধা। কিন্তু এ সব কাজের অন্তরালেই রয়েছে স্বদেশ, স্বজাতির প্রতি সিংহবাবুর গভীর মমতা।

 

প্রতিবাদের প্রহর

এই মমতা কখনও কখনও প্রতিবাদেও প্রকাশিত। তেমনই একটি ঘটনা।

দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নীতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেছেন রেভারেন্ড জেমস লঙ। মামলা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি স্যর মার্ডান্ট ওয়েল্‌সের এজলাসে। এই বিচারপতি বাঙালি সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে চলেন। প্রায়ই বিচারপতির আসন থেকে বলেন, ‘বাঙালি মিথ্যাবাদী, প্রতারক’। মামলাতেও তাঁর এই মানসিকতা প্রতিফলিত হল। লঙ সাহেবের এক মাস কারাবাস ও এক হাজার টাকা জরিমানার নির্দেশ দিলেন ওই বিচারপতি।

কিন্তু এই নির্দেশের তীব্র প্রতিক্রিয়া হল বাঙালি-মানসে। জরিমানার টাকা কালীপ্রসন্নই দিলেন। তবে ওই বিচারপতিকে শিক্ষা দিতে রাজা রাধাকান্ত দেবের নাটমন্দিরে বসল এক বিরাট সভা। কালীপ্রসন্ন তো বটেই, এলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, নবাব আসগর আলি খাঁ, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্বও। অনেকেই অবশ্য পাছে রাজরোষে পড়েন, এই ভেবে এড়িয়েও গেলেন সে সভা। ওই সভা থেকেই ওয়েল্‌সের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় সরব হলেন কালীপ্রসন্ন। ওই বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থার দাবিতে প্রায় কুড়ি হাজার লোকের সই সংবলিত আবেদনপত্র পাঠানো হল ইংল্যান্ডে সেক্রেটারি অব স্টেট চার্লস উডের কাছে। ওয়েল্‌স সম্পর্কে উড সতর্কবার্তা পাঠালেন গভর্নর জেনারেলকে!

 

সৎ-বিচার

কিন্তু শুধু ইংরেজের বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরব হওয়াই নয়, সেই ব্যবস্থার অঙ্গ হয়ে একে শোধরাতেও চাইলেন কালীপ্রসন্ন। ২৩ বছর বয়সে হলেন অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট ও ‘জাস্টিস অব পিস’। আর সেই আসনে বসেই একের পর এক দৃষ্টান্তমূলক রায় দেওয়া শুরু হল।

অভিযোগ এক: টেরিটি বাজার অপরিষ্কার করছেন বর্ধমানের মহারাজা মহতাপ চাঁদ। এই মহারাজা কালীপ্রসন্নের বিশেষ কাছের মানুষ। নিজের বইও উৎসর্গ করেছেন তাঁকে। কিন্তু কালীপ্রসন্ন রায় দিলেন, সব ময়লা সাফ না হওয়া পর্যন্ত ফি দিন ৫০ টাকা করে জরিমানা দেবেন মহারাজা।

অভিযোগ দুই: কলকাতার বাজারে কয়েক জন ব্যবসায়ী কম ওজনের বাটখারা ব্যবহার করছেন। লাভও হচ্ছে দেদার, কয়েক গুণ বেশি। মামলার শুনানি চলল। রায় হল, অভিযুক্ত আট জন দোকানদার প্রত্যেকে ২৫ টাকা করে জরিমানা দেবেন।

কিন্তু শুধু রায়দান নয়, নিজের রায়ে কোথাও ভুল হলে তা সংশোধন করে নিতেও এই যুবক বিচারপতির বিন্দুমাত্র সময় লাগত না। ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা এ বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়। অভিযোগ উঠল, ডাক্তার বীটসনের ‘পকেটবহি’ চুরি করেছেন কেরানি মহেশচন্দ্র দাস। সব দিক বিচার করে মহেশচন্দ্রের কারাবাসের নির্দেশ দিলেন কালীপ্রসন্ন। কিন্তু কিছু দিন পরে সেই ‘বহি অন্যের নিকটে দৃষ্ট’ হয়। সঙ্গে সঙ্গে বিচারক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে মহেশচন্দ্রের মুক্তি চেয়ে চিঠি লিখলেন।

 

সিংহ-জমিদার

আসলে বিচারপতি হিসেবে দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন করতে চেয়েছেন কালীপ্রসন্ন। জমিদার হিসেবেও তা-ই। কিন্তু তা করতে গিয়ে তিনি একটি অভিধা পেলেন, ‘টিকীকাটা জমিদার’। লোকমুখে গল্প প্রচারিত হল, কালীপ্রসন্ন নাকি ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের ‘বশীভূত করিয়া তাঁহাদিগের টিকি ক্রয় করিতেন, পরে ঐগুলি কাটিয়া লইয়া আলমারিতে সাজাইয়া রাখিতেন’। এমনকি সেগুলি কত টাকায় কেনা, সেই তথ্য একটি ছোট্ট চিরকুটে লিখে তা সংশ্লিষ্ট কাটা টিকির সঙ্গে সাঁটানো হত!

কিন্তু এ সব গল্পই অত্যন্ত অতিরঞ্জিত। এর প্রমাণ দেন ‘অর্ঘ্য’ পত্রিকার সম্পাদক অমূল্যচরণ সেন। মূল ঘটনাও তিনিই জানান।

ঘটনাটা এমন— কালীপ্রসন্নের বাড়িতে এক বার কী একটা ব্রতপালন চলছে। সেই উপলক্ষে এক ব্রাহ্মণকে গাভী দান করা হয়েছে। কিন্তু জমিদারের কাছে খবর এল, পথে যেতে যেতেই সেই গাভী নাকি কসাইকে বিক্রি করে দিয়েছেন সেই ব্রাহ্মণ। এর শাস্তিস্বরূপ ওই ব্রাহ্মণকে ডেকে ‘স্বহস্তে তাহার টিকি কাটিয়া লয়েন’ জমিদারমশাই।

কিন্তু এই জমিদারই আবার প্রজার অধিকারের সপক্ষে কথা বলেন। জমিদার ডাকলেই প্রজাকে আসতে হবে, প্রজার বাড়ি থেকে ধান লুট, এ সবেরও চূড়ান্ত বিরোধিতা শোনা যায় তাঁর কাছ থেকে।

 

আমারই বাংলা

শুধু প্রজার ধান ও ধনরক্ষার সপক্ষেই নয়, প্রজার তথা দেশের মুখের ভাষার প্রতিও এমনই মমতা কালীপ্রসন্নের। আর তাই ‘বঙ্গভাষার অনুশীলনের’ জন্য তৈরি করেন একটি ‘ডিবেটিং ক্লাব’। পরে যা ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’ নামে পরিচিত হয়। এই সভা থেকেই প্রকাশিত হয় কালীপ্রসন্ন সম্পাদিত ‘বিদ্যোৎসাহিনী পত্রিকা’। ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে এই সভা প্রবন্ধ প্রতিযোগিতারও আয়োজন করল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি হওয়া এ সব প্রতিযোগিতার পুরস্কার মূল্য দু’-তিনশো টাকা! ওরিয়েন্টাল সেমিনারির চার জন ছাত্রকে তো ভাল বাংলা লেখার জন্য মেডেলই দেওয়া হল। এ সবের জন্য খরচের সবটাই অবশ্য আসে বাবু কালীপ্রসন্নের পকেট থেকে।

‘সমুদয় ব্যয়’ বহন করে অন্যের লেখা প্রকাশেও (‌যেমন, ‘নূতন পুস্তক’, হরিমোহন গুপ্তের ‘শকুন্তলা’ অনুবাদ ইত্যাদি) উদ্যোগী হন কালীপ্রসন্ন। এ ছাড়া ‘সর্বতত্ত্ব প্রকাশিকা’ প্রকাশ, ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’, দৈনিক খবরের কাগজ ‘পরিদর্শক’ সম্পাদনা এবং নানা ভাষার পত্রপত্রিকা প্রকাশে আর্থিক সাহায্য... রয়েছে সে সবও।

জগন্মোহন তর্কালঙ্কার ও মদনমোহন গোস্বামীর শুরু করা ‘পরিদর্শক’-এর সম্পাদনার দায়িত্ব নেওয়ার পরে কালীপ্রসন্ন যে তিনটি প্রতিজ্ঞা বাঙালি পাঠকের কাছে করলেন, তা সাংবাদিকতা এবং সংবাদ-গদ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রতিজ্ঞা তিনটি, ‘সত্যপথ হইতে বিচলিত’ না হওয়া, ‘কোন বিষয়ের অতি বর্ণনা না’ দেওয়া এবং ‘পক্ষপাতদোষে’র ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলার।

বাংলা ভাষা ও সমাজের উন্নতির জন্যও এই তিনটি প্রতিজ্ঞা অত্যন্ত জরুরি। সেই প্রয়োজনীয়তা বুঝেই তাই হয়তো বিতর্ক হবে জেনেও ‘বিবিধার্থ সংগ্রহে’ মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’, দীনবন্ধুর ‘নীলদর্পণ’-এর সমালোচনা করলেন তিনি। ‘মেঘনাদবধ’ প্রসঙ্গে লিখলেন, বাংলা সাহিত্যে এমন কাব্য যে লেখা যেতে পারে, তা ‘...বোধ হয়, সরস্বতীও স্বপ্নে জানিতেন না।’ শুধু তাই নয়, সমসাময়িক পত্রিকাগুলি যখন ‘মেঘনাদবধ’-এর মুণ্ডপাত করছে, তখন বিদ্যোৎসাহিনী সভা এক মঙ্গল-সন্ধ্যায় মাইকেলকে সংবর্ধনাও জানাল!

এমনকি সেই আমলের অত্যন্ত বিতর্কিত ‘নীলদর্পণ’ নাটকের দ্বিতীয় সংস্করণটি প্রকাশ করে বিনামূল্যে তা জনসাধারণের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থাও করলেন কালীপ্রসন্ন। তবে এ কাজ যতটা স্বদেশের জন্য, ততটাই তাঁর নাট্যপ্রেমের জন্যও। 

সেই নাট্যপ্রেম কেমন, তা বুঝতে গেলে দ্রুত ১৮৫৭-য় যাওয়া জরুরি। এই বছরটি ভারতবর্ষের ইতিহাসে সিপাহি বিদ্রোহের সূত্রপাতের সময় হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু পাশাপাশি বাংলা থিয়েটারের জগতেও এটি একটি ঐতিহাসিক বছর। কারণ, এ বছর পরপর তিনটি নাট্যশালা তৈরি হয়। একটি কলকাতার সিমলায় আশুতোষ দেবের বাড়িতে, একটি রামজয় বসাকের চড়কডাঙার বাড়িতে এবং অন্যটি বাবু কালীপ্রসন্নের বাড়িতে। 

কালীপ্রসন্নের বাড়ির নাট্যশালা অর্থাৎ বিদ্যোৎসাহিনী রঙ্গমঞ্চের পথচলা শুরু ‘বেণীসংহার’ নাটকের অভিনয় দিয়ে। সেই অভিনয় দেখতে এলেন বিচারপতি আর্থার বুলার, ভারত সরকারের প্রধান সচিব সিসিল বিডন-সহ আরও অনেকে। সংবর্ধনা মিলল সর্বত্র।

এই সংবর্ধনা ও উৎসাহের বশেই কালীপ্রসন্ন অনুবাদ করলেন ‘বিক্রমোর্ব্বশী নাটক’। তবে তার আগেই মাত্র ১৪ বছর বয়সে লিখে ফেলেছেন প্রহসন ‘বাবু নাটক’। এই নাটকের জনপ্রিয়তা এমনই যে, সেটির সব কপি প্রকাশের মাত্র দু’বছরের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। পরে ধীরে ধীরে ‘মালতী মাধব নাটক’ অনুবাদ, ‘সাবিত্রী সত্যবান’ মৌলিক নাটক রচনাও করেছেন তিনি।

এমন নাট্যপ্রেমের ছোঁয়া দেখা গেল অভিনয় রীতিতেও। তিনি পাশ্চাত্য ধাঁচে ‘আভিনায়িক পাঠ’-এর প্রচার করলেন। আবার ‘বিক্রমোর্ব্বশী’তে আনলেন অমিত্রাক্ষর ছন্দের খানিক আভাস! এর কিছু দিন বাদে ‘পদ্মাবতী’ নাটকে এই ছন্দ নিয়ে এগিয়ে গেলেন মাইকেল।

শুধু নাটক রচনাতেই শান্ত থাকার পাত্র নন কালীপ্রসন্ন। আর তাই ‘বিক্রমোর্ব্বশী’র অভিনয়ে পুরুরবার চরিত্রে রঙ্গমঞ্চেও অবতীর্ণ হলেন। সেই অভিনয় প্রসঙ্গে ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ লিখল, ‘হিজ় মিন ওয়াজ় রাইট রয়্যাল, অ্যান্ড হিজ় ভয়েস ট্রুলি ইম্পিরিয়াল।’

কিন্তু এই নাটক নিয়েই একটি গোল বাঁধল। অনেকে বিশ্বাসই করতে পারলেন না, কালীপ্রসন্নের মতো এক তরুণ অনুবাদ করেছেন ‘বিক্রমোর্ব্বশী’র। এমনকি ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি চিঠিতে লেখা হল, এর লেখক পণ্ডিত দীননাথ শর্মা। প্রতিবাদ জানাল ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’। লিখল, ‘পণ্ডিত মহাশয় স্বয়ং সম্মুখে উপস্থিত থাকিয়া এই মিথ্যা নির্দ্দেশ অস্বীকার করিতেছেন।’

নাটকের পাশাপাশি অজস্র প্রবন্ধ এবং সর্বোপরি ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’য় (প্রথম ভাগের প্রকাশ ১৮৬২, প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগের একসঙ্গে প্রকাশ ১৮৬৪তে) কালীপ্রসন্ন-কীর্তি অন্য উচ্চতায় পৌঁছল। উনিশ শতকের সমাজকে, তার বাবুয়ানাকে, দোষ-গুণকে দুমড়ে-মুচড়ে একেবারে মুখের ভাষায় বাঙালির সামনে হাজির করলেন তিনি। এমনকি যে ব্রাহ্মদের সঙ্গে কালীপ্রসন্নের ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল, সেই ধর্মাবলম্বীদেরও প্রশ্ন করতে ছাড়লেন না, ‘আজকাল ব্রাহ্মধর্মের মর্ম বোঝা ভার, বাড়িতে দুর্গোৎসবও হবে আবার ফি বুধবার সমাজে গিয়ে চক্ষু মুদ্রিত করে মড়াকান্না কাঁদতেও হবে।’ আসলে ধর্ম নিয়ে নয়, বরং এর ব্যবহারিক নানা কিছু নিয়েই আপত্তি কালীপ্রসন্নের।

কিন্তু এই নকশার ভাষা একাধারে যেমন প্রশংসা পেল, তেমনই নিন্দাও জুটল ঢের। স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘হুতোমি ভাষা অসুন্দর এবং যেখানে অশ্লীল নয়, সেখানে পবিত্রতাশূন্য।’ তবে বাংলা গদ্যের ভাষাকে সাবালক করতে ও সাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নিরিখে হুতোমি ভাষাকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।

 

জনহিতে

আসলে সাহিত্য হোক বা সমাজ সংস্কার, কালীপ্রসন্নের যে কোনও কাজে ‘জন’ই ছিল প্রধান লক্ষ্য। আর সেই জনের জন্য যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের প্রতি এই মানুষটির কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। সে কৃতজ্ঞতা কেমন ধারার, সে প্রসঙ্গে দু’-চারটি ঘটনার কথা বলা যেতে পারে।

‘হিন্দু পেট্রিয়ট’-এর সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর পত্রিকায় নীলকর সাহেব আর্চিবাল্ড হিল্‌সের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ আনলেন। সাহেবও মানহানির মামলা ঠুকে দিলেন। রায় হল, মামলার যাবতীয় ব্যয়ভার হরিশ্চন্দ্রকে দিতে হবে। কিন্তু তত দিনে হরিশ্চন্দ্রের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর পরিবারের লোকজন দেখলেন, বাড়ি বিক্রি ছাড়া উপায় নেই। বাঙালির জনকণ্ঠ যে মানুষটি শুনিয়েছেন, তাঁর পরিবারেরই পথে বসার উপক্রম হল। এগিয়ে এলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ, কালীপ্রসন্ন-সহ আরও কয়েক জন। তৈরি হল ‘গৃহ রক্ষা তহবিল’। বাঁচল হরিশ্চন্দ্রের বাড়ি।

আসলে হরিশ্চন্দ্র সম্পর্কে বরাবরই ভীষণ শ্রদ্ধাশীল কালীপ্রসন্ন। তাই তাঁর মৃত্যুর পরে স্মৃতিরক্ষার জন্য ‘পঞ্চসহস্র মুদ্রা’ দান করেন এই জমিদার। কোনও স্মারক তৈরির জন্য বাঙালির কাছে আর্জি জানিয়ে পুস্তিকা লিখে প্রচার করা, হরিশ্চন্দ্রের ‘স্মৃতিমন্দির’ তৈরি করা হলে সুকিয়া বাগান স্ট্রিটে দু’বিঘা জমি দান করার মতো প্রতিশ্রুতি দিতেও দেখা গেল তাঁকে। কিন্তু সেই মন্দির আর দিনের আলো দেখেনি, বাঙালির আলস্যের জন্যই হয়তো।

তবে আলস্যকে প্রশ্রয় দেওয়া সিংহ মহাশয়ের চরিত্রে ছিল না। তাই হয়তো তিনি হাত ধরলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের। বিদ্যাসাগর তখন বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য লড়ছেন। সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন বঙ্গসমাজ থেকে ধেয়ে আসতে শুরু করল বাছাবাছা বাক্যবাণ, চূড়ান্ত বিরোধিতা। কিন্তু সিংহ মহাশয়ের ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’ দাঁড়াল বিদ্যাসাগরের পাশেই। অত্যন্ত সক্রিয় ভাবে। ১৮৫৬-র ৭ ডিসেম্বর প্রথম বিধবা বিবাহ সংঘটনের সময়েও সহযোগিতা করলেন জোড়াসাঁকোর এই মানুষটি। এমনকি ঘোষণা করলেন বিধবা বিবাহ করলেই মিলবে এক হাজার টাকা! তবে সেই আমলের কিছু লোভী মানুষের টাকা পাওয়ার লোভ এই সৎ উদ্দেশ্যকে ভেস্তে দিল।

বিধবা বিবাহের সপক্ষে দাঁড়ানোর পাশাপাশি কৌলীন্যপ্রথা, বহু বিবাহের বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগর যে আন্দোলন গড়ে তুললেন, তাতেও সক্রিয় মদত জোগালেন কালীপ্রসন্ন। কিন্তু এ সবের আগে কৌলীন্যপ্রথার অভিশাপটি কেমন ছিল, তার ছোট্ট কিছু পরিসংখ্যান দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যাসাগরের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, শুধু মাত্র হুগলিতেই ৭৬টি গ্রামের ১৩৩ জন ‘কুলীনের’ স্ত্রীর সংখ্যা ২,১৫১ জন। পূর্ব বঙ্গের বিক্রমপুরে ৬৫২ জন কুলীনের স্ত্রীর সংখ্যা ৩,৫৮৮ জন! এ সবের বিরুদ্ধে কালীপ্রসন্ন তাঁর ‘বিদ্যোৎসাহিনী পত্রিকা’য় প্রবন্ধ লিখলেন। পাশাপাশি, এই প্রথা আইন করে রদের জন্য ব্যবস্থাপক সভায় আর্জিপত্র পাঠানোতেও সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেল কালীপ্রসন্নকে!

সরব হলেন বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধেও। শাণিত ভাষায় তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, এই প্রথা বা অভ্যেস আসলে ‘নানা অনিষ্টের মূল’। আর এই মৌল সমস্যার শিকড় কোনখানে সে প্রসঙ্গে তাঁর কটাক্ষ, ‘...বৈদিক মহাশয়েরা গর্ভেই বিবাহের সম্বন্ধ স্থির করেন।’ 

কিন্তু এ তো গেল সমাজের অন্তর্লীন ঘাত-প্রতিঘাতের ছবি। ভারতীয় সমাজের ভিত্তি যা, অর্থাৎ কৃষি-ব্যবস্থা, সেটিরও উন্নতিতে বিশেষ মনোযোগ দিলেন জমিদারবাবু। উপলব্ধি করলেন কৃষি বিদ্যালয় তৈরি, কৃষি প্রদর্শনী আয়োজন করার। শুধু উপলব্ধিই নয়, সিসিল বিডন যে কৃষি প্রদর্শনীর আয়োজন করলেন, তাতেও বিশেষ সহযোগিতা করলেন এই জমিদার।

আসলে কালীপ্রসন্ন কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা— জনজীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আবশ্যিক উপকরণগুলি কী কী, তা অল্প বয়সেই উপলব্ধি করেছেন। আর তাই বিদ্যোৎসাহিনী পাঠশালা-সহ সাতটি অবৈতনিক স্কুল, চিৎপুরে দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরি, দুর্ভিক্ষে নিজের ‘উত্তরীয় বস্ত্র’টি পর্যন্ত বিলিয়ে দেওয়া, সবেই অগ্রণী মানুষটি।

বর্তমান সময়ে দেশ জুড়ে জলসঙ্কট একটি চর্চার বিষয়। উনিশ শতকের মধ্যভাগে এই মহানগরেও বিশুদ্ধ পানীয় জলের তেমন কোনও ব্যবস্থা ছিল না। বিষয়টি দেখে ইংল্যান্ড থেকে ২,৯৮৫ টাকায় চারটি ‘ধারাযন্ত্র’ আনালেন কালীপ্রসন্ন। সেগুলি বসানো হল কলকাতার চার জায়গায়।

 

মহাভারতের সঙ্গে

জনহিতে এমনই নানা বিতরণ আমৃত্যু করেছেন কালীপ্রসন্ন। কিন্তু এই বিতরণ-কাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ তাঁর মহাভারতের বঙ্গানুবাদ খণ্ডে খণ্ডে জনতাকে বিলিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি।

কালীপ্রসন্ন অনূদিত মহাভারত

সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এই মহা-অনুবাদ বিষয়ে দু’-চার কথা বলা আবশ্যিক। জীবনীকার মন্মথনাথ ঘোষের মতে, জনশ্রুতি যে, কালীপ্রসন্ন মহাভারতের কিছু অংশের বঙ্গানুবাদ করে তা অভিভাবক হরচন্দ্রের কাছে নিয়ে যান এবং গোটা মহাকাব্যটির অনুবাদ করার কথা বলেন। বিষয়টি শুনে হরচন্দ্র পণ্ডিতদের সহযোগিতা নেওয়ার কথা বলেন। কালীপ্রসন্ন বিদ্যাসাগরের কাছে গেলে তাঁর সক্রিয় পরামর্শে এবং সাত জন পণ্ডিতের সহযোগিতায় প্রায় আট বছর ধরে এই অনুবাদটি হয়। যাঁর কাছে হুতোমি ভাষা অশ্লীল ঠেকেছিল, সেই বঙ্কিমচন্দ্রও ‘ক্যালকাটা রিভিউ’-এ অভিনন্দন জানালেন। পাশাপাশি, ‘কৃষ্ণচরিত্র’র প্রথম ভাগের বিজ্ঞাপনে কালীপ্রসন্নের এই অনুবাদের প্রতি ‘গুরুতর’ ঋণ স্বীকারও করলেন বঙ্কিম।

এ বার আসা যাক সেই বিলিয়ে দেওয়ার কর্মযজ্ঞে। ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’য় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে জানানো হয়, ‘মহাভারতের আদিপর্ব তত্ত্ববোধিনী সভার যন্ত্রে মুদ্রাঙ্কন আরম্ভ হইয়াছে, অতি ত্বরায় মুদ্রিত হইয়া সাধারণে বিনামূল্যে বিতরিত হইবে।’ বরাহনগরের ‘সারস্বতাশ্রম’ ও ‘পুরাণসংগ্রহ কার্য্যালয়’-এর বাড়িতে অনুবাদ সম্পূর্ণ হয়ে ১৭টি খণ্ডে প্রকাশ পায়। আর খণ্ড প্রতি তিন হাজার কপি করে তা বিতরিত হয়! অর্থাৎ মোট প্রায় ৫১ হাজার কপি বিনামূল্যে বিতরিত হয়েছিল। বিনামূল্যে বিতরণের ছবিটা এমনই ছিল যে, প্রথম ওই বিজ্ঞাপনেই কলকাতার বাইরের লোকজন, 

যাঁরা এই বই নিতে আগ্রহী, তাঁদের জানানো হয় ‘ডাক স্ট্যাম্প প্রেরণ করিবেন না।’ কারণ তাঁদের কাছে বই পৌঁছে দিতে প্রতিটি জেলায় নিয়োগ করা হয় এক জন করে এজেন্ট!

 

শেষ নাহি যে

কিন্তু মহাভারতের অনুবাদকার্যের এই সুবিশাল পরিকল্পনায় কম করে ‘আড়াই লক্ষ মুদ্রা’ খরচ হয়েছিল বলে জনশ্রুতি। এই ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে ওড়িশায় সিংহ পরিবারের বিস্তৃত জমিদারি হস্তান্তরিত হল। বোধহয় হাতছাড়া হল বেঙ্গল ক্লাবের বাড়িটিও।

কার্যত কপর্দকশূন্য অবস্থায় ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বন্ধুরাও মুখ ফেরালেন, ঠকালেনও। কিন্তু কালীপ্রসন্ন ঠকেও জনহিতের নেশা ছাড়তে পারলেন না। ফলে, যাঁরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, তাঁদের নৈতিক চরিত্রের বদল ঘটতে পারে, এই আশায় ফের তাঁদেরই বিশ্বাস করলেন। এই পরিস্থিতিতে ঋণজালে আটকে পড়লেন সিংহ জমিদার।

উপর্যুপরি নানা আঘাতে বিধ্বস্ত কালীপ্রসন্ন এ বার আঁকড়ে ধরলেন বেঁচে থাকার এক কঠিন অবলম্বনকে। নিেজকে ডুবিয়ে দিলেন মদের নেশায়। কিন্তু তখনও জ্ঞানতৃষ্ণা তাঁকে ছেড়ে যায়নি। পরিকল্পনা করলেন এক ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার। ‘বঙ্গেশ বিজয়’ নামে সেই উপন্যাসের দুই ফর্মা জগন্মোহন তর্কালঙ্কার ভট্টাচার্যের ছাপাখানায় ছাপাও হয়। তবে উপন্যাসটি অসমাপ্ত।

কারণ, ১৮৭০-এর ২৪ জুলাই ডিসঅর্ডার অব লিভারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩০ বছর পাঁচ মাস বয়সে এই মহানগর থেকে বিদায় নেন কালীপ্রসন্ন। কালীপ্রসন্নের শেষ জীবনের মদ্যপানকে অনেকেই ‘নৈতিক অবনতি’ ও তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে দেখেন। কিন্তু তার পরেও কর্মকাণ্ডের জোরেই মদ্যপানের ‘দোষকেও’ অতিক্রম করে যান কালীপ্রসন্ন। রাজকৃষ্ণ রায় তাই লিখেছিলেন, ‘যদিও তোমাতে কিছু দোষ দেখা যায়,/ এহেন মহান্ গুণে সে দোষ কি আর/ ধরে কেহ; দোষাকারে যেমতি সুধার/ কলঙ্ক ঢাকিয়া করে গুণের প্রচার।’— এই গুণ দিয়েই অশেষের উদ্দেশে যাত্রা কলকাতার মহা-নাগরিকের! 

 

ঋণ: ‘বাংলার সমাজ ও সাহিত্যে কালীপ্রসন্ন সিংহ’: পরেশচন্দ্র দাস, ‘মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ’: মন্মথনাথ ঘোষ, হেইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, ‘সটীক হুতোম প্যাঁচার নকশা’: সম্পাদনা— অরুণ নাগ, ‘বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ’: বিনয় ঘোষ, ‘দি ইন্ডিয়ান স্টেজ’ (দ্বিতীয় খণ্ড): হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত